📄 আবদুর রহমান বিন আলমানসুরের দায়িত্ব গ্রহণ এবং আমিরিয়া সালতানাতের পতন
সাত বছর দায়িত্ব পালন করার পর ৩৯৯ হিজরীতে (১০০৯ খৃষ্টাব্দে) হাজিব আল-মুজাফ্ফার মৃত্যুবরণ করেন। ক্ষমতার বাগডোর আমিরিয়া বংশোদ্ভূত ব্যক্তিদের হাতে থাকার যে ধারা চলে আসছিল, সেই ধারাবাহিকতায় এরপর হাজিবের পদ গ্রহণ করেন আল-মুজাফ্ফারের ভাই আবদুর রহমান বিন আলমানসুর। তিনিও তাঁর পিতা ও ভাইয়ের মতো আমিরিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে মূলত দেশের শাসনকর্তৃত্ব লাভ করেন। কিন্তু আবদুর রহমান তাঁর পিতা আলমানসুর ও ভ্রাতা আল-মুজাফ্ফার থেকে সম্পূর্ণই ব্যতিক্রম ছিলেন। একে তো তাঁর মাতা ছিলেন নাভারা রাজকুমারী, অর্থাৎ খৃষ্টান নারী। তাকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো চারিত্রিক দৃঢ়তা তাঁর ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই আন্দালুসের মুসলিম জনগণ তাঁকে পছন্দ করতে পারেনি। অধিকন্তু হাজিব পদ গ্রহণ করার পরই আবদুর রহমান এমন একটি কাজ করেন, যা তাঁর পূর্বে তাঁর পিতা বা ভ্রাতা করেননি। তিনি খলীফা হিশাম ইবনুল হাকামকে বাধ্য করেন, যেন আবদুর রহমানকে পরবর্তী খলীফা (অলি আহদ) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ তিনি তাঁর পিতা ও ভাইয়ের মতো হাজিব পদের আড়ালে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাঁর ইচ্ছা ছিল সরাসরি খলীফা হিসেবে আন্দালুসের শাসনক্ষমতার অধিকারী হওয়া। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর এই আচরণে বহু উমাইয়া বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং জনগণের অন্তরে তাঁর প্রতি ক্রোধ দানা বাঁধতে থাকে। আবদুর রহমান আন্দালুসের প্রতিটি প্রদেশে আমিরিয়া বা বার্বারি গোত্রকে শাসক পদে নিয়োগ দিয়ে রেখেছিলেন। আর তারা উমাইয়াদের ওপর নির্যাতন চালাত। আবদুর রহমান যদিও আন্দালুসে বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন; কিন্তু তৎকালীন আন্দালুসের জনগণ ছিল রণক্ষেত্রে পারদর্শী। তারা ক্রমাগত খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলোতে অভিযানে অংশ নিতে অভ্যস্ত ছিল। এই পরিস্থিতিতে আবদুর রহমান যখন মুসলিম বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে উত্তর অভিযানে বের হলেন, তখন জনরোষ চরমে পৌঁছাল। সৈন্যরা বিদ্রোহ করল এবং পদ পরিবর্তনের দাবি তুলল। তারা প্রকাশ্যে এবং জোরপূর্বক খলীফা হিশাম ইবনুল হাকামকে সিংহাসনচ্যুত করল এবং তাঁর পরিবর্তে মুহাম্মাদ বিন হিশাম বিন আব্দুল জাব্বার বিন আব্দুল রহমান আননাসির (আবদুর রহমান আননাসিরের প্রপৌত্র) নামক উমাইয়া রাজপুত্রকে খলীফা হিসেবে নির্বাচন করল। যিনি মাহদী উপাধি ধারণ করলেন। হাজিব আবদুর রহমান বা শাঞ্জুল-এর কাছে এ সংবাদ পৌঁছামাত্র তিনি অভিযানের ময়দান ছেড়ে ফিরে আসার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তাঁর সৈন্যরা তাঁর পক্ষ ত্যাগ করল। আবদুর রহমান শাঞ্জুল পালানোর পথ খুঁজলেন। পরিশেষে মাহদী আবদুর রহমানের উদ্দেশ্যে এক সৈন্যদল প্রেরণ করেন এবং তাকে হত্যা করে তার মস্তক মাহদীর কাছে পাঠিয়ে দেন। কোনো কোনো বর্ণনা মতে, তিনি এক আশ্রমে লুকিয়ে ছিলেন। এরপর উমাইয়াদের একদল লোক তার সন্ধান পেয়ে যায়। প্রাণ বাঁচাতে তিনি মাহদীর স্বীকৃতি প্রদান করেন এবং অনুনয়-বিনয় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন; কিন্তু তারা সামান্যও করুণা না করে তাঁকে হত্যা করে। এর পরপরই পুরো আন্দালুস জুড়ে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ওঠে। আবদুর রহমানের হত্যা এক বিদ্রোহ-বিস্ফোরণের সূচনা করে। সবার জন্য এটি ছিল একটি সুযোগ। যখনই আবদুর রহমান ইবনে আলমানসুর নিহত হলেন, আন্দালুস একটি আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল এবং সর্বত্র অরাজকতা শুরু হল। বিদ্রোহ, বিভক্তি এবং পতনোন্মুখ পরিস্থিতির ঢেউ পুরো আন্দালুসের ওপর আছড়ে পড়ল এবং এই আন্দালুস ভেঙে বিভেদ হয়ে উঠল।
টিকাঃ
৫৮১. ইবনে আ’ধারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ৬/৩৪ ও ইবনুল খতীব, আল-ইহাতা আল-মু’য, পৃ: ৩৮।
৫৮২. ইবনুল খতীব, আল-ইহাতা আল-মু’য, পৃ: ৩৮, তারিখ ইবনে খালদুন, ৪/৪৯৪ ও মা’কাবী, আল- ফাওয়াহ, ১/২৪৩।
৫৮৩. ইবনুল খতীব, আল-ইহাতা আল-মু’য, পৃ: ৬১, ইবনে খালদুন, তারিখ ইবনে খালদুন, ৪/৪৮৪ ও মা’কাবী, ফাওয়াহ, ১/২৪১।
৫৮৪. ইবনে আ’ধারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ৬/৭১।