📄 আহমাদ আলমুসতাঈন বিন হুদ
ইউসুফ আল-মু'তামিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আহমাদ আল-মুসতাঈন জারাগোসায় শাসনভার গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি ‘মুসতাঈন আল-আসগার’ নামে সুপরিচিত। ক্ষমতা গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই তিনি খৃষ্টানদের আক্রমণ প্রতিরোধের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। ৪৭৮ হিজরীতে টলেডোর পতন ঘটানোর পরই আলফোন্সো তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে জারাগোসা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং জারাগোসা শহর অবরোধ করেন। মুসতাঈন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ক্যাসটিলার খৃষ্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজ রাজধানী রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করেন এবং প্রচুর অর্থ-সম্পদ প্রদানের বিনিময়ে আলফোন্সোকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। কিন্তু খৃষ্টান শক্তি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তাদের লক্ষ্য ছিল জারাগোসা নগরীর নিয়ন্ত্রণ। তবে ৪৭৯ হিজরীতে যখন সংবাদ পৌঁছল যে মাগরেব থেকে মুরাবিতী বাহিনী আসছে, তখন আলফোন্সো জারাগোসার অবরোধ তুলে নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।
৪৮৫ হিজরীতে সাল্লাকা প্রান্তরে মুরাবিতী ও আন্দালুসী সম্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর ক্যাসটিলার খৃষ্টান বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসতাঈন একে সুযোগ মনে করে আলমেরিয়া শহর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন কিন্তু তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে খৃষ্টান সেনাপতি এল-সিদ আলমেরিয়া দখল করে নেন। দীর্ঘ অবরোধে বিপর্যস্ত আলমেরিয়াবাসী ৪৮৮ হিজরীতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুসতাঈন এরপরও টিঁকে থাকার চেষ্টা করেন। ৫০৩ হিজরীতে (১১১০ খ্রিস্টাব্দে) আরাগোন-এর নৃপতি প্রথম আলফোন্সোর সঙ্গে ভ্যালটিয়েরা (Valtierra) যুদ্ধে মুসতাঈন নিহত হন।
টিকাঃ
৬৮. ইবন সাঈদ আল-আন্দালুসী, ২/৬৭।
৬৯. ইবনুল আছীর, আল-কামেল, ৫/২৮৭।
৭০. ইবনুল আছীর, ৫/৩৩৪-৩৩৫।
৭১. ইবনুল আছীর, ২/২৮৭; ইবন খালদুন, ৪/১৩৬।
📄 বনু হুদের সাম্রাজ্যের পতন
মুসতাঈন বিন হুদের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আব্দুল মালিক 'ইমাদুদ্দৌলা' উপাধি ধারণ করে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। জারাগোসাবাসী তাঁর হাতে এই শর্তে বাইয়াত গ্রহণ করে যে, তিনি খৃষ্টানদের সঙ্গে মিত্রতায় আবদ্ধ হবেন না এবং তাদের সাহায্য কামনা করবেন না। কিন্তু আব্দুল মালিক খৃষ্টানদের সাহায্য প্রার্থনা করলে জারাগোসার জনগণ তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং মাগরেব থেকে আগত মুরাবিতীগণের কাছে পদক্ষেপ গ্রহণের আবেদন জানায়। ৫০৩ হিজরীতে মুরাবিতী বাহিনী জারাগোসায় প্রবেশ করে। এর মাধ্যমে জারাগোসায় বনু হুদের শাসনের সমাপ্তি ঘটে। পরবর্তীতে ৫১২ হিজরীতে (১১১৮ খ্রিস্টাব্দে) খৃষ্টানদের হাতে জারাগোসার পতন ঘটে।
টিকাঃ
৭২. ইবনুল খতীব, আ’মালুল আ’লাম, পৃ: ১৭৫; ইবন খালদুন, ৪/১৩৬।
📄 জারাগোজা রাজদরবারের বিখ্যাত কয়েকজন আলিম
বনু হুদের আমলে জারাগোসা তৎকালীন আন্দালুসের অন্যান্য জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর মতোই পঠন-পাঠনে অগ্রগণ্য ছিল। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় জারাগোসা সেভিলের বনু আব্বাদ বা বাতালইউসের বনু আফতাসের সমকক্ষ বিবেচিত হতো। দার্শনিক ইবনে বাজা, ফকীহ তুরতূশী এবং ক্বারী ইসমাইল বিন খালাফের ন্যায় মহান আলেমগণ জারাগোসাকে আলোকিত করে রেখেছিলেন। এছাড়াও বনু হুদের দুই শাসক ইউসুফ আল-মু'তামিন ও তাঁর পিতা আহমাদ আল-মুজাফফার নিজেরাও গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে দক্ষ ছিলেন।
টিকাঃ
১৬০. ইবন ইদরীসী, পৃ: ৭৬।
১৬১. ইবন খালদুন, ৪/১৭৩।
📄 ফকীহ তুরতূশী রহ.
তাঁর পুরো নাম আবু বকর মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ বিন মুহাম্মাদ বিন খালাফ আল-কুরশী তুরতূশী। তিনি ৪৫০ হিজরীতে (১০৫৮ খৃষ্টাব্দে) টুরটোসা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তিনি জারাগোসায় কাযী আবুল ওয়ালিদ আলবাজীর কাছে ইলম অর্জন করেন। এরপর হজের উদ্দেশ্যে সফর করেন এবং হেজাজ ও ইরাকের প্রখ্যাত মাশায়েখদের কাছ থেকে হাদীসের রেওয়ায়েত গ্রহণ করেন। এরপর তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস হয়ে মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া নগরীতে বসবাস শুরু করেন।
তিনি ছিলেন একাধারে ইমাম, দুনিয়াবিমুখ, পরহেজগার এবং বিনয়ী। তিনি প্রায়ই বলতেন:
'নিসন্দেহে আল্লাহর এমন কিছু বিচক্ষণ বান্দা আছেন, যারা দুনিয়াকে পরিত্যাগ করেছেন এবং আখিরাতকে ভয় করেছেন। তারা দুনিয়াকে অতল সমুদ্ররূপে গণ্য করেছেন আর নেক আমলকে সেই সমুদ্রে জাহাজের মতো গ্রহণ করেছেন।'
ফকীহ তুরতূশীর বিখ্যাত রচনার মধ্যে রয়েছে রাজনীতি ও শাসননীতি বিষয়ক গ্রন্থ ‘সিরাজুল মুলূক’। এছাড়াও তিনি ‘কিতাবুল ফিতান’, ‘কিতাবুল বিদা’ ইত্যাদি অনেক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছেন। ৫২০ হিজরীতে (১১২৫ খৃষ্টাব্দে) আলেকজান্দ্রিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয়।
টিকাঃ
১৬২. ইবন বাসকুয়াল, আস-সিলাহ, ২/১০৯; যাহাবী, ১৯/৪৮০।
১৬৩. যাহাবী, ১৯/৪৮০।
১৬৪. যাহাবী, ১৯/৪৮২।
১৬৫. ইবন বাসকুয়াল, ২/১০৯।
১৬৬. যাহাবী, ১৯/৪৮০।
১৬৭. যাহাবী, ১৯/৪৮২।