📄 মুরাবিতী অভিযান ও অব্যাহত বিজয়
মুরাবিতীগণ আন্দালুসে প্রবেশ করার পর বিগত বছরগুলোতে খ্রিস্টানরা মুসলিম আন্দালুসের যেসব ভূমি মুসলমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে, তা পুনরুদ্ধার করতে সচেষ্ট হন। তাঁরা এ উদ্দেশ্যে একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ-তৎপরতা অব্যাহত রাখেন। ফলে একসময় মুরাবিতী সাম্রাজ্যের সীমানা উত্তর ফ্রান্সের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। পাশাপাশি তাঁরা পুনরায় টলেডোর নিয়ন্ত্রণ অর্জনেরও সচেষ্ট হন। কিন্তু এ প্রচেষ্টায় তাঁরা সফল হতে পারেননি। কারণ, টলেডো ছিল তৎকালীন আন্দালুসের সর্বাধিক সুরক্ষিত নগরীগুলোর একটি। অবশ্য মূল টলেডো নগরীর আশেপাশের অধিকাংশ শহরতলি ও গ্রাম মুসলিম বাহিনী পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল।
ইউসুফ বিন তাশফীনের মৃত্যুর এক বছর পর এবং যাল্লাকার ঐতিহাসিক যুদ্ধের প্রায় বাইশ বছর পর ৫০১ হিজরীতে (১১০৭ খৃস্টাব্দে) আন্দালুসে মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মধ্যে আরও একটি বিশাল যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধ উক্লিসিসের যুদ্ধ (Battle of Uclés) নামে খ্যাত। ইউসুফ বিন তাশফীনের পুত্র আলী বিন ইউসুফ বিন তাশফীনের শাসনামলে সংঘটিত এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ইউসুফ বিন তাশফীনের আরেক পুত্র তামিম বিন ইউসুফ বিন তাশফীন আর ক্রুসেড বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ষষ্ঠ আলফনসোর পুত্র সানচো। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনী নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। নিহত হয় খ্রিস্টান বাহিনীর সর্বাধিনায়ক সানচোসহ ২৩ হাজার সৈন্য। আন্দালুস-ইতিহাসে এ যুদ্ধকে 'দ্বিতীয় যাল্লাকা' নামে অভিহিত করা হয়।
উল্লেখ্য, ষষ্ঠ আলফনসোর এই পুত্র (সানচো) তার যে স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিল, সে পূর্বে মু'তামিদ বিন আব্বাদের পুত্র কর্ডোভার গভর্নর মামুনের দাসী ছিল। যখন মুরাবিতীগণ কর্ডোভা জয় করেন, তখন ‘জাইদা’ নাম্নী এ দাসীটি তার দু' সন্তানকে সঙ্গে নিয়ে টলেডোতে আলফনসোর কাছে পালিয়ে যায় এবং খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে আলফনসো তাকে বিয়ে করেন। উক্লিসিসের যুদ্ধের সময় সানচোর বয়স ছিল মাত্র এগার বছর। আলফনসো তখন বার্ধক্যের শেষ সীমায় উপনীত হয়েছিলেন। তখন তাঁর বয়স ছিল আশির উপরে। বার্ধক্যের ভারে আলফনসোর পক্ষে সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান সম্ভবপর ছিল না বিধায় সেনাবাহিনীর মাঝে বীরত্ব ও চেতনা জাগিয়ে তুলতে তিনি তাঁর কিশোর পুত্রকেই সেনাপতি করে প্রেরণ করেছিলেন।
এ যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পর মুসলিম বাহিনীর বিজয় অভিযান অব্যাহত থাকে। ৫০৯ হিজরীতে (১১১৫ খৃষ্টাব্দে) মুসলিম বাহিনী ইতিপূর্বে বিভক্ত শাসকবর্গের আমলে হাতছাড়া হওয়া বালিয়ারিক দ্বীপপুঞ্জ (Balearic Islands) পুনরায় জয় করতে সক্ষম হয়। মুরাবিতী সাম্রাজ্যের পদাতলে আন্দালুসের বড় একটি অংশ মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। আন্দালুসে মুরাবিতী শাসন প্রতিষ্ঠাকে তিনটি ধাপে বিভক্ত করা যায়। ১. নির্যাতিত মুসলমানদের উদ্ধারের উদ্দেশ্যে আন্দালুসে প্রবেশ। এ স্তর সমাপ্ত হয় যাল্লাকা বিজয়ের পরপরই মুরাবিতীদের প্রত্যাগমনের মাধ্যমে। ২. বিভক্ত আন্দালুসের শাসকবর্গের পারস্পরিক হানাহানি ও সংঘাতের কারণে সতর্কতামূলক অবস্থান। ৩. আন্দালুসকে মাগরেবের সঙ্গে একত্রীকরণের ধাপ। এ সময় মুরাবিতীগণ বিভক্ত শাসকবর্গের দাম্ভিক আচরণের চূড়ান্ত ফয়সালা করতে আন্দালুসে আগমন করেছিলেন।
টিকাঃ
১১১. দেখুন : ইবনুল আরাবী, আলমাওয়াসিমুল মুর্শিদিয়্যাহ, ৪/৫৪২, ইবনে আবি যারা, রাওয়াজুল কিরাতাস, পৃ : ১৬০।
১১২. দেখুন : ইবনুল আরাবী, আলমাওয়াসিমুল মুর্শিদিয়্যাহ, ৪/৫৫০ ও ইবনে আবি যারা, রাওয়াজুল কিরাতাস, পৃ : ১৬০।
১১৩. ইবনুল কাত্তান, ওয়াদিয়ুল আলাম, ৩/২০৬।
১১৪. ইবনে আবি যারা, রাওয়াজুল কিরাতাস, পৃ : ১৬২।
১১৫. মাক্কারী আবু রবীছ, আযহারুল আলাম, পৃ: ৭২ ও মাক্কারী, নাফহুল মুরাবিতীয়া, পৃ : ১৩৬-১৩৭।
📄 ষষ্ঠ আলফন্সোর পরিণতি
আলফনসো তার একমাত্র পুত্র সানচোর মৃত্যুতে প্রচণ্ড আঘাত পান এবং এর মাত্র বিশদিন পর ১১০৯ খৃষ্টাব্দের ২৯ জুন (৫০২ হিজরীর রবিউস সানি মাসে) মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে ক্যাসটেলানবাসীর মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। আলফনসো তার ছেচল্লিশ বছরের সুদৃঢ় ও উজ্জ্বল শাসনামলে ক্যাসটেলাকে কয়েক শতাব্দী ব্যাপৃত এক গৌরবময় অবস্থানে পৌঁছিয়ে দিয়েছিলেন। খ্রিস্টান সমাজ তাকে 'স্পেনের আলোকবর্তিকা ও গৌরব' উপাধি দিয়েছিল। তাঁর শাসনামলে ক্যাসটেলা রাষ্ট্র এমন শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছিয়েছিল যে, পরবর্তী সময়ে কোনো গৃহযুদ্ধ বা বিদ্রোহ তাকে দুর্বল করতে পারেনি।
টিকাঃ
২৯৯. ইবনে আবি যারা', রাওযুল কিরতাস, পৃ: ১৫৯ ও ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুররিবিন, ৪/৪০।
৩০০. মোনেম আওয়ারাত, তাবীখুল আন্দালুস ফী তরিখুল মুররাব্বিতীন ওয়াল মুওয়াহিদীন, ২/১৪২।