📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুরাবিতী অধ্যায়ের অনন্য নাম ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী

📄 মুরাবিতী অধ্যায়ের অনন্য নাম ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী


কিছুদিন পর মুরাবিতীবাদের আমীর ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী এক যুদ্ধে শহীদ হলেন। আমীর ইয়াহইয়া-ই সেই মহান ব্যক্তি, যাঁর মাধ্যমে ইতিহাসে মুরাবিতী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি ছিলেন সেই সাতজন ব্যক্তির একজন, যারা শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন গুদালা কওম কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ার পর শায়খের সঙ্গে দ্বীনদার ও সংগ্রামী জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীমের মৃত্যুর পর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন রহ. জাওয়াহার আলগুদালীকে নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। কিন্তু নেতৃস্থানীয় জাওয়াহার গুদালী এ প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন।
এরপর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন অত্যন্ত প্রভাবপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। আর তা হলো নেতৃত্বের দায়িত্ব ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনীকে প্রদান। পাঠকের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, সর্বপ্রথম যে সাতজন ব্যক্তি শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের তাঁবুতে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র দু' জন ছিলেন সানহাজা গোত্রের দ্বিতীয় বৃহৎ শাখা লামতূনা গোত্রের। তাদের একজন হলেন এই ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী, অপরজন তারই সহোদর আবূ বকর বিন ওমর লামতূনী।
বাস্তবে আমরা এ সম্ভাবনাটাও এড়িয়ে দিতে পারি না যে, শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের সঙ্গে ইয়াহইয়া-পরবর্তী গুদালা গোত্রপ্রধান জাওয়াহার গুদালীর পূর্বেই গোপনে সমঝোতা হয়েছিল এবং দ্বীন ও উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে জাওয়াহার গুদালী ইয়াহইয়া লামতূনীর জন্য নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। কেননা, এমন একটি দল, যাদের অধিকাংশই গুদালা গোত্রের, তাদের নেতৃত্ব লামতূনা গোত্রের ইয়াহইয়া বিন ওমরকে প্রদানের মধ্যে এমন সুদূরপ্রসারী মর্ম লুকিয়ে আছে, যা যুগ যুগ ধরে তাদের মধ্যে চলে আসা সাম্প্রদায়িক পতনকে রুখতে সক্ষম। তাছাড়াও এতে দাওয়াতী কাজের অগ্রগতির স্বার্থও নিহিত ছিল। কেননা, ইয়াহইয়া ও তার ভাই আবূ বকর উভয়ে ছিলেন লামতূনা গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি; কিন্তু শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের দাওয়াতের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে তারা নেতৃত্ব ত্যাগ করে শায়খের সামনে দু'জানু হয়ে বসাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তাদের একজনকে নেতৃত্ব প্রদান করা হলে স্বাভাবিকভাবেই লামতূনা গোত্রের লোকেরা মুরাবিতীদের এই সংস্কার-আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেবে বলে আশা করা যায়। অপরদিকে প্রথমেই লামতূনা গোত্রের ইয়াহইয়া বিন ওমরকে নেতৃত্ব প্রদান না করে জাওয়াহার গুদালীকে প্রস্তাব দেওয়া এবং জাওয়াহার কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যানের পেছনেও দ্বীনী ও দাওয়াতী স্বার্থ নিহিত ছিল। এর ফলে গুদালা গোত্রের লোকদের মনেও এই অদ্ভুত ধারণা সৃষ্টি হবে না যে, তাদের বাদ দিয়ে লামতূনা গোত্রের একজনকে তাদের নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু মুরাবিতুনদের মধ্যে বিগত বহু বছর ধরে বংশ ও গোত্রকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতা চলে আসছিল, তাই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে স্মরণীয় ছিল। ইতিহাস সাক্ষী, শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে কতটা ইতিবাচক প্রভাব রেখেছিল।
৪৪৫ হিজরীতে (১০৫৩ খৃষ্টাব্দে) ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী মুরাবিতীবাদের নেতা নির্বাচিত হলেন। এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও ছোট ছোট গোত্র বিজিত হতে থাকল এবং মুরাবিতীবাদের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার পাশাপাশি হাজারো মুসলমান তাদের শাসনভুক্ত হল। লামতূনা গোত্র মুরাবিতী কাফেলার শামিল হওয়ার কিছুদিন পরেই ৪৪৯ হিজরীতে তাদের নেতা ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী রহ. এক যুদ্ধে শহীদ হলেন। ফলে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার সহোদর শায়খ আবূ বকর বিন ওমর লামতূনী রহ.।
শায়খ আবূ বকর বিন ওমর লামতূনীও প্রবল উদ্দীপনা ও বীরত্বের সঙ্গে শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের যুদ্ধাভিযানের নেতৃত্বে শরীক হলেন এবং দিনে দিনে মুরাবিতীদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকল। মুরাবিতীগণ প্রথমে নিজেদের অবস্থানস্থল সেনেগালের উত্তরাঞ্চলের টারাপাবের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছতে শুরু করল এবং নিজেদের সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগী হল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুরাবিতী রাষ্ট্রের সীমা উত্তর সেনেগাল থেকে দক্ষিণ মৌরিতানিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হল। এরপর গুদালা গোত্রও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। যেহেতু উত্তর সেনেগাল থেকে দক্ষিণ মৌরিতানিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুবিশাল অঞ্চলে এ দুটি গোত্রই বিদ্যমান ছিল, তাই উভয় গোত্রের একজোট হওয়ার অর্থ দাঁড়াল, পুরো অঞ্চলই এখন মুরাবিতী জামাতের প্রতিনিধিত্ব করছে।
ইতিহাসের এ পর্যায়ে এসে সমাপ্তি ঘটল মুরাবিতী জামাতের মূল প্রতিষ্ঠাতা ও ইসলামী ইতিহাসের এক অমর নাম শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের সংগ্রামী জীবনের। ৪৬৫ হিজরীতে (১০৭৩ খৃষ্টাব্দে) ঘাও কোনো এক ধর্মের অনুসারী গোত্র বুরুওয়াতাহর সঙ্গে চলমান যুদ্ধে তিনি শহীদ হলেন। পরিসমাপ্তি ঘটল উম্মাহকে ঈমানী ও সংগ্রামী চেতনায় গড়ে তোলার এক মহান কারিগরের দীর্ঘ এগার বছরের সংগ্রাম-ইতিহাসের।

টিকাঃ
১০. ইবনাল, ইয়াযাইনুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৬/৩০২-৩০৩。
১২. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৮/৬১৮。
১৩. আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, লামতূনা ও গুদালা গোত্র ছিল মাগরেবের এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ গোত্র।

ফন্ট সাইজ
15px
17px