📄 আননাসির লি দ্বীনিল্লাহ ও পথচলায় নানা প্রতিবন্ধকতা
আল-মানসুর মুওয়াহিদীন তাঁর মৃত্যুর পূর্বে পুত্র আল-নাসির লি-দীনিল্লাহকে এই আশায় খেলাফত দিয়েছিলেন যে, আল্লাহ তাঁকে দীর্ঘ জীবন দান করবেন; আর এর মাঝে আল-নাসির লি-দীনিল্লাহ তাঁর পিতার যোগ্য নেতৃত্বগুণ ও প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জন করার সময় পাবেন। কিন্তু চার বছরও কম বয়সে আল-নাসির লি-দীনিল্লাহর মৃত্যু হলে অল্প বয়সেই অনভিজ্ঞ আল-নাসির লি-দীনিল্লাহকে কাঁধে তুলে নিতে হয় এক বিশাল সাম্রাজ্যের শাসনভার গ্রহণের গুরুদায়িত্ব।
আল-নাসির লি-দীনিল্লাহ ছিলেন ইলমী চেতনায় প্রদীপ্ত এবং উচ্চাভিলাষী এক যুবক। কিন্তু পিতার মতো স্বভাবজাত দক্ষতা তাঁর ছিল না। অধিকন্তু সাম্রাজ্য তখন চতুর্দিক থেকে শত্রুবেষ্টিত। খ্রিস্টান শক্তি তখন আরিক প্রান্তরের শোচনীয় পরাজয়ের বেদনা ভুলতে পারেনি। নতুন করে মুসলিম ভূখণ্ডে হামলা চালিয়ে এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তারা অধীর অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু এর চেয়েও বড় যে সমস্যাটি মুওয়াহিদীন সাম্রাজ্যকে বিচলিত করে রেখেছিল এবং যার কারণে মুসলিমদের ওপর হুমকি দেখা দিয়েছিল, তা হলো বনু গানিয়ার বিদ্রোহ। প্রকৃতপক্ষে তৎকালীন পরিস্থিতিতে বনু গানিয়ার ভূমিকা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ের ধ্বংসাত্মক। আল-মানসুর মুওয়াহিদীন মুকাদ্দিমা যুদ্ধাভিযান চলাকালীন তাদের দমন করা সম্ভব ছিল না। কিন্তু বনু গানিয়া আফ্রিকায় আবারও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। তাদের সঙ্গে এই অব্যাহত বিদ্রোহের কারণেই মুওয়াহিদীনরা যুদ্ধবিরতি চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আল-মানসুরের মৃত্যুর পর বনু গানিয়ার তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। নতুন খলিফা আল-নাসির লি-দীনিল্লাহ বাধ্য হয়ে তাঁর মূল শক্তি ব্যয় করেন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বনু গানিয়ার বিদ্রোহ দমনে। বেশ কয়েকটা যুদ্ধের পর তিনি এ বিদ্রোহকে পুরোপুরি দমন করতে সক্ষম হন। আল-নাসির লি-দীনিল্লাহ নিজে আলজেরিয়ায় বনু গানিয়া-দমন অভিযানে অংশগ্রহণ করেন এবং বনু গানিয়ার হাত থেকে আলজেরিয়া পুনরুদ্ধার করে রাজধানী মারাকেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
টিকাঃ
২১৬. ইবন : আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশি, আল-মু'জাব, পৃ. ৩৩৮।
২১৭. ইবনুল আযারী, আল-হুল্লা আল-মুয়াশশিয়াহ, পৃ : ২৮০।
২১৮. ইবন : আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশি, আল-মু'জাব, পৃ. ৩৩৮।
📄 অষ্টম আলফোসো ও মুসলিম ভূখণ্ডে চলমান অরাজকতার সদ্ব্যবহার
আল-নাসির লি-দীনিল্লাহ যখন আফ্রিকার অভ্যন্তরে বনু গানিয়ার বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত, তখন আলফনসোর মনে নতুন করে মুসলিম ভূখণ্ড দখলের স্বপ্ন দানা বেঁধে উঠেছিল। প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে তিনি নতুন করে যুদ্ধ-প্রস্তুতি শুরু করলেন। তিনি আল-মানসুর আল-মুওয়াহিদীর সাথে কৃত যুদ্ধবিরতি চুক্তি ভঙ্গ করে মুওয়াহিদীন ভূখণ্ডে হামলা চালালেন। তিনি কৃষি খামারে আগুন জ্বালিয়ে দিলেন, হত্যা করলেন নিরস্ত্র অসংখ্য মুসলমানকে। এটি ছিল মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান শক্তির নতুন যুদ্ধের সূচনা-সংকেত।
টিকাঃ
২১৯. ইবন : আবদুল ওয়াহিদ আল-মারাকুশি, আল-মু'জাব, পৃ : ৩৪৪ ও ইবনে খালিকান, তারীখে ইবনে খালিকান, ৬/২৪৯।
📄 খৃস্টশক্তির মোকাবেলায় মুওয়াহহিদী প্রশাসনের অমার্জনীয় কিছু ভুল
আল-নাসির লি-দীনিল্লাহর নেতৃত্ব-যোগ্যতা পূর্ববর্তী মুওয়াহহিদী শাসকদের তুলনায় কম ছিল, এর সাথে যুক্ত হলো আরেকটি মারাত্মক ভুল—পরামর্শব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করে সম্পূর্ণ নিজের মেধা-বিবেচনার ওপর নির্ভর করা। তাঁর পিতা আলমানসুর এ ভুলের প্রতিকার করেছিলেন এবং এর ফলশ্রুতিতে সফলতা ও ক্ষমতার সুদৃঢ়তা লাভ করেছিলেন। কিন্তু আননাসির লি-দীনিল্লাহ তাঁর পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ না করে পূর্বতন অযোগ্য শাসকদের পথ অনুসরণ করলেন। এদিকে মুওয়াহহিদী সামরিক শক্তিও দেশের অভ্যন্তরে বনু গানিয়ার অব্যাহত বিদ্রোহ দমনে দুর্বল ও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। এ সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত হলো আরও একটি চরম ক্ষতিকর বিষয়; আননাসির লি-দীনিল্লাহ প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আবু সাঈদ বিন জামে' নামক তাঁর জনৈক অসৎ ও অবিবেচক উযীরের সাহায্য গ্রহণ করতে লাগলেন। ঐতিহাসিকগণ অনেকেই এই ব্যক্তির উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর সমসাময়িক আন্দালুসী ও মাগরেবী ব্যক্তিগণও তাঁর ভূমিকা সম্পর্কে সরাসরি সংশয় প্রকাশ করেছেন।
টিকাঃ
৪৪৬. দেখুন : আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ : ৩৮৮, ইবনে আবি যারআ', রায়দুল কিরতাস, পৃ : ২৯৩ ও আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২০।
৪৪৭. দেখুন : ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২৫৯ ও আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২০।
৪৪৮. আননাসিরী, আলইসতিকসা, ২/২২১।
📄 খৃস্টানশক্তির ব্যাপক প্রস্তুতি
মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্য যখন এ ধরনের নানাবিধ জটিল সমস্যায় জর্জরিত, খ্রিস্টান শক্তির মাঝে তখন বিরাজ করছিল উচ্চ আধ্যাত্মিক চেতনাপ্রবাহ। খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গুরু স্বয়ং রোমের পোপ যুদ্ধের তদারকি করছিলেন। খ্রিস্টানরা একে ক্রুসেড (ধর্মীয়) যুদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করেছিল এবং এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের পুণ্যবান হওয়ার আশ্বাস দিয়েছিল। পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করল যখন পোপ নাফার-এর শাসকের কাছে বার্তা পাঠিয়ে আলমানসুরের সঙ্গে কৃত চুক্তি ভঙ্গ করতে এবং ক্যাসটিলার সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃগঠনে উদ্বুদ্ধ করলেন। পোপের নির্দেশ তিনি শিরোধার্য বলে মেনে নিলেন। এর ফলে ইউরোপীয় খ্রিস্টান শক্তি একক শক্তিতে পরিণত হলো। খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা দাঁড়াল প্রায় দুই লক্ষে। বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাজন্যবর্গ ও পাদ্রীগণের নেতৃত্বে খ্রিস্টান বাহিনী রওয়ানা হলো মুসলিম-খ্রিস্টান চূড়ান্ত যুদ্ধের উদ্দেশে।
টিকাঃ
৪৪৯. দেখুন : ইবনে আ'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, মুওয়াহ্হিদী অধ্যায়, পৃ : ২৬৪।