📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 অব্যাহত সামরিক তৎপরতা সত্ত্বেও পার্থিব মোহাচ্ছন্নতা

📄 অব্যাহত সামরিক তৎপরতা সত্ত্বেও পার্থিব মোহাচ্ছন্নতা


আলী বিন ইউসুফ বিন তাশফীনের শাসনামলে যদিও যুদ্ধ-তৎপরতা স্থগিত ছিল না; বরং আমীর আলী বিন ইউসুফের নেতৃত্বে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধ-তৎপরতা, অভিযান ও আক্রমণ অব্যাহত ছিল; কিন্তু এসবক্ষেত্রেও মুরাবিতী প্রশাসন পার্থিব মোহে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিল। এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এর পিছনে এমন বড় একটি ভুল কার্যকর ছিল, যা মুরাবিতী সাম্রাজ্যের মুসলমানগণ উদাসীনভাবে করে যাচ্ছিলেন। হায়! যদি আমরা এ থেকে শিক্ষা ও উপদেশ গ্রহণ করতাম!

ভয়াবহ সেই ভুলটি হল, তারা তাদের মনোযোগ ইসলামের অসহায় দুস্থদের সীমান্ত হতে ফিরিয়ে নিয়ে কেবল একটি বিশেষ দিকেই সুনজর দিতে আগ্রহী হয়েছিলেন এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোকে উপেক্ষা করেছিলেন। আন্দালুস, মাগরেব ও আশেপাশের অঞ্চলে মুরাবিতীগণ বিজয়াভিযানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সুশাসন ও সুষম প্রশাসনযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করা থেকে পুরোপুরি উদাসীন ছিলেন।

অথচ ইসলাম প্রকৃতিগতভাবেই ভারসাম্যপূর্ণ একটি ধর্ম। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা; যার মাঝে কোনো দিককে প্রাধান্য দিয়ে অন্য দিককে উপেক্ষা করার কোনো অবকাশ নেই। ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামী জীবনব্যবস্থাকে উপজীব্য করে শাসনকার্য পরিচালনার আদর্শ উদাহরণ তো আন্দালুসের ইতিহাসেই রয়েছে। আবদুর রহমান আন-নাসির যে ভারসাম্যপূর্ণ ও সুষম রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, তাঁর কথা স্মরণ করুন। বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জন, সামরিক সংগ্রাম, অর্থনীতি ও প্রশাসননীতি, সভ্যতা ও ধর্মপালন—প্রতিটি ক্ষেত্রে আবদুর রহমান আন-নাসির ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টি রেখেছিলেন বলেই তাঁর সাম্রাজ্য ছিল সফল।

তদ্রূপ শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের হাত ধরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আন্দোলন আবির্ভূত হয়েছিল। মুরাবিতী সাম্রাজ্যের সূচনালগ্নে আমরা দেখেছি জীবনের প্রতিটি অর্জন ও এর পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার যাবতীয় উপাদান ও কার্যকারণের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণে মুরাবিতী নেতৃবৃন্দ মনোযোগী ছিলেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে ছিল উপযোগী প্রচেষ্টা এবং কর্মপরিচালনা। এ কারণেই মুরাবিতী রাষ্ট্রের পথিকৃৎগণ একদিকে যেমন গড়ে উঠেছেন অশ্বারোহী যোদ্ধা ও দুনিয়াবিমুখ আবিদ হিসেবে, অপরদিকে নিয়েছেন সুদক্ষ রাজনীতির দীক্ষা। কিন্তু ৫০০ হিজরী-পরবর্তী সময়ে এ অঞ্চলের মুসলমানগণ তাদের পুরো শক্তি ব্যয় করেছেন লড়াইয়ের ময়দানে; অবহেলা করেছেন অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড, সঠিক সামাজিক শিক্ষাদান, সংস্কৃতির উন্নয়ন, ধর্মীয় শিক্ষার সার্বজনীন প্রসার ইত্যাদি। আর এটি ছিল মুরাবিতী সাম্রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার মতো একটি ভুল।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আলিমসমাজের উপস্থিতিতে অন্যায় ও পাপাচারের আধিক্য

📄 আলিমসমাজের উপস্থিতিতে অন্যায় ও পাপাচারের আধিক্য


আন্দালুস ও মাগরেব—মুরাবিতী সাম্রাজ্যের উভয় অংশেই পাপাচার, গোনাহ ও অপরাধকর্ম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। আর এ সবকিছুই হয়েছিল সমকালীন বিদ্যান আলিমসমাজের উপস্থিতিতেই। অবশ্য রাষ্ট্রের বিভূতি ও সম্পদের প্রাচুর্যের পরপরই গোনাহের ব্যাপক প্রাদুর্ভাবের একটি প্রাকৃতিক যোগসূত্র রয়েছে। অধিকাংশ গোনাহের কাজের জন্য প্রয়োজন অর্থ-সম্পদের। দুর্বল মনের অধিকারী যেসব মানুষ মুরাবিতী সাম্রাজ্যে বসবাস করত, তারা বিভিন্ন গোনাহের টানে প্রলুব্ধ হলেও অর্থাভাবে তা করতে পারত না। কিন্তু বিশাল জগত যখন মুরাবিতীদের সামনে উন্মুক্ত হলো এবং অপরিমিত সম্পদরাজি তাদের হস্তগত হল, তখনই দুর্বল ও দুষ্ট আত্মাগুলো সক্রিয় হল এবং নানা ধরণের অন্যায়-অপরাধের জালে পড়তে লাগল।

হ্যাঁ, এ কথা সত্য যে, এমন কিছু সৎ মানুষের অস্তিত্ব মুরাবিতী সাম্রাজ্যে ছিল, যারা সম্পদের প্রাচুর্য সত্ত্বেও মোহাচ্ছন্ন হয়নি; বরং তারা ছিলেন নববী আদর্শের ধারক; কিন্তু এ কথাও সত্য যে, তারা ছিলেন সংখ্যায় অতি অল্প, তারা সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রতিনিধিত্ব করতেন না। স্বাভাবিক রীতি হল, সম্পদ যখন অবারিত হয়ে যায়, তখন অধিকাংশ মানুষই এর মোহে আচ্ছন্ন হয়ে গোনাহে জড়িয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হযরত নূহ আ.-এর ঘটনাপ্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, 'তার সম্প্রদায়ের যে নেতৃবৃন্দ কুফর অবলম্বন করেছিল, তারা বলতে লাগল, আমরা তো তোমাকে আমাদের মতই মানুষ দেখছি, এর বেশি কিছু নয়। আমরা আরও দেখছি তোমার অনুসরণ করছে কেবল সেসব লোক, যারা আমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বহীন এবং ভাসা-ভাসা চিন্তার ভিত্তিতে এবং আমরা তো আমাদের ওপর তোমাদের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব দেখতে পাচ্ছি না; বরং আমাদের ধারণা, তোমরা সকলে মিথ্যাবাদী।' [সূরা হুদ: ২৭]

'যারা আমাদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বহীন'—এ উক্তি দ্বারা নেতৃবৃন্দের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের দুর্বল, সহজ-সরল ও দরিদ্র শ্রেণির জনগণ। তারাই নবী নূহ আ. এর অনুসরণ করেছিল। আর তাই পাপাচারের প্রাবল্য হল সম্পদের প্রাচুর্যের এক স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু প্রশ্ন হল, সমকালীন আন্দালুস ও মাগরেব অঞ্চল জুড়ে অবস্থানরত অসংখ্য আলিম তখন কী করছিলেন? কোথায় ছিলেন তাঁরা?!

ফন্ট সাইজ
15px
17px