📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারতের ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারতের ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা


প্রত্যেকেই মুহাম্মাদ বিন তুমারতের জীবন-ইতিহাস অত্যন্ত দুর্বোধ্য এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জটিল ও রহস্যঘেরা বর্ণনায় ভরপুর। জটাজালের পাশাপাশি তাতে পারস্পরিক অসঙ্গতি ও বৈপরীত্যও প্রচুর। তাই কোন ঘটনাটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট; কিংবা কোনটি আগের আর কোনটি পরের, তা নির্ণয় করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বিশেষত পূর্বতন যেসব ঐতিহাসিক তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা তাঁর ও তাঁর আমলে সংঘটিত ঘটনাবলির তারিখ নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারেননি।

এক তো তাঁর প্রাথমিক অপরিচিতি, একাকী চলা, নীরবতা ইত্যাদি ছিলই, পাশাপাশি তিনি যাযাবর জীবনের ন্যায় সর্বদা স্থান পরিবর্তন করতেন। দুর্গম ও সুরক্ষিত এক পাহাড়ি এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও তিনি স্থির হননি। দুর্গম এলাকায় তিনি দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনায় এসব এলাকার অধিবাসীদের ওপর নির্ভর করতেন। এসব এলাকার অধিবাসীদের দ্বীনী অবস্থা ও বুদ্ধি-বিবেক অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। তারা তাঁর অলৌকিকতা ও মাহদী হওয়ার দাবি অন্ধভাবে গ্রহণ করত। অধিকন্তু ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর নামে তিনি এসব গোত্রের যেসব লোক কিছুটা বোধ-বিবেচনার অধিকারী ছিল, তাদের সবাইকে তাঁর নিজের দলের জন্য হুমকি বিবেচনা করে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। হত্যা করিয়েছিলেন তাদেরই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে।

ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ তো এ তথ্যও উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন যারা নিহত হয়েছিল, তারা এমনকি পালানোর চেষ্টাও করেনি; বরং নিজেদের আপনজনের হাতে নিহত হতে অপেক্ষা করেছিল। যখনই কারো প্রতি সন্দেহ করা হতো যে সে বিরোধী, তৎক্ষণাৎ তার উভয় হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয়েছে এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে। ‘বাইদাক’ নামে খ্যাত আবু বকর বিন আলী সানহাজী নামক ইবনে তুমারতের জনৈক অনুসারী, যিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, তিনি ইবনে তুমারতের জীবনী নিয়ে ‘আখবারুল মাহদী ইবনে তুমারত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন; কিন্তু সেখানেও অধিকাংশ ইতিহাসের সময়কাল বা তারিখ উল্লেখ করেননি।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 বুহাইরা বা উদ্যানের যুদ্ধ

📄 বুহাইরা বা উদ্যানের যুদ্ধ


৫২৪ হিজরীতে (১১২৯ খৃস্টাব্দে) বুহাইরা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে মুরাবিতী বাহিনী মুওয়াহহিদী বাহিনীকে পরাজিত করে এবং মুওয়াহহিদী বাহিনীর চল্লিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। এ যুদ্ধ ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধে পরাজয়ের পর যারা তাঁর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তাদের সবাইকে তিনি তাঁদেরই আত্মীয়স্বজনের হাতে হত্যা করিয়েছিলেন।

ইবনুল আছীর রহ. লিখেছেন, মাহদী অর্থাৎ ইবনে তুমারত চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করলেন। এদের অধিকাংশই ছিল পদাতিক। তিনি ওয়ানাশরীমীকে সেনাপতি নিযুক্ত করলেন এবং আবদুল মুমিনকেও বাহিনীর দায়িত্ব দিলেন। মুওয়াহহিদী বাহিনী মারাকেশে পৌঁছলে নগরী অবরোধ করল। আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফ ইবনে তুমারতের দাওয়াতকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। মুওয়াহহিদী বাহিনী মারাকেশের নিকটবর্তী বুহাইরা নামক স্থানে সমবেত হলো। আলী বিন ইউসুফের পুত্র মুবায়্যেনের নেতৃত্বে বিশাল মুরাবিতী বাহিনী তাঁদের মোকাবেলা করতে উপস্থিত হলো। উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং যুদ্ধে মুওয়াহহিদী বাহিনী পরাজিত হলো। মুওয়াহহিদী পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধা নিহত হলো। আবদুল মুমিন তাঁর কিছু সঙ্গীকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের সংবাদ ইবনে তুমারতের কাছে পৌঁছলে প্রথমেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আবদুল মুমিন কি বাঁচতে পেরেছে?' সংবাদদাতারা জানাল, 'হ্যাঁ, তিনি প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।' তখন মুহাম্মাদ বিন তুমারত বললেন, 'তাহলে কিছুই খোয়া যায়নি।'

টিকাঃ
২৯০. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/২০০।
১০১. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬০-২৬১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনে তূমারতের অসিয়ত ও আবদুল মুমিনের বাইআত

📄 ইবনে তূমারতের অসিয়ত ও আবদুল মুমিনের বাইআত


মাররাকুশী 'আলমু'জিব' গ্রন্থে এক আশ্চর্য ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন পূর্বে ইবনে তুমারত তাঁর বিভিন্ন গোত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশেষ অনুসারীদের সমবেত করেন। সবাই তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তিনি প্রথমে আল্লাহর শানে হামদ ও সানা পাঠ করেন। এরপর নবীজীর নামে দরূদ পাঠ করেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোচনা করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন, বিভক্তি দূর করে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন এবং লাঞ্ছনার পর সম্মান দান করেছেন। আমি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছি এবং তাকে তোমাদের আমীর নির্ধারণ করেছি। সেই ব্যক্তিটি হচ্ছে আবদুল মুমিন। সুতরাং যতদিন সে আপন রবের প্রতি অনুগত থাকবে, তোমরাও তার অনুগত থাকবে।'

ইবনে তুমারতের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সকলে আবদুল মুমিনের হাতে বাইআত হয়। ইবনে তুমারত সকলের জন্য দোয়া করেন। এ অঙ্গীকার গ্রহণের অল্প কয়েকদিন পরেই ইবনে তুমারত ইন্তেকাল করেন আর মুওয়াহহিদী সম্প্রদায় তাদের নতুন নেতা আবদুল মুমিনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়।

টিকাঃ
১০৩. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬২-২৬৪।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম খলীফা

📄 মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম খলীফা


৫৪১ হিজরীতে (১১৪৬ খৃষ্টাব্দে) মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ অভ্যুদয় ঘটে। মুওয়াহহিদী রাষ্ট্রের প্রথম প্রকৃত শাসক হলেন মুহাম্মাদ বিন তুমারতের প্রধান শিষ্য আবদুল মুমিন বিন আলী (৪৮৭-৫৫৫ হিজরী/১০৯৪-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ)। তাঁর পুরো নাম আবদুল মুমিন বিন আলী বিন মাখলুফ আল-কুমী। তিনি বার্বার শাখা-গোত্র কুমিয়া-এর সদস্য ছিলেন। মরক্কোর তিলিমসান (Tlemcen) নগরীর নিকটবর্তী তাজিরুত এলাকায় তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং শৈশবেই ইলম অর্জনরত অবস্থায় বেড়ে ওঠেন। তাঁর পিতা একজন শিল্পী ছিলেন।

টিকাঃ
১০৪. দেখুন: ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৮/২২৬।
১০৫. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬৬ ও আননাসিরী, আলইসতিফ্ছা, ২/৯১।

ফন্ট সাইজ
15px
17px