📄 পত্র-বিনিময় এবং যুদ্ধের পূর্বে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
ইউসুফ বিন তাশফীনের নেতৃত্বে ত্রিশ হাজার সেনা রওনা হয় যাল্লাকার উদ্দেশ্যে। এই যাল্লাকা প্রান্তরেই সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম ঐতিহাসিক যুদ্ধ। ইউসুফ বিন তাশফীনের আগমনের খবর পেয়ে স্পেনীয়রাও সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং বিশাল সৈন্যসমাবেশ ঘটিয়েছিল। কোনো কোনো অনুমান অনুযায়ী খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা ছিল তিন লক্ষেরও অধিক। ফ্রান্স, ইতালি এবং বিভিন্ন খ্রিস্টান রাষ্ট্র সামরিক সাহায্য দিয়ে আলফনসোকে সহায়তা করেছিল। আলফনসো ক্রুশ ও ধর্মীয় আবেগের প্রাবল্য নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত হয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, 'এই সুবিশাল বাহিনী নিয়ে আমি জ্বীন-মানুষ এমনকি আসমানের ফিরেশতাদের বিরুদ্ধেও লড়তে পারব।' তিনি পুরোপুরিই উপলব্ধি করেছিলেন যে, এটি ইসলামের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের ধর্মযুদ্ধ, হিলাল-স্লিবের লড়াই।
আলফোনসো এর পূর্বে ইউসুফ বিন তাশফীনের কাছে একটি পত্র প্রেরণ করেছিলেন। পত্রের ভাষা ছিল আত্মম্ভরিতা ও অহংকারে পরিপূর্ণ। পত্রে আলফোনসো লিখেছিলেন,
'আসমান-জমীনের স্রষ্টা হে প্রভু! আপনার নামে শুরু করছি। প্রভু শান্তি বর্ষণ করুন তার রূহ ও কালিমা সায়্যেদুল মাসীহের প্রতি। পরিপক্ব ও সুদৃঢ় চিন্তার অধিকারী কারোরই অজানা নয় যে, আমি যেমন খ্রিস্টধর্মের নেতা, আপনিও তেমনই ইসলাম ধর্মের আমীর। আপনি নিশ্চয়ই জেনে থাকবেন যে, মুসলিম আন্দালুসের নেতৃত্বের ওপর বর্তমানে কী রূপ দুর্বল ও পরাজিত মনোভাব, পরনির্ভরতা, প্রজাদের প্রতি অবহেলা, আরামপ্রিয়তা ইত্যাদি চেপে বসেছে। আমি দমন-নীতি ও দেশান্তরের মাধ্যমে মুসলমানদের অপদস্থ করছি, তাদের সন্তান-সন্ততিকে দাস-দাসী বানিয়েছি, পুরুষদের অঙ্গ-চ্ছেদন করছি। আপনার যদি সামর্থ্য থাকে, তাহলে তাদেরকে সাহায্য করা থেকে নিবৃত্ত হওয়ার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। আপনাদের ধারণা হল, আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতি-দশজনের বিরুদ্ধে আপনাদের একজনের ওপর যুদ্ধ অবধারিত করেছেন। কিন্তু আপনাদের দুর্বলতা দেখে আল্লাহ আপনাদের বোঝা আরও হালকা করেছেন। এখন আমাদের একজন আপনাদের দশজনের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সক্ষম। আপনারা না পারবেন আত্মরক্ষা করতে, না পারবেন প্রতিরোধ গড়তে। আপনার সম্পর্কে আমাকে জানানো হয়েছে যে, আপনি সৈন্য সমবেত করেছেন এবং রণাঙ্গনের তত্ত্বাবধান করেছেন। কিন্তু আপনি তো বছরের পর বছর টালবাহানা করেই যাচ্ছেন, এক পা অগ্রসর হলে দু’ পা পিছিয়ে যাচ্ছেন। বুঝতে পারছি না, ভীরুতা ও কাপুরুষতা আপনার গতি মন্থর করে দিয়েছে, নাকি আপনার নিজস্ব প্রজ্ঞার প্রতি আপনার আস্থা নেই? আমি আরও শুনতে পেলাম, আপনি নাকি এমন কোনো কারণে সমুদ্র পাড়ি দিতে পারছেন না, যা সঙ্গে নিয়ে আপনার দ্বীপে ফেরা সঙ্গত নয়। এখন শুনুন, আপনার জন্য যা সহজ ও আরামদায়ক, তাই বলছি। আমি-ই আপনার পক্ষ হয়ে আপনার কৈফিয়ত পেশ করার সুযোগ করে দিচ্ছি। শর্ত এই যে, আপনি আপনার প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পূরণ করবেন, ভাগ্যের সঙ্গে বাজি ধরবেন এবং আপনার দাসদের দিয়ে আমার জন্য কিছু নৌযান পাঠাবেন, আমি আমার লোকবল নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আপনার দেশে আসব এবং আপনার সর্বতো উপযুক্ত স্থানে আপনার বিরুদ্ধে লড়াই করব। যুদ্ধে যদি আপনি জয়লাভ করেন, তাহলে অশেষ যুদ্ধলব্ধ সম্পদ আপনি লাভ করবেন, আর যদি আমি জয়লাভ করি, আপনার ওপর আমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আমি উভয় ধর্মের নেতা ও উভয় ভূখণ্ডের শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করব। মহান প্রভু সৌভাগ্য দান করে থাকেন এবং সংকল্প পূরণ সহজ করে দেন। তিনি ছাড়া সাহায্যকারী কেউ নেই এবং তার ব্যতিরেকে প্রকৃত কল্যাণ কোথাও নেই।'
মুরাবিতী সৈন্যদের সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আন্দালুসে পৌঁছা শেষ হলে ইউসুফ বিন তাশফীন এর জবাবে খ্রিস্টান আলফনসোর কাছে নিম্নোক্ত পত্র প্রেরণ করেন:
'আবুনাশন! আমি জানতে পেরেছি যে, তুমি আমাদের সঙ্গে সাক্ষাতের আবেদন জানিয়েছ এবং সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমাদের কাছে পৌঁছার জন্য কিছু নৌযান চেয়েছ। এখন সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আমরাই তোমার কাছে চলে এসেছি। আল্লাহ তাআলা এই ময়দানে তোমার সঙ্গে আমাদের সমবেত করে দিয়েছেন। শীঘ্রই তুমি তোমার প্রার্থনার পরিণতি প্রত্যক্ষ করবে। আর কাফিরদের প্রার্থনার পরিণতি তো কেবল ভ্রষ্টতা ব্যতিরেকে অন্য কিছু নয়।'
পাশাপাশি ইউসুফ বিন তাশফীন তাকে ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া প্রদান বা যুদ্ধ—তিনটির কোনো একটি বেছে নিতে বলেন। পত্র পেয়ে দাম্ভিক আলফনসো ক্রোধে ফেটে পড়েন। তাঁর শৌর্য ও ক্ষোভের সাগর ফুলে ওঠে, অহমিকা ও অবাধ্যতা বৃদ্ধি পায়। তিনি বলেন, 'কী! সে আমাকে এভাবে সম্বোধন করেছে; অথচ আমি ও আমার পিতা দীর্ঘ আশি বছর ধরে তার ধর্মাবলম্বীদের জিজিয়া দিতে বাধ্য করেছি।' এরপর আলফোনসো হুমকির জবাবে আরেকটি পত্র পাঠান এবং তাতে লেখেন, ‘আচ্ছা, আমি তোমার কথা মেনে নিলাম। এখন তোমার উত্তর ও প্রতিক্রিয়া কী?’ পত্র পাঠামাত্র আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন তা উল্টে অপর পৃষ্ঠে লেখেন, ‘আমার উত্তর তো কানে শোনার নয়; স্বচক্ষেই তুমি তা দেখতে পাবে।’ ইউসুফ বিন তাশফীনের উত্তর পাওয়ামাত্র আলফোনসো ভয় পেয়ে যান এবং বুঝতে পারেন, তিনি এমন এক ব্যক্তির মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন, আর যাই হোক, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে যার ওপর তাঁর কোনো কারসাজি চলবে না।
হিময়ারী 'আররাউদুল মি'তার'-এ লিখেছেন, খ্রিস্টান আলফোনসো যখন ইউসুফ বিন তাশফীনের সমুদ্র পাড়ি দেওয়া সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন, তখন তিনি আপন রাষ্ট্র, আশপাশের ও দূর-দূরান্তের খ্রিস্টান রাষ্ট্রগুলোর অধিবাসীদের মাঝে যুদ্ধের ঘোষণা ছড়িয়ে দিলেন। পাদ্রী, বিশপ ও সন্ন্যাসীগণ ক্রুশ উত্তোলন করে ও ইঞ্জিলের বাণী পাঠ করে মানুষকে যুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল। গ্যালিসিয়া, বিশকা ও আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলের অসংখ্য সৈন্য খ্রিস্টান বাহিনীতে যোগ দিতে সমবেত হল। ইবনে আব্বাদের প্রতি ক্রোধে উন্মাদ হয়ে তাকে হুমকি দেওয়ার পাশাপাশি আলফোনসো মুসলিম বাহিনীকে ধোঁকা ও ভয় দেখাতে লাগলেন।
খ্রিস্টান আলফনসো ইবনে আব্বাদের কাছে লিখলেন, 'তোমাদের বড় ইউসুফ দূর-দেশ থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে এসে পরিশ্রান্ত হয়ে গেছে। যদি তিনি বেঁচে থাকেন, ততদিন তার দেশদখল করার জন্য আমিই যথেষ্ট। তোমাদেরকে আর ক্রুদ্ধ করতে চাই না। তোমাদের প্রতি দয়া ও সৌজন্যস্বরূপ আমিই তাঁর কাছে আসছি এবং তোমাদের ভূমিতে তোমাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছি।' আর পারিষদ ও উলামাদের তিনি বললেন, 'আমার মত হল, যদি আমরা তাদেরকে আমাদের দেশে প্রবেশপথের সুযোগ দিই এবং তারা আমাদের ভূমিতে লড়াই করে আর কোনো কারণে আমরা যুদ্ধে পরাজিত হই, তাহলে তো তারা আমাদের দেশ উজাড় করে ফেলবে, এক সকালেই সবাইকে উচ্ছেদ করবে। তাই আমি চাচ্ছি, তাদের দেশে গিয়ে তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করব। যদি আমরা সেখানে পরাজিতও হই, তারা যা পাবে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকবে, পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়া ছাড়া পিছু ধাওয়ার বা আমাদের দেশে হামলা করার চিন্তা করবে না। ফলে আমাদের দেশও রক্ষা পাবে, পরাজয় কাটিয়ে উঠে পুনরায় প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও পাওয়া যাবে। আর যদি আমরা জয়লাভ করি, তাহলে আমরা নিজেদের দেশে যুদ্ধে পরাজিত হলে যা আশঙ্কা করছি, ঠিক তা-ই ঘটবে তাদের ভাগ্যে।'
টিকাঃ
৫২. ঐতিহাসিক উৎসগুলোর অধিকাংশেই যদিও খ্রিস্টান বাহিনীর সৈন্যসংখ্যা নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি; কিন্তু তাদের সংখ্যা যে বিশাল ছিল, বর্ণনা থেকে তা স্পষ্ট। কারও কারও মতে খ্রিস্টান বাহিনীর অশ্বারোহী সেনা ছিল আশি হাজার এবং পদাতিক সেনা ছিল দু’ লক্ষ। বিজয়ী, আলফাসুল কিরতাস, পৃ : ২৬৯, মাককারী, নাফহতুত তীব, ৪/৩৬০।
৫৩. ঐতিহাসিকগণের ভাষ্য মতে এটি বড় আলফোনসোর প্রেরিত পত্রের ভাষ্য নয়, বরং এটি আলফোনসো কর্তৃক আমীর ইউসুফ বিন তাশফীনের কাছে প্রেরিত পত্রেরই ভাষ্য। ইবনুল আছীর, আলকামিল, ১০/২৫৭, ইবনে খাল্লিকান, ওয়াকাইয়্যাতুল আইয়্যাম, ৭/৫-৭, মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, দাওলাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৭/১৬৫।
৫৪. ইবনে আবি যারা, রাওযুল কিরাতাস, পৃ : ১৪৭, বিজয়ী, আলফাসুল কি’তাস, পৃ: ২৪০, লেখক অজ্ঞাত, আলজুলফুল মুয়ান্নিফিয়া, পৃ: ৫০, মাককারী, নাফহতুত তীব, ৪/৩৬০, আন্দালুসী, আলজুবফুয়া, ২/৫২।
৫৫. ইবনুল আছীর, আলকামিল, ৮/৪৮৬ ও লেখক অজ্ঞাত, আলজুলফুল মুয়ান্নিফিয়া, পৃ: ৭০।
📄 মুসলিম বাহিনীর বিন্যাস ও ইবনে রুমাইলার স্বপ্ন
মুস্লিম বাহিনীর খোঁচা দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে আলফোনসো যুদ্ধের দিনও নির্দিষ্ট করে দেন। তিনি বার্তা পাঠান, 'আগামীকাল শুক্রবার আর শুক্রবার আপনাদের সাপ্তাহিক আনন্দের দিন। তাই সেদিন আমরা আপনাদের বিরুদ্ধে লড়তে চাই না। তার পরের দিন শনিবার, ইহুদিদের আনন্দের দিন। যেহেতু আমাদের এ অঞ্চলে প্রচুর ইহুদিও আছে, তাই আমাদের কর্তব্য তাদের দিকটাও খেয়াল রাখা। আর এর পরদিন হল রোববার, আমাদের আনন্দের দিন। সুতরাং, আসুন, আমরা এসব আনন্দের দিনগুলোর সম্মান বজায় রাখি। সোমবারেই পরস্পরের সাক্ষাৎ হবে।'
আলফোনসোর বার্তা পাঠ করার পর ইউসুফ বিন তাশফীন প্রভাবিত হয়ে পড়েন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজন্যবর্গ কখনো প্রতারণা করেন না; অধিকন্তু এটি ছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে তার প্রথম মোকাবিলা। তবে মু'তামিদ বিন আব্বাদ ঠিকই আলফোনসোর চাল ধরে ফেলেছিলেন এবং তার আশঙ্কার কথা ইউসুফ বিন তাশফীনকে জানিয়ে রাখেন।
মু'তামিদের সতর্কবার্তার ভিত্তিতে ইউসুফ বিন তাশফীন পূর্ণ সতর্কতা অবলম্বন করেন এবং আলফোনসোর কথার ওপর আস্থা না রেখে যুদ্ধ-প্রস্তুতিতেই মনোযোগী হন। তিনি পরবর্তী দিন যুদ্ধ করার জন্য বাহিনীকে পূর্ণ প্রস্তুত করেন। এটি ছিল এমন এক উত্তেজনাপূর্ণ মুহূর্ত, আন্দালুসিবাসী তাদের মাটিতে অনেক বছর পর যার স্বাদ পেতে যাচ্ছে। লাঞ্ছনা, অবমাননা ও জিজিয়া প্রদানের দিনগুলো পেরিয়ে কত বছর পর আবারও তারা খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে! আন্দালুসের মুমিনদের অন্তর শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষায় এই ক্ষণটির জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেছে! ইউসুফ বিন তাশফীন এ সময় সকলকে সূরা আনফাল পাঠ করার আদেশ দেন এবং সকলকে পূর্ণ সংকল্প নিয়ে যুদ্ধ করতে নির্দেশ প্রদান করেন। তিনি নিজে বাহিনীর প্রতিটি অংশের কাছে গিয়ে গিয়ে আওয়াজ দিতে থাকেন, 'সৌভাগ্য তার জন্য, যে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করবে। আর যে গাফেল হবে, তার জন্য তো রয়েছে আযাব ও গনীমত।'
'আররাওয়াদুল মি'তার' গ্রন্থে আছে, ইউসুফ বিন তাশফীন ও মু'তামিদ বিন আব্বাদ আপন আপন সেনাদের নসীহত করতেন। ফকীহ ও আবিদগণ মানুষকে নসীহত করার পাশাপাশি সবর ও অবিচলতার প্রতি উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়নের ভয়াবহ আযাবের কথা স্মরণ করিয়ে দিতেন। জুমা-পূর্ব রাতে কর্ডোভার বিশিষ্ট মালেকী শায়খ ক্বাজী আবুল আব্বাস আহমাদ বিন রুমাইলা আলকুরতুবীও মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে ময়দানে উপস্থিত ছিলেন। ইবনে বাশকুওয়াল ‘আসসিলাহ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, তিনি (আবুল আব্বাস আহমাদ বিন রুমাইলা) ছিলেন জ্ঞানানুরাগী, মাশায়েখে কেরামের সংস্পর্শপ্রিয়। দুনিয়াবিমুখতা সম্বন্ধে তার চমৎকার কিছু কবিতা আছে। তিনি দান-সাদাকা ও কল্যাণমূলক কাজ প্রচুর পরিমাণে করতেন। আবুল আব্বাস তাক্বওয়া ও ধার্মিকতায় অগ্রগামী ছিলেন। সেদিন শায়খের দায়িত্ব কেবল মসজিদে বসে থাকা, দরস প্রদান করা কিংবা কোরআন শিক্ষাদানে সীমাবদ্ধ ছিল না। সে রাতে তাঁর অবস্থান ছিল সেনাছাউনিতে।
শায়খ আবুল আব্বাস সে রাতে স্বপ্নে দেখেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলছেন, 'ইবনে রুমাইলা! নিঃসন্দেহে তোমরা বিজয়ী হবে আর নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হবে।' এটুকু দেখার পর ইবনে রুমাইলার ঘুম ভেঙে যায়। তিনি জানেন, স্বপ্নে রাসূলকে দেখার অর্থ স্বয়ং রাসূলকেই দেখা। কেননা, শয়তান কখনো নবীজীর আকৃতি ধারণ করতে পারে না। বুখারী শরীফে ইমাম বুখারী রহ. আপন সনদে হযরত আনাস রাযি.-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'যে আমাকে নিদ্রাবস্থায় দেখল, সে ঠিক আমাকেই দেখল। কারণ, শয়তান আমার আকৃতি ধারণ করতে পারে না। আর মুমিনের স্বপ্ন নবুয়্যতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ।'
আনন্দে উদ্বেলিত শায়খ আবুল আব্বাস উঠে দাঁড়ান। খুশিতে তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারছিলেন না। স্বয়ং নবীজী স্বপ্নযোগে তাঁকে সুসংবাদ দিয়েছেন যে, শীঘ্রই তিনি আল্লাহ্র রাস্তায় শহীদ হতে যাচ্ছেন। তাঁর সামনে এখন একই সঙ্গে দুটি সুসংবাদ: মুমিনদের বিজয় আর নিজের শাহাদাত লাভ। আল্লাহু আকবার! কী আনন্দ বিজয়ের! কী আজব শাহাদাতের! ইবনে রুমাইলা তৎক্ষণাৎ গভীর রাতের শয্যা ত্যাগ করে মুস্লিম সেনাপতিদেরকে; এমনকি স্বয়ং মু'তামিদ বিন আব্বাদকে জাগিয়ে তোলেন। সবাইকে শোনান স্বপ্নে পাওয়া নবীজী-প্রদত্ত সুসংবাদের কথা। স্বপ্নের এ সুসংবাদ ইবনে আব্বাদকেও আলোড়িত করে, করে আন্দোলিত। তিনি এ সংবাদ ইউসুফ বিন তাশফীন ও সকল সেনাপতির কাছে পৌঁছিয়ে দেন। আনন্দের আতিশয্যে মুজাহিদ ও সেনাপতিদের উচ্চকিত তাকবিরে জেগে উঠে পুরো মুস্লিম বাহিনী। সবার কণ্ঠে একই আনন্দধ্বনি— ইবনে রুমাইলা নবীজীকে স্বপ্নে দেখেছেন, নবীজী সুসংবাদ দিয়েছেন: “নিঃসন্দেহে তোমরা বিজয়ী হবে আর নিশ্চয়ই তুমি আমার সঙ্গে মিলিত হবে।”
টিকাঃ
৪১. হিময়ারী, আররাউদুল মি'তার, পৃ: ২৯৮।
৪২. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৬ ও আলইনফামুল মুতান্নাসিয়্যা, পৃ: ৩৭।
৪৩. আববুল ওয়াহিদ আলমাররাকুশী, আলমু'জিম ফী তালখীছি আখবারিল মাগরিব, পৃ: ১৬৪-১৬৫।
৪৪. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭।
৪৫. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯৯।
৪৬. ইবনে বাশকুওয়াল, আসসিলাহ, ১/১১০।
৪৭. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৬৪৬।
৪৮. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০, মাককারী, নাহজুত ত্বীব, ৪/৩৬৫ ও আলআনাদাসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫।
📄 রণাঙ্গনের নজরদারীতে ইবনে আব্বাদের গোয়েন্দা-তৎপরতা
মুরাবীতি বাহিনীর প্রধান সেনাপতি আলফোনসোর কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের শিকার হতে পারে—এই আশঙ্কায় ইবনে আব্বাদ মুরাবীতি ছাউনির ওপর নজর রাখছিলেন। কারণ, মুরাবীতগণ আন্দালুস-ভূমিতে একেবারেই নবাগত। এ দেশের গতি-প্রকৃতি সম্বন্ধে তাদের তেমন ধারণা নেই। তিনি নিজেই এ দায়িত্ব পালন করেন। এমনকি কথিত আছে, মুরাবীতি ছাউনি থেকে জনৈক সৈনিক কোনো কাজে বা প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে বের হলে স্বয়ং ইবনে আব্বাদকে মুরাবীতি ছাউনির চারপাশে টহলরত অবস্থায় দেখতে পায়। ইবনে আব্বাদ যখন মুরাবীতি ছাউনির বিভিন্ন পথের প্রবেশমুখগুলোতে অশ্বারোহী বাহিনীর বিভিন্ন রেজিমেন্টকে নিযুক্ত করার কাজ শেষ করে নিজেই টহল দিচ্ছিলেন। মুরাবীতি ছাউনি থেকে বের হওয়া সৈন্যরা চলাফেরার সময় বারবার ইবনে আব্বাদের মুখোমুখি হওয়ায় মনে করেছে সবাই যে, হয়তো ভুল পথে অগ্রসর হচ্ছে।
রাতেই মু'তামিদের গোয়েন্দা-বাহিনীর দু’জন সদস্য তাঁকে জানায় যে, তারা দু'জন রাতের অন্ধকারে আলফোনসোর ছাউনির কাছে চলে গিয়েছিল। সেখান থেকে তারা খ্রিস্টান বাহিনীর কোলাহল এবং অস্ত্রের ঝনঝনানি শুনতে পেয়েছে। গোয়েন্দা-বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী আলফোনসোর আগামীকাল যুদ্ধ শুরু করার তৎপরতা নিশ্চিত হওয়া গেল। এর কিছুক্ষণ পর আলফোনসোর ছাউনির ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা গুপ্তচরেরাও উপস্থিত হয়ে ইবনে আব্বাদকে জানায়, 'আমরা গোপনে শুনতে পেয়েছি আলফোনসো তার সঙ্গীদের বলছিল—ইবনে আব্বাদই এ যুদ্ধের প্রধান পরিচালক। এমনকি মরুভূমির এই বেদুইন বাহিনী যদিও সামরিক ক্ষেত্রে পারদর্শী, কিন্তু এ দেশ ও পরিবেশ-প্রতিবেশ সম্পর্কে তারা অনভিজ্ঞ। ইবনে আব্বাদই তোমাদেরকে পরিচালিত করছে। সুতরাং তোমরা তাকেই প্রধান লক্ষ্য হিসেবে স্থির করবে এবং আক্রমণ চালাবে। সে যদি পরাভূত হয়, তাহলে এই বেদুইনরা তোমাদের সামনে তুচ্ছ। তোমরা যদি অকুতোভয়ে তাদের ওপর হামলা চালাও, আমার মনে হয় না, তারা তোমাদের সামনে টিকতে পারবে।'
ইবনে আব্বাদ তখন সেনাপতি আলফোনসোর এই গোপন পরিকল্পনার খবর পৌঁছিয়ে দেওয়ার জন্য তার কতিপয় কাতিব ও আবু বকর বিন রুমাইরাকে ইউসুফ বিন তাশফীনের মুরাবীতি ছাউনিতে প্রেরণ করেন এবং আমিরুল মুস্লিমীনকে গোয়েন্দাদের সংগৃহীত করা যাবতীয় তথ্য অবহিত করেন।
টিকাঃ
৪৯. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭ ও হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০।
📄 মুসলিম বাহিনী ও যুদ্ধ-পরিকল্পনা
১২ রজব, ৪৭৯ হিজরী (২৩ অক্টোবর, ১০৮৬ খৃষ্টাব্দ)। বাদ ফজর। মুস্লিম বাহিনীর বিন্যাস ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। বাহিনীর সদস্যগণ ভোরে ফজর নামায শেষ করার পরপরই ষষ্ঠ আলফোনসো স্বীয় অঙ্গীকার ভঙ্গ করে আক্রমণ শুরু করলেন। প্রতারণা, বিশ্বাসঘাতকতা, প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করা—এগুলো তো খ্রিস্টানদের প্রাচীন স্বভাব। খ্রিস্টান বাহিনীর হঠাৎ আক্রমণে মুস্লিম বাহিনী এক কিংকর্তব্যবিমূঢ় পরিস্থিতির সম্মুখীন হল, যেমনটি স্বয়ং ইউসুফ বিন তাশফীনও পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা এক পত্রে নিশ্চিত করেছেন। খ্রিস্টান বাহিনীর সবগুলো অংশ চারদিক থেকে মুস্লিম বাহিনীর ওপর একসাথে বিপুল বেগে ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রথম আঘাতটি ছিল নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কঠিন।
উল্লেখ্য, মুস্লিম বাহিনী ৬টি মূল অংশে বিভক্ত ছিল।
১. আন্দালুসী বাহিনী। এ অংশে আন্দালুসের সকল সৈনিক অন্তর্ভুক্ত ছিল। তাদের নেতৃত্বে ছিলেন মু'তামিদ বিন আব্বাদ ও আন্দালুসের অন্যান্য রাজন্যবর্গ; যেমন—আলমারিয়ার শাসক ইবনে সামাদিহ, গ্রানাডার শাসক আবদুল্লাহ বিন বুলুকক্বীন, উচ্চ সীমানার প্রধান নিরাবত্তারক ইবনে মাসলামা, ইবনে নুনুন, ইবনুল আফতাত প্রমুখ। ইউসুফ বিন তাশফীন তাদের সকলকে মু'তামিদের সঙ্গে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন। মু'তামিদ ছিলেন এই বাহিনীর একবারে কেন্দ্রস্থলে, মুতাওয়াক্কিল বিন আফতাস দক্ষিণ বাহুতে, পূর্ব আন্দালুসের শাসকবর্গ বাম বাহুতে এবং অন্যান্য শাসকবর্গ ছিলেন এই দলের পেছনের অংশে। খ্রিস্টান বাহিনীর প্রথম আক্রমণ প্রতিরোধকারী অগ্রবর্তী অংশের জন্য মু'তামিদ নিজেকেই নির্বাচন করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি তাঁর বিগত বছরগুলোর ভুল-ত্রুটি ও কলঙ্কিত অবস্থান ধুয়ে ফেলতে চেয়েছিলেন কিংবা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য বিজয়ের মূল কৃতিত্ব ও মর্যাদা লাভ করা এবং বিজয়ের গৌরব তাঁর নামে প্রচারিত হওয়া। বাস্তব নিয়ত কী ছিল, আল্লাহই ভালো জানেন।
অবশ্য কোনো কোনো বর্ণনামতে, স্বয়ং ইউসুফ বিন তাশফীন আশঙ্কা করেছিলেন যে, মু'তামিদ হয়তো যুদ্ধক্ষেত্রে অটল থাকবেন না এবং সর্বস্ব বিসর্জন করে যুদ্ধ করবেন না। তাই ইউসুফ বিন তাশফীনের তদারকিতেই মূলত মু'তামিদ নিজেকে অগ্রবাহিনীর সম্মুখ সারিতে রেখেছিলেন।
২. মুরাবিতী যোদ্ধাগণের একটি অংশ। এ দলটির নেতৃত্বে ছিলেন মুরাবিতী বীর যোদ্ধা দাউদ বিন আয়েশা। এ দলটির অবস্থান ছিল আন্দালুসি দলের পেছনে।
৩. মুরাবিতী বাহিনীর মূল অংশ। ইউসুফ বিন তাশফীনের নেতৃত্বে এ দলটি যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত মূল বাহিনী হতে দূরে একটি টিলার আড়ালে এমনভাবে লুকিয়ে ছিল, যাতে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে তাদের দেখা না যায়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে মনে হবে, পুরো মুসলিম বাহিনী দু' দলে বিভক্ত; আন্দালুসি বাহিনী এবং দাউদ বিন আয়েশার নেতৃত্বাধীন মুরাবিতী বাহিনী।
এই পদক্ষেপের পেছনে ইউসুফ বিন তাশফীনের পরিকল্পনা ছিল—যুদ্ধ যখন তীব্রতর পর্যায়ে পৌঁছবে এবং উভয় পক্ষ লড়াই করে ক্লান্ত ও দুর্বল হয়ে পড়বে, হারিয়ে ফেলবে লড়াই করার শক্তি, যেমনটি সাধারণ যুদ্ধের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে, তখন তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে মুসলিম বাহিনীর কাতারে যোগ দিয়ে যুদ্ধের পাল্লা মুসলিম বাহিনীর দিকে ঝুঁকিয়ে দেবেন।
অবশ্য ইউসুফ বিন তাশফীনের এই পরিকল্পনা মুসলমানের যুদ্ধ-ইতিহাসে নতুন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। এই একই কৌশল সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ রাযি. পারস্য-বিজয়ের সময় ওয়ালাজা রণাঙ্গনে (Battle of Walaja) ব্যবহার করেছিলেন। তাছাড়া পারস্য-অভিযানেই আরেক বিখ্যাত সাহাবী নোমান বিন মুকাররিন রাযি.-ও এই একই পরিকল্পনা কাজে লাগিয়েছিলেন নিহাওয়ান্দের যুদ্ধে (Battle of Nahavand)। সুতরাং ইউসুফ বিন তাশফীনের এই পরিকল্পনা প্রমাণ করে, তিনি ইতিহাস পাঠ করতেন এবং ইসলামী ইতিহাসের মহান সেনাপতি ও বীর সৈনিকদের যুদ্ধ-ইতিহাস অধ্যয়ন করে তা থেকে শিক্ষা নিতেন।
টিকাঃ
৫০. হিময়ারী, আররাওয়াদুল মি'তার, পৃ: ২৯০, মাককারী, নাহজুত ত্বীব, ৪/৩৬৫ ও আলআন্দালুসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫।
৫১. ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ: ১৬৭ ও আলইনফামুল আলআন্দালুসী, আলইস্তাক্বসা, ২/৪৫-৪৮।
৩৭. আহাআর, আলহাল্লাতুল মুয়ালাশিয়া, পৃ: ২৮।
৩৮. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আ'ইয়ান, ১/১১৯।
৩৯. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭।
৪০. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৪/৪৮৭, ইবনে আবি জারা’, রাওযুল কিরতাস, পৃ: ১৪৪ ও ইবনুল আছীর, আ'মালুল আ'লাম, ৩/২৪২-২৪৩।