📄 ইবনুল আওয়াম আলইশবীলী রহ.
তাঁর পুরো নাম আবু আবু যাকারিয়া ইয়াহইয়া বিন মুহাম্মাদ বিন আহমাদ। তিনি ইবনুল আওয়াম আলইশবীলী নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি ছিলেন আন্দালুসে ইসলামী সভ্যতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার সময়কালের একজন বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব। বসবাস করতেন সেভিলায়। উদ্ভিদবিদ্যাতে সুপণ্ডিত এবং প্রাণীর ও কৃষিশাস্ত্রে সমৃদ্ধির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। ইবনুল আওয়াম কৃষিবিষয়ে মনোনিবেশ করেছিলেন এবং এ ক্ষেত্রে নিপুণতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। তিনি কৃষিবিজ্ঞান সম্পর্কে অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও পূর্ণাঙ্গ একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। ইবনুল আওয়াম ও তাঁর মতো আরও কিছু সুপণ্ডিত আলিমগণ যদি না হতেন, তাহলে নিশ্চিত করেই বলা যায় দ্বাদশ শতাব্দীর সূচনায়ই কৃষিবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইউরোপ চরম শিখরে পৌঁছত না। মুসলিম কৃষিবিদ আলিমগণ নির্দিষ্টভাবে সেচপ্রক্রিয়া, সার, চাষাবাদ ইত্যাদি বিষয়ে ইবনুল আওয়ামের যুগান্তকারী বিভিন্ন আবিষ্কার দ্বারা উপকৃত হয়েছেন এবং এসব গবেষণা সম্পর্কিত বিভিন্ন বই বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তাঁর প্রচুর অভিজ্ঞতা ও গবেষণাধর্মী দুঃসাহসিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলস্বরূপ আরবগণ এবং পরবর্তী সময়ে ইউরোপের অধিবাসীগণ মাটির বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য, সারমিশ্রণ পদ্ধতি, রোপণ-চাষাবাদ ও সেচের বিভিন্ন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পেরেছে। কৃষিবিজ্ঞান সম্পর্কে ইবনুল আওয়ামের রচিত অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন একটি গ্রন্থ রয়েছে। গ্রন্থটি কেবল কৃষিবিজ্ঞানের বিভিন্ন তথ্যসমূহ হওয়ার কারণেই মর্যাদা লাভ করেনি; বরং আন্দালুস-ভূমিতে কৃত বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার আলোকে অজৈব রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা সম্পর্কে তাঁর আবিষ্কৃত নতুন নতুন সূত্র ও চিন্তাধারা আলোচনার কারণেও এর বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। ইবনুল আওয়াম আঙুর গাছ প্রতিপালন সম্পর্কে একটি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। 'উয়ুনুল হাকাইক ওয়া ইয়াখদুদ দাস্বায়িক' নামে এর হস্তলিখিত একটি পাণ্ডুলিপি সন্ধান পাওয়া গেছে। এই মহান আলিম ৫৯৬ হিজরীতে (১২০০ খ্রিস্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করেন।
টিকাঃ
১৭৮. দেখুন : মুহাম্মাদ আসীম ফারুখ, মাওসু'আতু আ'লামিল্ ফিক্রিল্ ইসলামী, ৬/১৪৪।
১৭৯. দেখুন : যিরিকলী, আলআ'লাম, ৮/৩০১।
📄 ইবনে তুফাইল রহ.
বিখ্যাত দার্শনিক ইবনে তুফাইল রহ.-এর পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মাদ বিন আবদুল মালিক বিন মুহাম্মাদ বিন তুফাইল আলকাইসী। জন্ম ৪৪৮ হিজরীতে (১০৫৫ খ্রিস্টাব্দে)। তিনি দক্ষিণ আন্দালুসের 'আশ' উপত্যকার অধিবাসী ছিলেন। দর্শনশাস্ত্রের কালজয়ী গ্রন্থ 'রিসালাতু হাই বিন ইয়াকযান' তাঁর অমর কীর্তি। লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় আলিম, প্রাজ্ঞ দার্শনিক, মনীষীদের উক্তি ও মতামত সম্পর্কে জ্ঞানী, প্রাচ্যের দর্শনের বিষয়ে অনুরাগী, গবেষক, দূরদর্শী, দক্ষ চিকিৎসাবিজ্ঞানী, ফলিত বিজ্ঞানবিদ, সুসাহিত্যিক, গদ্য ও পদ্যের নিপুণ কারিগর; এককথায় সকল শাস্ত্রে সমান দক্ষ।
মাররাকুশী তাঁর সম্পর্কে 'আলমু'জিব' গ্রন্থে লিখেছেন, শেষ জীবনে তিনি সকল শাস্ত্রের অধ্যয়নব্যস্ততা ছেড়ে দিয়ে কেবল ইসলামে ইজতিহাদে নিমগ্ন হয়েছিলেন। তিনি শরীয়ত ও দর্শনের সামঞ্জস্যবিধানে যথেষ্ট অনুরাগী ছিলেন। বাহ্যিক ও আত্মিক উভয় ক্ষেত্রে সরব আদর্শকে শ্রদ্ধায় অনুসরণ করতেন। আমীরুল মুমিনীন ইউসুফ বিন আলীর রাজদরবারের জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ ও প্রাজ্ঞ আলিমগণকে সমবেত করার দায়িত্ব ইবনে তুফায়েল আপন স্কন্ধে তুলে নিয়েছিলেন। তিনি আলিমগণকে সম্মান ও তাযীম করা এবং তাদের প্রতি সবিশেষ গুরুত্বদানের জন্য খলীফাকে উৎসাহিত করতেন। মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ফকীহ ও খ্যাতনামা দার্শনিক আবুল ওয়ালীদ ইবনে রুশদকে তিনিই খলীফার দরবারে নিয়ে এসেছিলেন। এখান থেকেই ইবনে রুশদ খ্যাতি লাভ করেন এবং আপন মর্যাদার উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত হন।
ইবনে তুফায়েলের অত্যুৎকৃষ্ট সাহিত্যসমৃদ্ধ কিছু কবিতা রয়েছে। মন ও দুনিয়াবিমুখতা সম্পর্কে তাঁর রচিত কয়েকটি পঙ্ক্তি হলো—মন! প্রিয়জনের বিরহ যাতনায় কাঁদছ! দেহপিঞ্জর হতে হৃৎপিণ্ডের বিচ্ছেদে তবে কাঁদনি কেন? রুহ নামের এক আলোকচ্ছটা মাটির পিঞ্জরার মাঝে কিছুদিন বিচরণ করেছে, তারপর মাটির দেহকে কাফনের আচ্ছাদনে ফেলে রেখে দূর উচ্চতায় পাড়ি জমিয়েছে। ইবনে তুফায়েল ৮৭ বছর জীবন লাভ করেছিলেন। তিনি ৫৮১ হিজরীতে (১১৮৫ খৃষ্টাব্দে) মাররাকিশে ইন্তেকাল করেন। তাঁর জানাযায় খলীফা ইয়াকুব আলমানসুর উপস্থিত ছিলেন।
টিকাঃ
৯৫৮. লিসানুদ্দীন ইবনুল খতীব, আলইহাতা, ৮/১৮২।
৯৫৯. আব্দুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ : ৩৫২।
৯৬০. প্রাগুক্ত, পৃ : ৩৫৪।
৯৬১. সাকাফী, আলওয়াতাবী ফিল ওফায়াইয়াত, ১/৩৪৬।
৯৬২. দেখুন : আব্দুল ওহাহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ : ৩১৩-৩১৪।
৯৬৩. সাকাফী, আলওয়াতাবী ফিল ওফায়াইয়াত, ১/৩৪৬।