📄 আলমুক্তিাদির বিল্লাহ আহমাদ বিন হুদ
পিতার মৃত্যুর পর আহমাদ ‘আল-মুক্তাদির বিল্লাহ’ উপাধি নিয়ে ক্ষমতায় বসেন। তিনি তাঁর ভাইদের পরাজিত করে পুরো জারাগোসায় একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে জারাগোসা রাষ্ট্র আয়তনে অনেক বড় হয়ে যায়। তিনি ৪৬৬ হিজরীতে দানিয়া নগরী জয় করেন। ৪৭৪ হিজরীতে তাঁর মৃত্যু হয়।
টিকাঃ
৬৫২. ইবনুল আব্বারী, ৫/২২২-২২৩।
📄 বারবাষ্ট্রোর ট্রাজেডি
৪৫৬ হিজরীতে (১০৬৪ খৃষ্টাব্দে) জারাগোসা রাষ্ট্রের অন্তর্গত বারবাষ্ট্রো (Barbastro) নগরীতে খৃষ্টানরা এক ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ চালায়। তারা প্রায় চল্লিশ হাজার মুসলমানকে হত্যা করে এবং সাত হাজার মুসলিম নারীকে বন্দি করে নিয়ে যায়। খাবারের অভাব এবং পানীয় জলের নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে নগরবাসী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু খৃষ্টানরা বিশ্বাসঘাতকতা করে অমানবিক নৃশংসতা চালায়। পরবর্তীতে আল-মুক্তাদির বিন হুদ পুনরায় বারবাষ্ট্রো উদ্ধার করতে সক্ষম হন।
টিকাঃ
৯৫৯. আল-মাক্কারী, ৪/১৮৯।
📄 ইউসুফ আলমু’তামিন বিন হুদ
পিতা সুলাইমান বিন হুদ যে ভুল করেছিলেন, সেই একই ভুলের শিকার হন পুত্র আল-মু'তামিনও। তিনি তাঁর সাম্রাজ্যকে তাঁর দুই ছেলের মাঝে বণ্টন করে দেন। বড় ছেলে ইউসুফ আল-মু'তামিনকে প্রদান করেন জারাগোসা ও তুদেলার প্রদেশসমূহের দায়িত্ব আর ছোট ছেলে মুনযিরকে দেন দানিয়া ও মনজোন (Monzón) অঞ্চলের দায়িত্ব। ইতঃপূর্বে সুলাইমানের পুত্রদের মাঝে সাম্রাজ্য নিয়ে যেরূপ বিবাদ সৃষ্টি হয়েছিল, আল-মু'তামিনের পুত্রদ্বয়ও একই ধরনের বিবাদে জড়িয়ে পড়েন। উভয়েই তাঁর ভাইয়ের অধিকৃত অঞ্চল নিজ করায়ত্তে আনতে সচেষ্ট হন এবং ভাইকে পরাজিত করতে খৃষ্টানদের সাহায্য কামনা করেন। ইউসুফ আল-মু'তামিন সাহায্য চান কাস্টিলার খৃষ্টান সেনাপতি এল-সিদ (El Cid Campeador) ও তাঁর ভাড়াটে সেনাবাহিনীর। ৪৭১ হিজরিতে (১০৭৯ খ্রিস্টাব্দে) মুনযির ও তাঁর মিত্রগণ পরপর দুটি যুদ্ধে কঠিন পরাজয়ের শিকার হন। উভয় যুদ্ধে এল-সিদ ইউসুফ আল-মু'তামিনের মিত্র হিসেবে ভূমিকা পালন করেন।
ইউসুফ আল-মু'তামিন ভৌগোলিক কারণে ভ্যালেন্সিয়া শহরটি কব্জায় নিতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ভ্যালেন্সিয়ার প্রশাসক আবু বকর বিন আবদুল আযীয তাঁর মনোভাব বুঝতে পেরে তাঁর সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেন এবং নিজ কন্যাকে আল-মু'তামিনের পুত্র আহমাদ আল-মুসতাঈনের কাছে বিয়ে দিয়ে জারাগোসায় পাঠিয়ে দেন।
ইউসুফ আল-মু'তামিনের কৃতিত্ব কেবল তাঁর সামরিক দক্ষতা ও রাষ্ট্র সম্প্রসারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তার ক্ষেত্রেও তাঁর যথেষ্ট খ্যাতি ছিল। তিনি গণিতশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। এসব শাস্ত্রে তাঁর রচিত গ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল 'রিসালাতুল ইসতিকমাল' (الرسالة الاستكمال)। তাঁর এ গ্রন্থটি পরবর্তী সময়ে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। একাডেমিক মান বিবেচনায় গ্রন্থটিকে গণিতশাস্ত্রের আকর গ্রন্থ ইউক্লিডের (Euclid) এলিমেন্টস ও টলেমির অ্যালমাজেস্টের চেয়েও উঁচু মানের বলে গণ্য করা হয়। আল-মু'তামিন ৪৭৬ হিজরীতে (১০৮৬ খ্রিস্টাব্দে) ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
৫৫৭. এল-সিদ-এর মূল নাম রুদরিগো ডি বিবার। তিনি কাস্টিলার নিকটবর্তী বিবার অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ ভাড়াটে যোদ্ধা। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট নীতি-আদর্শ ছিল না, অর্থের বিনিময়ে কখনো তিনি মুসলিমদের পক্ষে আবার কখনো খৃষ্টানদের পক্ষে যুদ্ধ করতেন।
৬৪. ইবনুল আছীর, আল-কামেল, ৫/৩৩; ইবন খালদূন, ৪/১৩৬।
৬৫. ইবন খালদূন, ৪/১৩৬; মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, ২/৪০৫।
৬৬. ইবনে সাঈদ আল-আন্দালুসী, ২/৬৭।
📄 আহমাদ আলমুসতাঈন বিন হুদ
ইউসুফ আল-মু'তামিনের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আহমাদ আল-মুসতাঈন জারাগোসায় শাসনভার গ্রহণ করেন। ইতিহাসে তিনি ‘মুসতাঈন আল-আসগার’ নামে সুপরিচিত। ক্ষমতা গ্রহণ করার অব্যবহিত পরেই তিনি খৃষ্টানদের আক্রমণ প্রতিরোধের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়েন। ৪৭৮ হিজরীতে টলেডোর পতন ঘটানোর পরই আলফোন্সো তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে জারাগোসা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং জারাগোসা শহর অবরোধ করেন। মুসতাঈন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ক্যাসটিলার খৃষ্টান বাহিনীর বিরুদ্ধে নিজ রাজধানী রক্ষায় প্রাণপণ চেষ্টা করেন এবং প্রচুর অর্থ-সম্পদ প্রদানের বিনিময়ে আলফোন্সোকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। কিন্তু খৃষ্টান শক্তি এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। তাদের লক্ষ্য ছিল জারাগোসা নগরীর নিয়ন্ত্রণ। তবে ৪৭৯ হিজরীতে যখন সংবাদ পৌঁছল যে মাগরেব থেকে মুরাবিতী বাহিনী আসছে, তখন আলফোন্সো জারাগোসার অবরোধ তুলে নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন।
৪৮৫ হিজরীতে সাল্লাকা প্রান্তরে মুরাবিতী ও আন্দালুসী সম্মিলিত বাহিনীর কাছে পরাজিত হওয়ার পর ক্যাসটিলার খৃষ্টান বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। মুসতাঈন একে সুযোগ মনে করে আলমেরিয়া শহর পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করেন কিন্তু তা সফল হয়নি। পরবর্তীতে খৃষ্টান সেনাপতি এল-সিদ আলমেরিয়া দখল করে নেন। দীর্ঘ অবরোধে বিপর্যস্ত আলমেরিয়াবাসী ৪৮৮ হিজরীতে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। মুসতাঈন এরপরও টিঁকে থাকার চেষ্টা করেন। ৫০৩ হিজরীতে (১১১০ খ্রিস্টাব্দে) আরাগোন-এর নৃপতি প্রথম আলফোন্সোর সঙ্গে ভ্যালটিয়েরা (Valtierra) যুদ্ধে মুসতাঈন নিহত হন।
টিকাঃ
৬৮. ইবন সাঈদ আল-আন্দালুসী, ২/৬৭।
৬৯. ইবনুল আছীর, আল-কামেল, ৫/২৮৭।
৭০. ইবনুল আছীর, ৫/৩৩৪-৩৩৫।
৭১. ইবনুল আছীর, ২/২৮৭; ইবন খালদুন, ৪/১৩৬।