📄 দু’টি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর
১. বিজয়াভিযানের পতাকা সমুন্নত থাকা সত্ত্বেও কীভাবে জনসাধারণ পার্থিব মোহে আচ্ছন্ন হল?
২. প্রাজ্ঞ-বিদগ্ধ আলিমসমাজের উপস্থিতি সত্ত্বেও কীভাবে অন্যায়-অনাচার ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ল?
প্রকৃত বাস্তবতা হল, এই স্খলন ও পতনের দায় থেকে তৎকালীন আলিমসমাজ মোটেই মুক্ত ছিলেন না; বরং তাদের কাঁধেই এর দায়-দায়িত্বের বড় একটি অংশ বর্তায়। ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখতে পাই, আলিমসমাজ এ সময় লিপ্ত ছিলেন বিভিন্ন মাসআলার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গবেষণায়; তারা জ্ঞাতসারে উপেক্ষা করেছিলেন দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদিকে। তারা ব্যস্ত ছিলেন গৌণ বিষয় নিয়ে; কিন্তু অবহেলা করেছিলেন তার চেয়েও অগ্রগণ্য ও অধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো। বিশেষ প্রয়োজনীয় নয় এমন অনেক বিষয়ে তারা কলম ধরেছিলেন, বিতর্ক-সভা সরগরম রেখেছিলেন এবং শাখাগত মাসআলাকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়েছিলেন; কিন্তু একই সময় তারা এমন বিষয়াদিকে উপেক্ষা করেছিলেন, যা পরিহার করা কখনো কোনো ক্ষেত্রেই বৈধ নয়।
আবদুল ওয়াহিদ মারাকুশী লিখেছেন, আলিমগণ মাযহাবের শাখাগত মাসআলাসমূহে গভীর জ্ঞান রাখতেন। ফলে সে যুগে মাযহাব-বিষয়ক প্রজ্ঞার বাজার সরগরম ছিল। এই চাহিদা পূরণেই কাজ করা হয়েছে, অন্য সব কিছু বলতে গেলে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে। মাযহাবকেন্দ্রিক বিতর্ক-চর্চা এত বেড়ে গিয়েছিল যে, এমনকি কোরআন-সুন্নাহর মৌলিক জ্ঞানচর্চাও বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। সমকালীন বিদগ্ধ আলিমসমাজের কেউ-ই কোরআন-সুন্নাহর সেবায় পূর্ণ যত্নবান ছিলেন না। ইলমুল কালামের কোনো বিষয় অধ্যয়ন বা আলোচনা করাকে সে যুগের ফকীহগণ কুফরী বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তাঁরা ইলমুল কালামকে বিদআত ও দ্বীনের নব-উদ্ভাবিত বিষয় বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।
এই বাড়াবাড়ির ফলে আকীদাগত বিষয়ে গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল এবং খলীফার অন্তরে ইলমুল কালামের প্রতি ঘৃণা বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল। ফলে তিনি তাঁর রাজ্যে ইলমুল কালামের অধ্যয়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেন। আবু হামিদ গাযালীর গ্রন্থাদি যখন মাগরেবে পৌঁছায়, খলীফা তা পুড়িয়ে ফেলার আদেশ দেন; যার কাছে তাঁর কোনো গ্রন্থ পাওয়া যাবে, তাকে কঠিন শাস্তি প্রদানের ফরমান জারী করেন। আমীর আলী ইবনু ইউসুফ ইমাম আবু হামিদ গাযালী রহ.-এর গ্রন্থাদি এই যুক্তিতে জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন যে, তা ইসলামের সঠিক চেতনার বিরোধী। অথচ ইমাম গাযালী উম্মাহর সেই ক্ষণজন্মা মনীষী, যাঁকে 'হুজ্জাতুল ইসলাম' উপাধি প্রদান করা হয়েছে। আলী ইবনু ইউসুফ সেই গাযালীর কিতাব বাজেয়াপ্ত করেছিলেন, যিনি আন্দালুসে তাঁর পিতার শাসন-অধিকারের শরয়ী বৈধতার ফতোয়া দিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১০১. আবদুল ওয়াহিদ মারাকুশী, আল-মুজীব, পৃ: ২১৮।
📄 কঠিন অর্থনৈতিক সংকট
মুরাবিতী শাসনকালের শেষে ভাঙন ও পতনের আরও একটি কার্যকারণ প্রকাশিত হয়েছিল। পাপাচার ও অন্যায় কর্মের আধিক্য, আলিমসমাজের সমাজবিচ্ছিন্নতা—এই সবকিছুর পর নেমে এসেছিল আরও ভয়াবহ এক সমস্যা—কঠিন অর্থনৈতিক সংকট।
৫০২ হিজরীতে তাঞ্জা নগরীতে (Tangier) প্রবল বন্যা হয় এবং বাড়ি-ঘর, নিরাপত্তাপ্রাচীর সবকিছু বন্যার তোড়ে ভেঙে যায়। প্রাণহানি ঘটে অসংখ্য মানুষের, মারা যায় প্রচুর গবাদি পশু। ৫২০ হিজরী হতে একটানা ৫৩১ হিজরী পর্যন্ত আন্দালুসের ফসলের ক্ষেত্রে চলে পঙ্গপালের ধ্বংসযজ্ঞ। এ কারণে ৫২৬ হিজরীতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ ও মহামারী ছড়িয়ে পড়ে এবং প্রচুর মানুষ মৃত্যুবরণ করে। গমের মূল্য অত্যধিক হারে বেড়ে যায়। এর পূর্বে ৫২৫ হিজরীতে কর্ডোভা শহরের বাজারে ব্যাপক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ৫৩৫ হিজরীতে ফেয নগরীর বাজারে আরেকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে এবং বাজারের অধিকাংশ দোকান পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে যায়। এই দুর্ঘটনায় প্রচুর সম্পদ ধ্বংস হয় এবং অনেকে দারিদ্রতার শিকার হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিক বর্ণনায় সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক দুর্ভিক্ষের আলোচনাও এসেছে, যার ফলে চাষযোগ্য ক্ষেত-খামার শুকিয়ে গিয়েছিল এবং প্রচুর গবাদি পশু মারা গিয়েছিল।
একশ্রেণির মানুষ মনে করেন, একই সময়ে পরপর সংঘটিত এ জাতীয় দুর্ঘটনা কেবলই প্রাকৃতিক। কিন্তু এগুলো মোটেই আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; বরং এটাই পবিত্র কুরআনে উল্লিখিত আল্লাহ তাআলার রীতির বাস্তব রূপ। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, 'যদি সেই সকল জনপদবাসী ঈমান আনত ও তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে আমি তাদের জন্য আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী থেকে কল্যাণধারা উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা (সত্য) প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং তারা ক্রমাগত যা করে যাচ্ছিল, তার পরিণামে আমি তাদেরকে পাকড়াও করি।' [সূরা আ'রাফ : ৯৬]
বোঝা গেল, মুমিনগণ যখনই আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়, তখনই আল্লাহ তাআলা তাদেরকে দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক সংকট ইত্যাদি বিপদে আক্রান্ত করেন। সুতরাং কোনো দেশ বা সমাজে অর্থনৈতিক পতন পরিলক্ষিত হলে বুঝতে হবে সেখানে সঠিক পথ হতে বিচ্যুতি ঘটেছে।
এসকল ঘটনার পরে ৫১৪ হিজরীতে (১১২০ খৃস্টাব্দে) কুতুনদা যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী বড় ধরণের পরাজয়ের শিকার হয়। এরপর ৫২৩ হিজরীতে (১১২৯ খৃস্টাব্দে) কুলাইয়া যুদ্ধেও মুসলিম বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়।
টিকাঃ
১০৩. ইবনু আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ৪/৬০।
১০৪. 'মুদ্দ' প্রাচীনকালে প্রচলিত একটি পরিমাণ একক।
১০৫. ইবনুস সাফার আল-আযারিয়াফী, নাফহুত তীব, ৭: ১২৯-১৫২।
১০৬. প্রাগুক্ত, পৃ: ১২৯, ২৬৮।
১০৭. দেখুন: সাফফারী, শামসুল মুরাবিতীন, পৃ: ২২২।
১১৬. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৯/২০৬ ও ইবনুল কাত্তান, নাফহুল ত্বীব, ৭: ১৪২।