📄 দুই. মুসলমানদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায়
তৎকালীন বিভক্ত মুসলিম আন্দালুসের শাসকবর্গের যে নীতিটি অত্যন্ত পীড়াদায়ক ও অবমাননাকর ছিল তা হলো, তারা খ্রিস্টান রাজাকে জিযিয়া প্রদান করতেন। চূড়ান্ত লাঞ্ছনা ও অপমান স্বীকার করে তারা মনে করতেন এর মাধ্যমে তারা তাদের ক্ষমতা ও ভূমি রক্ষা করতে পারবেন। যে নীতি ও কৌশলের সহায়তায় আলফান্সো তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তা মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল: ১. বিভক্ত রাষ্ট্রগুলোকে অব্যাহত হামলায় ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত রাখা। ২. জিযিয়া ও করের বোঝা চাপিয়ে দিয়ে তাদেরকে দুর্বল ও অক্ষম করে ফেলা। তাঁর এই নীতির ফলে বিভক্ত মুসলিম আন্দালুসের শাসকবৃন্দ একই সঙ্গে সামরিক ও অর্থনৈতিক উভয় দিক থেকে দুর্বল হয়ে পড়েন এবং প্রতিরোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেন।
বস্তুত তৎকালীন মুসলিম আন্দালুসের পরিস্থিতি এমন ছিল যে, পবিত্র কোরআনের সুরা মায়েদার ৫১-৫২ নম্বর আয়াতগুলো যেন তৎকালীন আন্দালুসবাসী সম্পর্কেই নাযিল হয়েছিল। বিভক্ত আন্দালুসের শাসকবর্গ মুসলিম ভাইদের পক্ষ থেকে আগত সম্ভাব্য বিপদের আশঙ্কায় সখ্যতা গড়েছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে। তারা নিরাপত্তা খুঁজে পেয়েছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনের মাঝে।
টিকাঃ
৫৬৭. সুরা আলে ইমরানের ১৫৬ নং আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৫৬৮. সুরা আল-কাহাফের ৩৭ নং আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৫৬৯. সুরা আল-ফুরকানের ২৬ নং আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
৫৭০. আলফান্সোর পূর্বপুরুষদের সময় থেকে এই কর ব্যবস্থা শুরু হয়েছিল।
৫৭১. সুরা তাগাবুন ০২ নং আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
📄 তিন. আকস্মিক বীরত্ব!
৪৭২ হিজরীর মাঝামাঝিতে (১০৮২ খৃষ্টাব্দে) আলফান্সো আরও বেশি দাম্ভিক ও দুর্বিনীত হয়ে ওঠেন। তিনি 'দুই ধর্মের শাসক' উপাধি ধারণ করেন এবং এরপর থেকে নির্বিঘ্নে মুসলিম শাসকদের ওপর খবরদারি করতে শুরু করেন। টলেডো জয়ের পর তাঁর পরবর্তী পরিকল্পনা ছিল সেভিল রাষ্ট্রকে আপন করতলগত করা। আলফান্সো সেভিলকে ভীত-সন্ত্রস্ত করতে জিযিয়া আরোপ ও অবরোধ হামলার ওপর নির্ভর করতেন। কিন্তু এর পরপরই এমন একটি ঘটনা ঘটে, যার কারণে আলফান্সোর সামরিক পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। আলফান্সো এ সময় তাঁর জনৈক ইহুদি উযীরকে নেতৃত্বে জিযিয়া আদায়ের জন্য একটি প্রতিনিধিদল সেভিল-শাসক মু'তামিদ বিন আব্বাদের কাছে পাঠান। প্রতিনিধিদলটি সভাসদ ও মন্ত্রীপরিষদের সামনে মু'তামিদকে অবমাননাকর ভাষায় কথা বলতে থাকে। মু'তামিদের মাঝে আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। তিনি দরবারী তলোয়ারের এক আঘাতে চরম উদ্ধত আলফান্সোর ইহুদি উযীরের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন। এরপর তিনি অন্যান্য প্রতিনিধিদের বন্দী করেন। সংবাদ পেয়ে আলফান্সো উন্মাদ হয়ে যান। তিনি তৎক্ষণাৎ সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে সেভিলের ভূমিতে ধবংসযজ্ঞ চালাতে থাকেন।
📄 সেভিল অবরোধ
সেভিল রাষ্ট্রের অধীনস্থ সকল প্রদেশে ব্যাপক লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগের পর ৪৭৭ হিজরিতে (১০৮৫ খৃষ্টাব্দে) আলফান্সো সেভিল নগরী অবরোধ করেন। এরপর তিনি মু'তামিদের কাছে একটি বার্তা পাঠান। বার্তাটি ছিল হুমকি ও প্রতিশোধের ভাষায় পূর্ণ। বার্তার সারমর্ম ছিল এই যে, টলেডোর পতন দেখেও যেন সেভিল শিক্ষা গ্রহণ করে। মু'তামিদ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ ও আলেমদের একত্রিত করলেন। তৎকালীন প্রখ্যাত ফকীহ আবু আবদুল্লাহ বিন আল-কাশ উল্লেখ করলেন, 'এই পরিস্থিতির জন্য আমাদের অনৈক্যই দায়ী। এখন আমাদের কেবল একটি করণীয় আছে– আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করা এবং কাফিরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ময়দানে অবতীর্ণ হওয়া।' এরপর মু'তামিদ আলফান্সোর চিঠির কড়া জবাব দিলেন। তিনি লিখলেন, 'তোমার হুমকি আমাদের সামনে তুচ্ছ। আল্লাহই তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করবেন এবং তোমার বিরুদ্ধে আমরা আল্লাহর সাহায্য চাই।' এরপর মু'তামিদ সেভিলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও সুদৃঢ় করতে মনোযোগ দেন।
টিকাঃ
১২৯. বিস্তারিত বিবরণ দেখুন: আন্দালুসিয়া মুক্তারমালা, পৃ: ৫২-৫৩।
১৩০. দিয়ারী, আন্দালুসিয়া ইতিহাস, পৃ: ২৪৪।