📄 ইউসুফ বিন তাশফীন রহ. ও ইস্পাতকঠিন দায়িত্বভার
আল্লামা যাহাবী রহ. ইউসুফ বিন তাশফীন-এর বিবরণ উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, ইউসুফ বিন তাশফীন ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমাশীল, মুসলিমদের প্রতি অত্যন্ত দয়ার্দ্র। তিনি ছিলেন বাদামী বর্ণবিশিষ্ট, স্লিম গড়নের, পাতলা শ্মশ্রুমন্ডিত, চিকন কণ্ঠের অধিকারী, সুদক্ষ অশ্বারোহী, দক্ষ নেতা, বিচক্ষণ ও বলিষ্ঠ সেনাপতি। তিনি জুমার খুতবায় (খলীফা হিসেবে) ইরাকের আব্বাসী খলীফার নাম উল্লেখ করতেন।
বিখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনুল আসীর রহ. তাঁর পরিচয় এভাবে তুলে ধরেছেন, তিনি ছিলেন সহনশীল, ক্ষমাশীল, উদার, দানশীল, ধার্মিক, মহৎপ্রাণ। তিনি আহলে ইলম ও আহলে দ্বীন তথা আলিম-উলামা ও দ্বীনদার ব্যক্তিদের ভালোবাসতেন এবং তাদেরকে তার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন করতেন। আলিম-উলামাদের তিনি অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং তাদের পরামর্শ অনুযায়ী চলতেন। কেউ তাকে নসীহত করলে তিনি তা শ্রবণ করার সময় ভীত-প্রকম্পিত হয়ে পড়তেন এবং তার হৃদয় বিগলিত হয়ে যেত, নসীহতের প্রভাব তার মাঝে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হত। তিনি বড় বড় ত্রুটি ও অপরাধকে মার্জনা ও উপেক্ষা করা পছন্দ করতেন।
শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী তার চাচাতো ভাই ইউসুফ বিন তাশফীনের হাতে যে মুরাবিতী সাম্রাজ্য ছেড়ে গিয়েছিলেন, তার পরিস্থিতি অবশ্য তখনও সম্পূর্ণ স্থিতিশীল হয়নি। তাই আবু বকর তার স্থলাভিষিক্ত শাসক ইউসুফকে মুরাবিতীদের বিরুদ্ধাচারণকারী সবচেয়ে শক্তিশালী তিন প্রতিপক্ষ—ইয়ানুরান, ঘিলাসা ও মুতগাওয়াও গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পরামর্শ দিলেন। ইউসুফ বিন তাশফীন তার অধীনস্থ অঞ্চল উত্তর মৌরিতানিয়া ও দক্ষিণ মাগরেবের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। তিনি এ অঞ্চলে বসবাসকারী বারবার গোত্রীয় মানুষের জীবনধারা প্রত্যক্ষ করলেন। নির্দিষ্ট করে বললে ৪৫০ হিজরীতে (১০৫৮ খৃষ্টাব্দে) তিনি এ অঞ্চলের গোত্রগুলোর মাঝে বিস্ময়কর কিছু বিষয় দেখতে পেলেন। এসব গোত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হল:
১. ওমরা গোত্র: ওমরা একটি বারবার গোত্র। এ গোত্রে তৎকালীন সময় হতে এক শতাব্দীরও অধিক সময় পূর্বে হামীম বিন মালিহুল্লাহ নামক জনৈক ব্যক্তি নবুওয়াতের দাবি করেছিল। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, সে শুধু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নবুওয়াত অস্বীকার করেনি; বরং সে নিজেকে দ্বীনে ইসলামের অনুসারী দাবি করত। নবুওয়াত দাবি করার পর সে তার অনুসারীদের জন্য নতুন ধর্ম-নীতি প্রণয়ন করেছিল। তার অনুসারীরা ইসলাম মনে করে সেই নতুন ধর্মেরই অনুসরণ করত। হামীম বিন মালিহুল্লাহ তার অনুসারীদের জন্য দিনে-রাতে মাত্র দু’ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছিল; এক ওয়াক্ত সূর্যোদয়ের সময়, অন্য ওয়াক্ত সূর্যাস্তের সময়। সে তার অনুসারীদের জন্য প্রতি বছর একটি করে রোযা নির্ধারিত করেছিল। তার প্রণীত বিধানগুলোর মধ্যে আরও ছিল ওযুর বিধান বাতিল, বীর্যপাতের পর পবিত্রতা অর্জনের অপরিহার্যতা বাতিল, হজের ফরযিয়াত বাতিল, গাধার মাংস খাওয়া হালাল, শূকর খাওয়া বৈধ, যবেহ করা ব্যতিরেকে মাছ খাওয়া হারাম ইত্যাদি। নিজেকে মুসলমান দাবি করে এ ধরনের মনগড়া বিধান প্রদান করা নিঃসন্দেহে সুস্পষ্ট বিভ্রান্তি ও চরম মূর্খতা। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, মানুষ তার এই বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা মেনে নিত আর বিশ্বাস করত এরই নাম ‘ইসলাম’।
২. বুরগুয়াতা গোত্র: এটি এ অঞ্চলের আরেকটি বারবার গোত্র। এদের নেতা ছিল সালেহ বিন তারীফ বিন শায়েম নামক জনৈক ব্যক্তি। নাম সালেহ হলেও এই ব্যক্তিটির কার্যকলাপ কিন্তু মোটেই সালেহ বা নেককারোচিত ছিল না। সেও নিজেকে নবী দাবি করেছিল। তার অনুসারীদের জন্য সে যেসব বিধি-বিধান প্রণয়ন করেছিল সেগুলো হল—সকালে পাঁচ ওয়াক্ত ও সন্ধ্যায় পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয, ওযুর মধ্যে প্রচলিত অঙ্গগুলোর পাশাপাশি নাভি ও উভয় কাঁধ ধৌত করা ফরয, আপন চাচাতো বোনকে বিয়ে করা হারাম, চারের অধিক বিয়ে করা বৈধ ইত্যাদি। আর এ সবকিছুর পরও সে নিজেকে একজন মুসলমান ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসারী বলে দাবি করত। মুরাবিতীদের অভ্যুদয়ের সময় বুরগুয়াতা সম্প্রদায়ের সর্দার ছিল সালেহ বিন তারীফের জনৈক পৌত্র আবু হাফস। শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের আমলে মুরাবিতীগণ এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল এবং এদের বিরুদ্ধে লড়াই চলাকালেই শায়খ শহীদ হন। মৃত্যুর পূর্বে শায়খ মুরাবিতীদের অসিয়ত করে যান যে, তারা যেন এই কওমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রেখে জয় লাভ করে এবং এক্ষেত্রে দুর্বলতা ও কাপুরুষতার শিকার না হয়। শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী দায়িত্ব গ্রহণ করেই তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধারা পুনরায় চালু করেন এবং তাদেরকে চূড়ান্ত পরাজয়ের মুখোমুখি হতে বাধ্য করেন।
৩. বিনাতা গোত্র: বিনাতা গোত্র ছিল এ অঞ্চলের আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী গোত্রগুলোর একটি। কিন্তু তাদের মাঝে জুলুম-অত্যাচারের ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছিল। তারা তাদের আশেপাশের এলাকায় ছিনতাই-লুটপাট ও রাহাজানি চালাত। সবলরা দুর্বলদের ওপর নিপীড়ন করত। ঐতিহাসিক আননাসিরী তাদের অবস্থা এভাবে ব্যক্ত করেছেন, মাগরেবের বিনাতা গোত্রের সর্দাররা তাদের অধীনস্থদের ওপর ইচ্ছেমতো স্বেচ্ছাচারিতা চালাত; কিন্তু নিয়ন্ত্রণকারী কেউ ছিল না। তারা আপন প্রবৃত্তি ও স্বার্থের চাহিদা অনুযায়ী প্রজাদের পরিচালিত করত। বিনাতা কওমের সঙ্গে মুরাবিতীদের যুদ্ধ শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের জীবনদশায়ই শুরু হয়েছিল। পরবর্তী ইয়াহইয়া বিন ওমর ও আবু বকর বিন ওমরের আমলেও এই যুদ্ধ অব্যাহত ছিল এবং মুরাবিতীগণ বিনাতা গোত্র অধ্যুষিত অনেক এলাকায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আবু বকর বিন ওমর লামতূনী বিনাতা গোত্র ও এর শাখা-গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ধারা আরও জোরদার করেন। তিনি ইউসুফ বিন তাশফীনকে বিনাতা সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত রেখে একে সুস্থিত ও শান্ত রাখার পরামর্শ দেন।
টিকাঃ
১০. দেখুন : ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরতাস, পৃ. ১২৩ ও আললুদাগী, আলইনক্বিজা, ২/৭।
১১. যাহাবী, সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ১৬/১৫৯।
১২. ইবনুল আসীর, আলকামিল ফিত তারিখ, ৯/১০।
৩০. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ১০৪, ইবনুল খতীব, আ’মালুল আ’লাম, ৬/২৩২ ও আলদালাহী, আলইস্তিকসা, ২/২।
৩১. হামীম নামক এ ব্যক্তির নবুওয়াতের দাবি ঘটেছিল ৩৭১ হিজরীতে।
৩২. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ৯৯।
৩৩. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ৮৮-৯৬, ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২৩৫ ও আলদালাহী, আলইস্তিকসা, ২/১৪৬, ১৪৮।
৩৪. এই সালেহ বিন তারীফের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল হিশাম বিন আব্দুল মালিকের আমলে।
৩৫. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ১০২, ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/২৩৭ ও আলদালাহী, আলইস্তিকসা, ২/৯৬।
৩৬. আননাসিরী, আলইস্তিকসা, ২/১২।
৩৭. আলদালাহী, দিবাছতুন ফী তালীফীল মাগরাব ওয়া আত্তাকজ, পৃ. ২৯৯।
📄 ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ইউসুফ বিন তাশফীনকে অত্যন্ত ব্যথিত করল। তিনি তাঁর বাহিনী নিয়ে উত্তরে রওয়ানা হলেন। মুরাবিতী বাহিনীর সদস্য-সংখ্যা ইতোমধ্যে চল্লিশ হাজারে পৌঁছেছে। এ অঞ্চলের প্রতিটি গোত্র—যারা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী ছিল এবং যারা পথভ্রষ্ট ছিল—সবার বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করলেন। অবশ্য কালের পরিক্রমায় এসব গোত্রের মানুষেরা ইসলামের সঠিক শিক্ষা গ্রহণ করতে শুরু করল এবং মুসলিম সেনাদলে অন্তর্ভুক্ত হল।
দক্ষিণ সেনেগাল ও আফ্রিকার অরণ্যে প্রায় দীর্ঘ পনের বছর দাওয়াতী কার্যক্রম পরিচালনা করার পর শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী যখন ৪৬৪ হিজরীতে (১০৭১ খৃষ্টাব্দে) মুরাবিতী রাষ্ট্রে প্রত্যাবর্তন করলেন, তিনি দেখতে পেলেন, যে ইউসুফ বিন তাশফীনকে তিনি ৪৫০ হিজরীতে (১০৫৮ খৃষ্টাব্দে) কেবল উত্তর সেনেগাল ও দক্ষিণ মৌরিতানিয়ায় দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন, আজ মাত্র পনের বছরের পরিক্রমায় সেই ইউসুফ বিন তাশফীন পুরো সেনেগাল, পুরো মৌরিতানিয়া, মরক্কো, আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার বড় এক অংশের অধিকারী হয়েছেন।
আবু বকর বিন ওমর লামতূনী আরও দেখতে পেলেন, মুরাবিতীদের এই রাষ্ট্রটি এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার ভিত্তি তাকওয়ার ওপর। তিনি মুরাবিতী রাষ্ট্র ছেড়ে যাওয়ার পূর্বে যে নগরটির অস্তিত্বই পৃথিবীর বুকে ছিল না, সেই নগরীটি হল ইউসুফ বিন তাশফীন কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত মারাকেশ (Marrakesh) নগরী। এ নগরীর প্রথম স্থাপনা ছিল সেই ঐতিহাসিক মসজিদটি, যা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্মিত মসজিদে নববীর আদলে পুরোপুরি মাটি ও কাঁচা ইট দ্বারা তৈরি করা হয়েছে। মহৎ আদর্শের অনুকরণে আমীর ইউসুফ বিন তাশফীন এক লক্ষ অশ্বারোহী সৈন্যের আমীর হয়েও নিজে সকলের সঙ্গে মাটি বহনের কাজ করে মসজিদ নির্মাণে অংশগ্রহণ করেছেন।
আবু বকর বিন ওমর লামতূনী তাঁর সামনে এমন এক মহান নেতাকে দেখতে পেলেন, যিনি এত অল্প সময়ে এমন একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, যার অস্তিত্বও পূর্বে বিশ্ববাসীর কাছে ছিল না। তিনি আরও উপলব্ধি করলেন, এই মহান নেতা দুনিয়াবিমুখ, সংযমী ও মিতভাষী, খোদাভীরু, দ্বীনের আলিম ও আল্লাহর অনুগত। এ সবকিছু প্রত্যক্ষ করে আবু বকর বিন ওমর লামতূনী এমন একটি কাজ করলেন, যাঁর দৃষ্টান্ত কেবল মুসলমানদের ইতিহাসেই পাওয়া সম্ভব।
তিনি ইউসুফ বিন তাশফীনকে বললেন, 'ভাই! আমার তুলনায় তুমিই শাসনকার্য পরিচালনার অধিকতর উপযুক্ত। তুমিই প্রকৃত শাসক। যদিও আমি তোমাকে আমার ফিরে আসা পর্যন্ত সময়ের জন্য স্থলাভিষিক্ত করে গিয়েছিলাম; কিন্তু এখন তুমিই এই রাষ্ট্রের আমীর ও শাসক হওয়ার যোগ্য। তুমি এ অঞ্চলের মানুষকে এক পতাকাতলে সমবেত করতে এবং রাষ্ট্রের শাসক হয়ে এর চেয়েও বৃহৎ অঞ্চলে ইসলামের বিস্তার ঘটাতে সক্ষম। আর আমি? আমি তো মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে ইসলামে দীক্ষিত করার স্বাদ পেয়ে গেছি। তাই আমি আবারও ফিরে যেতে চাই আফ্রিকার গহীন অরণ্যে, মানুষকে এক আল্লাহর পথে আহ্বান করতে।'
টিকাঃ
৩৮. ইবনে আবি যারা’, রাওযুল কিরাতাস, পৃ. ১৩৯।
৩৯. ইবনুল খতীব, আ’মালুল আ’লাম, ৬/২৩৪ ও আলদালাহী, আলইস্তিকসা, ২/২০।
৫০. ‘ইবনে আবি যারা’, রাওদুল কিরাতাস, পৃ : ১৬৬–১৬৯ ও আলফাসবী, জাইরিউষ্ফুনা, ২/২২-২৭।
📄 আবু বকর বিন ওমর লামতূনী : এক মহান দাঈ ও সুমহান সেনাপতি
ইসলামের দাওয়াতী মেহনতের উদ্দেশ্যে আবু বকর বিন ওমর লামতূনী আবারও চলে গেলেন আফ্রিকার গহীন অরণ্যে। এবার তিনি ইসলামের পতাকাতলে শামিল করলেন বর্তমানের গিনি, দক্ষিণ সেনেগাল, সিয়েরালিওন, আইভোরিকোট, মালি, বুরকিনা ফাসো, নাইজার, ঘানা, বেনিন, টোগো, নাইজেরিয়া, ক্যামেরুন, গ্যাবন ইত্যাদি আফ্রিকান রাষ্ট্রকে। নাইজেরিয়ায় এটি ছিল ইসলামের দ্বিতীয় পদার্পণ; কয়েক শতাব্দী পূর্বেও নাইজেরিয়ায় একবার ইসলামের দাওয়াত পৌঁছেছিল।
এভাবে এই মহান বীর যোদ্ধা আবু বকর বিন ওমর লামতূণীর হাত ধরে আফ্রিকার গহীন অরণ্যের অনেক রাষ্ট্র ইসলামের পতাকাতলে শামিল হয়েছিল। হাফেজ ইবনে কাসীর রহ.-এর ভাষ্যমতে, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী যখন আল্লাহর পথে লড়াইয়ের আহ্বান জানালেন, তখন পাঁচ লক্ষ জানবাজ সৈনিক লাব্বাইক বলে সাড়া দিত। এ তো কেবল যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের কথা, এর বাইরে রয়ে গেছে কত নারী, শিশু ও অসংখ্য অগণিত সাধারণ মানুষ, যাদেরকে আল্লাহ তাআলা এই মহান দাঈর হাতে হেদায়েত দান করেছেন।
যখনই আজ নাইজার, মালি, নাইজেরিয়া বা ঘানায় কোনো মুসলমান ইবাদত করেন, কিংবা যখনই তারা কোনো নেক আমল করেন, নিশ্চিতভাবেই শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী রহ. ও তাঁর সঙ্গী কাফেলার নেক আমলের দফতরে সেসব আমলের সওয়াব জমা হতে থাকে। হাফিজ ইবনে কাসীর রহ. ‘আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, আবু বকর বিন ওমর লামতূনী ছিলেন মুজাহিদ শাসক। ফারগানা অঞ্চলের এই মহান ব্যক্তির সঙ্গে এত বেশি নেক-মুত্তাকী লোকের সম্মিলন ঘটেছিল, যা অন্য কোন শাসকের ক্ষেত্রে হয়নি। তিনি যখন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযানে রওয়ানা হতেন, পাঁচ লক্ষ সৈনিক তার সঙ্গে শরীক হত। প্রত্যেকেই তার আনুগত্যে অটল থাকত। তিনি সেখানে ইসলাম কায়েম করতেন, দ্বীনের রক্ষণাবেক্ষণ করতেন। তিনি আপন আকীদা ও দ্বীনের শুদ্ধতা বজায় রাখার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে সদাচরণ করতেন এবং আব্বাসী খেলাফতের প্রতি আনুগত্য পোষণ করতেন। রব্বাযানবী নামক স্থানে তীরবিদ্ধ হয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
এভাবে আল্লাহর রাস্তায় এক অনন্য সংগ্রামী জীবন সমাপ্ত করে ৪৮৩ হিজরীতে (১০৯০ খ্রিস্টাব্দে) এক যুদ্ধাভিযানে শায়খ আবু বকর বিন ওমর লামতূনী শহীদ হন। পরিশেষে ঘটে ইসলামী ইতিহাসের দাওয়াত ও সামরিক অঙ্গনের উজ্জ্বলতম এই মহিমান্বিত সফরের সমাপ্তি।
টিকাঃ
৫১. ‘ইবনে কাসীর, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১২/১৮৫।’
📄 আমীরুল মুসলিমীন ইউসুফ বিন তাশফীন ও মুরাবিতী রাষ্ট্র
আমরা মুরাবিতী ইতিহাসের আলোচনা শুরু করেছিলাম ৪৪০ হিজরী (১০৪৮ খ্রিস্টাব্দ) থেকে। যে ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল একজন মাত্র ব্যক্তি শায়খ আবদুল্লাহ্ বিন ইয়াসিনের হাত ধরে। আর এখন মাত্র আটাশ বছর পর ৪৬৮ হিজরীতে (১০৭৫ খ্রিস্টাব্দে) মুরাবিতী নেতা ইউসুফ বিন তাশফীন এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী। নিজের জন্য তিনি নির্বাচন করেছেন ‘আমীরুল মুসলিমীন’ ও ‘নাসিরুদ্দিন’ পরিচয়। যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনি ‘আমীরুল মুমিনীন’ উপাধি কেন ধারণ করেন না? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন,
'আল্লাহ্ মাফ করুন, আমি এ উপাধি কিছুতেই ধারণ করব না। এ উপাধি তো ধারণ করবেন আব্বাসী খলীফাগণ। তারা অভিজাত ও সম্ভ্রান্ত বংশ-পরিচয়ের অধিকারী। তারা মক্কা ও মাদীনা উভয় হারামাইনের খলীফা। আমি তো তাদের একজন কর্মচারী, তাদের প্রচারক মাত্র।'
অথচ পাঠক জেনে অবাক হবেন, তখন আব্বাসী খেলাফত শক্তি ও আয়তন উভয় দিক থেকেই ছিল মুরাবিতী সাম্রাজ্যের তুলনায় দুর্বল ও ক্ষুদ্র। আব্বাসীদের শাসন তখন কেবল বাগদাদে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ইউসুফ বিন তাশফীন ছিলেন বিনয়ী ও মহান শাসক। তিনি মনেপ্রাণে চাইতেন, মুসলমানরা যেন এক পতাকাতলে সমবেত হয়। তিনি নিজের শক্তি থাকা সত্ত্বেও আব্বাসী খেলাফতের বিরুদ্ধে কোনো বিদ্রোহ চালাননি। বরং নিজ এলাকায় আব্বাসী খেলাফতের একজন গভর্নর হয়ে থাকাই ছিল তার তামান্না। আর তাই তিনি উচ্চারণ করতে পেরেছিলেন এই ঐক্যের বাণী, ‘আমি তো এখানে তাদের এক কর্মচারী মাত্র।’ বস্তুত এটাই ছিল সঠিক প্রজ্ঞা, এটাই ইসলামের সার্বজনীন চিন্তা।
টিকাঃ
৪২. লেখক অজ্ঞাত, আলফাসুল মুরাবিতীন, পৃ : ২১। ‘ইবনে আবি যারা’ ও লিসানুদীন ইবনুল খতীবসহ অন্য অনেকেই ইউসুফ বিন তাশফীনকে বহু পরে ৪৯৬ হিজরীতে বাগদাদের খলিফার পক্ষ থেকে ‘আমীরুল মুসলিমীন’ উপাধি দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।