📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ‘মুরাবিতীন’ শব্দের অর্থ

📄 ‘মুরাবিতীন’ শব্দের অর্থ


আরবী ‘রিবাত' শব্দের মূল গঠনতান্ত্রিক অর্থ হল প্রত্যেক এমন বস্তু, যা দ্বারা কোনো কিছুকে বাঁধা হয়। পরবর্তীতে শব্দটি সীমান্ত-প্রহরীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে; যারা সর্বদা বাইরের আক্রমণ থেকে সীমান্তসমূহকে রক্ষায় ব্যস্ত থাকে। এ বিবেচনায় রিবাত-এর আরেকটি অর্থ হল সার্বক্ষণিক যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা। ইমাম বুখারী রহ. আপন সনদে সাহল বিন সা’দ রাদি. –এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ্র পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও তার উপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।'
যেহেতু মুরাবিতীগণ (সীমান্তরক্ষীগণ) সীমান্ত এলাকাতে ছাউনি স্থাপন করে মুসলিম সীমান্তকে রক্ষা করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করেন, তাই শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন ও তার সঙ্গীগণ, যারা সেনেগাল নদীর পাড়ে ছাউনি স্থাপন করে অবস্থান করছিলেন, সকলে মুরাবিতী জামাত নামে খ্যাতি লাভ করেন এবং ইতিহাসে এ নামেই প্রসিদ্ধি অর্জন করেন।
অবশ্য কোনো কোনো গ্রন্থে তাদেরকে ‘মুলাছছামীন’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে আমীরুল মুলাছছামীন, ‘দাওলাতুল মুলাছছামীন’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ নামকরণের কারণ উল্লেখ করে ঐতিহাসিক ইবনে খালিকান রহ. লিখেছেন, এ সম্প্রদায়ের লোকেরা সবসময় নিজেদের চেহারা সেকাবা বা মুখোশে আবৃত করে রাখত এবং কখনোই উন্মুক্ত করত না। এ কারণেই মানুষ তাদেরকে ‘মুলাছছামীন’ বলে ডাকত। এ রীতি তারা বংশপরম্পরায় পূর্বসূরিদের কাছ থেকে লাভ করেছিল। এভাবে চেহারা আবৃত রাখার কারণ সম্পর্কে কথিত আছে, হিমিয়ার গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিগণ অত্যধিক গরম ও প্রচণ্ড শীত থেকে আত্মরক্ষার জন্য মুখ ঢেকে রাখত। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে গোত্রের সাধারণ মানুষগণও এরূপ করতে শুরু করে। আরেক বর্ণনামতে, এর কারণ হচ্ছে, একবার তাদের পার্শ্ববর্তী এক শক্তিশালী গোত্র—তারা যখন পুরুষরা গ্রামের বাইরে থাকত, তখন তারা গ্রামে আক্রমণ করে ধন-সম্পদ লুট করত এবং নারীদেরকে অপহরণ করত। তখন গোত্রের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরামর্শ দেন, গোত্রের নারীদেরকে পুরুষদের পোশাক পরিধান করিয়ে গোপনে গ্রামের এক প্রান্তে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং পুরুষগণ নারীদের বেশে চেহারা ঢেকে বাড়িতে অবস্থান করবে। যখন শত্রুরা তাদেরকে নারী ভেবে আক্রমণ করতে আসবে, তখন তারা বেরিয়ে আসবে। গ্রামের নওজোয়ানরা প্রবীণদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে এবং প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে হত্যা করে। শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের এই কৌশলের সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এরপর থেকে তারা সর্বদা সেকাবা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখত।
ইবনুল আছীর তাদের এই রীতি অবলম্বনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, একবার গ্রাম থেকে একটি দল শত্রুপক্ষীয় এলাকায় প্রতিশোধ নিতে গিয়েছিল। সে সময়ে শত্রুরা তাদের এলাকায় আক্রমণ চালাতে আসে। এলাকায় গ্রাম প্রধান, নারী ও শিশুরা ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিল না। প্রবীণ ব্যক্তিগণ যখন নিশ্চিত হলেন যে, আগত কাফেলা তাদের শত্রু, তখন তারা নারীদেরকে পুরুষদের বেশ ধারণ করার, পরিচয় লুকানোর জন্য চেহারা আবৃত রাখার এবং অস্ত্রধারণ করার নির্দেশ দিলেন। নারীরা তা-ই করল। বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা সামনে থাকল আর নারীরা বাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল। শত্রুদল কাছে আসার পর তারা সামনে দীর্ঘ বাহিনী দেখল এবং তাদের পুরুষ মনে করল। তারা বলাবলি করতে লাগল, এসব পুরুষরা নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য রণে নেমেছে। সুতরাং তারা মরণপণ লড়াই করে হলেও তাদেরকে রক্ষা করবে। তাই আমরা তাদেরকে হামলা না করে বাইরে থাকা গবাদি পশু লুট করে চলে যাব। আর যদি তারা আমাদের পশ্চাদধাবন করে, তাহলে যেহেতু তারা পরিবার থেকে দূরে থাকবে, সহজেই আমরা তাদের পরাভূত করতে পারব। যখন শত্রুদল চারপাশ থেকে গবাদি পশু একত্র করতে লাগল, ঠিক তখনই গোত্রের পুরুষ সদস্যরা ফিরে এল। ফলে শত্রুদল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল এবং নিজেদেরকে শত্রুপক্ষের দু’ দলের মাঝে আবিষ্কার করল। পুরুষ দল তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করল, নারীরা হত্যা করল আরও বেশি। সেই সময় থেকে তারা সেকাবা পরিধান করে নিজেদের সার্বক্ষণিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে নিল, যেন যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ পার্থক্য করা না যায়। রাত-দিন সকলসময়ই তারা সেকাবা পরিধান করে থাকত।

টিকাঃ
৯৪. দেখুন : ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, (রিবাত) ৭/৩০২।
৯৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৬৪ ও জামে’ তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৪।
২০. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ৬/১২৯।
১১. উল্লেখ্য ইবনুল আছীর (ইবনুল জাযারি)। এ নামে তিনজন ব্যক্তি বিখ্যাত এবং তারা পরস্পর সহোদর ভাই।
৯৭. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৮/৩০৯।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুরাবিতী অধ্যায়ের অনন্য নাম ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী

📄 মুরাবিতী অধ্যায়ের অনন্য নাম ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী


কিছুদিন পর মুরাবিতীবাদের আমীর ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী এক যুদ্ধে শহীদ হলেন। আমীর ইয়াহইয়া-ই সেই মহান ব্যক্তি, যাঁর মাধ্যমে ইতিহাসে মুরাবিতী অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। তিনি ছিলেন সেই সাতজন ব্যক্তির একজন, যারা শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন গুদালা কওম কর্তৃক বিতাড়িত হওয়ার পর শায়খের সঙ্গে দ্বীনদার ও সংগ্রামী জীবনকে বেছে নিয়েছিলেন। ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীমের মৃত্যুর পর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন রহ. জাওয়াহার আলগুদালীকে নেতৃত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানালেন। কিন্তু নেতৃস্থানীয় জাওয়াহার গুদালী এ প্রস্তাব সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলেন।
এরপর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন অত্যন্ত প্রভাবপূর্ণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। আর তা হলো নেতৃত্বের দায়িত্ব ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনীকে প্রদান। পাঠকের নিশ্চয়ই স্মরণ আছে, সর্বপ্রথম যে সাতজন ব্যক্তি শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের তাঁবুতে অংশগ্রহণে সম্মত হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র দু' জন ছিলেন সানহাজা গোত্রের দ্বিতীয় বৃহৎ শাখা লামতূনা গোত্রের। তাদের একজন হলেন এই ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী, অপরজন তারই সহোদর আবূ বকর বিন ওমর লামতূনী।
বাস্তবে আমরা এ সম্ভাবনাটাও এড়িয়ে দিতে পারি না যে, শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের সঙ্গে ইয়াহইয়া-পরবর্তী গুদালা গোত্রপ্রধান জাওয়াহার গুদালীর পূর্বেই গোপনে সমঝোতা হয়েছিল এবং দ্বীন ও উম্মাহর বৃহত্তর স্বার্থে জাওয়াহার গুদালী ইয়াহইয়া লামতূনীর জন্য নেতৃত্ব ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। কেননা, এমন একটি দল, যাদের অধিকাংশই গুদালা গোত্রের, তাদের নেতৃত্ব লামতূনা গোত্রের ইয়াহইয়া বিন ওমরকে প্রদানের মধ্যে এমন সুদূরপ্রসারী মর্ম লুকিয়ে আছে, যা যুগ যুগ ধরে তাদের মধ্যে চলে আসা সাম্প্রদায়িক পতনকে রুখতে সক্ষম। তাছাড়াও এতে দাওয়াতী কাজের অগ্রগতির স্বার্থও নিহিত ছিল। কেননা, ইয়াহইয়া ও তার ভাই আবূ বকর উভয়ে ছিলেন লামতূনা গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি; কিন্তু শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের দাওয়াতের প্রকৃত স্বাদ আস্বাদন করতে তারা নেতৃত্ব ত্যাগ করে শায়খের সামনে দু'জানু হয়ে বসাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তাদের একজনকে নেতৃত্ব প্রদান করা হলে স্বাভাবিকভাবেই লামতূনা গোত্রের লোকেরা মুরাবিতীদের এই সংস্কার-আন্দোলনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেবে বলে আশা করা যায়। অপরদিকে প্রথমেই লামতূনা গোত্রের ইয়াহইয়া বিন ওমরকে নেতৃত্ব প্রদান না করে জাওয়াহার গুদালীকে প্রস্তাব দেওয়া এবং জাওয়াহার কর্তৃক তা প্রত্যাখ্যানের পেছনেও দ্বীনী ও দাওয়াতী স্বার্থ নিহিত ছিল। এর ফলে গুদালা গোত্রের লোকদের মনেও এই অদ্ভুত ধারণা সৃষ্টি হবে না যে, তাদের বাদ দিয়ে লামতূনা গোত্রের একজনকে তাদের নেতৃত্ব প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু মুরাবিতুনদের মধ্যে বিগত বহু বছর ধরে বংশ ও গোত্রকেন্দ্রিক সাম্প্রদায়িকতা চলে আসছিল, তাই এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তা বিশেষভাবে স্মরণীয় ছিল। ইতিহাস সাক্ষী, শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের এই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণে কতটা ইতিবাচক প্রভাব রেখেছিল।
৪৪৫ হিজরীতে (১০৫৩ খৃষ্টাব্দে) ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী মুরাবিতীবাদের নেতা নির্বাচিত হলেন। এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্তের প্রভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই একের পর এক ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ও ছোট ছোট গোত্র বিজিত হতে থাকল এবং মুরাবিতীবাদের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা হওয়ার পাশাপাশি হাজারো মুসলমান তাদের শাসনভুক্ত হল। লামতূনা গোত্র মুরাবিতী কাফেলার শামিল হওয়ার কিছুদিন পরেই ৪৪৯ হিজরীতে তাদের নেতা ইয়াহইয়া বিন ওমর লামতূনী রহ. এক যুদ্ধে শহীদ হলেন। ফলে তার স্থলাভিষিক্ত হলেন তার সহোদর শায়খ আবূ বকর বিন ওমর লামতূনী রহ.।
শায়খ আবূ বকর বিন ওমর লামতূনীও প্রবল উদ্দীপনা ও বীরত্বের সঙ্গে শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের যুদ্ধাভিযানের নেতৃত্বে শরীক হলেন এবং দিনে দিনে মুরাবিতীদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকল। মুরাবিতীগণ প্রথমে নিজেদের অবস্থানস্থল সেনেগালের উত্তরাঞ্চলের টারাপাবের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছতে শুরু করল এবং নিজেদের সাম্রাজ্যের সীমা বৃদ্ধি করতে উদ্যোগী হল। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মুরাবিতী রাষ্ট্রের সীমা উত্তর সেনেগাল থেকে দক্ষিণ মৌরিতানিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হল। এরপর গুদালা গোত্রও তাদের সঙ্গে যোগ দিল। যেহেতু উত্তর সেনেগাল থেকে দক্ষিণ মৌরিতানিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত এই সুবিশাল অঞ্চলে এ দুটি গোত্রই বিদ্যমান ছিল, তাই উভয় গোত্রের একজোট হওয়ার অর্থ দাঁড়াল, পুরো অঞ্চলই এখন মুরাবিতী জামাতের প্রতিনিধিত্ব করছে।
ইতিহাসের এ পর্যায়ে এসে সমাপ্তি ঘটল মুরাবিতী জামাতের মূল প্রতিষ্ঠাতা ও ইসলামী ইতিহাসের এক অমর নাম শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনের সংগ্রামী জীবনের। ৪৬৫ হিজরীতে (১০৭৩ খৃষ্টাব্দে) ঘাও কোনো এক ধর্মের অনুসারী গোত্র বুরুওয়াতাহর সঙ্গে চলমান যুদ্ধে তিনি শহীদ হলেন। পরিসমাপ্তি ঘটল উম্মাহকে ঈমানী ও সংগ্রামী চেতনায় গড়ে তোলার এক মহান কারিগরের দীর্ঘ এগার বছরের সংগ্রাম-ইতিহাসের।

টিকাঃ
১০. ইবনাল, ইয়াযাইনুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ৬/৩০২-৩০৩。
১২. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৮/৬১৮。
১৩. আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি, লামতূনা ও গুদালা গোত্র ছিল মাগরেবের এ অঞ্চলের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বৃহৎ গোত্র।

ফন্ট সাইজ
15px
17px