📄 ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ : আন্দালুসে বিভক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন
যাল্লাকা প্রান্তে চূড়ান্তরূপে পরাজিত হওয়ার পরও মুসলিম আন্দালুসে খ্রিস্টানদের আগ্রাসন বন্ধ হল না; বরং এ যুদ্ধের পর খ্রিস্টানগণ মুসলিম ভূমিতে হামলা, আক্রমণ ও ধ্বংসযজ্ঞ আরও বৃদ্ধি করল। খণ্ডিত আন্দালুসীয় শাসকবর্গ এর মোকাবিলায় কিছুই করতে পারলেন না। বরং অবস্থার অবনতিতে একসময় খ্রিস্টানদের হাতে পূর্ব আন্দালুসের প্রধান নগরী এবং পুরো মুসলিম আন্দালুসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগরী ভ্যালেন্সিয়া পতন ঘটল। শাসকবর্গের মাঝে পূর্ব থেকে চলে আসা পারস্পরিক হানাহানি ও সংঘাতও বন্ধ হল না। ইউসুফ বিন তাশফীন মাগরেবে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে তাদেরকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন এবং যে বিষয়ে তাদেরকে সতর্ক করেছিলেন, তা তারা মোটেই স্মরণ রাখল না। ফলে বাধ্য হয়ে জনসাধারণ আবারও ইউসুফ বিন তাশফীনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করল। স্বয়ং মু’তামিদ বিন আব্বাদও তার সহায়তা কামনা করলেন। এসব কারণেই আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন দ্বিতীয়বারের মতো সাগর পাড়ি দিয়ে আন্দালুসের মাটিতে পা রাখলেন।
এবারও প্রথমবারেরই পুনরাবৃত্তি ঘটল। মুরাবিতী সৈন্যগণ খ্রিস্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে একের পর এক কয়েকটি যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করল। তবে ৪৮৮ হিজরীতে (১০৯৫ খৃস্টাব্দ) অ্যালেডো (Aledo) দুর্গ অবরোধকালে ইউসুফ বিন তাশফীন অনুভব করলেন, বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকবর্গ প্রতারণা ও কপটতার আশ্রয় নিচ্ছেন এবং তার সঙ্গে অবাধ্য আচরণ করছেন। তিনি উপলব্ধি করলেন, আন্দালুসের মুসলিম শাসকবর্গের মধ্যে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সম্পর্ক-স্থাপন ও পক্ষপাতিত্বের প্রবণতা রয়েছে। এতে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন।
পরবর্তী সময়ে এ ধরনের পরিস্থিতি বারবার সৃষ্টি হতে লাগল। বাধ্য হয়ে ইউসুফ বিন তাশফীন ৪৮৯ হিজরীতে (১০৯৬ খৃস্টাব্দ) তৃতীয়বারের মতো সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তার বাহিনীসহ আন্দালুসে প্রবেশ করলেন। প্রকৃতপক্ষে, ইউসুফ বিন তাশফীনের হৃদয়ে আন্দালুসের ক্ষমতার প্রতি মোটেই মোহ ছিল না। প্রথমবার সাগর পাড়ি দেওয়ার পূর্বে তিনি এ নিয়ে দীর্ঘ সময় দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। ইতঃপূর্বে যুদ্ধে জয়লাভ করার পর তিনি গনীমতের সম্পদে নিজের অধিকার উপেক্ষা করেছেন এবং তা মু’তামিদসহ অন্যান্য শাসকদের জন্য ছেড়ে দিয়েছেন; নিজে তা থেকে কিছুই নেননি। এরপর বিভক্ত আন্দালুসীয় শাসকবর্গের পারস্পরিক মোকাবিলা ও ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে তাদের কারও কারও মিত্রতার কারণে তিনি পুনরায় আন্দালুসে পা রেখেছেন। আর এবার তৃতীয়বারের মতো তাঁর আন্দালুসে আগমন ছিল এসব শাসকবর্গের তামাশার চূড়ান্ত মীমাংসা করতে। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের নাম দিয়ে ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী এবং পরস্পর সংঘাত ও হানাহানিতে লিপ্ত এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলির পতনের সময় ঘনিয়ে এসেছিল।
দ্বিতীয়বারের অভিযান শেষ সময়েই ইউসুফ বিন তাশফীনের সামনে এসব শাসকবর্গের প্রকৃত রূপ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। তিনি দেখেছিলেন, কীভাবে তারা পরস্পর হানাহানি ও সংঘাতে লিপ্ত আছে, আপন ভাইদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের সাহায্য কামনা করছে, কীভাবে খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে তার যুদ্ধাভিযানে তারা অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থেকে মুশরিকদের প্রতি সৌহার্দ্য প্রকাশ করছে। এমনকি দ্বিতীয়বারের সফরে তিনি যখন অ্যালেডো দুর্গ অবরোধকারী খ্রিস্টানদের অবরোধ করলেন, তখন পূর্ব আন্দালুসের কিছু শাসক তাকে সহায়তা করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে দাম্ভিক ভাষায় বলল, 'আপনার আনুগত্য স্বীকার করা আমার জন্য অপরিহার্য নয়। কেননা, আপনি কুরাইশ বংশীয় ইমাম নন।'
এর থেকে আরও জঘন্য বিষয় হল, এমন একটি পত্র ইউসুফ বিন তাশফীনের হস্তগত হল, যা জনৈক মুসলিম শাসকের পক্ষ থেকে খ্রিস্টান শাসকের কাছে পাঠানো হয়েছিল এবং তাতে খ্রিস্টানদেরকে ইউসুফ বিন তাশফীনের মোকাবিলায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে এবং অটল থাকতে উৎসাহ যোগানো হয়েছিল।
টিকাঃ
৫০. মাওকী আরু ক্বালীল, আযাহফকা, পৃ: ৩৪-৩৮।