📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকবর্গের পারস্পরিক বিভেদ-হানাহানি

📄 বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকবর্গের পারস্পরিক বিভেদ-হানাহানি


পূর্বের পরিচ্ছেদের আলোচনায় আমরা দেখেছি, কীভাবে মুসলিম আন্দালুসে বিভক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এবং কীভাবে সুদীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে আন্দালুস শাসন করা খেলাফতের সুউচ্চ মহল একটি বিপন্ন ভূখণ্ডে ভিন্ন-ভিন্ন কাঠামোতে পরিণত হয়েছে। যদি বিভক্ত রাষ্ট্রসমূহের শাসকগণ আপন আপন কর্তৃত্বাধীন অঞ্চল নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, গোলযোগ সত্ত্বেও নিজ এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিবদ্ধ থাকতেন, ইসলামী আত্মমর্যাদাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে উম্মাহর চেতনায় সমৃদ্ধ হতেন, তাহলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতো। কিন্তু এই বিদ্রোহী শাসকগণ শান্তি ও ঐক্যের পরিবর্তে বিচ্ছেদ ও বিচ্ছিন্নতাকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন; প্রতিটি মুহূর্তে নিজেদের হীন স্বার্থে অতি তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে মুসলমানদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করেছিলেন। নিজেদের ক্ষমতাকে সুদৃঢ় করতে তাঁরা খ্রিস্টান শাসকদের সাহায্য নিতেও দ্বিধা করেননি। এভাবে মুসলিম আন্দালুস পরিণত হয়েছিল পরস্পর বিবাদমান ও বিচ্ছিন্ন শাসকবর্গের সংঘাতের ক্ষেত্রে। এর ফলস্বরূপ এমন সব বিয়োগান্তক ঘটনাবলির জন্ম হয়েছিল, যার মাঝে মুসলিম উম্মাহ নিপতিত ছিল প্রায় এক শতাব্দীকাল।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 এক. সেভিল ও বাতালইযুসের মধ্যে বিরোধ

📄 এক. সেভিল ও বাতালইযুসের মধ্যে বিরোধ


এই দুই রাজ্যের মধ্যকার সংঘাত ও যুদ্ধ উভয়ই লম্বী প্রতিদ্বন্দ্বীর চরম রূপ নিয়েছিল। সেভিল-শাসক কাযী আবুল কাসিম বিন আব্বাদ ও বাতালইযুস-শাসক আবদুল্লাহ বিন মাসলামা আল-আফতাস উভয়েই আপন রাষ্ট্রের সুরক্ষা ও সীমানা বিস্তারে সচেষ্ট ছিলেন। সংঘাতের সূচনা হয় ‘মাজ’ নগরীর দখল নিয়ে। ৪৩১ হিজরীতে কাযী ইবনে আব্বাদের পুত্র ইসমাইল কারমোনা নগরী কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে বার্বারদের সাথে যুদ্ধে তিনি নিহত হন। এরপর ৪৪২ হিজরীতে মু’তাদিদ বিন আব্বাদ পুনরায় বাতালইযুসের বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালান। দীর্ঘ সংঘাতের পর ৪৪৩ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে (১০৫১ খৃষ্টাব্দে) কর্ডোভার শাসক ইবনে জাহওয়ারের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি ও সন্ধি স্থাপনে সম্মত হয়। এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধের ফলে উভয় রাষ্ট্রের মুসলিম শক্তি ও সম্পদ দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

টিকাঃ
৯৭২. ইবন কাসসার, আলওয়াফিয়া, ৫/৫০।
৯৭৩. জামহারাতুল মুকতাসাব, ১/৩১১।
৯৭৪. ইবনে বাসসাম, আলওয়াফিয়া, ৬/১৯-২২।
৯৭৫. ইবনে বাসসাম, আলওয়াফিয়া, ৬/২২।
৯৭৬. ইবন কাসসার, আলওয়াফিয়া, ৬/৩০-৩৩; ইবন আযারী, ৫/২৮-২৯।
৯৭৭. ইবন বাসসাম, আলওয়াফিয়া, ৬/৪৮।
৬০৯. ইবনুল কায়সার, আল-বায়ান, ৩/৩০০-৩১ ও ইবনে আ'আরী, আল-বায়ানুল মুখরিব, ৬/২১৯-২০।
৬১০. ইবনুল কায়সার, আল-বায়ান, ৩/৩০০-৩১ ও ইবনে আ'আরী, আল-বায়ানুল মুখরিব, ৬/২১১-২৩।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দুই. সেভিল ও গ্রানাডার মধ্যে বিরোধ

📄 দুই. সেভিল ও গ্রানাডার মধ্যে বিরোধ


গ্রানাডা সাম্রাজ্য দীর্ঘকাল ধরে সেভিলের সাম্রাজ্য সম্প্রসারণ লালসার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সেভিলের বনু আব্বাদ ও গ্রানাডার বনু যীরী উভয়ই ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। ৪৩১ হিজরীতে ইলিওজা (Ecija) দুর্গের দখল নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে প্রথম যুদ্ধ বাঁধে। এতে সেভিল সেনাপতি ইসমাইল বিন আব্বাদ নিহত হন। পরবর্তীতে মু’তাদিদ বিন আব্বাদ এবং গ্রানাডার বাদিস বিন হাবুসের মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করে। ৪৪৮ হিজরীতে মালাগা দখলের লড়াইয়ে সেভিল বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। মু’তামিদ বিন আব্বাদের শাসনামলে এই বিরোধ আরও তীব্র হয়। ৪৬৬ হিজরীতে মু’তামিদ গ্রানাডার কাছ থেকে জাইয়ান (Jaen) কেড়ে নিতে সক্ষম হলেও মালাগা জয় করতে ব্যর্থ হন। ক্ষমতার লোভে উভয় পক্ষই খ্রিস্টান রাজা ষষ্ঠ আলফোন্সোর সাহায্য কামনা করে এবং তাঁকে বিপুল পরিমাণ জিজিয়া প্রদান করতে সম্মত হয়। ৪৭৮ হিজরীতে টলেডোর পতনের পর বিপদের গুরুত্ব উপলব্ধি করে উভয় রাষ্ট্র মাগরেবের ইউসুফ বিন তাশফীনের সাহায্য চাইতে বাধ্য হয়।

টিকাঃ
৬৭২. ইবনুল কায়সার, আল-বায়ান, ৩/৩০০-৩১; ইবনুল আ'আরী, ৬/২১৯-২০।
৬৪২. ইবনুল আ'আরী, আল-বায়ানুল মুখরিব, ৬/২৩০।
৬৪৩. ইবনে খালদুন, ৪/৩৩৫ ও ৬/৩০০।
৬৪৪. ইবনে কায়সার, আল-বায়ান, ৩/৪০০-৪০; ইবনে আ'আরী, ৬/২১৩-২১৫।
৬৬৯. ইবনে আ'আরী, আল-বায়ানুল মুখরিব, ৬/২৭১-৭২।
১**. ইবনে আল্-খাতীব, আল-ইহাতা ফি তারিখি গারনাতা, ৩/৩১৩-৩১৪; ইবনুল বশকুয়াল, ১/৪৬৬-৪৬৭; ইবনে ইযারী, ৬/১৮০।
২**. ইবনুল বশকুয়াল, আস-সিলাহ্, পৃ: ৩০৩-৩০৪।
৩**. ইবনুল বশকুয়াল, আস-সিলাহ্, পৃ: ৫৩৮ ও ইবনে ইযারী, ৬/১৮১।
১**. ইবনে ইযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব ফি আখবারিল আন্দালুস, ৬/১৮১-১৮৩।
১**. ইবন ইযারী, ৬/১৮২-১৮৩।
১**. ইবনে ইযারী, ৬/১৮৪-১৮৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 তিন. সেভিল ও কর্ডোভার মধ্যে সংঘাত

📄 তিন. সেভিল ও কর্ডোভার মধ্যে সংঘাত


সেভিলের শাসক বনু আব্বাদ ৪১৪ হিজরীতে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই কর্ডোভা দখলের স্বপ্ন দেখতেন। ৪২৬ হিজরীতে কাযী ইবনে আব্বাদ মৃত খলীফা হিশাম আল-মুয়াইয়াদের ন্যায় দেখতে এক ব্যক্তিকে হাজির করে নিজের শাসনকে বৈধতা দিতে চান। ৪১৭ হিজরীতে তিনি কর্ডোভা আক্রমণ করলেও ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে কর্ডোভা-শাসক আব্দুল মালিক বিন জাহওয়ারের অযোগ্যতার সুযোগ নিয়ে ৪৬২ হিজরীতে সেভিল বাহিনী পুনরায় কর্ডোভা আক্রমণ করে। তারা আব্দুল মালিককে গ্রেফতার করে এবং কর্ডোভাকে সেভিলের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। ৪৬৭ হিজরীতে টলেডোর শাসক আল-মামুন এক কূটকৌশলের মাধ্যমে কর্ডোভা দখল করে নেন। কিন্তু ৪৬৯ হিজরীতে মু’তামিদ পুনরায় কর্ডোভা পুনরুদ্ধার করেন। এভাবেই কর্ডোভাকে কেন্দ্র করে সেভিল ও টলেডোর মধ্যে রক্তক্ষয়ী রেষারেষি চলতে থাকে।

টিকাঃ
৬৩৭৬. ইবনে আব্বাদী, ১/১৯০ ও ইবনুল খতীব, আ‘মালুল আ‘লাম, পৃঃ ১১২।
৮৮৮. ইবনে আব্বাদী, ১/১৯০, ১৯৪-২০১ ও ইবনুল খতীব, পৃঃ ১৫৪।
৬৯৮৬. ইবনে বাসসাম, আয‍যখীয়া, ১/৫০৮-৫০৯ ও ইবনে আব্বাদী, ২/২৯২-৩০০।
৬৯৯১. ইবনে বাসসাম, ২/০০৯-০১০ ও ইবনুল খতীব, পৃঃ ১৪৯।
৬৯৯৬. ইবনে বাসসাম, ১/৫০৯-৫১১।
৬৯৯৫. ইবনে বাসসাম, ১/৫০৯-৫১১ ও ইবনুল খতীব, পৃঃ ১৪১-১৫১।
৭০০৭. ইবনে আযারী।

ফন্ট সাইজ
15px
17px