📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবদুল মুমিন বিন আলীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক

📄 আবদুল মুমিন বিন আলীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক


আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী তাঁর পরিচয়-বিবরণীতে লিখেছেন, আবদুল মুমিন ছিলেন সুগঠিত দেহ, উজ্জ্বল অবয়ব এবং সুউচ্চ কণ্ঠস্বরের অধিকারী। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং সফল বীর সেনানী ছিলেন। তিনি প্রতিদিন পবিত্র কুরআনের এক-সপ্তমাংশ তিলাওয়াত করতেন, রেশমী পোশাক পরিহার করতেন, সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। তবে তিনি তাঁর বিরোধী পক্ষের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম।

আল্লামা যাহাবী রহ. ‘সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবদুল মুমিন যখন মাগরেবের উপকূলে সিলা নগরীতে অবস্থান করেন এবং নদী অতিক্রম করেন, তখন তিনি সিজদায় পড়ে যান। তিনি বলেন, 'আমি এমন এক যুবকের কথা জানি, যে একসময় অত্যন্ত রিক্ত অবস্থায় এই নদী পার হয়েছিল। নৌকার মাঝি তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং দাঁড় দিয়ে আঘাত করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। আজ আল্লাহ আমাকে এই বিশাল বাহিনীর অধিনায়ক করেছেন।'

আবদুল মুমিন বিন আলীর ষোলোজন পুত্রসন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মুহাম্মাদ, আলী, উমর, ইউসুফ, উসমান, সুলাইমান, ইয়াহইয়া প্রমুখ। তাঁর শাসনামলে যারা নামাযে উপস্থিত থাকতো না, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। তাঁর এই কঠোরতা এবং নিয়মবর্তিতা মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্যকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল।

টিকাঃ
১০৬. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬।
১০৭. আল্লামা যাহাবী ও ইবনুল ইমাদ-এর বর্ণিত এ গুণ এ কথাই বোঝায় যে, সে যুগে রেশমী কাপড় পরিধান করা মানুষের রীতি ও পছন্দের বিষয় ছিল।
১০৮. ইবনুল ইমাদ, শাযারাতুয যাহাব, ৪/১৩৬ ও আননাসিরী, আলইসতিফ্ছা, ২/৯৬।
১৬১. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৩ ও যাহাবী, সিয়ার আ'লামিন নুবালা, ২১/৩৭৫।
১৬২. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 কঠিন সংঘাত ও সশব্দ পতন!

📄 কঠিন সংঘাত ও সশব্দ পতন!


ইবনে তুমারতের ইন্তেকালের পর আবদুল মুমিন বিন আলীর নেতৃত্বে মুওয়াহহিদী বাহিনীর অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ৫২৮ হিজরীতে আবদুল মুমিন বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটালেন এবং সেনাবাহিনী নিয়ে টাডলায় পৌঁছালেন। সেখানে মুরাবিতী ও মুওয়াহহিদী বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে মুওয়াহহিদী বাহিনী জয়লাভ করল। ৫৩৩ হিজরীতে মুরাবিতী শাসক আলী বিন ইউসুফ তাঁর পুত্র তাশফিনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করলেন এবং আব্দুল মুমিনের বিদ্রোহ দমনে বিশাল বাহিনী প্রেরণ করলেন।

তাশফিন বিন আলী মুরাবিতী বাহিনী নিয়ে পাহাড়ী অঞ্চলে আব্দুল মুমিনের অনুসরণ করতে লাগলেন। ৫৩৮ হিজরীতে শীতকালে আবদুল মুমিন বিন আলী দুর্গম পাহাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। তুষারপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাশফিনের বাহিনী প্রচণ্ড কষ্টের সম্মুখীন হয়। রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় মুরাবিতী বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আব্দুল মুমিন তিলিমসান ও ওয়াহরান নগরীতে আক্রমণ চালিয়ে সেগুলো দখল করে নেন। ৫৩৯ হিজরীতে ওয়াহরানের উপকূলে এক দুর্ঘটনায় তাশফিন বিন আলী নিহত হন।

তাশফিনের মৃত্যুর পর মুরাবিতী সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়। আব্দুল মুমিন একে একে ফেয, সাবতা ও অন্যান্য শহর জয় করেন। ৫৪০ হিজরীতে মুওয়াহহিদী বাহিনী ফেয নগরী দখল করে। এরপর ৫৪১ হিজরীতে তাঁরা মুরাবিতী সাম্রাজ্যের রাজধানী মারাকেশ অবরোধ করেন। দীর্ঘ এগারো মাস অবরোধের পর মারাকেশবাসীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। ৫৪২ হিজরীতে আব্দুল মুমিন জোরপূর্বক মারাকেশে প্রবেশ করেন এবং শেষ মুরাবিতী শাসক কিশোর ইসহাক বিন আলীকে হত্যা করেন। এর মাধ্যমেই গৌরবময় মুরাবিতী সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং মাগরেবে মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
৩৬৮. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, ৯/২০১।
৩৬৯. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, ৯/২০১।
৩৭০. আব্দুল ওয়াহিদ মারাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৯০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুরাবিতী রাষ্ট্রের পতন ও মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী অনিবার্য ঘটনাপ্রবাহ

📄 মুরাবিতী রাষ্ট্রের পতন ও মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী অনিবার্য ঘটনাপ্রবাহ


৫৪১ হিজরীতে মুরাবিতী সাম্রাজ্যের পতন এবং মুওয়াহহিদী শক্তির উত্থানের ফলে আন্দালুস ও মাগরেব উভয় অঞ্চলে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তন আসে। এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে খ্রিস্টান শক্তিগুলো মুসলিম ভূখণ্ডে আক্রমণ শুরু করে।

১. ৫৪২ হিজরীতে খ্রিস্টান বাহিনীর হাতে আলমারিয়ার পতন ঘটে। যুদ্ধে বহু মুসলমান শহীদ হন এবং প্রায় চৌদ্দ হাজার মুসলিম নারীকে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়।
২. ৫৪৩ হিজরীতে উত্তর-পূর্ব আন্দালুসের বারবাস্ত্র ও লায়েদা নগরী খ্রিস্টানদের দখলে চলে যায়।
৩. একই বছর পর্তুগাল রাষ্ট্র দক্ষিণে আরও বিস্তৃতি লাভ করে এবং লিসবনসহ বড় অংশ দখল করে নেয়।
৪. খ্রিস্টানরা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে উত্তর আফ্রিকার জিব্রাল্টার এলাকাতেও আক্রমণ চালায়।

এই বিপর্যয়গুলো ছিল মূলত মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ অনৈক্য ও গৃহযুদ্ধের অনিবার্য ফল।

টিকাঃ
১৬৯. দেখুন : ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৯/৩৪, আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জাব, পৃ: ১৭৪。
১৭০. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৪০০ ও আন্দালুসী, আলইসতিকসা, ২/১১৮。
১৭১. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৪০০。
১৭২. দেখুন : ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৯/৩৭ ও আন্দালুসী, আলইসতিকসা, ২/১১৮。
১৭৩. ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৪/৪২৬。
১৭৪. দেখুন : ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৯/৪৩ ও ইবনে খালদুন, তারিখ ইবনে খালদুন, ৬/২০০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px