📄 আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন, নববী মিশন
শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন সাহারার পথে রওনা হলেন। আলজেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল ও মৌরিতানিয়ার উত্তর অঞ্চল পাড়ি দিয়ে তিনি পৌঁছলেন প্রত্যন্ত উষ্ণ ও অনুর্বর মৌরিতানিয়ার দক্ষিণ অঞ্চলে গুদালা গোত্র অধ্যুষিত এলাকায়। তিনি সেখানকার মুসলমানদের করুণ পরিণতি স্বচক্ষে অবলোকন করলেন। দেখলেন, কীভাবে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীল ও অন্যায় কাজে লিপ্ত হচ্ছে; দেখলেন, কেউ তাদের বাধা দিচ্ছে না, বাধা দেওয়ার কথা ভাবছেও না। তিনি দেখলেন এবং দরদভরা হৃদয়ে অস্থির হলেন। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করে তিনি তাদের মাঝে দ্বীনী শিক্ষার প্রচার শুরু করলেন, তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ করলেন, অসৎ কাজ হতে নিষেধ করলেন। সানহাজা গোষ্ঠী তখন কতটা অজ্ঞতাচ্ছন্ন ছিল, তার বিবরণ কান্নায় ইয়াহইয়া রহ. এভাবে দিয়েছেন, দ্বীনের জ্ঞান তাদের মাঝে একেবারেই অল্প ছিল। তাদের অধিকাংশ ছিল অজ্ঞ, মূর্খ। বেশিরভাগ মানুষ কালিমা ছাড়া কিছুই জানত না। সামান্য পরিচয় ব্যতীত ইসলামের বিধি-বিধান ও কর্ম-পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো জ্ঞান তাদের ছিল না।
কিন্তু আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন যখন দ্বীনী জ্ঞানের প্রচার শুরু করলেন, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজে বাধা দিতে লাগলেন, গুদালা গোত্রের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তার প্রতি বিক্ষুব্ধ হল। কারণ, চলমান মূর্খতাপূর্ণ পরিবেশ থেকে তারাই সবচে’ বেশি ফায়দা লুটছিল। তাদের প্ররোচনায় জনসাধারণ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনকে বাধা দেওয়া শুরু করল এবং তার দাওয়াতী কাজে বাধা সৃষ্টি করল। গোত্রপ্রধান ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী শত চেষ্টা করেও এদের হাত থেকে শায়খকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হলেন।
বিরুদ্ধবাদীদের শত বাধাও আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনকে হতোদ্যম করতে পারল না। তিনি আপন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখলেন। জনসাধারণ তাকে বেদম প্রহার করল, অপমান করল; এমনকি একপর্যায়ে বিতাড়ন ও হত্যার হুমকি দিল; কিন্তু শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন অটল-অবিচল। বাধা যত বৃদ্ধি পায়, তার চেয়ে বহু গুণে বৃদ্ধি পায় তার দৃঢ়তা ও কর্ম-তৎপরতা। এভাবেই দিন অতিবাহিত হতে লাগল। তিনি মানুষকে দাওয়াত দিতে যাচ্ছেন। একপর্যায়ে মানুষ তাকে বসতি থেকে তাড়িয়ে দিল। সানহাজা গোষ্ঠী যারা তাদের আচরণে ভারাক্রান্ত ছিল, বলল, তুমি নিজের চিন্তা কর, আমাদের চিন্তা তোমার করতে হবে না। তুমি আপন কওমের কাছে ফিরে যাও, আমাদের বাদ দিয়ে তাদের দ্বীন শেখাও। এই দেশ যেমন আছে, তেমনই থাকতে দাও। এখানকার মানুষজন নিয়ে তোমার মাথা ঘামানোর কোনো প্রয়োজন নেই। আর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন, বিশ্বাস করুন প্রিয় পাঠক! আমি যেন দিব্য চোখে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, মানুষ তাকে তাড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি দাঁড়িয়ে আছেন সানহাজা গোত্রের সীমানা ঘেঁষে; বুক চিরে প্রভাবিত হচ্ছে একজন দরদী মানুষের হৃদয়ে জমে থাকা ব্যথার বরফ; মুসলিম উম্মাহর প্রতি মমতাময় হৃদয়ে ধরে আসা কষ্টে তিনি উচ্চারণ করছেন, 'আহা! আমার সম্প্রদায় যদি জানতে পারতো!' কত ব্যথা হৃদয়ে ভরা! তিনি চাইছেন বদলে দিতে; কিন্তু পারছেন না। মানুষ তার কাছ থেকে পালিয়ে ছুটছে ভ্রান্তি ও বিভ্রান্তির পথে, সুপথ ও সঠিক নীতি হতে বিচ্যুতির দিকে; কিন্তু তিনি সংশোধনের সুযোগ পাচ্ছেন না। এ বিষয়টিও তাকে পীড়া দিচ্ছিল যে, এ দেশে কত মুসলিম শিশু জন্মগ্রহণ করবে; কিন্তু দ্বীন শিক্ষা দেওয়ার এবং সঠিক পথের সন্ধান দেওয়ার উপযুক্ত কাউকে তারা খুঁজে পাবে না। তিনি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু কোথায় থাকবেন? কীভাবে থাকবেন? নতুন করে গুদালা গোত্রের মাঝে ফিরে যাবেন? কিন্তু তারা যে তাকে হত্যা করে ফেলবে। তাকে হত্যা করেও যদি তারা কোনো কল্যাণের সন্ধান পেত, তিনি হাসিমুখে মৃত্যুকে স্বাগত জানাতেন। কিন্তু হায়! কোথায় তাদের কল্যাণ? কত দূর?
টিকাঃ
৩২. কান্নায় ইয়াহইয়া, তারিখুল মাঘারিব, ২/৬৪।
📄 আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন, মুরাবিতী সাম্রাজ্যের অণুরোদ্গম
আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন ভাবতে লাগলেন, তিনি কী করবেন। তারপর অফুরন্ত সাগরের ন্যায় তিনি ভাবতে লাগলেন। অবশেষে আবরাহা গুদালা তাকে পথ দেখালেন। তিনি আফ্রিকা মহাদেশের গভীরতম জঙ্গল সাহারার আরও গভীর দক্ষিণ দিকে চলে গেলেন এবং একটি দ্বীপে পৌঁছালেন। ঐতিহাসিকদের প্রবল ধারণামতে এটি ছিল টিম্বাকটু (Timbuktu) শহরের নিকট নাইজার নদীর বাঁকে অবস্থিত কোনো এলাকা। যার গর্ভ থেকে এই মুরাবিতী সাম্রাজ্যের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন এ দ্বীপটির পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছেন, নীল নদ এই দ্বীপটিকে বেষ্টন করে আছে। গ্রীষ্মকালে নদীর পানি এত কম থাকে যে, পায়ে হেঁটে পার হওয়া যায়; আর শীতকালে তা এমন খরস্রোতা রূপ ধারণ করে যে, পার হতে নৌকার প্রয়োজন হয়।
আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন সেখানে একটি সাদামাটা আবাসস্থল স্থাপন করলেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর বিগত দিনের দাওয়াতী প্রচেষ্টার ফলে গুদালা গোত্রের কিছু মানুষের অন্তরে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কঠোর শ্রম ও স্বভাব-প্রকৃতির প্রীতি সঞ্চারিত হয়েছিল। তাঁরা যখন শায়খের এই দূরবর্তী অবস্থানের সংবাদ পেলেন, তখন মৌরিতানিয়ার দক্ষিণ অঞ্চল থেকে তাঁরাও শায়খের কাছে ভিড় জমাতে লাগল। প্রথমে এদের সংখ্যা সাতের অধিক ছিল না। হিজরতকারী দলটির নেতৃত্বে ছিলেন ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী; তিনি তার জাতি ও ক্ষমতা ছেড়ে শায়খের দরবারে উপস্থিত হয়েছিলেন। কোন কোন ঐতিহাসিক উৎসগ্রন্থের বর্ণনামতে এই প্রথম কাফেলায় লামতুনা গোত্রের দু’জন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিও ছিলেন। তাঁরা হলেন ইয়াহইয়া বিন ওমর ও তার ভাই আবু বকর বিন ওমর।
নতুন এই পরিবেশ যদিও অত্যন্ত প্রতিকূল ছিল, তা বলাই বাহুল্য। সেখানেই ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন তাদেরকে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর যেভাবে ইসলাম অবতীর্ণ হয়েছে, ইসলামের সেই সঠিক ও স্বচ্ছ শিক্ষা প্রদান করতে লাগলেন; তাদের সামনে তুলে ধরলেন, কেন ও কীভাবে ইসলাম সর্বজনীন ও পূর্ণাঙ্গ এবং কীভাবে ইসলাম মানবজীবনের সকল বিষয়ে সুবিন্যস্ত ও সুশৃঙ্খল ধারা সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকল তালিবে ইলমের সংখ্যা এবং স্বাভাবিকভাবেই আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা। প্রথমে পঞ্চাশ, এরপর এক শ', দেড় শ', দুই শ'। একসময় জ্ঞানপিপাসুদের সংখ্যা এত বৃদ্ধি পেল যে, শায়খের পক্ষে সবার কাছে একসঙ্গে তার ইলম পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়াল। তখন তিনি তাদেরকে ছোট ছোট কয়েকটি 'হালাকা' ও পাঠচক্রে বিভক্ত করলেন এবং প্রতিটি হালাকার জন্য মেধাবী একজনকে জিম্মাদার নিযুক্ত করলেন। প্রকৃতপক্ষে বহুসংখ্যক ছাত্রকে একাধিক শিক্ষক দিয়ে কভার করে সহজ শিক্ষাপ্রদানের নীতিটি ছিল নববী আদর্শপ্রসূত। মক্কার সাহাবীদেরকে ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার সময় নবীজী এই পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন। পরবর্তী সময়ে দ্বিতীয় বাইআতে আকাবার সময় মদীনা থেকে আগত বাহাত্তর জন সাহাবীকে নবীজী ভাগে বিভক্ত করেন এবং প্রতি পাঁচজনের জন্য একজন করে মুখপাত্র ও জিম্মাদার নির্ধারণ করেন। এরপর নবীজী তাদেরকে পুনরায় মদীনায় পাঠিয়ে দেন। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের বীজ মূলত এদের মাধ্যমেই রোপিত হয়েছিল। শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন এই নববী মানহাজ অনুসরণ করে তার তারবিয়াতি মেহনত অব্যাহত রাখলেন। ফলে দাওয়াতী প্রচেষ্টার সূচনা ও মাতৃভূমি ত্যাগ করে এই দূর দ্বীপে আশ্রয় নেওয়ার মাত্র চার বছরের মাথায় ৪৪০ হিজরীতে (১০৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলামের এই ক্ষুদ্র দলটির সংখ্যা এক হাজারে পৌঁছল। যা ছিল ইসলামের এক ঐতিহাসিক সমৃদ্ধি।
টিকাঃ
৩৩. বর্তমান আফ্রিকান রাষ্ট্র মালির একটি শহর।
৩৪. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/০০২।
৩৫. ইবনে খালদুনের উল্লেখিত নাইজার কোন শাখা নয়। এটি মালি ও সুদানে অবস্থিত নাইজার নদী। নীলনদের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।
৩৬. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/৮০।
৩৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৬/১০।
৩৮. ইবনে খালদুন, তারিখুল মাঘারিব, ২/৬৪। ইবনুল আসীর, আল-কামিল ফিল-তারিখ, ৯/৪০৭।
৩৯. ইবনে খালদুন, তারিখুল মাঘারিব, ২/৮০।
📄 মুরাবিতীদের আবির্ভাব এবং নববী আদর্শে তারবিয়াত ও দীক্ষা
ইবনে আবি যারা মুরাবিতী আন্দোলনের এই পর্যায় সম্বন্ধে লিখেছেন, তাঁরা ওই দ্বীপে উপস্থিত হলেন এবং তাঁদের সঙ্গে দ্বীপে প্রবেশ করলেন গুদালা গোত্রের মাশায়েখদের অনেকে। তারা সেখানে একটি ছাউনি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং সেখানে অবস্থান করে প্রায় তিন মাস পর্যন্ত আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন রইলেন। এক কান-দু কান করে মানুষের কাছে তাঁদের ইবাদতের কথা, জান্নাতের প্রত্যাশায় ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির আশায় রোনাজারি করার কথা পৌঁছে গেল। ফলে ইসলাম সম্পর্কে জানতে ইচ্ছুক প্রচুর মানুষ তথায় গিয়ে ধীরে ধীরে সেখানে ভিড় জমাল।
আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন তাদেরকে কোরআন পাঠ শিক্ষা দিতে লাগলেন, তাদের মাঝে পরকালমুখিতা সৃষ্টি করলেন, নেককাজের প্রতি তাদের উদ্বুদ্ধ করলেন এবং আখেরাতের আযাব থেকে তাদের সতর্ক করতে লাগলেন। ফলে মুসলমানদের প্রতি তার হৃদয়ের ভালোবাসা ও মমতার বিষয়টি সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল এবং অল্প ক'দিনের মধ্যেই সানহাজা গোত্রের বিশিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় প্রায় এক হাজার ব্যক্তি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করল। যেহেতু তারা ইলম অর্জনের জন্য সবসময় শায়খের ছাউনির পাশে জমে থাকত, তাই তিনি তাদেরকে মুরাবিতীন (ছাউনিওয়ালা) বলে ডাকতেন।
শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন তাদেরকে কোরআন, সুন্নাহ, ওজু, নামায, যাকাতসহ যাবতীয় ফারায়েজ শিক্ষা দিতে লাগলেন। যখন তারা দ্বীনের এসব বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করল এবং সংখ্যায়ও অনেক হল, একদিন তিনি তাদেরকে সমবেত করে নসীহত করতে শুরু করলেন এবং ঐকান্তিকভাবে আল্লাহর ভয়, আমর বিল মা’রুফ ও নাহি আনিল মুনকার অবলম্বনের আদেশ দিলেন এবং এতে যে ফাযায়েল ও সওয়াব নিহিত আছে, তা শোনালেন।
তারপর তিনি তাদেরকে সানহাজা গোত্রের যারা তাদের বিরুদ্ধাচরণ করছে, তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানিয়ে বললেন, হে মুরাবিতী সম্প্রদায়! তোমরা তো এখন বড় একটি জামাত। তোমরা তোমাদের সম্প্রদায়ের নেতৃত্বস্থানীয় ও শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তি। আল্লাহ তাআ'লা তোমাদের বিশ্বাস ও আমল সংশোধন করেছেন এবং তোমাদেরকে তাঁর সরল ও সঠিক পথের সন্ধান দান করেছেন। সুতরাং তোমাদের কর্তব্য হল আল্লাহ-প্রদত্ত নেয়ামতের শোকর করা, সৎ কাজের আদেশ করা ও অসৎ কাজে বাধা প্রদান করা এবং আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করা।
তখন উপস্থিত ফারিরাসা ইলমের জামাত বলল, শায়খ! আপনি যা ইচ্ছা আদেশ করুন, আমাদেরকে বাধ্য ও অনুগত পাবেন। আপনি যদি আমাদেরকে আমাদের বাপ-দাদাকে হত্যা করার আদেশও করতেন, আমরা তাও পালন করতাম।
শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন তাদেরকে বললেন, আল্লাহর বরকতকে সঙ্গী করে তোমরা বের হয়ে পড় এবং তোমাদের আপন সম্প্রদায়কে সতর্ক কর, তাদেরকে আল্লাহর আয়াতের ভীতি প্রদর্শন কর, আল্লাহর বিধি-বিধান ও দলিল-প্রমাণ তাদের কাছে পুরোপুরি পৌঁছে দাও। যদি তারা তাওবা করে এবং হকের পথে ফিরে আসে, যেসব অন্যায়-অনাচারে তারা লিপ্ত আছে, তা পুরোপুরি বর্জন করে, তাহলে তাদের ছেড়ে দাও। আর যদি তারা সত্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়, নিজেদের ভ্রান্ত চিন্তা ও ভ্রষ্ট কর্মে অটল থাকে এবং অবাধ্যতাকেই আঁকড়ে থাকে, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করব এবং আল্লাহ পাকের ফয়সালা আসার পূর্ব পর্যন্ত আল্লাহর বিধান পালন করে যাব। আল্লাহ তাআ'লাই সর্বোত্তম ফয়সালাকারী।
শায়খের এই ভাষণের পর প্রত্যেকে আপন আপন পরিবার ও বংশের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। তারা তাদেরকে দ্বীনের কথা শোনাল, অন্যায়ের কথা শোনাল এবং যে পাপাচারে সকলে নিমজ্জিত আছে, তা ত্যাগ করার আহ্বান জানাল। কিন্তু কেউ তাদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে হকের পথে ফিরে এল না।
এরপর শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন নিজেই বের হয়ে এলেন এবং সকল শাখা-গোত্রের প্রধান ব্যক্তি ও প্রবীণদেরকে একত্র করে তাদের সামনে আল্লাহর বিধান পাঠ করে শুনিয়ে তাদেরকে তাওবার প্রতি আহ্বান জানালেন। একটানা সাতদিন তিনি তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভীতি প্রদর্শন করে সতর্ক করলেন; কিন্তু তারা শায়খের কথার প্রতি মোটেই ভ্রুক্ষেপ করল না; বরং অনাচার আরও বাড়িয়ে দিল। অবশেষে তাদের হেদায়েতের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন তার শিষ্যদেরকে বললেন, আমরা আল্লাহর বিধান পূর্ণরূপে পৌঁছে দিয়েছি এবং সতর্ক করেছি। এখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা আমাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হও।
টিকাঃ
৯৩. ইবনে আবি যারা', রাওদুল কির্ভাস, পৃঃ ১৪৬ ও আননাসিরি, আলইস্তাকসা, ২/৮।
📄 ‘মুরাবিতীন’ শব্দের অর্থ
আরবী ‘রিবাত' শব্দের মূল গঠনতান্ত্রিক অর্থ হল প্রত্যেক এমন বস্তু, যা দ্বারা কোনো কিছুকে বাঁধা হয়। পরবর্তীতে শব্দটি সীমান্ত-প্রহরীদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতে থাকে; যারা সর্বদা বাইরের আক্রমণ থেকে সীমান্তসমূহকে রক্ষায় ব্যস্ত থাকে। এ বিবেচনায় রিবাত-এর আরেকটি অর্থ হল সার্বক্ষণিক যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা। ইমাম বুখারী রহ. আপন সনদে সাহল বিন সা’দ রাদি. –এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, 'আল্লাহ্র পথে একদিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও তার উপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।'
যেহেতু মুরাবিতীগণ (সীমান্তরক্ষীগণ) সীমান্ত এলাকাতে ছাউনি স্থাপন করে মুসলিম সীমান্তকে রক্ষা করেন এবং আল্লাহর রাস্তায় লড়াই করেন, তাই শায়খ আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিন ও তার সঙ্গীগণ, যারা সেনেগাল নদীর পাড়ে ছাউনি স্থাপন করে অবস্থান করছিলেন, সকলে মুরাবিতী জামাত নামে খ্যাতি লাভ করেন এবং ইতিহাসে এ নামেই প্রসিদ্ধি অর্জন করেন।
অবশ্য কোনো কোনো গ্রন্থে তাদেরকে ‘মুলাছছামীন’ নামেও অভিহিত করা হয়েছে। ইতিহাস-গ্রন্থগুলোতে আমীরুল মুলাছছামীন, ‘দাওলাতুল মুলাছছামীন’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এ নামকরণের কারণ উল্লেখ করে ঐতিহাসিক ইবনে খালিকান রহ. লিখেছেন, এ সম্প্রদায়ের লোকেরা সবসময় নিজেদের চেহারা সেকাবা বা মুখোশে আবৃত করে রাখত এবং কখনোই উন্মুক্ত করত না। এ কারণেই মানুষ তাদেরকে ‘মুলাছছামীন’ বলে ডাকত। এ রীতি তারা বংশপরম্পরায় পূর্বসূরিদের কাছ থেকে লাভ করেছিল। এভাবে চেহারা আবৃত রাখার কারণ সম্পর্কে কথিত আছে, হিমিয়ার গোত্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিগণ অত্যধিক গরম ও প্রচণ্ড শীত থেকে আত্মরক্ষার জন্য মুখ ঢেকে রাখত। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে গোত্রের সাধারণ মানুষগণও এরূপ করতে শুরু করে। আরেক বর্ণনামতে, এর কারণ হচ্ছে, একবার তাদের পার্শ্ববর্তী এক শক্তিশালী গোত্র—তারা যখন পুরুষরা গ্রামের বাইরে থাকত, তখন তারা গ্রামে আক্রমণ করে ধন-সম্পদ লুট করত এবং নারীদেরকে অপহরণ করত। তখন গোত্রের প্রবীণ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ পরামর্শ দেন, গোত্রের নারীদেরকে পুরুষদের পোশাক পরিধান করিয়ে গোপনে গ্রামের এক প্রান্তে পাঠিয়ে দিতে হবে এবং পুরুষগণ নারীদের বেশে চেহারা ঢেকে বাড়িতে অবস্থান করবে। যখন শত্রুরা তাদেরকে নারী ভেবে আক্রমণ করতে আসবে, তখন তারা বেরিয়ে আসবে। গ্রামের নওজোয়ানরা প্রবীণদের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে এবং প্রতিপক্ষকে পরাভূত করে হত্যা করে। শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের এই কৌশলের সম্মান বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এরপর থেকে তারা সর্বদা সেকাবা দিয়ে মুখ ঢেকে রাখত।
ইবনুল আছীর তাদের এই রীতি অবলম্বনের কারণ উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, একবার গ্রাম থেকে একটি দল শত্রুপক্ষীয় এলাকায় প্রতিশোধ নিতে গিয়েছিল। সে সময়ে শত্রুরা তাদের এলাকায় আক্রমণ চালাতে আসে। এলাকায় গ্রাম প্রধান, নারী ও শিশুরা ছাড়া কেউ উপস্থিত ছিল না। প্রবীণ ব্যক্তিগণ যখন নিশ্চিত হলেন যে, আগত কাফেলা তাদের শত্রু, তখন তারা নারীদেরকে পুরুষদের বেশ ধারণ করার, পরিচয় লুকানোর জন্য চেহারা আবৃত রাখার এবং অস্ত্রধারণ করার নির্দেশ দিলেন। নারীরা তা-ই করল। বয়োবৃদ্ধ ও শিশুরা সামনে থাকল আর নারীরা বাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ল। শত্রুদল কাছে আসার পর তারা সামনে দীর্ঘ বাহিনী দেখল এবং তাদের পুরুষ মনে করল। তারা বলাবলি করতে লাগল, এসব পুরুষরা নিজেদের পরিবারকে রক্ষা করার জন্য রণে নেমেছে। সুতরাং তারা মরণপণ লড়াই করে হলেও তাদেরকে রক্ষা করবে। তাই আমরা তাদেরকে হামলা না করে বাইরে থাকা গবাদি পশু লুট করে চলে যাব। আর যদি তারা আমাদের পশ্চাদধাবন করে, তাহলে যেহেতু তারা পরিবার থেকে দূরে থাকবে, সহজেই আমরা তাদের পরাভূত করতে পারব। যখন শত্রুদল চারপাশ থেকে গবাদি পশু একত্র করতে লাগল, ঠিক তখনই গোত্রের পুরুষ সদস্যরা ফিরে এল। ফলে শত্রুদল কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ল এবং নিজেদেরকে শত্রুপক্ষের দু’ দলের মাঝে আবিষ্কার করল। পুরুষ দল তাদেরকে নির্বিচারে হত্যা করল, নারীরা হত্যা করল আরও বেশি। সেই সময় থেকে তারা সেকাবা পরিধান করে নিজেদের সার্বক্ষণিক নীতি হিসেবে গ্রহণ করে নিল, যেন যুবক-বৃদ্ধ, নারী-পুরুষ পার্থক্য করা না যায়। রাত-দিন সকলসময়ই তারা সেকাবা পরিধান করে থাকত।
টিকাঃ
৯৪. দেখুন : ইবনে মানযুর, লিসানুল আরব, (রিবাত) ৭/৩০২।
৯৫. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ২৭৬৪ ও জামে’ তিরমিযী, হাদীস নং ১৬৬৪।
২০. ইবনে খালিকান, ওয়াফায়াতুল আইয়ান, ৬/১২৯।
১১. উল্লেখ্য ইবনুল আছীর (ইবনুল জাযারি)। এ নামে তিনজন ব্যক্তি বিখ্যাত এবং তারা পরস্পর সহোদর ভাই।
৯৭. ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৮/৩০৯।