📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ব্যক্তি আলমানসুর মুওয়াহহিদী

📄 ব্যক্তি আলমানসুর মুওয়াহহিদী


ব্যক্তিগত বিবেচনায় আবু ইউসুফকে গণ্য করা যায় আন্দালুসের মহান শাসক আবদুর রহমান আদদাখিল ও তাঁর পরবর্তী আবদুর রহমান আননাসিরের মতো মহান শাসকবর্গের কাতারে। তাঁরা এমন সুবিশাল কর্মযজ্ঞের আঞ্জাম দিয়েছেন, যা প্রবীণ ও অভিজ্ঞ অনেক শাসকও পারেননি। আবু ইউসুফ ইয়াকুব আলমানসুর মুওয়াহহিদী মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। এ বয়সেই তিনি চমৎকারভাবে প্রশাসন পরিচালনা করেন, খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে ইসলামের পতাকা সমুন্নত করেন, সমাজে ন্যায়ের নিভাঁজ প্রতিষ্ঠা করেন এবং উৎকৃষ্টতর ও কল্যাণকর পন্থায় আমর বিল মা'রুফ, নাহী আনিল মুনকার, ওয়াজ-নসীহত ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও তত্ত্বাবধান করেন।

আবু ইউসুফ ইয়াকুব আলমানসুর মুওয়াহহিদী তাঁর পূর্ববর্তী মুওয়াহহিদী শাসকবর্গের ধারাকে অনেকটা পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। স্থির ও প্রজ্ঞাভাব, ন্যায়পরায়ণতা ও সহিষ্ণুতা ছিল তাঁর অন্যতম চরিত্র-বৈশিষ্ট্য। এমনকি তিনি পথচারীদের সমস্যায় দাঁড়িয়ে যেতেন এবং অসহায় নারী ও দুর্বলদের প্রয়োজন পূরণ করতেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে তিনি নিজেই ইমামতি করতেন। তিনি দুনিয়াবিমুখী ছিলেন; মোটা ও অমসৃণ পশমী কাপড় পরিধান করতেন। তিনি তাঁর পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের মাঝে এবং সমাজের সর্বত্র শরয়ী হুদুদ ও শাস্তি-আইন বাস্তবায়ন করেছেন। ফলে রাষ্ট্রের পরিস্থিতি ছিল স্থিতিশীল আর একের পর এক বিজয় অভিযান রাষ্ট্রকে করেছিল সমৃদ্ধ।

আবু ইউসুফ ইয়াকুব আলমানসুর মুওয়াহহিদী তাঁর রাষ্ট্রের সভ্যতা ও নাগরিক জীবন উন্নত করতে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছিলেন। তিনি রাবাত (Rabat) নগরীতে এক সুবিশাল হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। ঐতিহাসিক আব্দুল ওয়াহিদ মাররাকুশী এ হাসপাতালের বিবরণ দিতে গিয়ে একে চোখ ধাঁধানো বিস্ময় বলে অভিহিত করেছেন। তিনি প্রথমে শহরের মনোরম, সমতল ও প্রশস্ত একটি ময়দান নির্বাচন করেন। এরপর তিনি প্রকৌশলী ও স্থপতিদেরকে সর্বাধুনিক নকশা অনুযায়ী এর ভবনগুলো নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। সেখানে সব ধরনের সুগন্ধি ও ফলজ গাছের চারা রোপণ করা হয়। রোগীদের আহার ও চিকিৎসার জন্য তিনি সরকারি কোষাগার হতে বিপুল পরিমাণ অর্থ মঞ্জুর করেন। আমীরুল মুমিনীন প্রতি শুক্রবার জুমার নামাযের পর নিজে হাসপাতালটি পরিদর্শন করতেন এবং রোগীদের খোঁজখবর নিতেন। তিনি নিজে জনগণের যাকাতের অর্থ সংগ্রহ করতেন এবং প্রকৃত প্রাপকদের মধ্যে বণ্টন করতেন।

টিকাঃ
৯৬৪. দেখুন : ইবনে আযারী, আলমুওয়াহহিদুন, পৃ : ১৭০ ও ইবনে আবি যারা', রাওযুল কির্তাস, পৃ : ২২৬।
৯৬৫. দেখুন : খাযরাজী, তাশরিফুল ইসলাম, ৪২/২২৬ ও আলনাসাকী, আলইকতিফা, ২/১৮৬।
৯৬৬. ইবনুল খতীব এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন।
৯৬৭. দেখুন : ইবনে আযারী, আলমুওয়াহহিদুন, পৃ : ১৭০।
৯৬৮. দেখুন : আবদুল ওহাহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ : ৩০৬।
৯৬৯. প্রাগুক্ত, পৃ : ৩৫৪।
৯৭০. প্রাগুক্ত, পৃ : ৩৫৫।
৯৭১. প্রাগুক্ত, পৃ : ৩৫৫।
২৫২. আব্দুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু‘জিম, পৃ: ৩৫ ও যাহাবী, সিয়ার আলামিন নুব্বালা, ২১/৩৫৬।
২৫৩. মাররাকেশের আঞ্চলিক উচ্চারণে ‘রাবাত’ শব্দটিকে ‘রাবাত’ উচ্চারণ করা হতো।
২৫৪. যাহাবী, সিয়ার আলামিন নুব্বালা, ২১/৩৫৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনে তূমারতের ভ্রান্ত দাবিসমূহ হতে আলমানসুর মুওয়াহহিদীর দায়মুক্তি ঘোষণা

📄 ইবনে তূমারতের ভ্রান্ত দাবিসমূহ হতে আলমানসুর মুওয়াহহিদীর দায়মুক্তি ঘোষণা


আলমানসুর মুওয়াহহিদী ইবনে তূমারতের ভ্রান্ত দাবি হতে নিজেকে ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করার সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি ইবনে তূমারতের নামের সঙ্গে ইমাম মাহদী যোগ করা, খুতবায় মাহদী হিসেবে তাঁর নাম পাঠ করা এবং তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহকে প্রামাণিক হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া বন্ধ করেছিলেন। আলমানসুর মুওয়াহহিদীর দরবার সবসময় আলিম-ওলামা ও সৎ ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে ভরপুর থাকত। আল্লামা যাহাবী রহ. ‘সিয়ার আ'লামিন নুব্বালা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি কোরআন ও হাদীসের দক্ষ শায়খ ছিলেন; পাশাপাশি তিনি ফিকহ নিয়েও আলোচনা ও পর্যালোচনায় অংশ নিতেন। তিনি বিনম্রতা ও প্রভাবসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন।

ইবনে তূমারতের কোরআন-সুন্নাহবিরোধী চিন্তাধারাকে অস্বীকার জানিয়েই আলমানসুর মুওয়াহহিদী আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ ও সংশোধনবাদী জামাআতের আদর্শে ফিরে আসেন। ঐতিহাসিক মাররাকুশী একটি ঘটনা উদ্ধৃত করেছেন যে, আলমানসুর মুওয়াহহিদী একবার এক আলিমকে বলেছিলেন—'হে আবুল আব্বাস! তুমি আল্লাহর দরবারে আমার পক্ষ হয়ে সাক্ষী দিও যে, আমি ইসমাতের (অর্থাৎ ইবনে তূমারতের নিষ্পাপ হওয়ার) আকীদা পোষণ করি না।' অন্য এক প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, 'কোথায় ইমাম?! কীসের ইমাম?!'

তিনি জনগণের কথা শোনার জন্য সাধারণ বৈঠক করতেন। সমাজের ছোট-বড় কারো সেখানে প্রবেশে বাধা ছিল না। তিনি বাজারের তত্ত্বাবধায়ক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের প্রতিমাসে দু’বার তাঁর দরবারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন এবং তাঁদের কাছ থেকে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নিতেন।

টিকাঃ
২৫৫. আলমানসুর-পুত্র ও পরবর্তী মুওয়াহহিদী খলীফা মামুনের বর্ণনা অনুযায়ী।
২৫৬. দানি বটিলস-এর উক্তি।
২৫৭. ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, মুওয়াহহিদী অধ্যায়, পৃ: ২৬৬-২৬৭।
২৫৮. যাহাবী, সিয়ার আলামিন নুব্বালা, ২১/৩৫৯।
২৫৯. আব্দুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু‘জিম, পৃ: ৩৬৬।
২৬০. প্রাগুক্ত, পৃ: ৩৬৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px