📄 গুদালা গোত্র ও মুরাবিতীদের আবির্ভাব
মৌরিতানিয়ার সুবিশাল মরুভূমির গভীরতম এলাকা, নির্দিষ্ট করে বললে সেই তফ ও অনুরূপ অঞ্চল, যেখানে ছড়িয়ে আছে সাহারার বিস্তৃত উর্বর এলাকা, যেখানে চামড়া অনেক বেশি, যেখানকার অধিবাসিগণ নিজ হাতে চাষাবাদ করতে জানে না; বরং তারা অত্যন্ত বেদুঈন-জীবন যাপন করে, সেই অঞ্চলে 'সানহাজা' গোত্র নামে পরিচিত আফ্রিকান আমাজিগণ (বর্বর) জাতিগোষ্ঠীর এক বৃহৎ গোত্রীয় বসবাস করত। ধর্ম-বিশ্বাসে তারা ছিল অগ্নিপূজারী। মরুভূমিতে বসবাসরত এ জাতি সভ্যতার সব ধরনের আলো থেকে বঞ্চিত ছিল। এমনও হয়েছে যে, সানহাজা গোত্রের কোনো ব্যক্তি দীর্ঘ কয়েক যুগ জীবন লাভ করা সত্ত্বেও জীবনে কোনদিন রুটির স্বাদ পায়নি; বরং লাভ করেনি 'দর্শন-সৌভাগ্যও'। সভ্যতার আলো বঞ্চিত এই জাতিগোষ্ঠী এভাবেই অতিবাহিত করেছিল দিন, মাস, বছর এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী।
পরবর্তীতে হিজরী তৃতীয় শতাব্দীতে তাদের কাছে পৌঁছায় ইসলামের সুশীতল বাণী। অন্য সব এলাকার মতো আফ্রিকার এই গহীন মরুভূমিতেও স্বভাবধর্ম ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে অতি দ্রুতগতিতে। কিন্তু তারা যেহেতু বসবাস করত সাহারার গভীরতম অঞ্চলে মাগরেবের এক্কেবারে শেষ প্রান্তে, তাই 'ইসলাম' নামক প্রদীপের ক্ষণিকের আলোকরশ্মিই তাদের জীবনে এসেছিল। ইসলামের সুমহান শিক্ষা, সুমহৎ আদর্শ-পদ্ধতি ও আদর্শ জীবনচার—কিছুই তারা লাভ করেনি; বরং তারা ডুবে ছিল নিজেদের সুপ্রাচীন অজ্ঞতা ও বেদুঈন জীবনধারায়। অবস্থাটা মনে হবে, ইসলাম ও ইসলামের শিক্ষা যেন তারা কখনোই লাভ করেনি; ইসলাম যেন আফ্রিকান ঐ গহীন মরুভূমিতে প্রবেশই করেনি।
এর কিছুদিন পর তারা এক শাসকের শাসনব্যবস্থায় একত্রিত হয়। শাসকের মৃত্যুর পর শাসনকর্তৃত্ব গ্রহণ করেন তার পৌত্র। কিন্তু সানহাজা গোত্র তাদের নতুন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তাকে হত্যা করে। শাসকবিহীন সানহাজা গোত্র এরপর পর-পর বিভেদে জড়িয়ে ছোট ছোট দশ-উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তারও অনেকদিন পর সানহাজা গোত্র পুনরায় নতুন এক শাসকের নামে সমবেত হয় এবং একতাবদ্ধ গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। নতুন এই শাসকের নাম ইবনে তাইফায়ুন লামতুনা। তিনি ছিলেন সানহাজা গোত্রের অন্যতম বৃহৎ শাখা 'লামতুনা' ক্বাবিলার। কিন্তু সানহাজা গোত্রকে একতার বন্ধনে আবদ্ধকারী নতুন শাসক ইবনে তাইফায়ুন বেশি দিন বাঁচেননি। এক যুদ্ধে তিনি নিহত হলে তার স্থলাভিষিক্ত হন তার জামাতা ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী। তিনি ছিলেন লামতুনার মতোই সানহাজা গোত্রের আরেক বৃহৎ শাখা গোত্র 'গুদালা' বংশোদ্ভূত। ইবনে তাইফায়ুন-এর মৃত্যুর পর ইয়াহইয়া অধিষ্ঠিত হন সানহাজা গোত্রের নেতৃত্ব আসনে।
যে যুগে সানহাজা গোত্র ইসলামের শিক্ষা হতে এতটাই দূরে ছিল যে, ঐতিহাসিকগণ এক বিস্ময়কর দৃষ্টান্ত উল্লেখ করেছেন। বর্ণিত আছে, সানহাজা গোত্রের জনৈক ব্যক্তি তার পুত্র ও কন্যাকে একসঙ্গে মরুভূমিতে গবাদি পশু চড়াতে পাঠিয়েছিল। কিছুদিন পর বোন তার ভাই কর্তৃক অন্তঃসত্ত্বা হয়ে শোকালয়ে ফিরে আসে! আরও আশ্চর্যের বিষয়, কেউ এতে ঘোরতর আপত্তিও করেনি। হত্যা-রাহাজানি ছিল তাদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। অন্যের বিবাহিতা স্ত্রীর সঙ্গে তার স্বামীর জ্ঞাতসারে বরং স্বামীর উপস্থিতিতে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি এবং নীতি-নৈতিকতাবিদ্বেষী কর্মকাণ্ড তাদের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সানহাজা গোত্রের পুরুষগণ যতজন নারীকেই ইচ্ছা একসঙ্গে বিবাহ করত। এমনকি গোত্রপ্রধান ইয়াহইয়া নয়জন নারীকে বিয়ে করেছিলেন। মোটকথা, একপ্রকার ফাহেশা কাজ ছাড়া নামায, যাকাত বা শরীয়তের অন্য কোন বিধান তারা মোটেই জানত না। প্রিয় পাঠক! আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, আমরা বর্তমানে যে সমাজে ও যে ধরনের পরিস্থিতিতে বসবাস করছি, তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ও শোচনীয় ছিল আলোচ্য সানহাজা গোত্রের সমাজ-পরিবেশ। এবার সামনে আমরা দেখব, কীভাবে একটি জাতি জেগে ওঠে? উপলব্ধি করব, নববী আদর্শের অনুসরণে পরিচালিত সুশৃঙ্খল কিছু পদক্ষেপের মাধ্যমে কীভাবে একটি জাতির সামগ্রিক অবস্থা আমূল বদলে যায় এবং কীভাবে একটি নতুন ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়? পাশাপাশি আমরা পরিচিত হব সেসব মহান ব্যক্তিত্বের সঙ্গে, যাঁরা ছিলেন এই জাতি-সংস্কার ও রাষ্ট্র-বিনির্মাণ রেনেসাঁসের প্রধান পথিকৃৎ।
টিকাঃ
১. শাহাবী, তাবলীগুল ইসলাম, ৩৯/৪২।
২. আলী সাল্লাবী, সানহাজাতুল মুরাবিত্তীন, পৃ : ১০।
৩. ইবনে আবি যার', আলফাদায়িলুল মুরাবিত্তীন, পৃ : ১২৪।
📄 ইয়াহইয়া বিন ইবরাহীম আলগুদালী রহ. জাতির সংস্কার-চিন্তায় দগ্ধ এক মহান শাসক
নতুন শাসক ইয়াহইয়া আলগুদালী কিছুদিন পর হজ্ব করার মনস্থ করলেন। এটি সে যুগের কথা, যখন হজ্বের সফর কেবল হজ্বের সফর হত না, হজ্বের সফর হত একই সঙ্গে প্রেমের সফর ও জ্ঞানার্জনের সফর। আর তাই দীর্ঘ এক সফরের প্রস্তুতি নিয়ে ইয়াহইয়া মুসলিম প্রাচ্যের উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। যাত্রার পূর্বে তিনি তার পুত্র ইবরাহীমকে তার স্থলাভিষিক্ত করে গেলেন। যথাযথভাবে হজ্ব সমাপন করার পর ফেরার পথে তিনি কায়রোওয়ানে উপস্থিত হলেন এবং সেখানকার তৎকালীন মালেকী ইমাম আবু ইমরান বিন মূসা বিন ইসা আলফাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। উত্তর আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোতে সেকালে মালেকী মাযহাবই প্রচলিত ছিল এবং বর্তমানেও সেখানে মালেকী মাযহাবই প্রচলিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, তৎকালীন আলআন্দালুসের মুসলিম জনগোষ্ঠীও ছিল মালেকী মাযহাবের অনুসারী।
যাই হোক, ইয়াহইয়া আলগুদালী মালেকী শায়েখ আবু ইমরান আলফাসীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। আবু ইমরান সেই মহান আলিম, যার সম্পর্কে ইমাম ইয়াযী মন্তব্য করেছেন, তিনি ছিলেন কায়রোওয়ানের শীর্ষস্থানীয় ফকীহ এবং আপন যুগের ইমাম। তিনি আন্দালুসিয়া সফর করেছেন এবং ইলম অন্বেষণে প্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ সফর করে ইরাক পর্যন্ত গিয়েছেন। কায়রোওয়ান, মিসর, মক্কাসহ ইলমের সমৃদ্ধ সব অঙ্গন থেকে তিনি হাদীস শ্রবণ করেছেন। অপরদিকে আল্লামা হিময়ারী 'আরাওয়াতুল মি'আর' গ্রন্থে তাকে ফকীহ, ইমাম, ইলম ও সৎ গুণের ক্ষেত্রে সুভাসিত ব্যক্তির অভিধায় আখ্যায়িত করেছেন।
ইবনে ফারহুন লিখেছেন, তিনি (আবু ইমরান) ছিলেন জ্ঞান ও যুক্তি-শক্তির ক্ষেত্রে আপন যুগের শীর্ষতম ব্যক্তি। মালেকী মাযহাবের প্রখর জ্ঞানের পাশাপাশি তিনি হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সূক্ষ্মতত্ত্ব, মর্মার্থ অনুধাবন ইত্যাদি ক্ষেত্রেও বিদ্বান ছিলেন। তিনি বিশুদ্ধ ও প্রাজ্ঞ উচ্চারণে সাত কেরাতে কুরআন পাঠ করতেন। এছাড়াও ইলমুল রিজাল, ইলমুল জারাহ ও তা'দীল ইত্যাদি শাস্ত্রেও তার অসামান্য দক্ষতা ছিল। মাগরেব ও আন্দালুসিয়ার বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য তালিবে ইলম তার কাছে ইলমী সুধা লাভ করে ধন্য হয়েছে। তার ফিকহ ও জ্ঞানসম্পর্কিত বহু রেওয়াত করার ইজাযত লাভের জন্য মানুষ ভিড় করত। ফিকহে মালেকীর আকর গ্রন্থ 'আলমুদাওওয়ানা'-এর ওপর তার সুবিশাল টীকাগ্রন্থ রয়েছে, যা তিনি সমাপ্ত করতে পারেননি।
ফকীহ আবু ইমরানের সাক্ষাৎ লাভ ও তার দরসে বসার পর ইয়াহইয়ার চোখ খুলে গেল। তিনি বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন এবং বুঝতে পেলেন নতুন এক জীবনের সন্ধান লাভ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, তার জাতি মূর্খতার ঘোর-অমানিশায় নিমজ্জিত আছে। নিশ্চিত করেই বলা যায়, জাতি ও জাতির কল্যাণকামী এই মহান শাসকের সামনে যখন বাস্তবতা উন্মোচিত হল, তখন তিনি আপন জাতির প্রতি বিরাট এক দায়িত্বভার অনুভব করলেন। তিনি তার শায়েখ ও উস্তাদ আবু ইমরানকে জানালেন তার পশ্চাৎপদ জাতির কথা। জানালেন, তিনি এমন এক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করছেন, যারা দীন সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সাধারণ জনগণ তো কালিমাও জানে না; গোত্রের বিশেষ ব্যক্তিদের মধ্যেও খুব অল্পসংখ্যক মানুষই নামায পড়ে। তাদের না আছে ধর্মজ্ঞান, না আছে অনুসরণীয় মাযহাব। কারণ, তারা বসবাস করে সভ্য জগত থেকে বহু দূরে মরুভূমি পল্লীতে। ধর্ম সম্পর্কে বিজ্ঞ কোনো ব্যবসায়ী বা আলেম কেউ-ই তাদের এলাকায় সফর করে না। অবশ্য তাদের মাঝে এখন অনেক মানুষ আছে, যারা সুযোগ ও পরিবেশ পেলে দ্বীনের নিত্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ফিকহ বা ইলম অর্জন করতে আগ্রহী।
ফকীহ আবু ইমরান ইয়াহইয়ার সব কথা মনোযোগ সহকারে শুনলেন। তিনি ইয়াহইয়াকে বিভিন্ন প্রশ্ন করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সবকিছু জেনে নিলেন এবং সানহাজা জাতির জ্ঞান-দীনতা সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন। এরপর তিনি তার ছাত্রদের সামনে বিশাল চিত্র তুলে ধরে মরুভূমির দীন সম্পর্কে অজ্ঞ মানুষদের কাছে দ্বীন পৌঁছানোর জন্য সফরে উদ্বুদ্ধ করলেন। কিন্তু কেউ-ই তাতে রাজী হল না। এরপর ফকীহ আবু ইমরান ইয়াহইয়াকে পাঠালেন তার নিজের শাখ মুজাগারার বিখ্যাত ফকীহ ওয়াজ্জাজ বিন মিলু আললামতী’র নিকট। ইয়াহইয়া তার কাছে উপস্থিত হয়ে সবকিছু খুলে বললে ফকীহ ওয়াজ্জাজ ইয়াহইয়ার সঙ্গে পাঠানোর জন্য নির্বাচিত করলেন তার অন্যতম মেধাবী ও নামকরা ছাত্র আবদুল্লাহ বিন ইয়াসিনকে।
টিকাঃ
৬. হাদাবী, আললুদাগুন মুজতাবা, ১/১০০।
৭. হিময়ারী, আরাওয়াতুল মি'আর, ১/ ৪৩০।
৮. ইবনে ফারহুন, আদ-দিবাযুল মুযাহহাব ফী মা'রিফাতি আ'য়ানিল উলামায়ে মাযহাব (আলমালকী), ২/৩৫৮-৩৫৯।
৯. ইবনে আবী যারা’, আদ-দাফউ'ল মুত্তাবিয, পৃ : ১২২।