📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবু বকর বিন ওমর লামতূনী : এক মহান দাঈ ও সুমহান সেনাপতি

📄 আবু বকর বিন ওমর লামতূনী : এক মহান দাঈ ও সুমহান সেনাপতি


ইসলামের দাওয়াতী মেহনতের উদ্দেশ্যে আবু বকর বিন ওমর লামতূনী আবারও চলে গেলেন আফ্রিকার গহীন অরণ্যে। এবার তিনি ইসলামের পতাকাতলে শামিল করলেন বর্তমানের গিনি, দক্ষিণ সেনেগাল, সিয়েরালিওন, আইভোরিকোট, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, ঘানা, বেনিন, টোগো, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, গ্যাবন ইত্যাদি আফ্রিকান রাষ্ট্রকে। নাইজেরিয়ায় এটি ছিল ইসলামের দ্বিতীয় পদার্পণ; কয়েক শতাব্দী পূর্বেও নাইজেরিয়ায় একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছিল।

এভাবে এই মহান বীর যোদ্ধা আবু বকর বিন ওমর লামতূণীর হাত ধরে আফ্রিকার গহীন অরণ্যের অনেক রাষ্ট্র ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছিল। হাফেজ ইবনে কাসীর রহ.-এর ভাষ্যমতে, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী যখন আল্লাহর পথে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন, তখন পাঁচ লক্ষ জানবাজ সৈনিক লাব্বাইক বলে সাড়া দিত। এ তো কেবল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কথা, এর বাইরে রয়ে গেছে কত নারী, শিশু ও অসংখ্য অগণিত সাধারণ মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা এই মহান দাঈর হাতে হেদায়েত দান করেছেন।

যখনই আজ নাইজার, মালি, নাইজেরিয়া বা ঘানায় কোনো মুসলমান ইবাদত করেন, কিংবা যখনই তারা কোনো নেক আমল করেন, নিশ্চিতভাবেই শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী রহ. ও তাঁর সঙ্গী কাফেলার নেক আমলের দফতরে সেসব আমলের সওয়াব জমা হতে থাকে। হাফিজ ইবনে কাসীর রহ. ‘আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী ছিলেন মুজাহিদ শাসক। ফারগানা অঞ্চলের এই মহান ব্যক্তির সঙ্গে এত বেশি নেক-মুত্তাকী লোকের সম্মিলন ঘটেছিল, যা অন্য কোন শাসকের ক্ষেত্রে হয়নি। তিনি যখন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে রওয়ানা হতেন, পাঁচ লক্ষ সৈনিক তার সঙ্গে শরীক হত। প্রত্যেকেই তার আনুগত্যে অটল থাকত। তিনি সেখানে ইসলাম কায়েম করতেন, দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। তিনি আপন আকীদা ও দ্বীনের শুদ্ধতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতেন এবং আব্বাসী খেলাফতের প্রতি আনুগত্য পোষণ করতেন। রব্বাযানবী নামক স্থানে তীরবিদ্ধ হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

এভাবে আল্লাহর রাস্তায় এক অনন্য সংগ্রামী জীবন সমাপ্ত করে ৪৮৩ হিজরীতে (১০৯০ খ্রিস্টাব্দে) এক যুদ্ধাভিযানে শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী শহীদ হন। পরিশেষে ঘটে ইসলামী ইতিহাসের দাওয়াত ও সামরিক অঙ্গনের উজ্জ্বলতম এই মহিমান্বিত সফরের সমাপ্তি।

টিকাঃ
৫১. ‘ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/১৮৫।’

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র

📄 আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র


আমরা মুরাবিতী ইতিহাসের আলোচনা শুরু করেছিলাম ৪৪০ হিজরী (১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল একজন মাত্র ব্যক্তি শায়খ আবদুল্লাহ্ বিন ইয়াসিনের হাত ধরে। আর এখন মাত্র আটাশ বছর পর ৪৬৮ হিজরীতে (১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে) মুরাবিতী নেতা ইউসুফ বিন তাশফীন এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী। নিজের জন্য তিনি নির্বাচন করেছেন ‘আমীরুল মুসলিমীন’ ও ‘নাসিরুদ্দিন’ পরিচয়। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি কেন ধারণ করেন না? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,
'আল্লাহ্ মাফ করুন, আমি এ উপাধি কিছুতেই ধারণ করব না। এ উপাধি তো ধারণ করবেন আব্বাসী খলীফাগণ। তারা অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশ-পরিচয়ের অধিকারী। তারা মক্কা ও মাদীনা উভয় হারামাইনের খলীফা। আমি তো তাদের একজন কর্মচারী, তাদের প্রচারক মাত্র।'

অথচ পাঠক জেনে অবাক হবেন, তখন আব্বাসী খেলাফত শক্তি ও আয়তন উভয় দিক থেকেই ছিল মুরাবিতী সাম্রাজ্যের তুলনায় দুর্বল ও ক্ষুদ্র। আব্বাসীদের শাসন তখন কেবল বাগদাদে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন ছিলেন বিনয়ী ও মহান শাসক। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন, মুসলমানরা যেন এক পতাকাতলে সমবেত হয়। তিনি নিজের শক্তি থাকা সত্ত্বেও আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ চালাননি। বরং নিজ এলাকায় আব্বাসী খেলাফতের একজন গভর্নর হয়ে থাকাই ছিল তার তামান্না। আর তাই তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন এই ঐক্যের বাণী, ‘আমি তো এখানে তাদের এক কর্মচারী মাত্র।’ বস্তুত এটাই ছিল সঠিক প্রজ্ঞা, এটাই ইসলামের সার্বজনীন চিন্তা।

টিকাঃ
৪২. লেখক অজ্ঞাত, আলফাসুল মুরাবিতীন, পৃ : ২১। ‘ইবনে আবি যারা’ ও লিসানুদীন ইবনুল খতীবসহ অন্য অনেকেই ইউসুফ বিন তাশফীনকে বহু পরে ৪৯৬ হিজরীতে বাগদাদের খলিফার পক্ষ থেকে ‘আমীরুল মুসলিমীন’ উপাধি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px