📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী রহ.

📄 কাযী আবু বকর ইবনুল আরাবী রহ.


তাঁর পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন আবদুল্লাহ বিন আহমাদ ইবনুল আরাবী। তিনি ৪৬৯ হিজরীতে (১০৭৬ খৃষ্টাব্দে) সেভিলে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে আন্দালুসেই শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর গভীর পাণ্ডিত্য অর্জনের উদ্দেশ্যে পিতার সঙ্গে সফরে বের হন এবং পর্যায়ক্রমে বাগদাদ, দামেশক, বাইতুল মুকাদ্দাস, মক্কা ও মিশরে সমকালীন বড় বড় আলিমদের নিকট ইলম অর্জন করেন। এই দীর্ঘ ইলমী সফরের মাঝেই আলেকজান্দ্রিয়ায় থাকাকালে তাঁর পিতা মৃত্যুবরণ করেন এবং সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। এরপর ৪৯১ হিজরীতে তিনি আন্দালুসে ফিরে আসেন।

তাঁর প্রসিদ্ধ উস্তাদগণের মধ্যে আছেন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম আবু হামিদ গাযযালী রহ., ফকীহ আবু বকর শাশী রহ., আল্লামা আবু যাকারিয়া তিবরীযী রহ., আল্লামা তুরতূশী রহ. প্রমুখ বিখ্যাত উলামায়ে কেরাম। তাঁর মাধ্যমে আন্দালুসীয়বাসী লাভ করেছে মুসলিম প্রজন্মের ইলমের এক বিশাল ভাণ্ডার এবং উচ্চ সনদ। বড় বড় শায়খ ও অনেক আলিম তাঁর শিষ্যত্ব লাভে ধন্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন কাযী ইয়ায রহ., আবু জাফর বিন বাতিশ রহ. প্রমুখ।

ইবনুল আরাবীর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রচনাকর্ম হল: আহকামুল কুরআন, আনওয়ারুল ফাজর ফিত তাফসীর (আশি হাজার পৃষ্ঠার বিশাল তাফসীরগ্রন্থ), আননাসিখ ওয়াল মানসূখ, আল-কিবাস, শরহ মুওয়াত্তা মালিক বিন আনাস, আরিদাতুল আহওয়াযী (সহীহ তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ)।

ইবনে বাসকুয়াল তাঁর আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি ছিলেন শাস্ত্রীয় ইমাম, হাদীসের জগতে হাফিয, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী। তাঁকে 'খিতামাত উলামায়ে আন্দালুস' উপাধি দেওয়া হয়েছিল। তিনি সকল শাস্ত্রে শাস্ত্রজ্ঞ ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। ইলমচর্চা ও ইলম প্রচারে অনুরাগী ছিলেন। সঠিক ও ভুল রেওয়ায়েত বিচারে তীক্ষ্ণ মেধাশক্তির পরিচয় দিতেন। এ সবকিছুর পাশাপাশি তিনি আচার ও আখলাক, বিনয় ও সদাচরণ, দয়া ও পরমতসহিষ্ণুতা, বিচক্ষণতা ইত্যাদি উন্নত মানবিক গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে সেভিলের কাযী পদে নিয়োগ দেওয়া হলে অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দৃঢ়তা, অনমনীয়তা ও শরয়ী বিধান বাস্তবায়ন—তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আন্দালুসবাসীকে উপকৃত করেন। অত্যাচারী ও অন্যায়কারীরা তাঁর প্রভাবে সদা ভীত ও সন্ত্রস্ত থাকত। পরবর্তী সময়ে তাঁকে এ পদ থেকে অপসারণ করা হলে তিনি ইলমের প্রচার-প্রাসারের কাজে মনোযোগী হন এবং শিক্ষাদান ও লেখনীর কার্যে পূর্ণ আত্মনিয়োগ করেন। ৫৪৩ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে (১১৪৮ খৃষ্টাব্দে) তিনি মাগরেবে ইন্তেকাল করেন এবং ফেয নগরীতে সমাহিত হন।

টিকাঃ
৩০১. আন্দালুসের কয়েকজন বিখ্যাত আলিম 'ইবনুল আরাবী' নামে প্রসিদ্ধ। অপরজন হলেন বিখ্যাত সূফী আলিম মুহিউদ্দীন ইবনুল আরাবী রহ.। তাঁর জন্ম ৫৬০ হিজরীতে। মুফতী তকী উসমানী, জাহান-ই-দীদা, পৃষ্ঠা: ২৬৭।
৩০২. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ২/৩০৫।
৩০৩. ইবনে বাসকুয়াল, আসসিলাহ, ২/৬৬৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 কাযী ইয়ায বিন মূসা বিন ইয়ায রহ.

📄 কাযী ইয়ায বিন মূসা বিন ইয়ায রহ.


তিনি ছিলেন একাধারে কাযী, শাস্ত্রজ্ঞ, মুজতাহিদ, ইমাম। জন্ম ও বসবাস মাগরেবের সিউটা হলেও বংশগত দিক থেকে তিনি আন্দালুসী ছিলেন। ৪৭৬ হিজরীর মধ্য শাবানে (১০৮৩ খৃষ্টাব্দে) তিনি সিউটায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুত্র কাযী আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আপন পিতার কীর্তিসমূহ উল্লেখ করে 'আত্তা’রীফ বিল কাযী ইয়ায' নামক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

কাযী ইয়াযের ঊর্ধ্বতন পুরুষ আমরান ছিলেন আন্দালুসের শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিদের একজন। তিনি অনেক যুদ্ধ করেছেন এবং হাজিব আলমানসুর বিন আবু আমীরের সঙ্গে অনেক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। কাযী ইয়াযের পিতা ছিলেন হাফিয কুরআন, তাফসীর ও উলুমুল কুরআনের বিভিন্ন শাস্ত্রে প্রাজ্ঞ, তৎকালীন অন্যতম ইমামুল হাদীস, ইলমুল উসুল ও ইলমুল কালামে শাস্ত্রজ্ঞ, ফক্বীহ, মাসায়িলের হাফিয, সুসাহিত্যিক, কবি ও সুবক্তা। কাযী ইয়ায ইলম অর্জনের জন্য প্রথমে আন্দালুস সফর করেন। তিনি সেখানে কর্ডোভা, মুরসিয়া ও অন্যান্য ইলমী অঙ্গনে ইলম অর্জন করেন। এরপর তিনি সিউটা ফিরে আসেন এবং তখন থেকেই সিউটার শীর্ষস্থানীয় আলিমগণের কাতারে গণ্য হতে থাকেন। অথচ তাঁর বয়স ছিল মাত্র ত্রিশ বছর। তিনি প্রথমে সিউটার উপদেষ্টার দায়িত্ব, এরপর কাযীর দায়িত্ব পালন করেন এবং সদাচরণ ও সুচারুরূপে কর্মসম্পাদনের মাধ্যমে প্রভূত প্রশংসা ও খ্যাতি অর্জন করেন। এরপর ৫০২ হিজরীর সফর মাসের শুরুতে তিনি গ্রানাদায় চলে আসেন এবং সেখানে বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি তাডলা (Tadla) এর বিচারকের দায়িত্বও পালন করেছিলেন।

কাযী ইবনে ইয়াযের উল্লেখযোগ্য রচনাকর্মের মধ্যে আছে: কিতাবুশ শিফা বি তা’রীফি হুকুকিল মুসতাফা, ইক্বমালুল মু’লিম (মুসলিম শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ), আলমুসতাসফা, তারতীবুল মাদারিক ওয়া তাক্বরীবুল মাসালিক, আলই’লাম বি ফুনূদি কাওয়াইদিল ইসলাম। ইবনে বাসকুয়াল লিখেছেন, তিনি প্রচুর হাদীস সংগ্রহ করেছেন। হাদীস সংগ্রহ ও মুখস্থ করার প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও প্রচেষ্টা ছিল। ইলমের বিভিন্ন শাখায় দক্ষতা, সুতীক্ষ্ণ মেধা ও বোধের জন্য তিনি বিখ্যাত ছিলেন। ফকীহ মুহাম্মাদ বিন হামাদা সাবতী তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, মাত্র আটাশ বছর বয়সে ক্বাযী ইয়ায ইলমী বিতর্কের মজলিসে অংশগ্রহণ করেন, পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে বিচারকের দায়িত্ব পালন শুরু করেন। তিনি সদালাপী ছিলেন। ন্যায়ের প্রশ্নে অটল-অবিচল ও কঠোর ছিলেন। সমকালীন সিউটায় তাঁর চেয়ে অধিক গ্রন্থ রচনাকারী অন্য কেউ ছিল না।

ক্বাযী ইবনে খালিকান 'ওয়াফিয়াতুল আ'ইয়ান' গ্রন্থে ক্বাযী ইয়ায সম্পর্কে লিখেছেন, তিনি তৎকালীন যুগে হাদীস, উসুলুল হাদীস, নাহু, তাফসীর, কালামুল আরব ইত্যাদি শাস্ত্রে ইমাম ছিলেন। আবু আবদুল্লাহ মুহাম্মাদ আমিন তাঁর গ্রন্থে কাযী ইয়ায রহ.-এর ইলমী মাকাম ও মর্যাদার কথা উল্লেখ করে লিখেছেন, ক্বাযী ইয়াযের মর্যাদা ও অবস্থান ইমাম বুখারী ও ইমাম-চতুষ্বয়ের পর্যায়ের। খেয়াল করে দেখুন, হাদীস-শাস্ত্রবিদ, সীরাত চরিত বা ফকীহগণের যে কোনো নির্ভরযোগ্য রচনারই আপনি অধ্যয়ন করবেন, তাতে ক্বাযী ইয়াযের উক্তি পাবেন। অথচ ক্বাযী ইয়ায ইলম অর্জনের উদ্দেশ্যে কেবল আন্দালুসেই সফর করেছিলেন; মুসলিম প্রাচ্যে তিনি কখনোই সফর করেননি। ক্বাযী ইয়ায রহ. ৫৪৪ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসের নয় তারিখ মধ্যরাতে (১১৪৯ খৃষ্টাব্দে) শুক্রবার মারাকেশে ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
৩০৪. ইবনে বাসকুয়াল, আসসিলাহ, ২/৬৬৯-৬৬৯।
৩০৫. দেখুন: মাযাযী, ওয়াফিয়াতুল হুফ্ফায, ৪/৩৮।
৩০৬. ইবনে খালিকান, ওয়াফিয়াতুল আ'ইয়ান, ৩/৪৮০।
৩০৭. আবদুল হাই আলকাস্তালী, ফারিছুল ফারিছ, ১/৮৪।
৩০৮. দেখুন: ইবনুল কাসীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/২২২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px