📄 চাই না কোন প্রতিদান, চাই না কৃতজ্ঞতা
যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর মুসলিম বাহিনী প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ একত্র করল। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন এক্ষেত্রে সত্যতা ও একনিষ্ঠতার উজ্জ্বল ও গৌরবময় এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। বিশেষভাবে বিভক্ত মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গসহ সকল আন্দালুসবাসীর সামনে নির্মোহতার অনন্য এক প্রায়োগিক নমুনা স্থাপন করে তিনি পুরো গনীমতের সম্পদ আন্দালুসবাসীকে প্রদান করলেন। নির্তেজাল তাকওয়ার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে তিনি ফিরে গেলেন মাগরেবে। এাবস্থায় তিনি আন্দালুসবাসীকে বলে গেলেন,
'আমরা তোমাদের কাছে কোন প্রতিদান চাই না এবং কৃতজ্ঞতাও না।' [সুরা দাহর : ০৯]
মাক্কারী রহ. ‘নাফ্ফুত্ ত্বীব’ গ্রন্থে লিখেছেন, মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর চারদিন সেখানেই অবস্থান করল এবং যুদ্ধলব্ধ সকল সম্পদ একত্রিত করা হল। আমীর ইউসুফ বিন তাশফীনকে এগুলো বণ্টনের অনুরোধ করা হলে তিনি তা থেকে সামান্যও গ্রহণ করলেন না; বরং আন্দালুসের রাজন্যবর্গকে অগ্রাধিকার দিলেন। তিনি তাঁদের জানিয়ে দিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর পথে লড়াইয়ের আজরে আযীম ও চিরস্থায়ী সওয়াব অর্জন; অন্য কিছু নয়। রাজন্যবর্গ যখন ইউসুফ বিন তাশফীনের এই উদারতা ও পরার্থপরায়ণতা প্রত্যক্ষ করল, তখন তাঁর প্রতি তারা শ্রদ্ধাবনত হল এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করল।
মাগরেবে ফিরে আসার পূর্বে ইউসুফ বিন তাশফীন বিভক্ত মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গকে একত্র করে ঐক্যবদ্ধ থাকার এবং হানাহানি ও সংঘাত পরিহার করার নির্দেশ দিলেন, যেন তাদের অনৈক্যের কারণে এই মহান বিজয়ের সুফল বিনষ্ট না হয়। এরপর এই জবরদস্ত মুসলিম বীর ফিরে গেলেন নিজ দেশে। এ সময় তাঁর বয়স ছিল ঊনআশি বছর! তিনি চাইলেই পারতেন নির্জন মরুভূমি ও উত্তাল সাগর পাড়ি দেওয়ার কষ্ট সহ্য না করতে। চাইলেই পারতেন যুদ্ধক্ষেত্রের দুর্যোগ ও রক্তপাত থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করতে। কিন্তু তিনি এই বয়সেও খুব কঠিন সব বাধাকে জয় করেছেন, তৌহিদী চেতনাকে লালন করেছেন এবং অশ্বের পিঠে চড়ে রণাঙ্গনে ছুটে বেড়িয়েছেন। তাঁর চেতনা ও প্রেরণা ছিল—তুচ্ছ লক্ষ্য অর্জনে ভোগ করা মৃত্যুর স্বাদ তো গুরুত্বপূর্ণ কোন মিশন বাস্তবায়ন করতে গিয়ে লাভ করা মৃত্যু-স্বাদের তুলনায় ভিন্ন কিছু নয়।
টিকাঃ
১৫. মাক্কারী, নাফফুত্ ত্বীব, ৪/৩৯৯।
📄 মু’তামিদ বিন আব্বাদ ও আল্লাহর পথের সৈনিকের মর্যাদা
যাল্লাকার যুদ্ধের জ্ঞানী-গুণী, প্রতিভাশালী আলিমসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের অনেকেই শহীদ হয়েছিলেন। যেমন, নবীজীকে স্বপ্নে দেখা ইবনে রুমাইলা, মারাকেশের কাজী আবু মারওয়ান আবদুল মালিক প্রমুখ। আল্লাহ তাআ’লা তাদের সকলকে রহমতের বারিধারায় সিক্ত করুন। যুদ্ধ শেষে মু’তামিদ বিন আব্বাদ যখন সেভিলে প্রত্যাবর্তন করলেন, উৎসাহী জনতার ভিড় যেন উপচে পড়ছিল। সবাই তাকে বিজয়ের অভিনন্দন জানাচ্ছিল। কাজী সাহেবগণ কোরআন তেলাওয়াত করছিলেন, কবিগণ তার শানে রচিত কবিতা পাঠ করছিলেন।
আবদুল জলিল বিন ওয়ারদুন রহ. বলেন, 'সেদিন আমিও মু’তামিদের সংবর্ধনা-অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম এবং তার সামনেই পাঠ করব বলে মনের মাধুরি মিশিয়ে অতি চমৎকার একটি কবিতা রচনা করলাম। এমন সময় আমি কাজী সাহেবকে তেলাওয়াত করতে শুনলাম—তোমরা যদি তাকে সাহায্য না কর, তবে (তাতে তার কোন ক্ষতি নেই। কেননা,) আল্লাহই তার সাহায্য করেছেন। [সুরা তাওবা : ৪০] এ আয়াত শুনে আমি জনতাকে বলে উঠলাম, চুপচাপ থাক আমার কবিগণ। কোরআনের এই চিরন্তন আয়াত তো আমার জন্য উপস্থাপন করার মতো কিছুই বাকি রাখেনি!'
যুদ্ধে মু’তামিদের বীরত্ব ও রণনৈপুণ্যের খ্যাতি সবার মুখে ছড়িয়ে পড়ল এবং তার গৌরব ও মর্যাদা বিস্তৃত হল। তিনি লাভ করলেন জনমানুষের হৃদয়ের আসন এবং শাসকবর্গের সম্মান। রাজদরবারগুলো থেকে সবাই তাকে অভিনন্দন জানিয়ে বার্তা পাঠাল। পরবর্তী সময়ে ইউসুফ বিন তাশফীনের সঙ্গে তিনি যে ব্যতিক্রমী আচরণ করেছিলেন, তার পূর্ব পর্যন্ত তিনি সকলের কাছে মাননীয় ও সম্মানিত ছিলেন।
টিকাঃ
১১. পূর্বলিখিত শ্লোকটি নেওয়া হয়েছে ‘দিওয়ানুল মু’তামিদ’ হতে।
১২. বুখারী, তারাজুমুল রি’তার, পৃঃ ২২০, মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৩৩৯ ও আলনাসিরী, আলইস্তিকছা, ২/৪৮।
৮৯. হিময়ারী, আররাওয়াতুল মি’তার, পৃ: ২৪২, মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৪/৩৭০ ও আলনাসিরী, আলইস্তিকছা, ২/৫০।