📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও মুরাবিতী-বিরোধী আন্দোলনের সূচনা

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও মুরাবিতী-বিরোধী আন্দোলনের সূচনা


মুরাবিতী সাম্রাজ্য অতি দ্রুত গতিতে সুনিশ্চিত বিপর্যয় ও ধ্বংসের অতল গহ্বরে পতনের দিকে এগিয়ে চলছিল। আর তাই তাদের অপসারণ এবং ক্ষমতার পালাবদলে তাদের পরিবর্তে ভিন্ন কোনো শ্রেণির আগমন ছিল আল্লাহর রীতি ও বিধানের দাবি। বাস্তবে তা-ই ঘটল। ৫১২ হিজরীতে (১১১৮ খ্রিস্টাব্দে) মাসমুদা (বার্বার) শাখা-গোত্র হারগার মুহাম্মাদ বিন তূমারত নামক জনৈক ব্যক্তি মুরাবিতী সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দিলেন। অবশ্য সংস্কার ও সংশোধনের নীতির ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ বিন তূমারতের গৃহীত পন্থা ছিল শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের গৃহীত পন্থার তুলনায় সম্পূর্ণই ভিন্ন।

মুহাম্মাদ বিন তূমারত ৪৭০ হিজরীতে (১০৮০ খ্রিস্টাব্দে) জন্মগ্রহণ করেন এবং মাসমুদা গোত্রের একটি সচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠেন। নিজেকে তিনি নবী-দৌহিত্র হাসান বিন আলী বিন আবী তালিব রাযি.-এর বংশোদ্ভূত বলে দাবি করলেও ঐতিহাসিকগণের অগ্রগণ্য মত হলো, তিনি প্রকৃতপক্ষে স্থানীয় বার্বার বংশোদ্ভূতই ছিলেন। মুহাম্মাদ বিন তূমারত সাতাশ বছর বয়স পর্যন্ত অর্থাৎ ৫০০ হিজরী (১১০৭ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত আপন পরিমন্ডলেই বসবাস করেন। তিনি ছিলেন ইলম অর্জনের অনুরাগী। আর সে যুগের তালেবে ইলমদের রীতি ছিল, তারা ইলম অর্জনের জন্য ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করতেন।

এরই সূত্র ধরে মুহাম্মাদ বিন তূমারত ৫০০ হিজরীতে কর্ডোভা সফর করেন এবং সেখানকার আলিমগণের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে জ্ঞানার্জন করেন। এরপর জ্ঞানতৃষ্ণাকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি তাঁর ইলমী সফর অব্যাহত রাখেন এবং মুসলিম প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। প্রথমে তিনি আলেকজান্দ্রিয়ায় যান। এরপর যান মক্কায়। এ সময় তিনি পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন এবং তৎকালীন মক্কার বিভিন্ন ওলামায়ে কেরামের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এরপর তিনি গমন করেন বাগদাদে। সেখানে দীর্ঘ দশ বছর অবস্থান করে সমকালীন বাগদাদের নামকরা সকল ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে ইলম অর্জন করেন। এটা সে সময়ের কথা, যখন বাগদাদ ছিল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ, শিয়া, মু'তাজিলাবাদসহ নানা মত ও পথের বিচিত্র সব স্রোতধারায় উত্তাল। মুহাম্মাদ বিন তূমারত এসব বিচিত্র মতের আলিমদের কাছ থেকেই অর্জন করেন বিভিন্নমুখী ইলম।

৫১২ হিজরীতে (১১১৮ খ্রিস্টাব্দে) তিনি ফিরে আসেন আপন মাতৃভূমিতে। তখন তাঁর বয়স হয়েছিল ৩৮ বছর। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর এই প্রত্যাবর্তনকালের বিবরণ দিতে গিয়ে মন্তব্য করেছেন, 'ইলমের অতল সমুদ্র ও প্রদীপ্ত তারকা হয়ে তিনি মাগরেবে প্রত্যাবর্তন করেন।' অর্থাৎ ইসলামের নানামুখী চিন্তাধারা ও বিভিন্ন শাস্ত্রের জ্ঞান দ্বারা তিনি সমৃদ্ধ হন এবং বাস্তবে সে যুগের শীর্ষস্থানীয় আলিমগণের কাতারে শামিল হন।

টিকাঃ
১১২৭. দেখুন : ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৯/১৬১।
১১২৮. ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৬/২৫৬।
১১২৯. আবদুর ওয়াহিদ আল-মাররাকুশী, আল-মু'জাব ফী তালখীছি আখবারিল মাগরিব, পৃ : ২৪৫ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৬/২৫৬।
১৩০. ইমাম আবু হামিদ গাযালীর সাথে তাঁর সাক্ষাতের বিষয়টি ঐতিহাসিক ও যৌক্তিকভাবে সঠিক নয়।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত এবং আমর বিল মা’রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে তার গৃহীত নীতি

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত এবং আমর বিল মা’রূফ ও নাহী আনিল মুনকারের ক্ষেত্রে তার গৃহীত নীতি


ইরাক ও শাম থেকে মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তনের পথে মুহাম্মাদ বিন তূমারত কিছুদিন আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থান করে তাঁর শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেন। আলেকজান্দ্রিয়ায় অবস্থানকালেই তিনি আমর বিল মা'রুফ ও নাহী আনিল মুনকারের মেহনত শুরু করেন। যদিও তিনি ছিলেন একজন বিদগ্ধ আলিম; কিন্তু সংস্কারের আদেশ ও অসৎ কাজ নিষেধের কর্মকাণ্ডে তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর পন্থা অবলম্বনকারী। এক্ষেত্রে তাঁর কঠোরতা ছিল ভীতিকর পর্যায়ের। তাই তিনি যখন আমর-নাহীর কাজ আরম্ভ করলেন, মানুষ তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগল এবং তাঁকে এড়িয়ে চলতে আরম্ভ করল। আলেকজান্দ্রিয়ার তৎকালীন গভর্নর তাঁর কর্মকাণ্ডে শঙ্কিত হয়ে তাঁকে সেখান থেকে একপ্রকার তাড়িয়ে দিলেন।

এরপর তিনি জাহাজে চড়ে মাতৃভূমি মাগরেবের পথ ধরলেন। জাহাজের মধ্যেও তিনি তাঁর আমর-নাহীর কঠোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। জাহাজে মদপানে বাধা দিলেন এবং কুরআন তিলাওয়াতের নির্দেশ দিলেন। এসব বিষয়ে কঠোরতা করতে গিয়ে জাহাজের আরোহীদের সঙ্গে তিনি বিতর্কে জড়িয়ে পড়লেন। ক্রুদ্ধ আরোহীগণ তাঁকে সমুদ্রে ফেলে দিল। এরপর তিনি পুরো একদিন সাঁতার কেটে জাহাজের পাশে চলতে লাগলেন। অবশেষে তাঁর এই দুরবস্থা প্রত্যক্ষ করে আরোহীদের মনে দয়া জাগল এবং তারা তাঁকে পুনরায় জাহাজে তুলে নিল। এ ঘটনার পর জাহাজের আরোহীদের হৃদয়ে তাঁর প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। মাগরেব পৌঁছা পর্যন্ত তাঁর প্রতি মানুষের এই সম্মান বজায় ছিল।

এরপর তিনি গেলেন তিউনিসিয়ায়। পথে তিনি মাহদিয়া নামক একটি শহরে পৌঁছালেন। মাহদিয়ায় পথ চলার সময় তিনি একটি তালাবদ্ধ মসজিদের পাশে বসলেন। তিনি কিছুক্ষণ রাস্তার পাশে বসে পথিকদের চলাচল দেখতে লাগলেন। যখনই তিনি গান-বাদ্যের সামগ্রী বা মদপাত্র নিয়ে কাউকে যেতে দেখতেন, তাঁর কাছে গিয়ে হাত থেকে তা কেড়ে নিয়ে ভেঙে ফেলছিলেন। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই শহরবাসীর মুখে তাঁর এই নাহী আনিল মুনকারের প্রচেষ্টার কথা ছড়িয়ে পড়ল। মানুষ দলে দলে তাঁর কাছে এসে দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদির দরস গ্রহণ করতে লাগল।

মুহাম্মাদ বিন তূমারত সমাজের অন্যায়-অনাচারের আমূল পরিবর্তন চাচ্ছিলেন একমুহূর্তে। তিনি সকল অপরাধের শিকড় সমূলে উৎপাটন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হলো, এটি সুন্নাতুল্লাহ ও জগতের স্বাভাবিক ধারার বিরোধী। স্বয়ং নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আমর বিল মা'রুফ ও নাহী আনিল মুনকারের কাজ শুরু করেছিলেন, তিনি তখন আমূল ও আকস্মিক পরিবর্তনের আহবান করেননি। বরং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে যে বিধান অবতীর্ণ হয়েছে, তিনি সে অনুযায়ী তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন। উদাহরণস্বরূপ, মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা মানুষের অবস্থা বিবেচনাপূর্বক পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে।

খলীফা উমর বিন আব্দুল আযীযের পুত্র তাঁর পিতার খেলাফতকালে চেয়েছিলেন সমস্ত অন্যায়ের আমূল সংস্কার করতে। কিন্তু তিনি দেখলেন, তাঁর পিতা এক্ষেত্রে ‘ধীরে চল’ নীতি অবলম্বন করেছেন। বিষয়টি পুত্রের কাছে কষ্টকর মনে হওয়ায় তিনি তাঁর পিতার কাছে অভিযোগ করলেন। উত্তরে উমর বিন আব্দুল আযীয স্বীয় পুত্রকে যা বললেন, তা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তিনি বললেন, 'বৎস! জনসাধারণকে আমি যদি এক মুহূর্তে যাবতীয় অন্যায় ছেড়ে দিয়ে পুরোপুরি ন্যায়ের পথে চলতে বাধ্য করি, তবে তারা একসাথে পুরোপুরি ন্যায়ের পথ ছেড়ে দেবে।'

কিন্তু মুহাম্মাদ বিন তূমারত এই সুন্নাতুল্লাহ ও সুন্নাতে নববীর পথ অবলম্বন করেননি। তিনি চেয়েছিলেন সবকিছুর আকস্মিক আমূল পরিবর্তন; তাও আবার অত্যন্ত কঠোর পদ্ধতিতে। অথচ আল্লাহ তাআ’লা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, 'তুমি যদি রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর-হৃদয় হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে বিক্ষিপ্ত হয়ে যেত।' [সূরা আলে-ইমরান : ১৫৯]

টিকাঃ
১৩২. আব্দুল ওয়াহিদ আল-মাররাকুশী, আল-মু'জাব ফী তালখীছি আখবারিল মাগরিব, পৃ : ২৪6 ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৬/২৬০।
১৩৩. আল-ইস্তিকসা, ২/৭৯।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও আবদুল মুমিন বিন আলী : দুই বিদ্রোহী চিন্তকের সম্মিলন

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও আবদুল মুমিন বিন আলী : দুই বিদ্রোহী চিন্তকের সম্মিলন


বিজায়া (Béjaïa) এলাকায় মুহাম্মাদ বিন তূমারত আবদুল মুমিন বিন আলী নামক জনৈক ব্যক্তির সাক্ষাৎ লাভ করলেন। ইবনে তূমারত শিক্ষাজীবনের শুরুতে যে জ্ঞানতৃষ্ণা লালন করতেন, এই ব্যক্তিটিও একই তৃষ্ণা নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন। প্রথম সাক্ষাতেই মুহাম্মাদ বিন তূমারত তাঁকে তাঁর মাতৃভূমি ত্যাগ ও বিভিন্ন দেশে ঘুরে বেড়ানোর কারণ জিজ্ঞেস করলেন। উত্তরে আব্দুল মুমিন জানালেন, তিনি ইলম ও দ্বীন অন্বেষণ করছেন। তখন মুহাম্মাদ বিন তূমারত বললেন, 'তুমি যা অন্বেষণ করছ, যা খুঁজে ফিরছ, তা আমার কাছেই আছে।' এরপর থেকে আবদুল মুমিন বিন আলী তাঁর সংস্পর্শে থেকে ইলমে দ্বীন অর্জন করতে লাগলেন। ইবনে তূমারতের ইলমের গভীরতা আবদুল মুমিনকে অভিভূত করল। তারা উভয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলেন এবং নিজেদের জীবনের গতিপথ এক করে নিলেন। মুহাম্মাদ বিন তূমারতের মৃত্যু পর্যন্ত উভয়ের একসঙ্গে পথচলা অব্যাহত ছিল।

আবদুল মুমিন বিন আলী মুহাম্মাদ বিন তূমারতের কাছ থেকে ইলম অর্জন করার পাশাপাশি কঠোর পন্থায় দ্বীনের দাওয়াত প্রদান এবং আমর বিল মা’রুফ ও নাহী আনিল মুনকারের দায়িত্ব পালনের পদ্ধতিও শিখে নিলেন। এরপর মাগরেবের ভূমিতে উভয়ে একসঙ্গে মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করতে লাগলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁদের সঙ্গে আরও পাঁচজন ব্যক্তি যোগ দিলেন। ফলে মুহাম্মাদ বিন তূমারতসহ এই দাওয়াতী কাফেলার সদস্যসংখ্যা দাঁড়াল সাতজনে।

এই অবস্থায় মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তাঁর সাথীগণ উপলব্ধি করলেন যে, মুরাবিতী সাম্রাজ্যে অন্যায়-অনাচার আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। মদ্যপান ও অশ্লীলতা সারা দেশে, এমনকি ইউসুফ বিন তাশফীন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাজধানী মারাকেশে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা দেখতে পেলেন, স্বয়ং গভর্নরগণ জনগণের ওপর জুলুম করছেন, জনগণের কাঁধে কঠিন করের বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাঁরা আরও দেখতে পেলেন, সমাজে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি স্বয়ং মুহাম্মাদ বিন তূমারতও একদিন দেখলেন, জনৈকা মহিলা একদল সৈন্য-সামন্ত নিয়ে বেপরোয়াভাবে পথে বেরিয়েছে। তাকে রাজকীয় প্রহরাও প্রদান করা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করে তিনি জানতে পারলেন, এভাবে সৈন্যপ্রহরায় চলা নারীটি স্বয়ং আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফের বোন। তিনি তখন কঠোরভাবে এর বিরোধিতা করেন; এমনকি তিনি ও তাঁর সঙ্গীরা আমীরের বোনের বাহনের মুখে আঘাত করে তাকে বাহন থেকে নামিয়ে দেন।

টিকাঃ
১১৯. আবদুন ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমুজব ফী আখবারিল মাগরিব, পৃ : ২৮৭, ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৪ ও আলনাফী, আলইকতিফা, ২/৭০।
১২০. দেখুন : আবদুন ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমুজব, পৃ : ৩০০ ।
১২১. দেখুন : ইবনে বাশকুওয়াল, আসসিলাহ।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার সংস্কার-চিন্তা

📄 মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তার সংস্কার-চিন্তা


এই লাঞ্ছনাকর ও লজ্জাজনক পরিস্থিতির সংস্কার ছিল অত্যাবশ্যক। আর এ চিন্তাই মুহাম্মাদ বিন তূমারতের চিন্তাজগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। তাই তিনি তাঁর দাওয়াতী কাফেলার সদস্যদের নিয়ে পরামর্শে বসলেন এবং সবার সামনে তাঁর সংস্কার পরিকল্পনা পেশ করলেন। তিনি তাঁর পরিকল্পনা তুলে ধরতে গিয়ে বললেন, 'যেহেতু গোনাহ ও অন্যায়ের কাজ পুরো মুরাবিতী রাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং অবস্থা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পাপাচারের প্লাবন উঁচু টিলাকেও গ্রাস করে ফেলেছে, সুতরাং এখন সমাধানের পথ একটাই; আর তা হলো একবারে গোড়া থেকে শুদ্ধি অভিযান চালানো। অর্থাৎ আমরা শাসনকর্তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ করব। প্রথমে আলী বিন ইউসুফ ও তাঁর গভর্নরদের দিয়ে শুরু করব। তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সূচনা করে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেব। এরপর ক্ষমতা যখন আমাদের হাতে আসবে, তখন আমরা কুরআন-সুন্নাহর দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার করব।'

মুহাম্মাদ বিন তূমারত তাঁর সংস্কার ও সংশোধনের পথ সংক্ষিপ্ত করে নিতে চেয়েছিলেন। শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন যে সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে মানুষকে দ্বীন শিক্ষা দিয়ে মধ্য আফ্রিকার সংস্কার করেছিলেন, মুহাম্মাদ বিন তূমারত তেমন দীর্ঘ ধৈর্য ধরতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি চেয়েছিলেন আলী বিন ইউসুফকে অপসারণ করে ক্ষমতার সিংহাসনে বসতে এবং শাসনের মাধ্যমে মানুষকে দ্বীনের পথে আনতে।

আমীরুল মুসলিমীন আলী বিন ইউসুফও শরীয়ত প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন। তিনি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিধান জারি রেখেছিলেন। অবশ্য, দ্বীনের কিছু ক্ষেত্রে তাঁর শাসন ব্যবস্থায় বিচ্যুতি ছিল। কিন্তু শরয়ী শাসকের এই ত্রুটি কোনোক্রমেই মুহাম্মাদ বিন তূমারত ও তাঁর সঙ্গীদেরকে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার অনুমতি দেয় না; তা তাঁদের উদ্দেশ্য যতই মহৎ হোক না কেন। বরং তাঁদের কর্তব্য ছিল মানুষকে ধীরে ধীরে সংশোধন করা এবং শাসককে সঠিক পথে ফিরে আসতে সহায়তা করা। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মক্কায় তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন, তখন তিনি এই আমূল ও আকস্মিক ক্ষমতা দখলের পথ অবলম্বন করেননি। বরং তিনি বছরের পর বছর ধরে মানুষের তারবিয়াত করেছেন, তাঁদের চিন্তার সংস্কার করেছেন। মক্কায় তেরো বছর এবং মদীনা জীবনের প্রথম ভাগেও তিনি এই নীতিতেই মানুষকে সংশোধন করেছেন। এরপর যখন মুমিনদের শক্তি মজবুত হয়েছে, তখন তিনি সকল বিষয়ে কর্তৃত্ব গ্রহণ করেছেন।

টিকাঃ
১২২. আসসাওয়াব, ৪/১০।
১২৩. ইবনে খালিকান, আলইনতিফা, ৫/৩০।
১২৪. দেখুন : ইবনে কাসির, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২১১ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২২৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px