📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার সংস্কার-চিন্তা

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার সংস্কার-চিন্তা


এই লাঞ্ছনাকর ও লজ্জাজনক পরিস্থিতির সংস্কার ছিল অত্যাবশ্যক। আর এ চিন্তাই মুহাম্মাদ বিন তূমারতের চিন্তাজগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তাই তিনি তাঁর দাওয়াতী কাফেলার সদস্যদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন এবং সবার সামনে তাঁর সংস্কার পরিকল্পনা পেশ করলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে বললেন, 'যেহেতু গোনাহ ও অন্যায়ের কাজ পুরো মুরাবিতী রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অবস্থা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাপাচারের প্লাবন উঁচু টিলাকেও গ্রাস করে ফেলেছে, সুতরাং এখন সমাধানের পথ একটাই; আর তা হলো একবারে গোড়া থেকে শুদ্ধি অভিযান চালানো। অর্থাৎ আমরা শাসনকর্তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করব। প্রথমে আলী বিন ইউসুফ ও তাঁর গভর্নরদের দিয়ে শুরু করব। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেব। এরপর ক্ষমতা যখন আমাদের হাতে আসবে, তখন আমরা কুরআন-সুন্নাহর দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার করব।'

মুহাম্মাদ বিন তূমারত তাঁর সংস্কার ও সংশোধনের পথ সংক্ষিপ্ত করে নিতে চেয়েছিলেন। শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন যে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মানুষকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে মধ্য আফ্রিকার সংস্কার করেছিলেন, মুহাম্মাদ বিন তূমারত তেমন দীর্ঘ ধৈর্য ধরতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন আলী বিন ইউসুফকে অপসারণ করে ক্ষমতার সিংহাসনে বসতে এবং শাসনের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে।

আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফও শরীয়ত প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান জারি রেখেছিলেন। অবশ্য, দ্বীনের কিছু ক্ষেত্রে তাঁর শাসন ব্যবস্থায় বিচ্যুতি ছিল। কিন্তু শরয়ী শাসকের এই ত্রুটি কোনোক্রমেই মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তাঁর সঙ্গীদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অনুমতি দেয় না; তা তাঁদের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক না কেন। বরং তাঁদের কর্তব্য ছিল মানুষকে ধীরে ধীরে সংশোধন করা এবং শাসককে সঠিক পথে ফিরে আসতে সহায়তা করা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন, তখন তিনি এই আমূল ও আকস্মিক ক্ষমতা দখলের পথ অবলম্বন করেননি। বরং তিনি বছরের পর বছর ধরে মানুষের তারবিয়াত করেছেন, তাঁদের চিন্তার সংস্কার করেছেন। মক্কায় তেরো বছর এবং মদীনা জীবনের প্রথম ভাগেও তিনি এই নীতিতেই মানুষকে সংশোধন করেছেন। এরপর যখন মুমিনদের শক্তি মজবুত হয়েছে, তখন তিনি সকল বিষয়ে কর্তৃত্ব গ্রহণ করেছেন।

টিকাঃ
১২২. আসসাওয়াব, ৪/১০।
১২৩. ইবনে খালিকান, আলইনতিফা, ৫/৩০।
১২৪. দেখুন : ইবনে কাসির, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২১১ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আলী বিন ইউসুফ ও মুহাম্মাদ বিন তূমারত : মুখোমুখি অবস্থান

📄 আলী বিন ইউসুফ ও মুহাম্মাদ বিন তূমারত : মুখোমুখি অবস্থান


যাই হোক, মুহাম্মাদ বিন তূমারত রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন ও সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর এই চিন্তাধারা ছিল নববী পদ্ধতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফ মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তাঁর আন্দোলনের কথা জানতে পারলেন। কিন্তু তিনি অস্থির না হয়ে গভীর ধৈর্য ও উদারতার পরিচয় দিলেন এবং মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও মুরাবিতী আলিমগণের মাঝে একটি বিতর্কসভা আয়োজনের পরিকল্পনা করলেন।

রাজপ্রাসাদে বিতর্কসভা অনুষ্ঠিত হলো। মুহাম্মাদ বিন তূমারত তাঁর ছয় সঙ্গীকে নিয়ে উপস্থিত হলেন; সাম্রাজ্যের আলিমগণও প্রধান বিচারপতি ও বিখ্যাত আলিম মালিক বিন উহাইবের নেতৃত্বে উপস্থিত হলেন। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে ইলমী বিতর্ক শুরু হলো। আলী বিন ইউসুফের এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে তিনি একজন ইনসাফপ্রিয় শাসক ছিলেন। তিনি চাইলে বিদ্রোহী হিসেবে তূমারতকে সহজেই বন্দী বা হত্যা করতে পারতেন।

রাজদরবারে অনুষ্ঠিত বিতর্কসভায় মুহাম্মাদ বিন তূমারত মুরাবিতী আলিমদেরকে যুক্তিতর্কে পরাজিত করলেন। যেহেতু তিনি বাগদাদে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে বিতর্কশাস্ত্রে পারদর্শী হয়েছিলেন, তাই প্রতিটি বিষয়ে তিনি ওলামায়ে কেরামকে পরাভূত করলেন। এমনকি খলীফা আলী বিন ইউসুফ যখন জানতে পারলেন যে, তাঁর রাষ্ট্রে অন্যায়-অনাচার সীমাহীন বৃদ্ধি পেয়েছে, তখন তিনি আল্লাহর ভয়ে কাঁদতে লাগলেন। কিন্তু তাঁর কান্না মুহাম্মাদ বিন তূমারতের মনে সামান্য দয়ারও উদ্রেক করল না। তিনি খলিফার সাথে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় কথা বলতে লাগলেন।

মজলিসে উপস্থিত মুরাবিতী নেতৃবৃন্দ জানতেন যে, মুহাম্মাদ বিন তূমারত মানুষকে খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে প্ররোচিত করছেন। তাই প্রধান বিচারপতি মালিক বিন উহাইব খলীফাকে কানে কানে বললেন, 'আপনার উচিত এখনই এই লোককে বন্দী করা; নয়তো শীঘ্রই এমন দিন আসবে যখন একে নিয়ন্ত্রণ করতে আপনার সমস্ত শক্তি ব্যয় হবে।' কিন্তু প্রধান উযীর পরামর্শ দিলেন অন্যরকম। তিনি বললেন, 'মুহাম্মাদ বিন তূমারত এখন আপনার মেহমান এবং তাঁর কথা শুনে আপনি কেঁদেছেন, এমতাবস্থায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে না। তাছাড়া তাঁর সাথে আছে মাত্র ছয়জন লোক, আর আপনি বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি।'

আলী বিন ইউসুফ সবদিক বিবেচনা করে মুহাম্মাদ বিন তূমারতকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তাঁর আশা ছিল, ইবনে তূমারত তাঁকে দেশ সংশোধনে সহায়তা করবেন। কিন্তু পরিস্থিতির মোড় অন্যদিকে ঘুরে গেল।

টিকাঃ
১৪৮. আব্দুল ওয়াহিদ আল-মাররাকিশী, আল-মু'জাব, পৃ : ২৩১, ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২১১ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও জামাআতুল মুওয়াহহিদীন

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও জামাআতুল মুওয়াহহিদীন


আমীর আলী বিন ইউসুফ বিন তাশফীনের প্রাসাদ থেকে বের হয়েই মুহাম্মাদ বিন তূমারত রাজধানী মারাকেশ ছেড়ে পাহাড়ি এলাকায় চলে গেলেন এবং সেখানকার তিনমাল (Tinmal) নামক একটি গ্রামে আশ্রয় নিলেন। অল্প কয়েক বছর পরই এ জনপদ নতুন এক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচিত হলো। মুহাম্মাদ বিন তূমারত ব্যক্তিগতভাবে কঠোর সাধনা করতেন। আহার করতেন অতি সামান্য এবং সঙ্গে কেবল একটি লাঠি ও পানির মশক রাখতেন। তাঁর এই সাধুতা দেখে পাহাড়ের মানুষ তাঁর পাশে জড়ো হতে লাগল। তিনি সেখানে একটি দল গঠন করলেন, যার নাম দিলেন ‘জামাআতুল মুওয়াহহিদীন’ বা একত্ববাদীদের দল।

আবদুল ওয়াহিদ মাররাকিশী লিখেছেন, তিনমাল থেকেই তাঁর আন্দোলনের শুরু। সেখানে মাসমুদা গোত্রের লোকেরা তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করল। তিনি তাঁদের জন্য আকীদাহ বিষয়ক একটি গ্রন্থ রচনা করেন। মানুষ যখন তাঁর ইলমের গভীরতা দেখল, তখন সবার মনে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও ভক্তি সৃষ্টি হলো। তিনি প্রথমে অমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকারের মাধ্যমে আন্দোলন শুরু করলেও পরে তাঁদেরকে সামরিক প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। এ সময় তিনি অনুসারীদের মাঝে ইমাম মাহদীর আলোচনা শুরু করেন এবং একপর্যায়ে নিজেকেই ‘নিষ্পাপ ও প্রতিশ্রুত মাহদী’ হিসেবে ঘোষণা করেন। তিনি নিজের জন্য একটি বানোয়াট বংশতালিকা তৈরি করে নিজেকে নবী-বংশীয় বলে প্রচার করলেন। মানুষ দলে দলে তাঁর হাতে বাইআত হতে লাগল। তিনি তাঁদের জন্য ‘আলামু মা ইতিলাদ’ ও ‘আকাইদু উসুলিদ্দীন’ নামে গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর আকীদা ছিল মিশ্র প্রকৃতির। একদিকে তিনি আশআরী মতাদর্শের কথা বলতেন, অন্যদিকে আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলি অস্বীকারের ক্ষেত্রে মুতাজিলাদের পথ অনুসরণ করতেন। এমনকি তিনি শিয়া মতবাদের অনেক কিছুই গোপনে পোষণ করতেন।

মুহাম্মাদ বিন তূমারতের প্রধান তিনটি ভ্রান্ত নীতি ছিল নিম্নরূপ:
১. নিষ্পাপত্বের দাবি: তিনি নিজেকে নিষ্পাপ বা মা’সুম দাবি করতেন, যা কেবল নবীদের বৈশিষ্ট্য। এটি ছিল রাফযী বা শিয়াদের মতাদর্শের অনুকরণ।
২. মুরাবিতীদের প্রতি 'দেহবাদী' হওয়ার অপবাদ: মুরাবিতীগণ আল্লাহর সিফাত বা গুণাবলিতে বিশ্বাস করতেন। একে কেন্দ্র করে ইবনে তূমারত তাদেরকে ‘মুজাসসিমীয়া’ বা দেহবাদী বলে কাফির ঘোষণা করেন। তিনি দাবি করেন একমাত্র তাঁর অনুসারীরাই প্রকৃত একত্ববাদী বা ‘মুওয়াহহিদীন’ এবং বাকি সব মুসলমান কাফির।
৩. মুরাবিতীদের হত্যা করার বৈধতা: তিনি মুরাবিতীদের রক্ত ও মাল তাঁর অনুসারীদের জন্য হালাল ঘোষণা করেন। তাঁর এই ফতোয়ার কারণে হাজার হাজার নিরপরাধ মুসলমানের রক্ত ঝরানো হয়। তিনি তাঁর অনুসারীদের পরীক্ষা করার জন্য ‘তমিজ’ বা শুদ্ধি অভিযানের নামে নিজস্ব দলের লোকদেরও হত্যা করতেন। তিনি আবু আব্দুল্লাহ ওয়ানাশরীমী নামক এক সহযোগীকে ‘বাশীর’ সাজিয়ে অলৌকিকতার নাটক করতেন। একবার একটি কূপের ভেতর লোক লুকিয়ে রেখে সেখান থেকে গায়েবি আওয়াজ শুনিয়ে লোক ঠকানোর ব্যবস্থা করেছিলেন এবং পরে সেই লুকানো লোকদের জ্যান্ত মাটিচাপা দিয়ে সত্য গোপন করেছিলেন। শুদ্ধি অভিযানের নামে তিনি প্রায় সত্তর হাজার মানুষকে পাহাড় থেকে ফেলে দিয়ে বা অন্য উপায়ে হত্যা করেছিলেন।

টিকাঃ
১৪৯. ইবনে খাল্লিকান, ওয়াকারইয়াতুল আইয়ান, ৩/৩৫৪ ও যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুব্বালা, ১৯/৪২২।
১৫০. ইবনে খালদুন, ওয়াকারইয়াতুল আইয়ান, ৬/২৩১।
১৫১. আব্দুল ওয়াহিদ আল-মাররাকুশী, আল-মু'জাব, পৃ: ২০৪।
১৫২. দেখুন : ইবনে তাইমিয়্যা, মিনহাজুস্ সুন্নাহ্, ৫/২২৯।
৩০০. এ বিষয়ে ইমাম গাযালী রহ. রচিত ‘ফাদাইহুল বাতিনিয়্যাহ’ ও খোমিনীর ‘আলহুকুমাহ আল ইসলামিয়া’ দ্রষ্টব্য।
৩০২. দেখুন : যাহাবী, সিয়ার আ’লামিন নুবালা, ১৯/৩৫০ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৩/২২৭।
৩০৩. ইবনুল আছীর, আলকামিল ফিত তারিখ, ৯/৬১ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৭/৪৬১।
৩০৪. আবুল আ’লিয়াহ আলমারাক্বাশী, আলমু’জিব, পৃ. ৩০৪।
৩০৫. দেখুন : আবুল ওয়ালিদ আলমারাক্বাশী, আলমু’জিব, পৃ. ৩০৬ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৩/২২৬।
৩০৬. ইবনুল আছীর, আলকামিল ফিল তারিখ, ৯/৬১ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৩/২২৬।
৩০৮. জামে' তিরমিযী, হাদীস নং ১০৯৬ ও সুনানে নাসাঈ, হাদীস নং ৩৮৬৭।
৩০৯. ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল কারীম, ১/৫৭৬।
৩১০. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৮৪৮ ও সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৬৭৬।
১. মায়িয ইবন খুওয়াইর, ফি জিলালিল কুরআন, ২/৭৩৩।
১৮০. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১৯/২৪৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার মুওয়াহহিদী জামাত সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার মুওয়াহহিদী জামাত সম্পর্কে একটি পর্যালোচনা


নতুন দল গঠনের এই পথ পরিক্রমায় মুহাম্মাদ বিন তূমারত তাঁর বিরোধিতাকারী হাজারো মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করেছিলেন। এমনকি তাঁর নিজ দলের লোকদেরকেও সামান্য অজুহাতে হত্যা করতে তিনি দ্বিধাবোধ করেননি। কেউ তাঁর মতের বিরোধী হলে তাঁর কাছে তার একমাত্র সমাধান ছিল—‘হত্যা’। তাঁর মতো অগাধ ইলমের অধিকারী একজন ব্যক্তির এ ধরণের চরম গর্হিত কাজে লিপ্ত হওয়া বিস্ময়কর। তাঁর মাহদী হওয়ার দাবি ছিল সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মানুষকে প্রতারিত করার কৌশল।

অবশ্য এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, তাঁর এই দাবিকে সত্য বলে বিশ্বাস করত এমন লোকের সংখ্যাও ছিল প্রচুর। কারণ সে সময়ের আলিমসমাজ জনসাধারণের মাঝে মৌলিক দ্বীনী শিক্ষা ও সঠিক আকীদা প্রসারের পরিবর্তে জটিল ও তাত্ত্বিক বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ওলামায়ে কেরাম ও জনসাধারণের মধ্যে এক ধরণের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ফলে সাধারণ মানুষ সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করতে পারছিল না। দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ এই মানুষগুলো যখন মুহাম্মাদ বিন তূমারতের মতো একজন পন্ডিত ব্যক্তিকে দেখল, যে অনর্গল কুরআন-হাদীস পাঠ করতে পারে, তখন তারা তাঁকে অন্ধভাবে অনুসরণ করতে শুরু করল। তারা তাঁর নিষ্পাপ হওয়ার দাবি এবং মুরাবিতীদের কাফির বলার ফতোয়াকে বিশ্বাস করে নিল।

মুরাবিতীরা যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইসলামের খেদমত করেছে, ভূখণ্ড জয় করেছে, তাঁদেরকে স্রেফ কিছু রাজনৈতিক ও পদ্ধতিগত মতভেদের কারণে কাফির আখ্যা দিয়ে তাঁদের রক্ত হালাল করা হয়েছিল। ‘মুওয়াহহিদী’ নামটি ব্যবহার করা হয়েছিল এটি বোঝাতে যে, পৃথিবীতে একমাত্র তাঁরাই প্রকৃত মুসলিম, আর বাকিরা পথভ্রষ্ট। এই চরমপন্থী মনোভাবের কারণে মাগরেব ও আন্দালুসের মাটি মুসলিম রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। ইবনে তূমারতের এই আন্দোলন আধ্যাত্মিকতার আবরণে মূলত একটি রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক অভ্যুত্থান ছিল।

টিকাঃ
১৭০. আবুল ওয়ালিদ আল-মাররাকিশী, আল-মু'জাব, পৃ : ২৬০-২৬২।
১৭১. যাহাবী, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ১৯/৫৯২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px