📄 উযীর আবুল হাযম বিন জাহওয়ার
আবুল হাযম বিন জাহওয়ারের পরিবার উমাইয়া প্রশাসক আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়ার সময় থেকেই আন্দালুসে একটি সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। তাঁর ঊর্ধ্বতন পুরুষ ইউসুফ বিন বখত ছিলেন খলীফা আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের মাওলা। আবুল হাযম নিজে আমিরিয়া সাম্রাজ্যের শেষ প্রতিনিধি আবদুর রহমান সানজুলের আমলে সরকারি কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধীমান, সাহসী এবং জাতীয় দুর্যোগে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম এক ব্যক্তিত্ব। কর্ডোভাবাসীরা তাঁকে ‘আমীদুল জামাআহ’ বা উযীর হিসেবে বরণ করে নেয়। উযীর ফাতহ বিন খাকান তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন যে, আবুল হাযম ছিলেন অত্যন্ত বিচক্ষণ; তিনি অস্থিরতাকে বশ করতে জানতেন এবং ফিতনার সময়ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিতেন।
টিকাঃ
(১) জুম্মাহ, জাহওয়াতুল মুকতাবাস, ৬/৩৪৩; ইবনে আযারী, ১/৩২১-৩২২।
(২) আল-মাগরিবী, আল-হুলাল, ২/১০৪।
📄 আবুল হাযম বিন জাহওয়ারের শাসনামল
কর্ডোভা প্রশাসক নির্বাচিত হওয়ার পর আবুল হাযম যে রীতি অবলম্বন করেন, তা তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার প্রমাণ দেয়। তিনি কর্ডোভা রাষ্ট্রের সীমানা উত্তরে সিয়েরা মোরেনা পর্বতমালা থেকে দক্ষিণে গ্রানাডার সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত রাখেন। প্রশাসন পরিচালনায় তিনি একক ক্ষমতা নিজের হাতে না রেখে সাবেক উযীর ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে একটি ‘মজলিসে শুরা’ বা মন্ত্রিপরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদের অনুমোদন ব্যতীত তিনি কোনো সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি নিজেকে ‘সুলতান’ বা ‘রাজা’ না বলে ‘পরিষদ পরিচালক’ হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তিনি রাজপ্রাসাদে থাকতেন না এবং সরকারি কোষাগার নিজের অধীনে না রেখে বিশ্বস্ত দায়িত্বশীলদের হাতে অর্পণ করেছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ ছিলেন এবং জুমার নামাজে সাধারণ মানুষের সাথে জামায়াতে শরিক হতেন।
টিকাঃ
৫৮. হুমায়রী, ১/৪৮; ইবনে আযারী, ১/১৭৬; ড. মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ ইনান, ৫/২২-২৩।
📄 আবুল হাযমের স্বরাষ্ট্রনীতি
আবুল হাযম যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন কর্ডোভার নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল। তিনি প্রথমেই আইন-শৃঙ্খলা জোরদার করেন এবং অপরাধীদের কঠোর হাতে দমন করেন। অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য তিনি বিলাসিতা ও অপচয় বন্ধ করে দেন। ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে তিনি বিনা সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেন, যা দিয়ে তারা ব্যবসায় বিনিয়োগ করত। তাঁর এই সময়োপযোগী পদক্ষেপের ফলে কর্ডোভায় খুব দ্রুত শান্তি ও সচ্ছলতা ফিরে আসে। বিচারব্যবস্থার সংস্কারের ফলে মানুষের মাঝে ন্যায়বিচার সুনিশ্চিত হয় এবং কর্ডোভা একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়। ঐতিহাসিক ইবনে হাইয়ান তাঁর এই সাফল্যের প্রশংসা করে একে একটি ‘ঐতিহাসিক বিপ্লব’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
টিকাঃ
৬১. হুমায়রী, ১/২৯; ইবনে বাসসাম, ১/৪০৫-৪০৬; ইবনুল আব্বার, ১/৩-৬।
📄 আবুল হাযমের পররাষ্ট্রনীতি
আবুল হাযম বিন জাহওয়ারের পররাষ্ট্রনীতি ছিল শান্তি ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। তিনি প্রতিবেশী ক্ষুদ্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন। যখনই কোনো দুই রাষ্ট্রের মধ্যে বিবাদ দেখা দিত, তিনি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে এগিয়ে আসতেন। তাঁর দূরদর্শিতার কারণে কর্ডোভা রাষ্ট্র যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি থেকে মুক্ত ছিল। তিনি বড় রাষ্ট্রগুলোর প্রভাব-প্রতিপত্তি স্বীকার করেও নিজের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতেন।