📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 উমাইয়া খেলাফতের পতন

📄 উমাইয়া খেলাফতের পতন


হিশাম ইবনুল হাকাম বিন আবদুর রহমান এবং মাহদী উপাধি গ্রহণকারী মুহাম্মদ বিন হিশাম বিন আবদুর জাব্বারের খেলাফতপ্রাপ্তির পর আন্দালুসের শাসনব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ল। মাহদী ছিলেন নামমাত্র খলীফা, রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসন নিয়ন্ত্রণের কোনো ক্ষমতাই তাঁর ছিল না। ক্ষমতা প্রাপ্তির পর প্রথমেই তিনি যা করলেন, তা হলো:

১. প্রশাসনের বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত আমিরিয়া বংশোদ্ভূত সকল লোককে তিনি বরখাস্ত করলেন, তাঁদেরকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নির্বাসিত করলেন এবং আমিরিয়াদের ধন-সম্পদ ও ইজ্জত-আব্রুর ওপর বিভিন্ন হামলা চালালেন। আমিরিয়া গোষ্ঠী ও পরিবারের লোকজন এমন নির্যাতন ও সম্পদহরণের শিকার হলো যে, জনসাধারণ আমিরিয়া শাসনতন্ত্রের কথা স্মরণ করে তাদের জন্য করুণা প্রার্থনা করতে লাগল। তিনি আলমানসুর প্রতিষ্ঠিত মদিনাতুয যাহিরা নগরী ধ্বংস করে ফেললেন এবং সেখানে অবাধ লুটতরাজ করার অনুমতি দিলেন। নির্বোধ শ্রেণির দুষ্ট লোকেরা উন্মত্ত হয়ে মদিনাতুয যাহিরার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো নগরীকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করল। কিছুদিন পূর্বেও যে নগরী ছিল জৌলুস ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, সামান্য সময়ের ব্যবধানে তা এমন এক বিরান নগরীতে পরিণত হলো যে, মনে হচ্ছিল গতকালও এখানে কিছুই ছিল না।

২. আন্দালুস সেনাবাহিনী হতে তিনি সাত হাজার সেনাকে ছাঁটাই করলেন। স্বাভাবিকভাবেই এই বিশৃঙ্খলাসমূহ খেলাফতের জন্য বিপজ্জনক হয়ে গেল।

৩. বারবারদের প্রতি তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও অবজ্ঞাসূচক আচরণ করতে লাগলেন। ফলে সাধারণ জনগণও তাঁদের সঙ্গে ধৃষ্টতামূলক ব্যবহার শুরু করল। বারবাররা ক’দিন পূর্বেও ছিল সালতানাত ও প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ; তাছাড়া তাঁরা ছিল সংখ্যা ও ক্ষমতার বিচারে তৎকালীন আন্দালুসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু নব্য উমাইয়ারা তাঁদের প্রতি প্রসন্ন ছিল না, কারণ বারবাররা ছিল বিলুপ্ত আমিরিয়া সালতানাতের মূল স্তম্ভ। তাঁদের প্রতি কঠোরতার বিষয়টি মাহদী গোপন রাখলেন না; বরং প্রকাশ্যে তাঁদের প্রতি কঠোরতা করতে লাগলেন; এমনকি একবার তিনি ঘোষণা করলেন, যে ব্যক্তি কোনো বারবারকে হত্যা করবে, সে সরকারের পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভ করবে। এ ঘোষণার পর জনগণ বারবারদের হত্যা ও লুণ্ঠনে মেতে উঠল। মাহদীর অকর্মণ্য আচরণের কারণে পূর্ব থেকেই বারবাররা বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এ ঘোষণার পর নতুন করে যে অরাজকতা সৃষ্টি হলো, তাতে বারবারদের ক্রোধ আরও বৃদ্ধি পেল এবং তাঁরা পুরোদমে বিদ্রোহের প্রস্তুতি নিল।

মাহদীর এই অনুদার আচরণের ফলে সর্বদিকে সকল জাতি-গোষ্ঠীর মাঝে মাহদীর বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলো। বিদ্রোহের একপর্যায়ে মাহদী বনূ আমিরিয়ার শক্তিশালী অংশের আক্রমণের মুখে পড়েন। শেষমেশ তাঁরা সুলাইমান বিন হাকাম বিন সুলাইমান বিন আবদুর রহমানের দিকে ধাবিত হলো এবং তাঁকে নিজেদের নেতা নির্বাচন করে 'আলমুসতাইন বিল্লাহ' উপাধি প্রদান করল।

টিকাঃ
৯৫৮. ইবনুল আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮০।
৯৫৯. ইবনে আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮১।
৯৬০. ইবনুল আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮২-৮৩; ইবনুল আ’বীর, আল-কামিল, ৭/২২৩ ও তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১৫০।
৯৬১. ইবনুল আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮২।
৯৬২. ইবনুল আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮৩।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুখোমুখি মাহদী-সুলাইমান : এক বিস্ময়কর ঘটনা

📄 মুখোমুখি মাহদী-সুলাইমান : এক বিস্ময়কর ঘটনা


শুরু হলো দু' পক্ষের মধ্যে প্রচণ্ড সংঘাত। একদিকে কর্ডোভা নিয়ন্ত্রণকারী মাহদী, অন্যদিকে বারবারদের মদদপুষ্ট সুলাইমান বিন হাকাম। এর পূর্বে বারবাররা খেলাফতের আরেক দাবিদার হিশাম বিন সুলাইমানকে সহায়তা করার পরিকল্পনা করেছিল; কিন্তু বিষয়টি জানতে পেরে মাহদী হিশাম ও তাঁর ভাইকে গ্রেফতার করেন এবং উভয়কে হত্যা করেন। তখন তাঁদের চাচাতো ভাই সুলাইমান বিন হাকাম কর্ডোভা থেকে পালিয়ে বারবারদের কাছে চলে যান। বারবাররা এবার তাঁর হাতেই বাইয়াত গ্রহণ করে এবং তাঁকে 'মুসতাইন বিল্লাহ' উপাধি প্রদান করে।

সুলাইমান বিন হাকাম ও তাঁর সঙ্গী বারবাররা উপলব্ধি করল যে, মাহদীর নেতৃত্বাধীন কর্ডোভা বাহিনীর তুলনায় তাঁদের সামরিক শক্তি অনেক দুর্বল। এ দুর্বলতা দূর করতে তাঁরা এমন এক বিস্ময়কর সিদ্ধান্ত নিল, যা ইতঃপূর্বে আন্দালুসের ইতিহাসে কখনো করা হয়নি। নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করতে তাঁরা ক্যাস্টিলার খৃষ্টান শাসকের কাছে সহায়তা চাইল। এই ক্যাস্টিলা রাষ্ট্রের কাছে সুলাইমান বিন হাকাম ও বারবার সঙ্গীরা মাহদীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য সাহায্য চাইল। ক্যাস্টিলা রাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট সুলাইমানের নেতৃত্বাধীন বারবার বাহিনীর সঙ্গে মাহদীর বাহিনীর প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে মাহদী পরাজিত হলেন। আন্দালুসের ক্ষমতার লাগাম চলে গেল সুলাইমান বিন হাকামের হাতে। যে ক্যাস্টিলা রাষ্ট্র কদিন পূর্ব পর্যন্তও অধিকাংশ সময় মুসলমানদের জিজিয়া প্রদানের মাধ্যমে বশ্যতা স্বীকার করে নিত, তারাই এখন আন্দালুসের মুসলমানদের পরস্পর গৃহযুদ্ধে লিপ্ত করার ও আন্দালুস ভূমিতে নিজেদের সেনাবাহিনী স্থাপন করার সুযোগ পেয়ে গেল।

প্রকৃতপক্ষে এই অস্থির সময়ের সূচনা হয়েছিল ৩৯৭ হিজরীতে হিশাম বিন হাকামের মাধ্যমে। এরপর পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় আরোহণ করলেন মাহদী ও সুলাইমান বিন হাকাম। সুলাইমান ক্যাস্টিলা-ভূপতির প্রত্যক্ষ সহায়তায় ৪০০ হিজরীতে (১০১০ খৃষ্টাব্দে) ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন।

টিকাঃ
৯৬৩. ইবন খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১৫০।
৯৬৪. ইবনে আ’খারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৩/৮৩; ইবনে খালদুন, ৪/১৫০ ও মাক্কারী, ১/৪৫৮।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 মুখোমুখি সুলাইমান-মাহদী : অতি-বিস্ময়কর ঘটনা!

📄 মুখোমুখি সুলাইমান-মাহদী : অতি-বিস্ময়কর ঘটনা!


ঘটনাপ্রবাহ আপন গতিতে এগিয়ে চলল। পরাজিত মাহদী ফেরারী হয়ে চলে গেলেন উত্তর দিকে। টরটোসা পৌঁছার পর থেকে মাহদী ভাবতে লাগলেন তাঁর হারানো শাসনক্ষমতার কথা। এ লক্ষ্যে তিনি এবার আমিরিয়া গোষ্ঠীর সাহায্য নেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। পরাজিত অবস্থায় মাহদী আমিরিয়া বংশের জনৈক কর্মকর্তার দেখা পেলেন, যাঁকে 'পরিচালক ওয়াজিহ' নামে ডাকা হতো। ওয়াজিহ মাহদীকে আশ্বাস দিলেন যে, তিনি তাঁকে ক্ষমতা ফিরে পেতে সহায়তা করবেন। কিন্তু তাঁরা অনুভব করলেন যে, সুলাইমান বিন হাকাম ও বার্বারদের বিশাল শক্তির সামনে তাঁরা অটল থাকতে পারবেন না। তাই তাঁরা বার্সেলোনার খৃষ্টান শাসকের সহায়তা কামনার সিদ্ধান্ত নিলেন। বার্সেলোনার প্রশাসক কয়েকটি শর্ত সাপেক্ষে মাহদী ও ওয়াজিহকে সহায়তা করতে সম্মত হলেন। শর্তগুলো ছিল অত্যন্ত লাঞ্ছনাদায়ক ও অপমানজনক। যেমন:

১. যুদ্ধের প্রতিদিনের জন্য বার্সেলোনা-প্রশাসককে একশ' স্বর্ণমুদ্রা প্রদান করতে হবে।
২. বার্সেলোনার প্রতিটি সৈনিককে প্রতিদিন একটি করে স্বর্ণমুদ্রা দিতে হবে।
৩. যুদ্ধলব্ধ সকল অস্ত্র ও সম্পদ বার্সেলোনা-প্রশাসক লাভ করবেন।
৪. মুসলিম আন্দালুসের উত্তর-পূর্ব সীমান্ত শহর 'সালিম' বার্সেলোনা-প্রশাসকের হাতে সমর্পণ করতে হবে।

ঐতিহাসিক ইবনে আযারী লিখেছেন, মাহদী সালিম নগরীতে খৃষ্টান বাহিনীর প্রবেশের অনুমতি দান ও নগরীর কর্তৃত্ব তাদের হাতে প্রদান করতে সম্মত হলেন। খৃষ্টান সৈন্যরা শহরে প্রবেশ করে প্রথমেই মসজিদে প্রবেশ করল এবং মসজিদের দেওয়ালে একটি ঘণ্টা টাঙ্গিয়ে দিল। তাঁরা আরও দাবি জানাল যে, বার্বারদের জান-মাল ও নারী সবই বার্সেলোনার সৈনিকদের জন্য বৈধ হবে। অবশেষে উভয় পক্ষের মধ্যে ঘোরতর যুদ্ধ সংঘটিত হলো। যুদ্ধে মাহদীর দল জয়লাভ করল আর পরাজিত সুলাইমান পালিয়ে গেলেন। মাহদী নতুন করে লাভ করলেন শাসনক্ষমতা; কিন্তু বিনিময়ে হারালেন তাঁর আত্মমর্যাদা ও গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।

টিকাঃ
৩৩০. দেখুন : ইবন আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৫/৬৪।
৩৩১. দেখুন : ইবন আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৫/৬৪।
৩৩২. ইবনে আযারী, ৫/৬৪ ও ইবনুল খতীব, পৃ : ১১৫।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দৃশ্যপটে ওয়াযিহ ও পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকাম

📄 দৃশ্যপটে ওয়াযিহ ও পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকাম


নতুন করে ক্ষমতা দখল করার পর মাহদী পুনরায় বারবারদের পেছনে লাগলেন এবং খৃষ্টান শক্তির সহায়তায় তাদের হত্যা ও সম্পত্তি হরণ করতে লাগলেন। কর্ডোভাবাসী এ পরিস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে মাহদী প্রশাসনের হাজিব ওয়াযিহের শরণাপন্ন হলো এবং মাহদীকে হত্যা করার জন্য তাকে প্ররোচিত করতে লাগল। কিছুদিন পরই ওয়াযিহ মাহদীর বিরুদ্ধে চাল চাললেন এবং তাঁকে হত্যা করে নিজেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে লাগলেন। ওয়াযিহ জানতেন যে, জনগণ বনু উমাইয়াদের কাউকে খলীফা আসনে দেখতে অভ্যস্ত। তাই তিনি পদচ্যুত খলীফা হিশাম বিন হাকামকে পুনরায় খলীফা হিসেবে সমাসীন করলেন। হিশাম বিন হাকাম নতুন করে খেলাফতের পদে বসলেন; কিন্তু এবারও তাঁর হাতে প্রকৃত কোনো ক্ষমতা ছিল না। ক্ষমতার প্রকৃত বাগডোর রয়ে গেল 'হাজিব' ওয়াযিহের হাতে।

টিকাঃ
৩৩৩. ইবনে আযারী, ৫/৬৭; ইবনুল খতীব, পৃ: ১১৫; ইবনে খালদুন, ৪/১৫ ও মাক্কারী, ১/১৬৪।

ফন্ট সাইজ
15px
17px