📄 ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ইউসুফ বিন তাশফীনকে অত্যন্ত ব্যথিত করল। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে উত্তরে রওয়ানা হলেন। মুরাবিতী বাহিনীর সদস্য-সংখ্যা ইতোমধ্যে চল্লিশ হাজারে পৌঁছেছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি গোত্র—যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী ছিল এবং যারা পথভ্রষ্ট ছিল—সবার বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করলেন। অবশ্য কালের পরিক্রমায় এসব গোত্রের মানুষেরা ইসলামের সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করল এবং মুসলিম সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত হল।
দক্ষিণ সেনেগাল ও আফ্রিকার অরণ্যে প্রায় দীর্ঘ পনের বছর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করার পর শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী যখন ৪৬৪ হিজরীতে (১০৭১ খৃষ্টাব্দে) মুরাবিতী রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করলেন, তিনি দেখতে পেলেন, যে ইউসুফ বিন তাশফীনকে তিনি ৪৫০ হিজরীতে (১০৫৮ খৃষ্টাব্দে) কেবল উত্তর সেনেগাল ও দক্ষিণ মৌরিতানিয়ায় দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, আজ মাত্র পনের বছরের পরিক্রমায় সেই ইউসুফ বিন তাশফীন পুরো সেনেগাল, পুরো মৌরিতানিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার বড় এক অংশের অধিকারী হয়েছেন।
আবু বকর বিন ওমর লামতূনী আরও দেখতে পেলেন, মুরাবিতীদের এই রাষ্ট্রটি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার ভিত্তি তাকওয়ার ওপর। তিনি মুরাবিতী রাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে যে নগরটির অস্তিত্বই পৃথিবীর বুকে ছিল না, সেই নগরীটি হল ইউসুফ বিন তাশফীন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মারাকেশ (Marrakesh) নগরী। এ নগরীর প্রথম স্থাপনা ছিল সেই ঐতিহাসিক মসজিদটি, যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্মিত মসজিদে নববীর আদলে পুরোপুরি মাটি ও কাঁচা ইট দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। মহৎ আদর্শের অনুকরণে আমীর ইউসুফ বিন তাশফীন এক লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যের আমীর হয়েও নিজে সকলের সঙ্গে মাটি বহনের কাজ করে মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছেন।
আবু বকর বিন ওমর লামতূনী তাঁর সামনে এমন এক মহান নেতাকে দেখতে পেলেন, যিনি এত অল্প সময়ে এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার অস্তিত্বও পূর্বে বিশ্ববাসীর কাছে ছিল না। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন, এই মহান নেতা দুনিয়াবিমুখ, সংযমী ও মিতভাষী, খোদাভীরু, দ্বীনের আলিম ও আল্লাহর অনুগত। এ সবকিছু প্রত্যক্ষ করে আবু বকর বিন ওমর লামতূনী এমন একটি কাজ করলেন, যাঁর দৃষ্টান্ত কেবল মুসলমানদের ইতিহাসেই পাওয়া সম্ভব।
তিনি ইউসুফ বিন তাশফীনকে বললেন, 'ভাই! আমার তুলনায় তুমিই শাসনকার্য পরিচালনার অধিকতর উপযুক্ত। তুমিই প্রকৃত শাসক। যদিও আমি তোমাকে আমার ফিরে আসা পর্যন্ত সময়ের জন্য স্থলাভিষিক্ত করে গিয়েছিলাম; কিন্তু এখন তুমিই এই রাষ্ট্রের আমীর ও শাসক হওয়ার যোগ্য। তুমি এ অঞ্চলের মানুষকে এক পতাকাতলে সমবেত করতে এবং রাষ্ট্রের শাসক হয়ে এর চেয়েও বৃহৎ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম। আর আমি? আমি তো মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলামে দীক্ষিত করার স্বাদ পেয়ে গেছি। তাই আমি আবারও ফিরে যেতে চাই আফ্রিকার গহীন অরণ্যে, মানুষকে এক আল্লাহর পথে আহ্বান করতে।'
টিকাঃ
৩৮. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ১৩৯।
৩৯. ইবনুল খতীব, আ’মালুল আ’লাম, ৬/২৩৪ ও আলদালাহী, আলইস্তিকসা, ২/২০।
৫০. ‘ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ : ১৬৬–১৬৯ ও আলফাসবী, জাইরিউষ্ফুনা, ২/২২-২৭।
📄 আবু বকর বিন ওমর লামতূনী : এক মহান দাঈ ও সুমহান সেনাপতি
ইসলামের দাওয়াতী মেহনতের উদ্দেশ্যে আবু বকর বিন ওমর লামতূনী আবারও চলে গেলেন আফ্রিকার গহীন অরণ্যে। এবার তিনি ইসলামের পতাকাতলে শামিল করলেন বর্তমানের গিনি, দক্ষিণ সেনেগাল, সিয়েরালিওন, আইভোরিকোট, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, ঘানা, বেনিন, টোগো, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, গ্যাবন ইত্যাদি আফ্রিকান রাষ্ট্রকে। নাইজেরিয়ায় এটি ছিল ইসলামের দ্বিতীয় পদার্পণ; কয়েক শতাব্দী পূর্বেও নাইজেরিয়ায় একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছিল।
এভাবে এই মহান বীর যোদ্ধা আবু বকর বিন ওমর লামতূণীর হাত ধরে আফ্রিকার গহীন অরণ্যের অনেক রাষ্ট্র ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছিল। হাফেজ ইবনে কাসীর রহ.-এর ভাষ্যমতে, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী যখন আল্লাহর পথে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন, তখন পাঁচ লক্ষ জানবাজ সৈনিক লাব্বাইক বলে সাড়া দিত। এ তো কেবল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কথা, এর বাইরে রয়ে গেছে কত নারী, শিশু ও অসংখ্য অগণিত সাধারণ মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা এই মহান দাঈর হাতে হেদায়েত দান করেছেন।
যখনই আজ নাইজার, মালি, নাইজেরিয়া বা ঘানায় কোনো মুসলমান ইবাদত করেন, কিংবা যখনই তারা কোনো নেক আমল করেন, নিশ্চিতভাবেই শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী রহ. ও তাঁর সঙ্গী কাফেলার নেক আমলের দফতরে সেসব আমলের সওয়াব জমা হতে থাকে। হাফিজ ইবনে কাসীর রহ. ‘আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী ছিলেন মুজাহিদ শাসক। ফারগানা অঞ্চলের এই মহান ব্যক্তির সঙ্গে এত বেশি নেক-মুত্তাকী লোকের সম্মিলন ঘটেছিল, যা অন্য কোন শাসকের ক্ষেত্রে হয়নি। তিনি যখন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে রওয়ানা হতেন, পাঁচ লক্ষ সৈনিক তার সঙ্গে শরীক হত। প্রত্যেকেই তার আনুগত্যে অটল থাকত। তিনি সেখানে ইসলাম কায়েম করতেন, দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। তিনি আপন আকীদা ও দ্বীনের শুদ্ধতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতেন এবং আব্বাসী খেলাফতের প্রতি আনুগত্য পোষণ করতেন। রব্বাযানবী নামক স্থানে তীরবিদ্ধ হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
এভাবে আল্লাহর রাস্তায় এক অনন্য সংগ্রামী জীবন সমাপ্ত করে ৪৮৩ হিজরীতে (১০৯০ খ্রিস্টাব্দে) এক যুদ্ধাভিযানে শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী শহীদ হন। পরিশেষে ঘটে ইসলামী ইতিহাসের দাওয়াত ও সামরিক অঙ্গনের উজ্জ্বলতম এই মহিমান্বিত সফরের সমাপ্তি।
টিকাঃ
৫১. ‘ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/১৮৫।’
📄 আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র
আমরা মুরাবিতী ইতিহাসের আলোচনা শুরু করেছিলাম ৪৪০ হিজরী (১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল একজন মাত্র ব্যক্তি শায়খ আবদুল্লাহ্ বিন ইয়াসিনের হাত ধরে। আর এখন মাত্র আটাশ বছর পর ৪৬৮ হিজরীতে (১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে) মুরাবিতী নেতা ইউসুফ বিন তাশফীন এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী। নিজের জন্য তিনি নির্বাচন করেছেন ‘আমীরুল মুসলিমীন’ ও ‘নাসিরুদ্দিন’ পরিচয়। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি কেন ধারণ করেন না? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,
'আল্লাহ্ মাফ করুন, আমি এ উপাধি কিছুতেই ধারণ করব না। এ উপাধি তো ধারণ করবেন আব্বাসী খলীফাগণ। তারা অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশ-পরিচয়ের অধিকারী। তারা মক্কা ও মাদীনা উভয় হারামাইনের খলীফা। আমি তো তাদের একজন কর্মচারী, তাদের প্রচারক মাত্র।'
অথচ পাঠক জেনে অবাক হবেন, তখন আব্বাসী খেলাফত শক্তি ও আয়তন উভয় দিক থেকেই ছিল মুরাবিতী সাম্রাজ্যের তুলনায় দুর্বল ও ক্ষুদ্র। আব্বাসীদের শাসন তখন কেবল বাগদাদে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন ছিলেন বিনয়ী ও মহান শাসক। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন, মুসলমানরা যেন এক পতাকাতলে সমবেত হয়। তিনি নিজের শক্তি থাকা সত্ত্বেও আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ চালাননি। বরং নিজ এলাকায় আব্বাসী খেলাফতের একজন গভর্নর হয়ে থাকাই ছিল তার তামান্না। আর তাই তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন এই ঐক্যের বাণী, ‘আমি তো এখানে তাদের এক কর্মচারী মাত্র।’ বস্তুত এটাই ছিল সঠিক প্রজ্ঞা, এটাই ইসলামের সার্বজনীন চিন্তা।
টিকাঃ
৪২. লেখক অজ্ঞাত, আলফাসুল মুরাবিতীন, পৃ : ২১। ‘ইবনে আবি যারা’ ও লিসানুদীন ইবনুল খতীবসহ অন্য অনেকেই ইউসুফ বিন তাশফীনকে বহু পরে ৪৯৬ হিজরীতে বাগদাদের খলিফার পক্ষ থেকে ‘আমীরুল মুসলিমীন’ উপাধি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।