📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস ও ইবনে রুমাইলার স্বপ্ন

📄 মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস ও ইবনে রুমাইলার স্বপ্ন


মুস্লিম বাহিনীর খোঁচা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে আলফোনসো যুদ্ধের দিনও নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি বার্তা পাঠান, 'আগামীকাল শুক্রবার আর শুক্রবার আপনাদের সাপ্তাহিক আনন্দের দিন। তাই সেদিন আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই না। তার পরের দিন শনিবার, ইহুদিদের আনন্দের দিন। যেহেতু আমাদের এ অঞ্চলে প্রচুর ইহুদিও আছে, তাই আমাদের কর্তব্য তাদের দিকটাও খেয়াল রাখা। আর এর পরদিন হল রোববার, আমাদের আনন্দের দিন। সুতরাং, আসুন, আমরা এসব আনন্দের দিনগুলোর সম্মান বজায় রাখি। সোমবারেই পরস্পরের সাক্ষাৎ হবে।'

আলফোনসোর বার্তা পাঠ করার পর ইউসুফ বিন তাশফীন প্রভাবিত হয়ে পড়েন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজন্যবর্গ কখনো প্রতারণা করেন না; অধিকন্তু এটি ছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে তার প্রথম মোকাবিলা। তবে মু'তামিদ বিন আব্বাদ ঠিকই আলফোনসোর চাল ধরে ফেলেছিলেন এবং তার আশঙ্কার কথা ইউসুফ বিন তাশফীনকে জানিয়ে রাখেন।

মু'তামিদের সতর্কবার্তার ভিত্তিতে ইউসুফ বিন তাশফীন পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং আলফোনসোর কথার ওপর আস্থা না রেখে যুদ্ধ-প্রস্তুতিতেই মনোযোগী হন। তিনি পরবর্তী দিন যুদ্ধ করার জন্য বাহিনীকে পূর্ণ প্রস্তুত করেন। এটি ছিল এমন এক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত, আন্দালুসিবাসী তাদের মাটিতে অনেক বছর পর যার স্বাদ পেতে যাচ্ছে। লাঞ্ছনা, অবমাননা ও জিজিয়া প্রদানের দিনগুলো পেরিয়ে কত বছর পর আবারও তারা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে! আন্দালুসের মুমিনদের অন্তর শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় এই ক্ষণটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে! ইউসুফ বিন তাশফীন এ সময় সকলকে সূরা আনফাল পাঠ করার আদেশ দেন এবং সকলকে পূর্ণ সংকল্প নিয়ে যুদ্ধ করতে নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি নিজে বাহিনীর প্রতিটি অংশের কাছে গিয়ে গিয়ে আওয়াজ দিতে থাকেন, 'সৌভাগ্য তার জন্য, যে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করবে। আর যে গাফেল হবে, তার জন্য তো রয়েছে আযাব ও গনীমত।'

'আররাওয়াদুল মি'তার' গ্রন্থে আছে, ইউসুফ বিন তাশফীন ও মু'তামিদ বিন আব্বাদ আপন আপন সেনাদের নসীহত করতেন। ফকীহ ও আবিদগণ মানুষকে নসীহত করার পাশাপাশি সবর ও অবিচলতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের ভয়াবহ আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। জুমা-পূর্ব রাতে কর্ডোভার বিশিষ্ট মালেকী শায়খ ক্বাজী আবুল আব্বাস আহমাদ বিন রুমাইলা আলকুরতুবীও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। ইবনে বাশকুওয়াল ‘আসসিলাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি (আবুল আব্বাস আহমাদ বিন রুমাইলা) ছিলেন জ্ঞানানুরাগী, মাশায়েখে কেরামের সংস্পর্শপ্রিয়। দুনিয়াবিমুখতা সম্বন্ধে তার চমৎকার কিছু কবিতা আছে। তিনি দান-সাদাকা ও কল্যাণমূলক কাজ প্রচুর পরিমাণে করতেন। আবুল আব্বাস তাক্বওয়া ও ধার্মিকতায় অগ্রগামী ছিলেন। সেদিন শায়খের দায়িত্ব কেবল মসজিদে বসে থাকা, দরস প্রদান করা কিংবা কোরআন শিক্ষাদানে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে রাতে তাঁর অবস্থান ছিল সেনাছাউনিতে।

শায়খ আবুল আব্বাস সে রাতে স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলছেন, 'ইবনে রুমাইলা! নিঃসন্দেহে তোমরা বিজয়ী হবে আর নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হবে।' এটুকু দেখার পর ইবনে রুমাইলার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জানেন, স্বপ্নে রাসূলকে দেখার অর্থ স্বয়ং রাসূলকেই দেখা। কেননা, শয়তান কখনো নবীজীর আকৃতি ধারণ করতে পারে না। বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী রহ. আপন সনদে হযরত আনাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে আমাকে নিদ্রাবস্থায় দেখল, সে ঠিক আমাকেই দেখল। কারণ, শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। আর মুমিনের স্বপ্ন নবুয়্যতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।'

আনন্দে উদ্বেলিত শায়খ আবুল আব্বাস উঠে দাঁড়ান। খুশিতে তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। স্বয়ং নবীজী স্বপ্নযোগে তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, শীঘ্রই তিনি আল্লাহ্র রাস্তায় শহীদ হতে যাচ্ছেন। তাঁর সামনে এখন একই সঙ্গে দুটি সুসংবাদ: মুমিনদের বিজয় আর নিজের শাহাদাত লাভ। আল্লাহু আকবার! কী আনন্দ বিজয়ের! কী আজব শাহাদাতের! ইবনে রুমাইলা তৎক্ষণাৎ গভীর রাতের শয্যা ত্যাগ করে মুস্লিম সেনাপতিদেরকে; এমনকি স্বয়ং মু'তামিদ বিন আব্বাদকে জাগিয়ে তোলেন। সবাইকে শোনান স্বপ্নে পাওয়া নবীজী-প্রদত্ত সুসংবাদের কথা। স্বপ্নের এ সুসংবাদ ইবনে আব্বাদকেও আলোড়িত করে, করে আন্দোলিত। তিনি এ সংবাদ ইউসুফ বিন তাশফীন ও সকল সেনাপতির কাছে পৌঁছিয়ে দেন। আনন্দের আতিশয্যে মুজাহিদ ও সেনাপতিদের উচ্চকিত তাকবিরে জেগে উঠে পুরো মুস্লিম বাহিনী। সবার কণ্ঠে একই আনন্দধ্বনি— ইবনে রুমাইলা নবীজীকে স্বপ্নে দেখেছেন, নবীজী সুসংবাদ দিয়েছেন: “নিঃসন্দেহে তোমরা বিজয়ী হবে আর নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হবে।”

টিকাঃ
৪১. হিময়ারী, আররাউদুল মি'তার, পৃ: ২৯৮।
৪২. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৬ ও আলইনফামুল মুতান্নাসিয়্যা, পৃ: ৩৭।
৪৩. আববুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জিম ফী তালখীছি আখবারিল মাগরিব, পৃ: ১৬৪-১৬৫।
৪৪. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭।
৪৫. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯৯।
৪৬. ইবনে বাশকুওয়াল, আসসিলাহ, ১/১১০।
৪৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৪৬।
৪৮. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০, মাককারী, নাহজুত ত্বীব, ৪/৩৬৫ ও আলআনাদাসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 রণাঙ্গনের নজরদারীতে ইবনে আব্বাদের গোয়েন্দা-তৎপরতা

📄 রণাঙ্গনের নজরদারীতে ইবনে আব্বাদের গোয়েন্দা-তৎপরতা


মুরাবীতি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আলফোনসোর কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে পারে—এই আশঙ্কায় ইবনে আব্বাদ মুরাবীতি ছাউনির ওপর নজর রাখছিলেন। কারণ, মুরাবীতগণ আন্দালুস-ভূমিতে একেবারেই নবাগত। এ দেশের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে তাদের তেমন ধারণা নেই। তিনি নিজেই এ দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি কথিত আছে, মুরাবীতি ছাউনি থেকে জনৈক সৈনিক কোনো কাজে বা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে স্বয়ং ইবনে আব্বাদকে মুরাবীতি ছাউনির চারপাশে টহলরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনে আব্বাদ যখন মুরাবীতি ছাউনির বিভিন্ন পথের প্রবেশমুখগুলোতে অশ্বারোহী বাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্টকে নিযুক্ত করার কাজ শেষ করে নিজেই টহল দিচ্ছিলেন। মুরাবীতি ছাউনি থেকে বের হওয়া সৈন্যরা চলাফেরার সময় বারবার ইবনে আব্বাদের মুখোমুখি হওয়ায় মনে করেছে সবাই যে, হয়তো ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে।

রাতেই মু'তামিদের গোয়েন্দা-বাহিনীর দু’জন সদস্য তাঁকে জানায় যে, তারা দু'জন রাতের অন্ধকারে আলফোনসোর ছাউনির কাছে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা খ্রিস্টান বাহিনীর কোলাহল এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে পেয়েছে। গোয়েন্দা-বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী আলফোনসোর আগামীকাল যুদ্ধ শুরু করার তৎপরতা নিশ্চিত হওয়া গেল। এর কিছুক্ষণ পর আলফোনসোর ছাউনির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা গুপ্তচরেরাও উপস্থিত হয়ে ইবনে আব্বাদকে জানায়, 'আমরা গোপনে শুনতে পেয়েছি আলফোনসো তার সঙ্গীদের বলছিল—ইবনে আব্বাদই এ যুদ্ধের প্রধান পরিচালক। এমনকি মরুভূমির এই বেদুইন বাহিনী যদিও সামরিক ক্ষেত্রে পারদর্শী, কিন্তু এ দেশ ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে তারা অনভিজ্ঞ। ইবনে আব্বাদই তোমাদেরকে পরিচালিত করছে। সুতরাং তোমরা তাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করবে এবং আক্রমণ চালাবে। সে যদি পরাভূত হয়, তাহলে এই বেদুইনরা তোমাদের সামনে তুচ্ছ। তোমরা যদি অকুতোভয়ে তাদের ওপর হামলা চালাও, আমার মনে হয় না, তারা তোমাদের সামনে টিকতে পারবে।'

ইবনে আব্বাদ তখন সেনাপতি আলফোনসোর এই গোপন পরিকল্পনার খবর পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য তার কতিপয় কাতিব ও আবু বকর বিন রুমাইরাকে ইউসুফ বিন তাশফীনের মুরাবীতি ছাউনিতে প্রেরণ করেন এবং আমিরুল মুস্লিমীনকে গোয়েন্দাদের সংগৃহীত করা যাবতীয় তথ্য অবহিত করেন।

টিকাঃ
৪৯. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭ ও হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুসলিম বাহিনী ও যুদ্ধ-পরিকল্পনা

📄 মুসলিম বাহিনী ও যুদ্ধ-পরিকল্পনা


১২ রজব, ৪৭৯ হিজরী (২৩ অক্টোবর, ১০৮৬ খৃষ্টাব্দ)। বাদ ফজর। মুস্লিম বাহিনীর বিন্যাস ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাহিনীর সদস্যগণ ভোরে ফজর নামায শেষ করার পরপরই ষষ্ঠ আলফোনসো স্বীয় অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আক্রমণ শুরু করলেন। প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা—এগুলো তো খ্রিস্টানদের প্রাচীন স্বভাব। খ্রিস্টান বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে মুস্লিম বাহিনী এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতির সম্মুখীন হল, যেমনটি স্বয়ং ইউসুফ বিন তাশফীনও পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা এক পত্রে নিশ্চিত করেছেন। খ্রিস্টান বাহিনীর সবগুলো অংশ চারদিক থেকে মুস্লিম বাহিনীর ওপর একসাথে বিপুল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম আঘাতটি ছিল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন।

উল্লেখ্য, মুস্লিম বাহিনী ৬টি মূল অংশে বিভক্ত ছিল।
১. আন্দালুসী বাহিনী। এ অংশে আন্দালুসের সকল সৈনিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মু'তামিদ বিন আব্বাদ ও আন্দালুসের অন্যান্য রাজন্যবর্গ; যেমন—আলমারিয়ার শাসক ইবনে সামাদিহ, গ্রানাডার শাসক আবদুল্লাহ বিন বুলুকক্বীন, উচ্চ সীমানার প্রধান নিরাবত্তারক ইবনে মাসলামা, ইবনে নুনুন, ইবনুল আফতাত প্রমুখ। ইউসুফ বিন তাশফীন তাদের সকলকে মু'তামিদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মু'তামিদ ছিলেন এই বাহিনীর একবারে কেন্দ্রস্থলে, মুতাওয়াক্কিল বিন আফতাস দক্ষিণ বাহুতে, পূর্ব আন্দালুসের শাসকবর্গ বাম বাহুতে এবং অন্যান্য শাসকবর্গ ছিলেন এই দলের পেছনের অংশে। খ্রিস্টান বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিরোধকারী অগ্রবর্তী অংশের জন্য মু'তামিদ নিজেকেই নির্বাচন করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর বিগত বছরগুলোর ভুল-ত্রুটি ও কলঙ্কিত অবস্থান ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন কিংবা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য বিজয়ের মূল কৃতিত্ব ও মর্যাদা লাভ করা এবং বিজয়ের গৌরব তাঁর নামে প্রচারিত হওয়া। বাস্তব নিয়ত কী ছিল, আল্লাহই ভালো জানেন।
অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে, স্বয়ং ইউসুফ বিন তাশফীন আশঙ্কা করেছিলেন যে, মু'তামিদ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকবেন না এবং সর্বস্ব বিসর্জন করে যুদ্ধ করবেন না। তাই ইউসুফ বিন তাশফীনের তদারকিতেই মূলত মু'তামিদ নিজেকে অগ্রবাহিনীর সম্মুখ সারিতে রেখেছিলেন।

২. মুরাবিতী যোদ্ধাগণের একটি অংশ। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মুরাবিতী বীর যোদ্ধা দাউদ বিন আয়েশা। এ দলটির অবস্থান ছিল আন্দালুসি দলের পেছনে।

৩. মুরাবিতী বাহিনীর মূল অংশ। ইউসুফ বিন তাশফীনের নেতৃত্বে এ দলটি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত মূল বাহিনী হতে দূরে একটি টিলার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে ছিল, যাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাদের দেখা না যায়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হবে, পুরো মুসলিম বাহিনী দু' দলে বিভক্ত; আন্দালুসি বাহিনী এবং দাউদ বিন আয়েশার নেতৃত্বাধীন মুরাবিতী বাহিনী।

এই পদক্ষেপের পেছনে ইউসুফ বিন তাশফীনের পরিকল্পনা ছিল—যুদ্ধ যখন তীব্রতর পর্যায়ে পৌঁছবে এবং উভয় পক্ষ লড়াই করে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়বে, হারিয়ে ফেলবে লড়াই করার শক্তি, যেমনটি সাধারণ যুদ্ধের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তখন তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে মুসলিম বাহিনীর কাতারে যোগ দিয়ে যুদ্ধের পাল্লা মুসলিম বাহিনীর দিকে ঝুঁকিয়ে দেবেন।

অবশ্য ইউসুফ বিন তাশফীনের এই পরিকল্পনা মুসলমানের যুদ্ধ-ইতিহাসে নতুন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এই একই কৌশল সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. পারস্য-বিজয়ের সময় ওয়ালাজা রণাঙ্গনে (Battle of Walaja) ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া পারস্য-অভিযানেই আরেক বিখ্যাত সাহাবী নোমান বিন মুকাররিন রাযি.-ও এই একই পরিকল্পনা কাজে লাগিয়েছিলেন নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে (Battle of Nahavand)। সুতরাং ইউসুফ বিন তাশফীনের এই পরিকল্পনা প্রমাণ করে, তিনি ইতিহাস পাঠ করতেন এবং ইসলামী ইতিহাসের মহান সেনাপতি ও বীর সৈনিকদের যুদ্ধ-ইতিহাস অধ্যয়ন করে তা থেকে শিক্ষা নিতেন।

টিকাঃ
৫০. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০, মাককারী, নাহজুত ত্বীব, ৪/৩৬৫ ও আলআন্দালুসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫।
৫১. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭ ও আলইনফামুল আলআন্দালুসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫-৪৮।
৩৭. আহাআর, আলহাল্লাতুল মুয়ালাশিয়া, পৃ: ২৮।
৩৮. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান, ১/১১৯।
৩৯. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭।
৪০. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭, ইবনে আবি জারা’, রাওযুল কিরতাস, পৃ: ১৪৪ ও ইবনুল আছীর, আ'মালুল আ'লাম, ৩/২৪২-২৪৩।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 যাল্লাকা, আন্দালুসে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ

📄 যাল্লাকা, আন্দালুসে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষার যুদ্ধ


৪৭৯ হিজরী ১২ রজব মোতাবেক ১০৮৬ খৃষ্টাব্দের ২৩ অক্টোবর শুক্রবার আলফনসো তার সুবিশাল বাহিনী নিয়ে মুসলিম বাহিনীর প্রথম অংশের (অর্থাৎ আন্দালুসি বাহিনীর) ওপর হামলা চালান। আলফনসো তার বাহিনী নিয়ে মু'তামিদের দিকে অগ্রসর হলেন এবং চারদিক থেকে তাকে ঘিরে ধরলেন। মু'তামিদ ও তার সঙ্গী আন্দালুসি সৈন্যগণ প্রবল বিক্রমে খ্রিস্টান বাহিনীর আক্রমণ প্রতিরোধ করতে লাগল এবং অভূতপূর্ব ধৈর্য ও অটলতার পরিচয় দিল।

খ্রিস্টান বাহিনীর আক্রমণ প্রতিহত করার পাশাপাশি ইবনে আব্বাদ ইউসুফ বিন তাশফীনের আগমনের পানে তাকিয়ে ছিলেন। ইউসুফ বিন তাশফীনের আগমন তার কাছে বিলম্বিত মনে হচ্ছিল। এদিকে খ্রিস্টান বাহিনীর আক্রমণ অত্যন্ত তীব্র হতে থাকে এবং পরিস্থিতি কঠিন থেকে কঠিনতর আকার ধারণ করে। মরুবাসী মুরাবিতীদের বিলম্বে মু'তামিদের বাহিনী পরাজয়ের আশঙ্কার শিকার হল। মু'তামিদ-পুত্র আবু আবদুল্লাহও অনেকে আশা ছেড়ে দিল এবং পরাভূত হল। ইবনে আব্বাদ নিজে গুরুতর আহত হলেন। প্রতিপক্ষের তরবারির আঘাতে তার মাথায় মারাত্মক যখম হল, ডান হাতও আঘাতপ্রাপ্ত হল। তার শরীরের একাংশ বর্শার আঘাতে রক্তাক্ত হল। যুদ্ধরত অবস্থায় একে একে তার তিনটি ঘোড়া নিহত হল। যখনই একটি ঘোড়া মারা যাচ্ছিল, আরেকটি ঘোড়া তাকে এগিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। ইবনে আব্বাদ যেন মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে তাঁর জানবাজি রেখে তরবারি চালনা করে যাচ্ছিলেন। এই মরণপণ অবস্থায় তাঁর মনে পড়ল তাঁর অতি প্রিয় এক ছোট পুত্রের কথা, যাকে তিনি অসুস্থ অবস্থায় সেভিলে রেখে এসেছিলেন। তার এই পুত্রের নাম ছিল মুয়া'তাদ, আর ডাকনাম ছিল আবু হাশেম। পুত্রের কথা স্মরণ হওয়ামাত্র স্বভাবতই মু'তামিদ রণাঙ্গনের এই সুকঠিন মুহূর্তে আবৃত্তি করলেন:
'আবু হাশেম! তরবারি ও বর্শার তীক্ষ্ণ ফলা আমাকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়েছে। এ চরম সঙ্গীন মুহূর্তে একমাত্র আল্লাহর জন্যই আমি অটল-অবিচল রয়েছি। ধুলোয় ধূসর রণাঙ্গনে আমার শ্রবণপটে বারবার ভেসে উঠেছে তোমার ডাক। তোমার সেই স্মৃতি আমাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের চিন্তা করতে দেয়নি।'

এর পরপরই বীর সেনাপতি দাউদ বিন আয়েশার নেতৃত্বে মুরাবিতী সৈন্যদের প্রথম দলটি আন্দালুসী সৈন্যদের সঙ্গে যোগ দিল। দাউদ বিন আয়েশা এসে ইবনে আব্বাদের দুশ্চিন্তা দূর করলেন। এদিকে আলফনসো তাঁর বাহিনীকে দু' ভাগে বণ্টন করেছিলেন। মুরাবিতী সৈন্যগণ যুদ্ধে যোগদান করাামাত্রই আলফনসো তাঁর বাহিনীর বিশাল দ্বিতীয় অংশটি নিয়ে দাউদ বিন আয়েশার বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং প্রবল হামলা চালালেন। মুরাবিতী সৈন্যগণ অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিপক্ষের আক্রমণ প্রতিরোধ করে যেতে লাগল। কিন্তু খ্রিস্টান সৈন্যদের সংখ্যাধিক্য মুসলিম বাহিনীর প্রতিরোধক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করছিল। উভয় পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ চলতে লাগল। হাজারো তরবারির ঝনঝনানি আর অসংখ্য বর্শার আঘাতে যুদ্ধক্ষেত্র প্রকম্পিত হল।

খ্রিস্টান বাহিনীর অপর অংশ ইবনে আব্বাদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনীর ওপর আক্রমণ অব্যাহত রাখল এবং প্রতিরোধক্ষমতা প্রায় গুঁড়িয়ে দিল। মুসলিম বাহিনীর বাতলানের অংশের সেনাপতিগণ যুদ্ধে পরাভূত হল। ইবনে আব্বাদ ও তার সৈন্যরা ময়দানে টিকতে পারছিল না। ইবনে আব্বাদ তার অবশিষ্ট সৈন্যদের নিয়ে রণাঙ্গনের এক প্রান্তে বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করে যাচ্ছিলেন এবং শত্রুদের বিজয় প্রায় নিশ্চিত ছিল। আলফনসো রণাঙ্গনে জয়-পরাজয়ের দোলনায় ছিল।

যখন যুদ্ধের পরিস্থিতি একবারে সন্ধিক্ষণে, ঠিক তখন ইউসুফ বিন তাশফীনের নেতৃত্বে মুরাবিতী সৈন্যদের মূল দলটি অগ্রসর হল। ফলত প্রবল ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে মুসলিম-খ্রিস্টান উভয় দলই ক্লান্ত হয়ে এসেছিল। ইউসুফ বিন তাশফীন ও তার সঙ্গীগণ এতক্ষণ ধরে ধৈর্য সহকারে এই মুহূর্তটির জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তাজা সেনাদের নিয়ে ইউসুফ বিন তাশফীন রণাঙ্গনে উপস্থিত হলেন যুদ্ধের শেষ দৃশ্যের সর্বশেষ যবনিকা টানার জন্য। ইউসুফ বিন তাশফীন তাঁর সঙ্গী সেনাদের দু' ভাগে ভাগ করলেন। আবান বিন আবু বকরের নেতৃত্বে প্রথম অংশে ছিল মিজাদা, মুহামাদা, ওমারাসহ অন্যান্য বর্বরী গোত্র এবং মাগরেবের বিভিন্ন গোত্রের যোদ্ধাগণ। এ দলটি দাউদ বিন আয়েশা ও ইবনে আব্বাদের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধরত মুসলিম বাহিনীর সহায়তায় অগ্রসর হল।

সিনহাজা গোত্রের অন্যান্য শাখা-গোত্র দ্বারা গঠিত দ্বিতীয় অংশটি নিয়ে ইউসুফ বিন তাশফীন যুদ্ধরত খ্রিস্টান বাহিনীর পেছনে চলে গেলেন এবং সরাসরি খ্রিস্টান বাহিনীর পিছন থেকে আক্রমণ করলেন। তারা আক্রমণাত্মকভাবে খ্রিস্টান বাহিনীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। খ্রিস্টানরা অপ্রস্তুত ছিল, আকস্মিক আক্রমণের সম্মুখীন হয়ে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীনের নেতৃত্বাধীন মুসলিম বাহিনী যুদ্ধ-দামামা বাজিয়ে বিজয় নিশান উড়িয়ে তাদের পিছু নিল। তাদের তরবারি চালনায় খ্রিস্টান বাহিনীর মাঝে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। আলফনসো অবাক হয়ে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন খ্রিস্টান বাহিনীর ছাউনি ভস্ম হওয়া, অস্ত্র-শস্ত্র লুঠ হওয়া, প্রহরীদলের নিহত হওয়া এবং নারীদের বন্দী হওয়ার দৃশ্য। আলফনসো দেখলেন, আমীরুল মুসলিমীন সরাসরি তার দিকে অগ্রসর হচ্ছেন। উভয়ের মধ্যে এক প্রলয়ংকারী লড়াই শুরু হলো। এমন ভয়ংকর লড়াইয়ের কথা ইতিহাসে বিরল।

খ্রিস্টান বাহিনী যখন দেখল যে, তাদের সামনেও মুসলিম বাহিনী, পেছনেও মুসলিম বাহিনী এবং তারা দু' দিক থেকেই অবরুদ্ধ, এ অবস্থা দেখে তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা দেখল, তাদের ছাউনি আগুনে পুড়ছে, সেখান থেকে বেঁচে থাকা আহত প্রহরীদলের আর্তনাদ ভেসে আসছে। এসব দৃশ্য দেখে তারা হতবুদ্ধি হয়ে পড়ল। তারা দ্রুত নিজেদের ছাউনি রক্ষায় অগ্রসর হতে চাইল। মুসলিম বাহিনীর মুখোমুখি হয়ে শুরু হল এক ভয়ংকর লড়াই। এ লড়াইয়ে অসংখ্য খ্রিস্টান সৈন্য নিহত হল। খ্রিস্টান বাহিনী তাদের পরাজয় স্বীকার করে পিছু হটতে লাগল। মুসলিম বাহিনী তাদের পশ্চাদ্ধাবন করল এবং তাদের অসংখ্য সৈন্যকে হত্যা করল। আলফনসো তার সৈন্য, পরিচারক ও ভৃত্যদেরকে অশ্বপৃষ্ঠ থেকে নেমে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করার আদেশ দিলেন। আল্লাহ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করলেন এবং কাফিরদের অভাবনীয় ক্ষতি সাধন করে দিলেন।

যাই হোক, এভাবে খ্রিস্টান বাহিনী সামনে থেকে আন্দালুসী বাহিনী এবং পেছন থেকে মুরাবিতী বাহিনী কর্তৃক অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। ফলে খ্রিস্টান বাহিনীর মাঝে বিশৃঙ্খলা ও পিছুটান শুরু হয়ে গেল। কিছু সৈনিক আলফনসোর পাশে সমবেত হয়ে তাঁর প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার চেষ্টা করল। কিন্তু এরপরই খ্রিস্টান বাহিনীর মধ্যে সৃষ্টি হল এক বিশাল ভাঙন। ইউসুফ বিন তাশফীন আলফনসোর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং আপন সঙ্গীদের নিয়ে তাঁর ওপর হামলা করলেন। ইবনে আব্বাদের সৈন্যরাও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। আসরে বিজয়ের সূত্রপাত হওয়ার পর মুসলিম বাহিনী এবার একযোগে খ্রিস্টান বাহিনীর ওপর হামলা চালাল। মুসলিম বাহিনীর অশ্বদলের পদচারণায় রণপ্রাঙ্গন প্রকম্পিত হয়ে উঠল। রক্তে পাড়ি দিয়ে প্রতিটি অশ্ব এগিয়ে চলল পরবর্তী শিকারের সন্ধানে। উভয় পক্ষই প্রচণ্ড বীরত্ব ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে লড়াই করে যাচ্ছিল। ইতোমধ্যে পরিস্থিতি পরিবর্তনের সংবাদ পেয়ে ইবনে আব্বাদের বাহিনীর পলায়নপর সেনারাও ফিরে এল এবং সবাই মিলে একসাথে হামলা চালাল। সূর্যাস্তের সামান্য পূর্ব পর্যন্ত চলল ঘোরতর লড়াই। এ সময় ইউসুফ বিন তাশফীন চার হাজার দক্ষ সুদানী সেনার একটি অশ্বারোহী দলকে নিযুক্ত করলেন। এরা ছিল তাঁর বিশেষ নিরাপত্তাবাহিনী। তারা আপন ঘোড়া থেকে নেমে গেল এবং বিশেষ মিশন পালনকারী দলের মতো খ্রিস্টান সৈন্যদের ভেদ করে তাদের মধ্যখানে অবস্থানরত নৃপতিকে লক্ষ্য করে এগিয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চার হাজার সেনার এই বিশেষ দলটি পৌঁছে গেল লড়াইয়ের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে। তাদেরই একজন খ্রিস্টান সেনাপতি ও নৃপতি আলফনসোর কাছে পৌঁছতে সক্ষম হলেন এবং সঙ্গে থাকা খঞ্জর আলফনসোর উরুতে বিদ্ধ করলেন।

যুদ্ধ তীব্রতর অবস্থায় পৌঁছলে পরিস্থিতি খ্রিস্টান বাহিনীর প্রতিকূলে চলে গেল। খ্রিস্টান বাহিনীর নামকরা বীর যোদ্ধা ও সেনাপতিগণ একে একে নিহত হল। অশ্বের পিঠ থেকে ছিটকে পড়তে লাগল খ্রিস্টান যোদ্ধাদের প্রাণহীন দেহ। এরই মাঝে জনৈক তরুণ মুসলিম যোদ্ধা অত্যাচারী আলফনসোর কাছে পৌঁছে হাতে থাকা খঞ্জর দিয়ে তার বর্ম ছিন্ন করে ফেলল এবং প্রচণ্ড আঘাত করে খঞ্জরটি তার উরুতে বিঁধিয়ে ফেলল। খঞ্জরটি তার উরু ভেদ করে অশ্বপিঠের জিন পর্যন্ত পৌঁছে গেল। পরবর্তী সময়ে আলফনসো প্রায়ই বলতেন, 'একজন তরুণ আমার মুখোমুখি হয়ে খঞ্জর দিয়ে আমার উরুতে এমনভাবে আঘাত করেছে যা আমি সারাজীবন মনে রাখব।'

মৃত্যু অবধি এই আঘাতের ক্ষত ও প্রভাব আলফনসোর শরীরে রয়ে গিয়েছিল। এর পর থেকে তিনি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতেন। আহত আলফনসো তার ছাউনির কাছে ছোট একটি টিলার আড়ালে আশ্রয় নিলেন। সুবিশাল বাহিনী নিয়ে যুদ্ধ শুরু করা আলফনসোর সঙ্গে এখন মাত্র পাঁচ শ' অশ্বারোহীর ক্ষুদ্র একটি দল, যারা প্রত্যেকেই আহত। বাকিরা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হয়েছে কিংবা মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়েছে। রাতের আঁধার গভীর হতেই আলফনসো পলায়নের পথ ধরলেন। পথে তার অবশিষ্ট সঙ্গীরা জখমের কারণে একের পর এক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগল। আলফনসো যখন টলেডোতে পৌঁছলেন, তখন তাঁর সঙ্গে এক শ' জন সৈন্যও অবশিষ্ট ছিল না। কোনো কোনো বর্ণনামতে তো একশ’ জনেরও কম সৈন্য জীবিত অবস্থায় টলেডোতে ফিরতে পেরেছিল।

মুসলিম বাহিনী গনীমত হিসেবে অসংখ্য অশ্ব, অস্ত্র-শস্ত্র, বাহন ইত্যাদি লাভ করল। এ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর প্রায় তিন হাজার সৈন্য শাহাদত বরণ করল। আর তাই সার্ব বিবেচনায় কোনো প্রকার অতিশয়োক্তি ছাড়াই যাল্লাকার যুদ্ধকে তুলনা করা যায় ইয়ারমুক ও কাদিসিয়ার যুদ্ধের সঙ্গে। রণপ্রাঙ্গন শান্ত হতেই মু'তামিদ ইবনে আব্বাদ পলায়নরত আলফনসোর চূড়ান্ত সমাপ্তি করতে তাকে ধাওয়া করার মত পেশ করলেন। কিন্তু ইবনে তাশফীন বললেন, 'এখন খ্রিস্টান বাহিনীর পদাঙ্ক অনুসরণ ও তাদেরকে ভীত-সন্ত্রস্ত করার অর্থ তাদেরকে মরণপণ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দেওয়া। তখন তাদের লড়াইয়ের মনোভাব হবে 'হয় মার, না হয় মর'। এতে মুসলিম বাহিনীর সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা আছে। বিশেষত যুদ্ধ চলাকালে প্রাথমিক প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে পিছিয়ে গিয়েছিল এমন অনেক আহত মুসলিম সৈন্যও এখন যুদ্ধপরিস্থিতি আমাদের পক্ষে আসার সংবাদ পেয়ে হয়তো ফেরার পথে আছে। তারা আলফনসোর পথে পড়তে পারে। স্বাভাবিকভাবে আমাদের এই দলবিচ্ছিন্ন আহত দুর্বল সেনারা শক্তির বিচারে আলফনসোর বাহিনীর সঙ্গে পেরে উঠবে না। তাদের ফিরে আসার জন্য যদি আমরা আজকের দিনটি অপেক্ষা করি, তাহলে তাদের প্রত্যাবর্তনে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যায় ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং আগামী দিন আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারব।' ইবনে আব্বাদ উল্টো বললেন, 'এখন যদি সে আমাদের সামনে থেকে পালিয়ে যেতে পারে, তাহলে তার পলায়িত সঙ্গীরা যখন তার সঙ্গে যোগ দেবে, তখন তাকে পরাভূত করা কঠিন হবে।' কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন। আমরা আজ যখন ইতিহাসের পাতায় সেদিনের ঘটনা পাঠ করছি, তখন এক্ষেত্রে ইউসুফ বিন তাশফীনের তুলনায় ইবনে আব্বাদের মতই তুলনামূলক সঠিক মনে হয়। কেননা, আলফনসো এরূপ দশা পেয়েও দমে যাননি; বরং এরপর আরও বিশ বছর মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে গেছেন; যাল্লাকার পরাজয়ে তিনি মোটেও দুর্বল বা হতোদ্যম হননি। যাল্লাকার যুদ্ধের দিন যদি তাকে হত্যা করা হতো, আজ আমরা নিশ্চিত করে আন্দালুসের ইতিহাস অন্যভাবে লিখতাম।

টিকাঃ
৪১. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান, ১/১১৯।
৪২. দেখুন ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭, হিজরী, আসরাদুল কিরাত, পৃ: ২৬১, আব্দুল ওয়াাহিদ আদমারুয়াহ, আল-মুজীব ফী তলখিছি আখবরিয়া মাগরিব, পৃ: ১৬৪-১৬৫, মাগামী, নাফহতুল তীর, ৫/৩৬৬ ও আল-মাকরী, আল-ইস্তিফাক, ২/৮৫।
৪৩. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭।
৪৪. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭।
৪৫. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭।
৪৬. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান, ১/১১৯।
১০. আলসরা, আলহুল্লাল মুওয়াস্সিয়া, পৃ: ২৯০।
১১. আলসরা, আলহুল্লাল মুওয়াস্সিয়া, পৃ: ৮১।
১২. ইবনুল খতীব, আ'মালুল আ'লাম, তৃতীয় খণ্ড, পৃ: ২৪৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px