📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আহমাদ বিন আবদুল্লাহ বিন যাকওয়ান রহ.

📄 আহমাদ বিন আবদুল্লাহ বিন যাকওয়ান রহ.


তাঁর পুরো নাম আবুল আব্বাস আহমদ বিন আবদুল্লাহ বিন হারুন বিন যাকওয়ান বিন উবায়দুল্লাহ বিন যাকওয়ান। জন্ম ৩৭২ হিজরী মোতাবেক ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে, মৃত্যু ৪১০ হিজরী মোতাবেক ১০২২ খ্রিস্টাব্দে। তিনি কর্ডোভার প্রধান বিচারপতি (কাজিদুল জামাআহ) ও কেন্দ্রীয় মসজিদের খতীব ছিলেন। আলমানসুর তাঁকে বিচারকের পদে অধিষ্ঠিত করেন। তিনি বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন সফর ও অভিযানে আমিরিয়াদের সঙ্গে থাকতেন। আমিরিয়াদের কাছে তাঁর অবস্থান ও মর্যাদা অনেক উঁচুতে ছিল। রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনিক-সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে আলমানসুর তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতেন। আলমানসুরের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র মুজাফফার ও আবদুর রহমান তাঁর থেকে পরামর্শ গ্রহণ করতেন। মুজাফফারের মৃত্যুর পর তাঁর ভাই আবদুর রহমান তাঁর পদমর্যাদা আরও বৃদ্ধি করেন এবং বিচারক পদের পাশাপাশি তাঁকে উযীরের পদও প্রদান করেন। এককথায় আহমাদ বিন যাকওয়ান সমকালীন আন্দালুসের নেতৃস্থানীয় ও শীর্ষ ব্যক্তিদের একজন ছিলেন এবং প্রশাসনের অত্যন্ত প্রভাবশালী ও উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

টিকাঃ
৩৯৫. ড. রাগিব সারজানি, তারীখু উলুমিল আন্দালুস, পৃ: ৮৩ ও খাধরী, তারীখুল ইসলাম, ২৮/৬১২।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনে জুলজুল রহ.

📄 ইবনে জুলজুল রহ.


তাঁর নাম আবু দাউদ সুলাইমান বিন হাসসান। প্রসিদ্ধ ছিলেন ইবনে জুলজুল নামে। জন্ম ৩৩২ হিজরী মোতাবেক ৯৪৩ খৃষ্টাব্দে, মৃত্যু ৩৭৭ হিজরীর (৯৮৭ খৃষ্টাব্দে) পরে। তিনি ছিলেন দক্ষ চিকিৎসক এবং ভেষজ ঔষধ বিষয়ে পারদর্শী। চিকিৎসাবিদ্যার প্রাচীনতম গ্রন্থ ডিয়োস্কোরিডাস (Dioscorides)-এর গ্রন্থ সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞান ছিল। ভেষজ ঔষধ ও প্রকৃতি বিজ্ঞানের এ বইটি উমাইয়া আমলে বাগদাদে আরবী অনুবাদিত হয়েছিল। কিন্তু অনুবাদের সময় গ্রিক ভাষায় লেখা মূল গ্রন্থটির অনেক শব্দের মর্মার্থ দুর্বোধ্য থাকায় আরবী না করে গ্রিক ভাষায় রেখে দেওয়া হয়েছিল। এ গ্রন্থ সংক্রান্ত ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ইবনে জুলজুল বলেন,

চিকিৎসকগণ এ গ্রন্থটির কেবল আরবী অংশ থেকে উপকৃত হতেন। আন্দালুসে যখন আবদুর রহমান আননাসিরের শাসনকাল চলছিল, তখন তৎকালীন কন্সট্যান্টিনোপল সাম্রাজ্যের অধিপতি রোমানুস (Romanus II) সমতলীনে আন্দালুসের খলীফা আননাসিরের সঙ্গে পত্র যোগাযোগ করেন এবং বিভিন্ন মূল্যবান উপহারসামগ্রী প্রেরণ করেন। এসব উপহারের মধ্যে (ভেষজশাস্ত্রে ব্যবহৃত) বিভিন্ন উদ্ভিদের বিষয়বলি সম্বলিত ডিয়োস্কোরিডাস গ্রন্থটির একটি অনুলিপিও ছিল। গ্রন্থটি গ্রিক ভাষায় লিখিত ছিল। উপহারসামগ্রীর মধ্যে আরও ছিল (বিখ্যাত গ্রিক ঐতিহাসিক) হেরোডোটাস (Herodotus)-এর লিখিত গ্রন্থ, যা প্রাচীন জাতি ও রাষ্ট্রসমূহ সম্পর্কে ল্যাটিন ভাষায় রচিত এক আশ্চর্য ইতিহাসগ্রন্থ। আর আন্দালুসে ল্যাটিন ভাষা জানে, এমন লোক কম ছিল। এরপর আন্দালুসের খলীফা কন্সট্যান্টিনোপল অধিপতি রোমানুসের সঙ্গে পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন এবং গ্রিক ও ল্যাটিন উভয় ভাষায় দক্ষ একজন বিদ্বান ব্যক্তিকে পাঠাতে অনুরোধ করেন। যিনি আন্দালুসে এসে এখানকার চিকিৎসকদের গ্রিক ভাষা শেখাবেন এবং পরবর্তী সময়ে তারা গ্রিক ভাষায় লিখিত চিকিৎসাগ্রন্থটির অনুবাদ করবে। রোমানুস 'সাকুলা' নামক জনৈক পণ্ডিতকে এ উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন। ৩৪৫ হিজরীতে সাকুলা কর্ডোভায় পৌঁছলেন। তিনি ডিয়োস্কোরিডাস চিকিৎসাগুহের দুর্বোধ্য অংশগুলোর মর্মোদ্ধার করেন। আন্দালুসের তখন অনেক সুদক্ষ ও প্রাজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় গ্রন্থটির আরবী রূপ পূর্ণতা লাভ করে। আমি পণ্ডিত সাকুলা ও সেসব চিকিৎসকদের দেখেছি এবং তাঁদের সংস্পর্শ থেকে অনেককিছু অর্জন করেছি। পণ্ডিত সাকুলা মুজাফফারের শাসনামলের শুরুর দিকে মারা যান। ইবনে জুলজুলের লেখা গ্রন্থাদির মধ্যে উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল তারীখুল আতিব্বা ওয়াল ফালাসিফা (তথা চিকিৎসক ও দার্শনিকদের জীবনকথা)। এ ছাড়াও তিনি ডিয়োস্কোরিডাস ঐতিহাসিক চিকিৎসাগুহের ওপর কাজ করেছেন এবং তাতে এমন কিছু তথ্য সংযোজন করেছেন, যা স্বয়ং ডিয়োস্কোরিডাসও জানতেন না।

টিকাঃ
৩০৬. ড. রাগিব সারজানি, তারীখুল ইসলাম, ২৭/২৯১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আন্দালুসে গণিতশাস্ত্রের পথিকৃৎ মাসলামা আলমাশরীইতি রহ.

📄 আন্দালুসে গণিতশাস্ত্রের পথিকৃৎ মাসলামা আলমাশরীইতি রহ.


বিখ্যাত দার্শনিক, গণিতজ্ঞ, রসায়নবিদ ও জ্যোতির্বিদ আল মাজরীতীর পুরো নাম আবুল কাসিম মাসলামা বিন আহমদ বিন কাসিম বিন আব্দুল্লাহ আল মাজরীতী। জন্ম ৩৩৮ হিজরীতে (৯৫৯ খৃষ্টাব্দে) মাজরীত (বর্তমান স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ) শহরে। তিনি আন্দালুসের গণিত-শাস্ত্রজ্ঞদের ইমাম ছিলেন এবং জ্যোতির্বিদ্যা ও তারকা-গণিতবিদ্যাতে সমকালীন আন্দালুসের সবচেয়ে সেরা আলেম ছিলেন। তিনি অন্যান্য আরও অনেক শাস্ত্রে বুৎপত্তি অর্জন করেছিলেন। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন তাঁর দুটি গ্রন্থের কথা উল্লেখ করেছেন। একটির নাম 'রূহুল হাকীম' (روح الحكيم), যা আন্দালুসের রসায়নবিদদের অন্যতম সেরা গাইড হিসেবে বিবেচিত ছিল; অপর গ্রন্থটির নাম 'গায়াতুল হাকীম' (غاية الحكيم), যা অত্যন্ত বিস্তৃত ও সুবিশাল একটি জ্ঞানকোষ। গ্রহর তত্ত্ব ও ঔষধসমূহ বিষয়ক এ গ্রন্থটি ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ল্যাটিন ভাষায় অনূদিত হয়েছে। উক্ত গ্রন্থটিতে প্রাচীন সভ্যতার ইতিহাস, নবতী, কিবতী, সুরিয়ানী ও ভারতীয়সহ প্রাচীনকালের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক গবেষণা ও আবিষ্কারের ইতিহাস এবং সভ্যতার উন্নতি ও উত্থানে এসব জাতিগোষ্ঠীর উদ্ভাবনী সাধনা ও প্রচেষ্টার ইতিহাস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়াও গ্রন্থটিতে গণিতশাস্ত্র, রসায়নশাস্ত্র, বলবিদ্যা (Mechanics), প্রাকৃতিক ইতিহাস (Natural history), কৃষি-ইতিহাস ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ের মনোজ্ঞ আলোচনা রয়েছে। তিনি জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত একটি গবেষণাপত্র প্রস্তুত করেছিলেন, যা সম্পর্কে সমকালীনদের উক্তি হল, মাসলামা (আলমাজরীতী) ও ইবনুস সামাহ-এর মতো উন্নত গবেষণাপত্র আর কখনো রচিত হয়নি। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আরও কিছু রচনা হল:

• রওজাতুল হাসায়েব
• সিয়াকুল আদাদ
• ইমতিয়াজু তাহলীলুল কাওয়াকিব
• কিতাবুল আসহার
• ইক্রা ইবনুল কুনু বি-মা ইয়া’তূবু

গ্রন্থের লেখক এডওয়ার্ড ড্যানডিক (Edward Cornelius Van Dyck) লিখেছেন, হাকীম মাজরীতী আলকুরুতুবীর অত্যন্ত তথ্যবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা সমৃদ্ধ আরেকটি সংকলন পাওয়া যায় ‘আরাসাইলুল জামিয়া’ (الرسائل الجامعة) নামে। গ্রন্থটি ‘রাসাইলু ইখওয়ানিস সাফা’ (رسائل إخوان الصفا) নামেও খ্যাত। মাজরীতীর এ গ্রন্থটি যদিও মূল 'রাসাইলু ইখওয়ানিস সাফা'-এর অনুলিপিতে রচিত; তবে তা এখনও ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়নি এবং মূল 'রাসাইলু ইখওয়ানিস সাফা'-এর মতো প্রসিদ্ধিও লাভ করতে পারেনি। বিখ্যাত গ্রন্থ প্রণেতা খায়রুদ্দীন যিরিকলী মন্তব্য করেছেন, কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন যে, তিনি রাসাইলু ইখওয়ানিস সাফা-এরও সংকলক; কিন্তু তা সুপ্রমাণিত নয়। আল্লামা মাসলামা মাজরীতী ৪৪৮ হিজরী মোতাবেক ১০৫৫ খৃষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন।

টিকাঃ
৪২৭. ফিবরুনী, আলহাজার, ৭/২২৯।
৪০৮. সুহাদাদ আব্দিল কাসব, মাহবুবাউ আলফাসিফাল ইসলাম, ৫/১১১।
৪০৯. খাধরী, তারীখুল ইসলাম, ২/৯৬৭।
৪০২. এডওয়ার্ড ড্যানডিক, কিতাবুন ফি ফুরূয়িল মালেকিয়্যাহ, পৃ: ১৮৪।
৪০৩. যিরিকলী, আলআলাম, ৭/২৬১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 ইবনুল ফাররাধী রহ.

📄 ইবনুল ফাররাধী রহ.


তার পুরো নাম আবুল ওয়ালিদ আবদুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ বিন ইউসুফ বিন নাসর আলআন্দালুসী। জন্ম ৪০৩ হিজরী মোতাবেক ১০১০ খৃষ্টাব্দে। প্রতিভাবান এ মহান হাকিম ও ইমাম 'ইবনুল ফারাদী' নামে খ্যাত ছিলেন। তিনি ছিলেন একাধারে হাদীসশাস্ত্রে পণ্ডিত, ঐতিহাসিক ও সুসাহিত্যিক। কর্ডোভায় ৪৬২ হিজরী মোতাবেক ১০৬৯ খৃষ্টাব্দে তাঁর মৃত্যু। আন্দালুসের কবি-সাহিত্যিকদের জীবনচরিত সম্পর্কে তিনি একটি গ্রন্থ প্রণয়ন করেছেন। এ ছাড়াও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ রচনা হল, আলমু'তালাফ ওয়াল মুখতুশাফ (المشتهف) ও মুর্দাফাতুল সিসবাহ। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে অন্যতম হলেন মালেকী মাযহাবের বিখ্যাত ইমাম আবু ওমর ইবনে আবদুল বার। ইবনে আবদুল বার তাঁর এই মহান উস্তাদের সম্পর্কে বলেছেন, তিনি ছিলেন ফকীহ, হাদীসশাস্ত্রে পন্ডিত, উস্তাদদের জীবনীকার ও রিজালশাস্ত্রের সকল অংশে যোগ্য আলেম। আমি আমার অধিকাংশ শায়েখের কাছে তাঁর সঙ্গে ইলম অর্জন করেছি। তিনি উন্নত স্বভাবসম্পন্ন, সদাচারী ব্যক্তি ছিলেন। আন্দালুস ইতিহাসে যাঁকে ইমাম হিসেবে গণ্য করা হয়, সেই ইবনে হাইয়্যান তাঁর সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, রেওয়ায়েতের প্রামাণ্যতা, হাদীস সংগ্রহ, ‘রিজাল’ সম্পর্কে বুৎপত্তি এবং বিভিন্ন শাস্ত্র ও সাহিত্যে অপূর্ব দক্ষতা ইত্যাদি বিবেচনায় কর্ডোভায় তাঁর পর্যায়ের কোনো আলেমের দেখা মেলেনি। অন্য সকল আলেমের চেয়ে প্রথম শ্রেণীতে তিনি অনেক অগ্রগণ্য ছিলেন। তিনি বিশুদ্ধ ভাষাভাষী ও সুন্দর হস্তাক্ষরের অধিকারী ছিলেন। ইবনুল ফারাদীর চমৎকার কিছু কবিতা রয়েছে।

টিকাঃ
৪৩০. খাধরী, তারীখুল ইসলাম, ১৭/১৭৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px