📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনে তূমারতের অসিয়ত ও আবদুল মুমিনের বাইআত

📄 ইবনে তূমারতের অসিয়ত ও আবদুল মুমিনের বাইআত


মাররাকুশী 'আলমু'জিব' গ্রন্থে এক আশ্চর্য ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন পূর্বে ইবনে তুমারত তাঁর বিভিন্ন গোত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশেষ অনুসারীদের সমবেত করেন। সবাই তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তিনি প্রথমে আল্লাহর শানে হামদ ও সানা পাঠ করেন। এরপর নবীজীর নামে দরূদ পাঠ করেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোচনা করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন, বিভক্তি দূর করে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন এবং লাঞ্ছনার পর সম্মান দান করেছেন। আমি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছি এবং তাকে তোমাদের আমীর নির্ধারণ করেছি। সেই ব্যক্তিটি হচ্ছে আবদুল মুমিন। সুতরাং যতদিন সে আপন রবের প্রতি অনুগত থাকবে, তোমরাও তার অনুগত থাকবে।'

ইবনে তুমারতের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সকলে আবদুল মুমিনের হাতে বাইআত হয়। ইবনে তুমারত সকলের জন্য দোয়া করেন। এ অঙ্গীকার গ্রহণের অল্প কয়েকদিন পরেই ইবনে তুমারত ইন্তেকাল করেন আর মুওয়াহহিদী সম্প্রদায় তাদের নতুন নেতা আবদুল মুমিনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়।

টিকাঃ
১০৩. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬২-২৬৪।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম খলীফা

📄 মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম খলীফা


৫৪১ হিজরীতে (১১৪৬ খৃষ্টাব্দে) মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অভ্যুদয় ঘটে। মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম প্রকৃত শাসক হলেন মুহাম্মাদ বিন তুমারতের প্রধান শিষ্য আবদুল মুমিন বিন আলী (৪৮৭-৫৫৫ হিজরী/১০৯৪-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ)। তাঁর পুরো নাম আবদুল মুমিন বিন আলী বিন মাখলুফ আল-কুমী। তিনি বার্বার শাখা-গোত্র কুমিয়া-এর সদস্য ছিলেন। মরক্কোর তিলিমসান (Tlemcen) নগরীর নিকটবর্তী তাজিরুত এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশবেই ইলম অর্জনরত অবস্থায় বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা একজন শিল্পী ছিলেন।

টিকাঃ
১০৪. দেখুন: ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৮/২২৬।
১০৫. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬ ও আননাসিরী, আলইসতিফ্ছা, ২/৯১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবদুল মুমিন বিন আলীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক

📄 আবদুল মুমিন বিন আলীর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু দিক


আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী তাঁর পরিচয়-বিবরণীতে লিখেছেন, আবদুল মুমিন ছিলেন সুগঠিত দেহ, উজ্জ্বল অবয়ব এবং সুউচ্চ কণ্ঠস্বরের অধিকারী। তিনি অত্যন্ত বিজ্ঞ, বিচক্ষণ এবং সফল বীর সেনানী ছিলেন। তিনি প্রতিদিন পবিত্র কুরআনের এক-সপ্তমাংশ তিলাওয়াত করতেন, রেশমী পোশাক পরিহার করতেন, সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোযা রাখতেন। তবে তিনি তাঁর বিরোধী পক্ষের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও নির্মম।

আল্লামা যাহাবী রহ. ‘সিয়ারু আ'লামিন নুবালা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবদুল মুমিন যখন মাগরেবের উপকূলে সিলা নগরীতে অবস্থান করেন এবং নদী অতিক্রম করেন, তখন তিনি সিজদায় পড়ে যান। তিনি বলেন, 'আমি এমন এক যুবকের কথা জানি, যে একসময় অত্যন্ত রিক্ত অবস্থায় এই নদী পার হয়েছিল। নৌকার মাঝি তাকে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল এবং দাঁড় দিয়ে আঘাত করে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। আজ আল্লাহ আমাকে এই বিশাল বাহিনীর অধিনায়ক করেছেন।'

আবদুল মুমিন বিন আলীর ষোলোজন পুত্রসন্তান ছিল। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—মুহাম্মাদ, আলী, উমর, ইউসুফ, উসমান, সুলাইমান, ইয়াহইয়া প্রমুখ। তাঁর শাসনামলে যারা নামাযে উপস্থিত থাকতো না, তাদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হতো। তাঁর এই কঠোরতা এবং নিয়মবর্তিতা মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্যকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছিল।

টিকাঃ
১০৬. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬।
১০৭. আল্লামা যাহাবী ও ইবনুল ইমাদ-এর বর্ণিত এ গুণ এ কথাই বোঝায় যে, সে যুগে রেশমী কাপড় পরিধান করা মানুষের রীতি ও পছন্দের বিষয় ছিল।
১০৮. ইবনুল ইমাদ, শাযারাতুয যাহাব, ৪/১৩৬ ও আননাসিরী, আলইসতিফ্ছা, ২/৯৬।
১৬১. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৩ ও যাহাবী, সিয়ার আ'লামিন নুবালা, ২১/৩৭৫।
১৬২. আবদুল ওয়াহিদ আলমাররাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 কঠিন সংঘাত ও সশব্দ পতন!

📄 কঠিন সংঘাত ও সশব্দ পতন!


ইবনে তুমারতের ইন্তেকালের পর আবদুল মুমিন বিন আলীর নেতৃত্বে মুওয়াহহিদী বাহিনীর অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ৫২৮ হিজরীতে আবদুল মুমিন বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটালেন এবং সেনাবাহিনী নিয়ে টাডলায় পৌঁছালেন। সেখানে মুরাবিতী ও মুওয়াহহিদী বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। যুদ্ধে মুওয়াহহিদী বাহিনী জয়লাভ করল। ৫৩৩ হিজরীতে মুরাবিতী শাসক আলী বিন ইউসুফ তাঁর পুত্র তাশফিনকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত ঘোষণা করলেন এবং আব্দুল মুমিনের বিদ্রোহ দমনে বিশাল বাহিনী প্রেরণ করলেন।

তাশফিন বিন আলী মুরাবিতী বাহিনী নিয়ে পাহাড়ী অঞ্চলে আব্দুল মুমিনের অনুসরণ করতে লাগলেন। ৫৩৮ হিজরীতে শীতকালে আবদুল মুমিন বিন আলী দুর্গম পাহাড়ে অবস্থান গ্রহণ করেন। তুষারপাত ও প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে তাশফিনের বাহিনী প্রচণ্ড কষ্টের সম্মুখীন হয়। রসদ ফুরিয়ে যাওয়ায় মুরাবিতী বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে আব্দুল মুমিন তিলিমসান ও ওয়াহরান নগরীতে আক্রমণ চালিয়ে সেগুলো দখল করে নেন। ৫৩৯ হিজরীতে ওয়াহরানের উপকূলে এক দুর্ঘটনায় তাশফিন বিন আলী নিহত হন।

তাশফিনের মৃত্যুর পর মুরাবিতী সাম্রাজ্যের পতন ত্বরান্বিত হয়। আব্দুল মুমিন একে একে ফেয, সাবতা ও অন্যান্য শহর জয় করেন। ৫৪০ হিজরীতে মুওয়াহহিদী বাহিনী ফেয নগরী দখল করে। এরপর ৫৪১ হিজরীতে তাঁরা মুরাবিতী সাম্রাজ্যের রাজধানী মারাকেশ অবরোধ করেন। দীর্ঘ এগারো মাস অবরোধের পর মারাকেশবাসীর শক্তি নিঃশেষ হয়ে আসে। ৫৪২ হিজরীতে আব্দুল মুমিন জোরপূর্বক মারাকেশে প্রবেশ করেন এবং শেষ মুরাবিতী শাসক কিশোর ইসহাক বিন আলীকে হত্যা করেন। এর মাধ্যমেই গৌরবময় মুরাবিতী সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত পতন ঘটে এবং মাগরেবে মুওয়াহহিদী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।

টিকাঃ
৩৬৮. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, ৯/২০১।
৩৬৯. ইবনুল আসীর, আল-কামিল, ৯/২০১।
৩৭০. আব্দুল ওয়াহিদ মারাকিশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৯০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px