📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইউসুফ বিন তাশফীন ও মাগরেব-আন্দালুস একক মুসলিম রাষ্ট্র

📄 ইউসুফ বিন তাশফীন ও মাগরেব-আন্দালুস একক মুসলিম রাষ্ট্র


দাম্ভিক ও উদ্ধত শাসকদের আপত্তির জবাবে ইউসুফ বিন তাশফীন তাদেরকে বলেছিলেন, 'আমি কুরাইশ বংশীয় নই ঠিক আছে; কিন্তু আমি তো আমীরুল মুমিনীন আবুলমুতাযাব্বেরের খাদেম। আমার শাসিত এলাকার দু’ হাজারের অধিক শহর হতে তার নামে খুতবা পাঠ করা হয়, আমার রাষ্ট্রের মুদ্রা তার নামেই তৈরি করা হয়।'

কিন্তু বাগদাদের আব্বাসী খলিফার সঙ্গে মিত্রতার এসব দলীল প্রদানের পরও এসব শাসকবর্গ শরীয়তের দোহাই দিতে লাগল। অথচ তাদের নিজেদেরই খেলাফত ও খলিফার সঙ্গে কোনো মিত্রতা বা সম্পর্ক ছিল না। যারা নিজেরা ক্ষমতা লাভ করার পর থেকে প্রতিটি মূহুর্ত মুসলমানদেরকে অপদস্থ করছিল, খ্রিস্টানদের হাতে মুসলিম ভূমি তুলে দিয়েছিল, তাদেরকে উপঢৌকন ও জিজিয়া প্রদান এবং মুসলিম ভাইদেরই হত্যা করার জন্য তাদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের মাধ্যমে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করেছিল, আজ তাদের মুখে শরীয়তের বুলি!

এই পরিস্থিতিতে ইউসুফ বিন তাশফীন বিভক্ত রাষ্ট্রগুলো জয় করার সিদ্ধান্ত নিলেন এবং পর্যায়ক্রমে একের পর এক রাষ্ট্র জয় করতে লাগলেন। তিনি মাগরেব ও আন্দালুসের শাসনকার্য অনুমোদনমূলক ফরমান লাভ করার উদ্দেশ্যে বাগদাদে খলীফাতুল মুসলিমীনের কাছে দরখাস্ত পাঠালেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল খলীফার ফরমান লাভ করার পাশাপাশি এসব শাসকবর্গের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের স্বপক্ষে শরীয়তী দলীল লাভ করা। এ উদ্দেশ্যে কাজী আবু মু’আয্যাদ আদরাবী ও তাঁর পুত্র আবু বকর ইবনুল আরাবী বাগদাদ পৌঁছলেন। সেখানে তাঁরা তৎকালীন মুসলিম প্রাচ্যের ফকীহকুলের শিরোমণি ইমাম আবু হামিদ গাযালীর সাক্ষাত লাভ করলেন এবং তাঁকে আন্দালুসের বিরাজমান পরিস্থিতি, ইউসুফ বিন তাশফীনের কীর্তি ও কর্মধারা, লড়াইয়ের ময়দানে ও দ্বীনের মর্যাদা বৃদ্ধিতে তার অবদান, বিভক্ত মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গের পারস্পরিক বিদ্রোহ-হানাহানি, পার্শ্ববর্তী শত্রুরাষ্ট্রের খ্রিস্টানদের সহায়তা গ্রহণ ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরলেন। এরপর ফকীহ ইবনুল আরাবী ইমাম গাযালীর কাছে আবেদন জানালেন, তিনি যেন এই বাস্তব পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে একটি ফতোয়া লিখে প্রদান করেন এবং খলীফাতুল মুসলিমীনের কাছ থেকে একটি ফরমান সংগ্রহ করে দেন।

তখন ইমাম গাযালী রহ. ইবনুল আরাবীর কাছ থেকে শোনা বিবরণের আলোকে বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকদের অবস্থান সম্পর্কে শরীয়তের বিধান এবং যুদ্ধের মাধ্যমে ইউসুফ বিন তাশফীন যেসব অঞ্চল জয় করেছেন, সেসব অঞ্চলে তার শাসন-ক্ষমতার স্বপক্ষে খলীফার সরকারী ফরমান লাভের অধিকার সম্পর্কে একটি ফতোয়া লিখে দিলেন। পরবর্তী সময়ে ইমাম গাযালী নিজেই ইউসুফ বিন তাশফীনের কাছে একটি পত্র লিখলেন এবং তাতে বিস্তারিতভাবে বিভক্ত শাসকদের আচরণ, তাদের দুঃশাসনে আন্দালুসের দুর্দশা, পারস্পরিক হানাহানি ও লাঞ্ছনা ইত্যাদির কথা তুলে ধরলেন।

দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় ইবনুল আরাবী আলেকজান্দ্রিয়া অতিক্রমকালে আল্লামা আবু বকর তুরতূষীর কাছ থেকেও ইউসুফ বিন তাশফীনের শাসন-বৈধতার স্বপক্ষে একটি পত্র সংগ্রহ করলেন। আল্লামা তুরতূষী ইউসুফ বিন তাশফীনকে কোরআনের বিধান অনুযায়ী ন্যায়ের সঙ্গে শাসনকার্য পরিচালনা করার উপদেশ দিলেন। ফকীহ ইবনুল আরাবী ৪৯০ হিজরীর শুরুতে ইন্তেকাল করলে তার পুত্র আবু বকর ইবনুল আরাবী ইমাম গাযালী ও আল্লামা তুরতূষীর সম্মতিপত্র নিয়ে আন্দালুসে ফিরে আসেন। এছাড়াও তিনি সঙ্গে নিয়ে আসেন মুরাবিতী শাসকদের পক্ষে খলীফা মুসতাযহিরের শাহী অনুমোদন-ফরমান।

ইউসুফ বিন তাশফীন-এর জন্য আন্দালুসে প্রবেশ মোটেও সহজ ছিল না। বিভক্ত আন্দালুসের শাসকবর্গ এমনকি সেভিলের শাসক মু'তামিদও তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। হ্যাঁ, সেই মু'তামিদ, যিনি যাল্লাকা যুদ্ধের পূর্বে ও পরে ইউসুফ বিন তাশফীনের আশ্রয় নেওয়া ছাড়া আর কখনো সামান্য মর্যাদাও লাভ করেননি। মুরাবিতী বাহিনী ও বিভক্ত শাসকবর্গদের মধ্যকার যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে আন্দালুসের সকল বিভক্ত রাষ্ট্র মুরাবিতী সাম্রাজ্যে অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে। ইউসুফ বিন তাশফীন পরিণত হন ফ্রান্সের সীমান্তবর্তী উত্তর আন্দালুস থেকে শুরু করে মধ্য আফ্রিকা পর্যন্ত এক সুবিশাল ইসলামী রাষ্ট্রের আমীর। এই একচ্ছত্র রাষ্ট্রের নাম মুরাবিতী সাম্রাজ্য। এই মহান ইসলামী নেতা ৫০০ হিজরী পর্যন্ত মুরাবিতী সাম্রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন। অনন্যসাধারণ কর্ম-অবদানের কারণে পরবর্তীতে মুরাবিতী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার মাত্র ষাট বছরের মাথায় মাগরেব-আন্দালুস সম্মিলিত রাষ্ট্র পরিণত হয় তৎকালীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্রে।

টিকাঃ
৯১. ইবন, বায়ানুল ইসলা মিম আলআদল, ৪/৮৪-৪৪।
১০৯. দেখুন : ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৮/৪৮৭, ইবনে খালদুন, তারিখ ইবনে খালদুন, ৬/১৮৭-১৮৮, মাক্কার‍ী, নাফহুত তীব, ৪/৩৭৩ ও ইব্ন, দালায়েলুল ইসলাম লি আন্নালুস, ৪/৪৬১-৪৪।
১১০. দেখুন : ইব্নুল আ'রাবী, আলমাওয়াইলুশ মুর্শিদিয়‍্যাহ, ৪/৪৫২, ইবনে আবি' রায়া', রাওয়াজুল খিরাতাস, পৃ : ১৬৬।

ফন্ট সাইজ
15px
17px