📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুওয়াহহিদী বাহিনী ইকাব প্রান্তরের পথে

📄 মুওয়াহহিদী বাহিনী ইকাব প্রান্তরের পথে


খ্রিস্টান বাহিনীর মোকাবিলা করার জন্য আননাসির লি-দীনিল্লাহ যুদ্ধের ডাক দিলেন এবং মাগরেব ও আন্দালুস থেকে সৈন্যদের সমবেত করলেন। মুসলিম বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পেল। কোনো কোনো বর্ণনাকারীর মতে মুসলিম বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ছিল পাঁচ লক্ষ। আননাসির লি-দীনিল্লাহ তাঁর বাহিনী নিয়ে মাগরেব থেকে রওয়ানা হলেন এবং জাবালে তারিক প্রণালী পাড়ি দিয়ে সেভিলে পৌঁছলেন। এরপর সেখান থেকে শালবাতেরায় গেলেন, সেখান থেকে আবার সেভিলে ফিরলেন। এরপর সেভিল থেকে ইকাবের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। ইকাব যাওয়ার পথে কিছু সময় ব্যয় হলো জাইয়ান শহরের বাইরের এলাকায়। ইকাব এলাকায় এই নামে একটি প্রাচীন প্রাসাদ ছিল বিধায় এলাকাটি ইকাব নামে পরিচিতি লাভ করে। ইকাব প্রান্তর মুসলিম বাহিনীর জন্য পরিণত হয় তাদের বিভিন্ন ভুলের শাস্তির স্থানে, যার কিছু যুদ্ধের পূর্বেই প্রকাশ পায় আর কিছু প্রকাশ পায় যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই।

টিকাঃ
৪৫০. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৪৬৬, আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২৩ ও জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১০৯।
৪৫১. ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, মুওয়াহ্হিদী অধ্যায়, পৃ : ২৬৩-২৬৫ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২৫৯।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 স্বেচ্ছাচারিতার পরিণতি, পরাজয়ের চোখরাঙানি

📄 স্বেচ্ছাচারিতার পরিণতি, পরাজয়ের চোখরাঙানি


বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে আননাসির লি-দীনিল্লাহ আন্দালুস-ভূমিতে অবতরণ করলেন। অভিযানের প্রথম সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে তিনি শালবাতেরা দুর্গ অবরোধ করলেন। টলেডোর দক্ষিণে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত এ দুর্গটি ছিল বিশাল ও সুরক্ষিত। অত্যন্ত সুরক্ষিত এ দুর্গ মুসলিম বাহিনী জয় করতে ব্যর্থ হলো। একপর্যায়ে আননাসির লি-দীনিল্লাহ সিদ্ধান্ত নিলেন এ দুর্গ অবিকৃত রেখেই সামনে অগ্রসর হবেন। কিন্তু উযীর ইবনে জামে' তাঁকে দুর্গটি জয়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে এখানেই অবস্থান করতে পীড়াপীড়ি করতে লাগল। ফলে মুসলিম বাহিনী এখানেই দুর্গ অবরোধ করে বসে রইল।

আননাসির লি-দীনিল্লাহর এই স্বেচ্ছাচারমূলক সিদ্ধান্তের ফলে যা ঘটল তা হলো:
১. শালবাতেরা দুর্গ অবরোধে দীর্ঘ অথচ মূল্যহীন কিছু সময়ের অপচয় হলো। যেখানে সময় নষ্ট না করে অগ্রসর হলে খ্রিস্টান বাহিনী পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের পূর্বেই বিশাল মুসলিম বাহিনী তাদের ওপর হামলা করতে পারত।
২. এ দীর্ঘ সময় হাতে পেয়ে খ্রিস্টান বাহিনী তাদের যুদ্ধপ্রস্তুতি পূর্ণ করতে সক্ষম হলো এবং ইউরোপ থেকে আরও অনেক সৈন্য সংগ্রহ করতে সমর্থ হলো।
৩. এ সময় আন্দালুস পর্বতমালার তুষার ও বরফের কারণে মুসলিম বাহিনী সীমাহীন ক্ষতির মুখোমুখি হলো। আননাসির লি-দীনিল্লাহ দীর্ঘ সময় শালবাতেরা অবরোধে কাটানোয় প্রচণ্ড শীতের মৌসুম শুরু হয়ে যায়। দীর্ঘ অবরোধজনিত ক্লান্তি এবং প্রচণ্ড ঠান্ডা আবহাওয়ার কারণে মুসলিম বাহিনীর অনেক সৈন্য মারা যেতে থাকে।

টিকাঃ
৪৫২. ইবনে আবি যারআ', রায়দুল কিরাতাস, পৃ : ২৯৬ ও আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২১।
৪৫৩. জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১০৮।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের মুসলিম বাহিনীতে যোগদান

📄 আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের মুসলিম বাহিনীতে যোগদান


যুদ্ধ-প্রস্তুতির প্রারম্ভে উত্তর থেকে আগত খ্রিস্টান বাহিনীকে বিভিন্ন দলে বিভক্ত করা হলো। প্রথম দল ইউরোপীয় সৈন্যদের, দ্বিতীয় দল আরাগোনের এবং তৃতীয় দল ক্যাসটেলা, পর্তুগাল, লিওন ও নাফার রাষ্ট্রের। তৃতীয় দলটি ছিল খ্রিস্টান বাহিনীর সবচেয়ে বড় অংশ। সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনী প্রথমে রাবাহ দুর্গ অবরোধ করল। রাবাহ দুর্গের দায়িত্বে ছিলেন বিখ্যাত আন্দালুসী সেনানায়ক আমীর আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস। খ্রিস্টান বাহিনী দীর্ঘক্ষণ ধরে রাবাহ দুর্গ অবরোধ করে রাখল। অবরোধের সময় দীর্ঘ হওয়ায় আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস উপলব্ধি করলেন এখান থেকে তাঁর ও সঙ্গী মুসলমানদের বের হওয়ার কোনো পথ নেই। তিনি পরিকল্পনা করলেন তারা এখান থেকে বেরিয়ে যাবেন এবং মূল মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেবেন। তাই তিনি অবরোধকারী খ্রিস্টান নেতার কাছে প্রস্তাব রাখলেন, তিনি যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্রসহ পুরো দুর্গ তাঁর হাতে তুলে দেবেন, বিনিময়ে তাঁকে এবং সকল মুসলিম নাগরিককে নিরাপদে বেরিয়ে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ দিতে হবে। খ্রিস্টান রাজা এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ফলে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস-এর নেতৃত্বে অসংখ্য মুসলমান দুর্গ থেকে বেরিয়ে এসে মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে রওয়ানা হলো।

কিন্তু সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীর ইউরোপীয় পক্ষ আলফনসোর এ সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানাল। তারা কেবল মুসলমানদের হত্যা করার জন্যই ইউরোপের দূর-দূরান্ত থেকে খ্রিস্টান বাহিনীতে যোগ দিয়েছে। সুতরাং তাঁদের চোখের সামনে মুসলমানেরা এভাবে নিরাপদে বেরিয়ে যাবে, এটা তাদের বরদাশত হলো না। কিন্তু আলফনসো জানতেন যে পরে যখন তিনি মুসলমানদের অন্যান্য দুর্গ অবরোধ করবেন, তখন তাঁর এই বদান্যতা কাজে দেবে। কিন্তু ইউরোপীয়ানরা তা অনুভব করতে পারল না এবং অনেকেই বাহিনী ছেড়ে চলে গেল। ফলে ইকাব প্রান্তরের মূল যুদ্ধ শুরু হওয়ার পূর্বেই খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা হ্রাস পেল প্রায় পঞ্চাশ হাজার। এটি ছিল মুসলিম বাহিনীর জন্য এক বড় নৈতিক ও বস্তুগত বিজয়। কিন্তু এই পলায়ন সত্ত্বেও খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা মুসলিম বাহিনীর তুলনায় অনেক বেশি ছিল।

টিকাঃ
৪৫৪. জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১০৯।
৫৫৫. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ ৪০১, ইবনে আবি যারআ', রায়দুল কিরাতাস, পৃ : ২৯৬, আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২২ ও জোসেফ আসচবাক, তারীখুল আন্দালুস ফী আহদিল মুওয়াহ্হিদীন, ২/১১৪।
৫৫৬. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৪৬৬, আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২৩।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দুষ্ট সঙ্গীর পরামর্শে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে হত্যা

📄 দুষ্ট সঙ্গীর পরামর্শে আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসকে হত্যা


আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস যখন আননাসির লি-দীনিল্লাহর কাছে পৌঁছালেন এবং আননাসির জানতে পারলেন যে, আবুল হাজ্জাজ রাবাহ দুর্গ ত্যাগ করে এসেছেন এবং দুর্গ থেকে যাবতীয় অস্ত্র-শস্ত্র ও রসদসামগ্রী খ্রিস্টান বাহিনীর কাছে সোপর্দ করেছেন, তখন তাঁর উযীর আবু সাঈদ বিন জামে' দুর্গের প্রতিরক্ষায় অবহেলার অপরাধে আবুল হাজ্জাজকে হত্যা করার পরামর্শ দিল। আননাসির লি-দীনিল্লাহ তাঁর এই উযীরের পরামর্শে সামান্য দ্বিধা না করে আন্দালুসের মহান বীর সেনাপতি আবুল হাজ্জাজকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলেন।

নিঃসন্দেহে এটি ছিল আননাসির লি-দীনিল্লাহর মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের নেতিবাচক দিকগুলো হলো:
১. আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিস এভাবে দুর্গ ছেড়ে এসে কোনো ভুল করেননি। তিনি যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তন করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত বৃহত্তর মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন। যদি তিনি দুর্গের ভেতরেই অবস্থান করতেন, তবে তাঁর এবং সঙ্গী মুসলমানদের প্রাণনাশ ছাড়া আর কিছুই ঘটত না।
২. যদি মেনেও নেওয়া হয় যে, আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ বিন কাদিসের এই সিদ্ধান্ত ভুল ছিল, তারপরও এই ভুলের শাস্তি কোনোমতেই প্রাণদণ্ড হতে পারে না।

আননাসির লি-দীনিল্লাহ-এর এই ভুল সিদ্ধান্তের ফলে মুসলিম বাহিনী একজন সুদক্ষ ও মহান বীরকে হারাল। এর ফলে আন্দালুসী বাহিনীর সদস্যদের মনে মাগরেব ও আন্দালুসের একটি বিভাজন কাজ করতে লাগল। প্রত্যেকের হৃদয়ে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হলো। এ কারণেই ঐতিহাসিক মাক্কারী লিখেছেন, 'ইকাব যুদ্ধের পরাজয় ছিল আন্দালুস ও মাগরেব—উভয় অংশের জন্য এক মহাভয়ঙ্কর বিপর্যয়। আর এর অন্যতম কারণ ছিল অসংগঠিত প্রশাসন-নীতি। অভিজ্ঞতাসম্পন্ন আন্দালুসী সেনাপতিদের খলীফা আননাসির লি-দীনিল্লাহ ও তাঁর উযীর তুচ্ছজ্ঞান করেছিলেন এবং ঐ জনৈক আন্দালুসী সেনাপতিকে হত্যা করেছিলেন। এর ফলে মুসলিম বাহিনীর মানসিকতা ও ইচ্ছাশক্তি সম্পূর্ণরূপে পরিবর্তিত হয়ে যায়।'

টিকাঃ
১৬৮. ইবনে আবি যারা‘, রাওদুল কিরাতাস, পৃ. : ২৬৮ ও ইবনে খালদূন, তারিখে ইবনে খালদূন, ৫/২৪৯।
১৬৯. তাবারী, তারিখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২/২৭৫।
১৭০. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৪০৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px