📄 মুরাবিতী-মুওয়াহহিদী দু’ পক্ষের মুখোমুখি অবস্থান
মুহাম্মাদ বিন তুমারতের অনুসারীরা সংখ্যায় যখন পঞ্চাশে পৌঁছায়, তখন তিনি তাদের নাম রাখলেন ‘পঞ্চাশের কাফেলা’। সুস (Souss) নদীর তীরবর্তী আবু বকর বিন আলী লামতূনী তখন তাদের অবস্থানস্থল হারাগায় অভিযান পরিচালনা করেন। মুহাম্মাদ বিন তুমারতের অনুসারীরা তাদের ভ্রাতৃগোষ্ঠী হানতাতা ও তিনমাল গোত্রের সাহায্য কামনা করে। তাদের সাহায্য নিয়ে মুওয়াহহিদী জামাত লামতূনী সেনাদের ওপর হামলা করে তাদেরকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। এর পূর্বেই তাদের ইমাম মুহাম্মাদ বিন তুমারত তাদেরকে বিজয়ের সুসংবাদ দিয়েছিলেন। ফলে ইবনে তুমারতের সততার প্রতি অনুসারীদের বিশ্বাস আরও পোক্ত হয়। এরপর মানুষ দলে দলে তাঁর দাওয়াতী আন্দোলনে শরীক হতে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
লামতূনী বাহিনী পরবর্তী সময়ে আরও একবার তাদের উদ্দেশে অভিযান পরিচালনা করে। এরা ‘সালামতূসা হাশম’ নামে পরিচিত ছিল। সংবাদ পেয়ে মুহাম্মাদ বিন তুমারত গোত্র হতে তাঁর সকল অনুসারীদেরকে সমবেত করেন এবং লামতূনী বাহিনীর মোকাবেলার উদ্দেশ্যে বের হন। বাঝিক নামক স্থানে উভয় দল মুখোমুখি হয়। যুদ্ধে মুওয়াহহিদী বাহিনী লামতূনী বাহিনীকে পরাজিত করে এবং আপাত পর্যন্ত তাঁদের পশ্চাদ্ধাবন করে। আপাত পৌঁছার পর আবু বকর বিন আলী ইবনু ইউসুফ ও ইবরাহীম বিন তাশফীন-এর বাহিনী ও লামতূনী বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেয়। মুওয়াহহিদী বাহিনী এই সম্মিলিত বাহিনীকেও পরাজিত করতে সক্ষম হয়।
ইবনে তুমারত তিনমালে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী ও সুরক্ষিত অঞ্চল গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি সেখান থেকে বিভিন্ন সময় বাহিনী পাঠিয়ে মুরাবিতী সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাতেন। এভাবে ধীরে ধীরে তিনি ও তাঁর পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে তাঁর সাম্রাজ্য সম্প্রসারিত করতে সক্ষম হন। সম্প্রসারণ প্রচেষ্টা চলাকালে বিভিন্ন এলাকার মুরাবিতীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। ৫১৭ হিজরীতে মুহাম্মাদ বিন তুমারত মুওয়াহহিদী গোত্রের সামনে এক বিশাল বাহিনী গঠন করলেন। বাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ছিল তিনমাল অঞ্চলের; এদের সঙ্গে সুস এলাকার অধিবাসীরাও যোগ দিয়েছিল। তিনি তাঁর বাহিনীকে বললেন, 'যাও, মুরাবিতী নামধারী এসব ধর্মদ্রোহী বিপথগামীদের উদ্দেশে রওয়ানা হও। এদেরকে অন্যায়ের মূলোৎপাটন, ন্যায়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিদাআত অপসারণ ও নিষ্পাপ ইমাম মাহদীর প্রতি বিশ্বাস-স্থাপনের আহ্বান জানাও। যদি তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাইয়ে পরিণত হবে। আর যদি তারা তোমাদের আহ্বানে সাড়া না দেয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে।'
টিকাঃ
১৭২. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৯।
📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারতের ইতিহাস সম্পর্কে পর্যালোচনা
প্রত্যেকেই মুহাম্মাদ বিন তুমারতের জীবন-ইতিহাস অত্যন্ত দুর্বোধ্য এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে জটিল ও রহস্যঘেরা বর্ণনায় ভরপুর। জটাজালের পাশাপাশি তাতে পারস্পরিক অসঙ্গতি ও বৈপরীত্যও প্রচুর। তাই কোন ঘটনাটি সত্য আর কোনটি বানোয়াট; কিংবা কোনটি আগের আর কোনটি পরের, তা নির্ণয় করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। বিশেষত পূর্বতন যেসব ঐতিহাসিক তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তাঁরা তাঁর ও তাঁর আমলে সংঘটিত ঘটনাবলির তারিখ নির্ভুলভাবে লিপিবদ্ধ করতে পারেননি।
এক তো তাঁর প্রাথমিক অপরিচিতি, একাকী চলা, নীরবতা ইত্যাদি ছিলই, পাশাপাশি তিনি যাযাবর জীবনের ন্যায় সর্বদা স্থান পরিবর্তন করতেন। দুর্গম ও সুরক্ষিত এক পাহাড়ি এলাকা ছাড়া অন্য কোথাও তিনি স্থির হননি। দুর্গম এলাকায় তিনি দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনায় এসব এলাকার অধিবাসীদের ওপর নির্ভর করতেন। এসব এলাকার অধিবাসীদের দ্বীনী অবস্থা ও বুদ্ধি-বিবেক অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। তারা তাঁর অলৌকিকতা ও মাহদী হওয়ার দাবি অন্ধভাবে গ্রহণ করত। অধিকন্তু ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর নামে তিনি এসব গোত্রের যেসব লোক কিছুটা বোধ-বিবেচনার অধিকারী ছিল, তাদের সবাইকে তাঁর নিজের দলের জন্য হুমকি বিবেচনা করে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। হত্যা করিয়েছিলেন তাদেরই আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে।
ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ তো এ তথ্যও উল্লেখ করেছেন যে, সেদিন যারা নিহত হয়েছিল, তারা এমনকি পালানোর চেষ্টাও করেনি; বরং নিজেদের আপনজনের হাতে নিহত হতে অপেক্ষা করেছিল। যখনই কারো প্রতি সন্দেহ করা হতো যে সে বিরোধী, তৎক্ষণাৎ তার উভয় হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলা হয়েছে এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে। ‘বাইদাক’ নামে খ্যাত আবু বকর বিন আলী সানহাজী নামক ইবনে তুমারতের জনৈক অনুসারী, যিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, তিনি ইবনে তুমারতের জীবনী নিয়ে ‘আখবারুল মাহদী ইবনে তুমারত’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন; কিন্তু সেখানেও অধিকাংশ ইতিহাসের সময়কাল বা তারিখ উল্লেখ করেননি।
📄 বুহাইরা বা উদ্যানের যুদ্ধ
৫২৪ হিজরীতে (১১২৯ খৃস্টাব্দে) বুহাইরা যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে মুরাবিতী বাহিনী মুওয়াহহিদী বাহিনীকে পরাজিত করে এবং মুওয়াহহিদী বাহিনীর চল্লিশ হাজার সৈন্য নিহত হয়। এ যুদ্ধ ‘শুদ্ধি অভিযান’-এর পূর্বে সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধে পরাজয়ের পর যারা তাঁর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিল, তাদের সবাইকে তিনি তাঁদেরই আত্মীয়স্বজনের হাতে হত্যা করিয়েছিলেন।
ইবনুল আছীর রহ. লিখেছেন, মাহদী অর্থাৎ ইবনে তুমারত চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করলেন। এদের অধিকাংশই ছিল পদাতিক। তিনি ওয়ানাশরীমীকে সেনাপতি নিযুক্ত করলেন এবং আবদুল মুমিনকেও বাহিনীর দায়িত্ব দিলেন। মুওয়াহহিদী বাহিনী মারাকেশে পৌঁছলে নগরী অবরোধ করল। আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফ ইবনে তুমারতের দাওয়াতকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। মুওয়াহহিদী বাহিনী মারাকেশের নিকটবর্তী বুহাইরা নামক স্থানে সমবেত হলো। আলী বিন ইউসুফের পুত্র মুবায়্যেনের নেতৃত্বে বিশাল মুরাবিতী বাহিনী তাঁদের মোকাবেলা করতে উপস্থিত হলো। উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হলো এবং যুদ্ধে মুওয়াহহিদী বাহিনী পরাজিত হলো। মুওয়াহহিদী পক্ষের হাজার হাজার যোদ্ধা নিহত হলো। আবদুল মুমিন তাঁর কিছু সঙ্গীকে নিয়ে পালাতে সক্ষম হলেন। যুদ্ধে পরাজয়ের সংবাদ ইবনে তুমারতের কাছে পৌঁছলে প্রথমেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন, 'আবদুল মুমিন কি বাঁচতে পেরেছে?' সংবাদদাতারা জানাল, 'হ্যাঁ, তিনি প্রাণে রক্ষা পেয়েছেন।' তখন মুহাম্মাদ বিন তুমারত বললেন, 'তাহলে কিছুই খোয়া যায়নি।'
টিকাঃ
২৯০. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৯/২০০।
১০১. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬০-২৬১।
📄 ইবনে তূমারতের অসিয়ত ও আবদুল মুমিনের বাইআত
মাররাকুশী 'আলমু'জিব' গ্রন্থে এক আশ্চর্য ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন পূর্বে ইবনে তুমারত তাঁর বিভিন্ন গোত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বিশেষ অনুসারীদের সমবেত করেন। সবাই তাঁর সামনে উপস্থিত হলে তিনি প্রথমে আল্লাহর শানে হামদ ও সানা পাঠ করেন। এরপর নবীজীর নামে দরূদ পাঠ করেন এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের প্রতি আল্লাহর সন্তুষ্টির আলোচনা করেন। তিনি বলেন, 'আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে হেদায়েত দান করেছেন, বিভক্তি দূর করে একতার বন্ধনে আবদ্ধ করেছেন এবং লাঞ্ছনার পর সম্মান দান করেছেন। আমি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য হতেই একজন ব্যক্তিকে নির্বাচন করেছি এবং তাকে তোমাদের আমীর নির্ধারণ করেছি। সেই ব্যক্তিটি হচ্ছে আবদুল মুমিন। সুতরাং যতদিন সে আপন রবের প্রতি অনুগত থাকবে, তোমরাও তার অনুগত থাকবে।'
ইবনে তুমারতের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর সকলে আবদুল মুমিনের হাতে বাইআত হয়। ইবনে তুমারত সকলের জন্য দোয়া করেন। এ অঙ্গীকার গ্রহণের অল্প কয়েকদিন পরেই ইবনে তুমারত ইন্তেকাল করেন আর মুওয়াহহিদী সম্প্রদায় তাদের নতুন নেতা আবদুল মুমিনের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়।
টিকাঃ
১০৩. আবদুল ওয়াহিদ মাররাকুশী, আলমু'জিব, পৃ: ২৬২-২৬৪।