📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুখোমুখি সুলাইমান-মাহদী : অতি-বিস্ময়কর ঘটনা!

📄 মুখোমুখি সুলাইমান-মাহদী : অতি-বিস্ময়কর ঘটনা!


ঘটনাপ্রবাহ আপন গতিতে এগিয়ে চলল। পরাজিত মাহদী ফেরারী হয়ে চলে গেলেন উত্তর দিকে। টরটোসা পৌঁছার পর থেকে মাহদী ভাবতে লাগলেন তাঁর হারানো শাসনক্ষমতার কথা। এ লক্ষ্যে তিনি এবার আমিরিয়া গোষ্ঠীর সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। পরাজিত অবস্থায় মাহদী আমিরিয়া বংশের জনৈক কর্মকর্তার দেখা পেলেন, যাঁকে 'পরিচালক ওয়াজিহ' নামে ডাকা হতো। ওয়াজিহ মাহদীকে আশ্বাস দিলেন যে, তিনি তাঁকে ক্ষমতা ফিরে পেতে সহায়তা করবেন। কিন্তু তাঁরা অনুভব করলেন যে, সুলাইমান বিন হাকাম ও বার্বারদের বিশাল শক্তির সামনে তাঁরা অটল থাকতে পারবেন না। তাই তাঁরা বার্সেলোনার খৃষ্টান শাসকের সহায়তা কামনার সিদ্ধান্ত নিলেন। বার্সেলোনার প্রশাসক কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে মাহদী ও ওয়াজিহকে সহায়তা করতে সম্মত হলেন। শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত লাঞ্ছনাদায়ক ও অপমানজনক। যেমন:

১. যুদ্ধের প্রতিদিনের জন্য বার্সেলোনা-প্রশাসককে একশ' স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করতে হবে।
২. বার্সেলোনার প্রতিটি সৈনিককে প্রতিদিন একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে।
৩. যুদ্ধলব্ধ সকল অস্ত্র ও সম্পদ বার্সেলোনা-প্রশাসক লাভ করবেন।
৪. মুসলিম আন্দালুসের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত শহর 'সালিম' বার্সেলোনা-প্রশাসকের হাতে সমর্পণ করতে হবে।

ঐতিহাসিক ইবনে আযারী লিখেছেন, মাহদী সালিম নগরীতে খৃষ্টান বাহিনীর প্রবেশের অনুমতি দান ও নগরীর কর্তৃত্ব তাদের হাতে প্রদান করতে সম্মত হলেন। খৃষ্টান সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই মসজিদে প্রবেশ করল এবং মসজিদের দেওয়ালে একটি ঘণ্টা টাঙ্গিয়ে দিল। তাঁরা আরও দাবি জানাল যে, বার্বারদের জান-মাল ও নারী সবই বার্সেলোনার সৈনিকদের জন্য বৈধ হবে। অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে মাহদীর দল জয়লাভ করল আর পরাজিত সুলাইমান পালিয়ে গেলেন। মাহদী নতুন করে লাভ করলেন শাসনক্ষমতা; কিন্তু বিনিময়ে হারালেন তাঁর আত্মমর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।

টিকাঃ
৩৩০. দেখুন : ইবন আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৫/৬৪।
৩৩১. দেখুন : ইবন আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৫/৬৪।
৩৩২. ইবনে আযারী, ৫/৬৪ ও ইবনুল খতীব, পৃ : ১১৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দৃশ্যপটে ওয়াযিহ ও পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকাম

📄 দৃশ্যপটে ওয়াযিহ ও পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকাম


নতুন করে ক্ষমতা দখল করার পর মাহদী পুনরায় বারবারদের পেছনে লাগলেন এবং খৃষ্টান শক্তির সহায়তায় তাদের হত্যা ও সম্পত্তি হরণ করতে লাগলেন। কর্ডোভাবাসী এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মাহদী প্রশাসনের হাজিব ওয়াযিহের শরণাপন্ন হলো এবং মাহদীকে হত্যা করার জন্য তাকে প্ররোচিত করতে লাগল। কিছুদিন পরই ওয়াযিহ মাহদীর বিরুদ্ধে চাল চাললেন এবং তাঁকে হত্যা করে নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলেন। ওয়াযিহ জানতেন যে, জনগণ বনু উমাইয়াদের কাউকে খলীফা আসনে দেখতে অভ্যস্ত। তাই তিনি পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকামকে পুনরায় খলীফা হিসেবে সমাসীন করলেন। হিশাম বিন হাকাম নতুন করে খেলাফতের পদে বসলেন; কিন্তু এবারও তাঁর হাতে প্রকৃত কোনো ক্ষমতা ছিল না। ক্ষমতার প্রকৃত বাগডোর রয়ে গেল 'হাজিব' ওয়াযিহের হাতে।

টিকাঃ
৩৩৩. ইবনে আযারী, ৫/৬৭; ইবনুল খতীব, পৃ: ১১৫; ইবনে খালদুন, ৪/১৫ ও মাক্কারী, ১/১৬৪।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 সুলাইমান বিন হাকামের গৃহীত কিছু পদক্ষেপ, ইতিহাস যার স্মরণে আজও ব্যথিত ও বিক্ষুব্ধ

📄 সুলাইমান বিন হাকামের গৃহীত কিছু পদক্ষেপ, ইতিহাস যার স্মরণে আজও ব্যথিত ও বিক্ষুব্ধ


সুলাইমান বিন হাকাম পালিয়ে গিয়ে পুনরায় ক্ষমতা দখলের জন্য চক্রান্ত করতে লাগলেন। তিনি ক্যাস্টেলার খৃষ্টান শাসকের সাহায্য প্রার্থনা করলেন। ক্যাস্টেলা-গোষ্ঠীকে নিজেদের পক্ষে টানতে হিশাম-ওয়াযিহ প্রশাসন ক্যাস্টেলার হাতে এমন দু'শটি দুর্গ ছেড়ে দিল, যা ইতঃপূর্বে খলীফা হাকাম ও হাজিব আলমানসুর জয় করেছিলেন। এই সিদ্ধান্তটি ছিল মুসলিম আন্দালুসের জন্য বড় দুর্ভাগ্যের বিষয়। ৪০২ হিজরীতে সুলাইমান বিন হাকাম বার্বারদের সঙ্গে নিয়ে কর্ডোভায় হামলা করলেন এবং ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালালেন। এরপর তিনি পুনরায় শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন। খলীফা হিশাম বিন হাকাম পালিয়ে গেলেন কিংবা নিহত হলেন। কর্ডোভা যদিও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল, কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা তখন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল।

টিকাঃ
৩৩৪. ইবনে আযারী, ৫/৬৭; ইবনুল খতীব, পৃ: ১১৫ ও মাক্কারী, ১/১৬৪।
৩৩৫. দেখুন : ইবন আযারী, ৫/৬৯; ইবনুল খতীব, পৃ: ১১৮ ও ইবনে খালদুন, ৪/১৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 সুলাইমানের বিরুদ্ধে বার্বারদের বিদ্রোহ : নতুন সংঘাত

📄 সুলাইমানের বিরুদ্ধে বার্বারদের বিদ্রোহ : নতুন সংঘাত


৪০৩ হিজরীতে সুলাইমান বিন হাকাম বার্বারদের সহায়তায় শাসনভার গ্রহণ করলেন। কিন্তু এক বছর পরই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হলো। সিউটা নগরীর প্রশাসক আলী বিন হামুদ বিদ্রোহ ঘোষণা করলেন। তিনি দাবি করলেন যে, সাবেক খলীফা হিশাম বিন হাকাম তাঁকে খেলাফতের দায়িত্ব পালনের ফরমান দিয়েছেন। ৪০৭ হিজরীতে আলী বিন হামুদ ও সুলাইমানের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে আলী বিন হামুদ জয়লাভ করলেন এবং কর্ডোভার সিংহাসন দখল করলেন। আলী বিন হামুদ ক্ষমতায় বসেই সুলাইমান, তাঁর ভাই এবং তাঁদের বৃদ্ধ পিতা হাকামকে হত্যা করলেন। এরপর তিনি 'নাসির' উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন। এর মাধ্যমেই উমাইয়া সালতানাতের পরিবর্তে আন্দালুসে 'হামুদী' রাজবংশের শাসনের সূচনা হলো। আলী তাঁর ভাই কাসিম বিন হামুদকে সেভিলের প্রশাসক নিযুক্ত করেন।

টিকাঃ
১. ইবনে খালদুন, আল-মুকাদ্দিমা, ৭/১৬১।
২. ইবনে খালদুন, ১/২১১।
৩. ইবনে খালদুন, ৬/৩৬২।

ফন্ট সাইজ
15px
17px