📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের মুসলিম বাহিনীতে যোগদান

📄 আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের মুসলিম বাহিনীতে যোগদান


যুদ্ধ-প্রস্তুতির প্রারম্ভে উত্তর থেকে আগত খ্রিস্টান বাহিনীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা হলো। প্রথম দল ইউরোপীয় সৈন্যদের, দ্বিতীয় দল আরাগোনের এবং তৃতীয় দল ক্যাসটেলা, পর্তুগাল, লিওন ও নাফার রাষ্ট্রের। তৃতীয় দলটি ছিল খ্রিস্টান বাহিনীর সবচেয়ে বড় অংশ। সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী প্রথমে রাবাহ দুর্গ অবরোধ করল। রাবাহ দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন বিখ্যাত আন্দালুসী সেনানায়ক আমীর আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস। খ্রিস্টান বাহিনী দীর্ঘক্ষণ ধরে রাবাহ দুর্গ অবরোধ করে রাখল। অবরোধের সময় দীর্ঘ হওয়ায় আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস উপলব্ধি করলেন এখান থেকে তাঁর ও সঙ্গী মুসলমানদের বের হওয়ার কোনো পথ নেই। তিনি পরিকল্পনা করলেন তারা এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন এবং মূল মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবেন। তাই তিনি অবরোধকারী খ্রিস্টান নেতার কাছে প্রস্তাব রাখলেন, তিনি যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্রসহ পুরো দুর্গ তাঁর হাতে তুলে দেবেন, বিনিময়ে তাঁকে এবং সকল মুসলিম নাগরিককে নিরাপদে বেরিয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। খ্রিস্টান রাজা এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ফলে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস-এর নেতৃত্বে অসংখ্য মুসলমান দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে রওয়ানা হলো।

কিন্তু সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীর ইউরোপীয় পক্ষ আলফনসোর এ সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাল। তারা কেবল মুসলমানদের হত্যা করার জন্যই ইউরোপের দূর-দূরান্ত থেকে খ্রিস্টান বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। সুতরাং তাঁদের চোখের সামনে মুসলমানেরা এভাবে নিরাপদে বেরিয়ে যাবে, এটা তাদের বরদাশত হলো না। কিন্তু আলফনসো জানতেন যে পরে যখন তিনি মুসলমানদের অন্যান্য দুর্গ অবরোধ করবেন, তখন তাঁর এই বদান্যতা কাজে দেবে। কিন্তু ইউরোপীয়ানরা তা অনুভব করতে পারল না এবং অনেকেই বাহিনী ছেড়ে চলে গেল। ফলে ইকাব প্রান্তরের মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পেল প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য এক বড় নৈতিক ও বস্তুগত বিজয়। কিন্তু এই পলায়ন সত্ত্বেও খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

টিকাঃ
৪৫৪. জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১০৯।
৫৫৫. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ ৪০১, ইবনে আবি যারআ', রায়দুল কিরাতাস, পৃ : ২৯৬, আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২২ ও জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১১৪।
৫৫৬. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৪৬৬, আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২৩।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দুষ্ট সঙ্গীর পরামর্শে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে হত্যা

📄 দুষ্ট সঙ্গীর পরামর্শে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে হত্যা


আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস যখন আননাসির লি-দীনিল্লাহর কাছে পৌঁছালেন এবং আননাসির জানতে পারলেন যে, আবুল হাজ্জাজ রাবাহ দুর্গ ত্যাগ করে এসেছেন এবং দুর্গ থেকে যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদসামগ্রী খ্রিস্টান বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেছেন, তখন তাঁর উযীর আবু সাঈদ বিন জামে' দুর্গের প্রতিরক্ষায় অবহেলার অপরাধে আবুল হাজ্জাজকে হত্যা করার পরামর্শ দিল। আননাসির লি-দীনিল্লাহ তাঁর এই উযীরের পরামর্শে সামান্য দ্বিধা না করে আন্দালুসের মহান বীর সেনাপতি আবুল হাজ্জাজকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেন।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল আননাসির লি-দীনিল্লাহর মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিকগুলো হলো:
১. আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস এভাবে দুর্গ ছেড়ে এসে কোনো ভুল করেননি। তিনি যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বৃহত্তর মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যদি তিনি দুর্গের ভেতরেই অবস্থান করতেন, তবে তাঁর এবং সঙ্গী মুসলমানদের প্রাণনাশ ছাড়া আর কিছুই ঘটত না।
২. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, তারপরও এই ভুলের শাস্তি কোনোমতেই প্রাণদণ্ড হতে পারে না।

আননাসির লি-দীনিল্লাহ-এর এই ভুল সিদ্ধান্তের ফলে মুসলিম বাহিনী একজন সুদক্ষ ও মহান বীরকে হারাল। এর ফলে আন্দালুসী বাহিনীর সদস্যদের মনে মাগরেব ও আন্দালুসের একটি বিভাজন কাজ করতে লাগল। প্রত্যেকের হৃদয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হলো। এ কারণেই ঐতিহাসিক মাক্কারী লিখেছেন, 'ইকাব যুদ্ধের পরাজয় ছিল আন্দালুস ও মাগরেব—উভয় অংশের জন্য এক মহাভয়ঙ্কর বিপর্যয়। আর এর অন্যতম কারণ ছিল অসংগঠিত প্রশাসন-নীতি। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্দালুসী সেনাপতিদের খলীফা আননাসির লি-দীনিল্লাহ ও তাঁর উযীর তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন এবং ঐ জনৈক আন্দালুসী সেনাপতিকে হত্যা করেছিলেন। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর মানসিকতা ও ইচ্ছাশক্তি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়।'

টিকাঃ
১৬৮. ইবনে আবি যারা‘, রাওদুল কিরাতাস, পৃ. : ২৬৮ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৫/২৪৯।
১৬৯. তাবারী, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৭৫।
১৭০. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৪০৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আননাসির লি দ্বীনিল্লাহর যুদ্ধ-কৌশল এবং ভুলের ধারাবাহিকতা

📄 আননাসির লি দ্বীনিল্লাহর যুদ্ধ-কৌশল এবং ভুলের ধারাবাহিকতা


আননাসির লি-দীনিল্লাহ সম্মুখযুদ্ধের পরিকল্পনা ও সেনাবাহিনী বিন্যাসের ক্ষেত্রে একের পর এক ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। তিনি পুরো বাহিনীকে সম্মুখ ফ্রন্ট ও পশ্চাৎ ফ্রন্ট—এই দু’ ভাগে বণ্টন করলেন। কিন্তু সম্মুখ ফ্রন্টে রাখলেন এক লক্ষ ষাট হাজার স্বেচ্ছাসেবক যোদ্ধাকে। আর পেছনের অংশে রাখলেন নিয়মিত মুওয়াহহিদী বাহিনীকে। যদিও স্বেচ্ছাসেবক যোদ্ধাগণ ঈমানী চেতনায় উদ্দীপ্ত ছিলেন, কিন্তু বড় সমরক্ষেত্রে লড়াইয়ের দক্ষতা ও পূর্ব অভিজ্ঞতা তাঁদের ছিল না। বিপরীতে খ্রিস্টান বাহিনী তাঁদের সম্মুখ ফ্রন্টের জন্য বাছাই করেছিল বাহিনীর সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও শ্রেষ্ঠ সৈনিকদেরকে। সুতরাং স্বাভাবিক বিবেচনাবোধের দাবি ছিল যে, আননাসির লি-দীনিল্লাহ মুসলিম বাহিনীর অগ্রভাগে এমন দক্ষ সৈন্যদের রাখবেন, যারা খ্রিস্টান বাহিনীর প্রথম হামলা সফলতার সঙ্গে প্রতিরোধ করতে পারবে। কিন্তু আননাসিরের ভুল পরিকল্পনায় ঘটল এর সম্পূর্ণ উল্টো।

ভুল পরিকল্পনার ধারা এখানেই থামল না। আননাসির আন্দালুসী সৈন্যদেরকে রাখলেন বাহিনীর ডান বাহুতে। সেনাপতি আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে হত্যা করায় তাঁদের অন্তর তখন ব্যথা ও ক্ষোভে পূর্ণ ছিল। সুতরাং খ্রিস্টান বাহিনীর প্রথম আক্রমণ মোকাবিলা করার জন্য তাঁদেরকে নির্বাচন করা ছিল আরেকটি কৌশলগত ভুল। আননাসির যেসব ভুল করেছিলেন তার সারসংক্ষেপ হলো:
১. শালবাতেরা দুর্গ অবরোধে দীর্ঘ সময় নষ্ট করা।
২. আবু সাঈদ বিন জামে' নামক অসৎ উযীরের কুপরামর্শ গ্রহণ।
৩. বীর সেনাপতি আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে প্রাণদণ্ড প্রদান।
৪. রণক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর বিন্যাস ও বণ্টনের ক্ষেত্রে ভুল।
৫. সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সৈন্যসংখ্যার ওপর অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে এই বিশ্বাস নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন যে, তাঁর সৈন্যসংখ্যা যেহেতু অনেক বেশি, তাই তিনিই জয়ী হবেন। তাঁর এই আত্মতৃপ্তি ছিল ধ্বংসের মূল কারণ।

টিকাঃ
১৭১. ইবনে আবি যারা‘, রাওদুল কিরাতাস, পৃ. : ২৬৯ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৫/২৪৯।
১৭২. জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/২২৩।
১৭৩. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৪০৫ ও আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইকাব প্রান্তর, তিক্ত শাস্তি

📄 ইকাব প্রান্তর, তিক্ত শাস্তি


আন্দালুসের ইতিহাসে ইকাব প্রান্তরে এক ঐতিহাসিক ট্রাজেডি মঞ্চস্থ হলো। আননাসির লি-দীনিল্লাহ ইকাব প্রান্তরে উপস্থিত হয়েছিলেন মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্যের ইতিহাসে সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি নিয়ে। কিন্তু যুদ্ধের শুরু থেকেই একের পর এক ভুলের কারণে পরাজয় ছিল অবশ্যম্ভাবী।

যুদ্ধের শুরুতেই স্বেচ্ছাসেবক সেনাদল খ্রিস্টান বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশের ওপর প্রবল বিক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু খ্রিস্টান বাহিনীর নিয়মিত ও অভিজ্ঞ কেন্দ্রীয় অংশের পক্ষ থেকে তারা কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হলো। খ্রিস্টানরা মুসলিম বাহিনীর এই অগ্রবর্তী দলকে ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলল। প্রথম ধাক্কাতেই হাজার হাজার মুসলিম যোদ্ধা নিহত হলো। মুওয়াহহিদী নিয়মিত বাহিনী এই ধাক্কা প্রতিরোধ করতে সক্ষম হলেও তাঁদের মনোবল ততক্ষণে ভেঙে গিয়েছিল। এই সুযোগে অষ্টম আলফনসো তাঁর বিশেষ প্রশিক্ষিত বাহিনীকে প্রেরণ করলেন। এরা যুদ্ধক্ষেত্রে যোগ দিতেই পরিস্থিতি পুরোপুরি খ্রিস্টানদের অনুকূলে চলে গেল।

ঠিক একই সময় আন্দালুসী বাহিনীর সেনাপতিগণও রণক্ষেত্র ত্যাগ করতে শুরু করলেন। তাঁদের অন্তর আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। তাঁরা যখন দেখলেন হাজার হাজার যোদ্ধা শহীদ হচ্ছে, তখন তাঁদের মাঝে ভীতি ছড়িয়ে পড়ল এবং তাঁরা পালাতে লাগলেন। খ্রিস্টান বাহিনী তখন চতুর্দিক থেকে মুসলিম বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শুরু হলো ভয়াবহ এক হত্যাকাণ্ড। মুসলিম বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাজিত হলো। আননাসির লি-দীনিল্লাহ অবশিষ্ট পরাজিত বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলেন।

আননাসির লি-দীনিল্লাহ যখন পালাচ্ছিলেন, তখন বলছিলেন—'রহমান সত্য বলেছেন আর শয়তান বলেছে মিথ্যা।' তিনি যখন ময়দানে প্রবেশ করছিলেন, তখন সংখ্যাধিক্যের কারণে ভাবছিলেন যে তিনিই জয়ী হবেন। এখন বুঝতে পারছেন যে তাঁর সেই চিন্তা ছিল শয়তানের মিথ্যা প্রবঞ্চনা। পরাজয়ের পর আননাসির ইকাব প্রান্তরের নিকটবর্তী বাইয়্যাসা ও উকবাবা শহর দুটি অরক্ষিত ফেলে সোজা সেভিলে চলে গেলেন। এর ফলে এই শহরগুলোতে খ্রিস্টান বাহিনী নিশ্চিত আক্রমণ করার সুযোগ পেল।

টিকাঃ
২৫৫. ইবনু খালিকান, ওয়াফিয়াতুল আ’ইয়ান, ৪/৪৬৬।
২৫৬. ইবনু খালিকান, ৪/৪৬৬ ও ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৯/৫১-৫২।
২৫৭. সূরা তাওবা, ৯/২৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px