📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 এক. রণাঙ্গনের সংগ্রামী সৈনিক

📄 এক. রণাঙ্গনের সংগ্রামী সৈনিক


মুহাম্মাদ বিন আবু আমির মোট চুয়াল্লিশটি যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহণ করেছিলেন; কিন্তু এর একটিতেও কোনো মুহূর্তে পরাজয়ের সম্মুখীন হননি। এর চেয়েও বিস্ময়ের বিষয় এই ছিল যে, তিনি এসব বিজয়াভিযানে লিন্স ও অন্যান্য খৃষ্টান রাষ্ট্রের এমন সব স্থানেও পৌঁছে গিয়েছিলেন, যেখানে ইতঃপূর্বে অন্য কোনো মুসলিম শাসক এমনকি মুসা বিন নুসায়ের ও তারিক বিন যিয়াদের ন্যায় প্রথম যুগের বিজেতারাও পৌঁছতে পারেননি। উদাহরণস্বরূপ হাজিব আলমানসুর সেই সাখরা অঞ্চলেও পৌঁছেছিলেন, যা ইতঃপূর্বে মুসলিম বাহিনী কর্তৃক বিজিত হয়নি। তিনি বিভিন্ন অভিযানে খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলোর কেন্দ্রে প্রবেশ করে যুদ্ধ করেছেন। এভাবে তিনি উত্তরে বিস্কে উপসাগরে ও আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন। তাঁর এসব অভিযানের কোনোটিই মুসলিম বাহিনীর পতাকা অবনমিত হয়নি, কোনো বাহিনী পরাজয়ের মুখ দেখেনি, মুসলিম বাহিনীর কোনো অংশও হতভম্ব হয়নি। হাজিব আলমানসুরের আমলের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম আন্দালুসে কেবল গ্রীষ্মকালে যুদ্ধাভিযানে বের হওয়ার রীতি প্রচলিত ছিল। কিন্তু হাজিব আলমানসুর প্রতিবছর দু'বার বিজয়াভিযানের উদ্দেশ্যে বের হতেন। তাঁর সময়ে এই অভিযানদ্বয় গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অভিযান নামে খ্যাত ছিল। তাঁর পরিচালিত অভিযানগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সান্ট ইয়াখুবের (Santiago de Compostela) যুদ্ধ। এ নগরীটি আইবেরিয়ান উপদ্বীপের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত ছিল। সমকালীন মুসলিম আন্দালুস থেকে এর দূরত্ব ছিল বিশাল এবং সে অঞ্চল ছিল অত্যন্ত দুর্গম। এ কারণে আলমানসুরের শাসনকালের পূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী এ অঞ্চলে পৌঁছতে পারেনি। অধিকন্তু সুনির্দিষ্টভাবে সেন্ট ইয়াখুব অঞ্চলটি সমকালীন খৃষ্টান জাতির কাছে অত্যন্ত পবিত্র নগরী হিসেবে বিবেচিত ছিল। ইবনে আ'যারী লিখেছেন, সেন্ট ইয়াখুব আন্দালুস ও তৎসংলগ্ন সুবিশাল খৃষ্টান অঞ্চলের খৃষ্টানদের কাছে সবচেয়ে দামি ও পবিত্র স্থান বলে বিবেচিত ছিল। ইবনে আবু আমির যখনই উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলোর রাজধানীতে আক্রমণ করতেন, খৃষ্টান রাজন্যবর্গ এই দুর্গম অঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে মুসলিম বাহিনীর আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করত। এ কারণে ইবনে আবু আমির এ শহরে অভিযান পরিচালনা করে নগরপ্রাচীর ও দুর্গ ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেন এবং খৃষ্টান রাজন্যবর্গকে এ কথা জানিয়ে চিঠি দিলেন যে, পুরো উপদ্বীপে এমন কোনো জায়গা নেই যেখানে তারা আশ্রয় নিতে পারে। ইবনে আবু আমির তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে উত্তরে সেন্ট ইয়াখুবের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। পথিমধ্যে তিনি প্রতিটি দুর্গ ও শহর জয় করলেন এবং বহু যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করলেন। অবশেষে সেন্ট ইয়াখুবে পৌঁছার পর তিনি দেখতে পেলেন পুরো নগরীটি জনশূন্য; কেবল একজন সন্ন্যাসী সেখানে সমাধির পাশে বসে আছে। আলমানসুর তাঁকে অভয় দিলেন এবং তাঁর কোনো ক্ষতি করতে নিষেধ করলেন। তিনি এ নগরীর দুর্গ ও নগরপ্রাচীরগুলো ধ্বংস করে ফেললেও সাধু ইয়াকুবের সমাধির কোনো ক্ষতি করেননি।

টিকাঃ
৪৯০. ইবন আ’যারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/৩১৯; মাক্কারী, ২/১৮৩।
৪৯১. ইবনে আ’যারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ১/২১২।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আলমানসুরের সৈনিকজীবনের উজ্জ্বল কিছু খণ্ডচিত্র

📄 আলমানসুরের সৈনিকজীবনের উজ্জ্বল কিছু খণ্ডচিত্র


হাজিব আলমানসুরের সামরিক জীবন ছিল অত্যন্ত গৌরবময়। তাঁর সৈনিকজীবনের কিছু বিশেষ ঘটনা এখানে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

ক. অপহৃত তিন মুসলিম নারীকে উদ্ধারে বিশাল বাহিনী প্রেরণ: একবার নাফার (Navarre) রাষ্ট্রের রাজা আলমানসুরের সঙ্গে করা চুক্তি ভঙ্গ করে তিনজন মুসলিম নারীকে একটি গির্জায় বন্দী করে রাখে। আলমানসুরের জনৈক দূত নাফার সফরকালে বিষয়টি জানতে পেরে আলমানসুরকে অবহিত করেন। আলমানসুর এই সংবাদ শোনামাত্রই বন্দী নারীদের উদ্ধারের জন্য এক বিশাল বাহিনী প্রেরণ করেন। নাফারের দ্বারপ্রান্তে মুসলিম বাহিনীকে দেখে নাফার-নৃপতি ভীত হয়ে পড়েন এবং জানান যে তারা এই বন্দীদের সম্পর্কে জানতেন না। মুসলিম দূত গির্জা থেকে নারীদের উদ্ধার করেন এবং রাজা বারবার ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

খ. অভিযান শেষে ফেরার পথে খৃষ্টানদের পথরোধ এবং আলমানসুরের অভিনব কৌশল: একবার উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রে অভিযান শেষে ফেরার পথে খৃষ্টান সেনারা একটি সংকীর্ণ গিরিপথ বন্ধ করে মুসলিম বাহিনীর পথ রোধ করে। আলমানসুর অত্যন্ত ধীরস্থিরতার সঙ্গে পুনরায় পেছনের দিকে ফিরে যান এবং খৃষ্টানদের একটি শহর দখল করে সেখানে মুসলিম সেনানিবাস স্থাপন করেন। সেখান থেকে তিনি নিয়মিত আক্রমণ চালিয়ে খৃষ্টানদের নাজেহাল করে দেন। শেষ পর্যন্ত খৃষ্টানরা বাধ্য হয়ে আলমানসুরের কাছে ক্ষমা চায় এবং তাদের পিছু হটার জন্য পথ খুলে দেয়। এমনকি তারা মুসলিম বাহিনীর গণিমত ও রসদ বহনের জন্য পশুপাল ও পরিবহনের ব্যবস্থা করে দিতে বাধ্য হয়।

গ. ঘরে নিয়ে যাওয়ার জন্য রণাঙ্গনে ব্যবহৃত কাপড়ের ধুলো-বালি সংগ্রহ: হাজিব আলমানসুরের অভ্যাস ছিল, প্রতিটি যুদ্ধাভিযান থেকে ফিরে আসার পর তিনি তাঁর রণপোশাক ঝেড়ে নিতেন এবং যে ধুলো-বালি বের হতো, তা একটি বোতলে জমিয়ে রাখতেন। জীবনসায়াহ্নে তিনি অসিয়ত করে গিয়েছিলেন যে, তাঁর মৃত্যুর পর যেন এই ধুলো ভর্তি বোতলটি তাঁর কবরে তাঁর সাথে দিয়ে দেওয়া হয়; যেন কিয়ামতের দিন এই ধুলোবালি আল্লাহর পথে তাঁর সংগ্রামের সাক্ষী হিসেবে কাজ করে।

টিকাঃ
৪৯৯. ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/২৪৪।
৫০০. ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/২৪৬; মাক্কারী, ২/৪০০।
৫০১. ইবনে আযারী, ২/২৪৬।
৫০২. ইবনে মাজা, হাদীস নং ২৭৬৮; নাসায়ী, ৩১১৪।
৫০৩. মাক্কারী, ২/৪১৬।
৫০৪. মুফতী শাফী, ২/২৪৬।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দুই. নাগরিক উন্নয়নের অনন্য রূপকার

📄 দুই. নাগরিক উন্নয়নের অনন্য রূপকার


হাজিব আলমানসুরের শাসনামলের আরেকটি উজ্জ্বলতম দিক হলো তিনি আন্দালুসের বস্তুগত উন্নতি ও নাগরিক সভ্যতার অগ্রযাত্রায় যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি মদিনাতুল যাহিরা নামে নতুন ও আধুনিকতম একটি শহরের পত্তন করেছিলেন। এছাড়াও তিনি কর্ডোভার মসজিদের আমূল সংস্কার করেন এবং মূল আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ অংশ মসজিদে যোগ করেন। মসজিদের পাশে এক মহিলার বাড়ি ছিল যার আঙ্গিনায় একটি খেজুর গাছ ছিল। মহিলাটি তাঁর বাড়ি বিক্রির শর্ত হিসেবে এমন একটি বাড়ি দাবি করেন যাতে খেজুর গাছ থাকবে। আলমানসুর রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে তাকে তাঁর পছন্দমতো বাড়ি কিনে দিয়ে মসজিদের জন্য জায়গাটি সংগ্রহ করেন। আলমানসুরের শাসনামলে কর্ডোভা মসজিদ সমকালীন বিশ্বের বৃহত্তম উপাসনালয়ে পরিণত হয়েছিল। এর পাশাপাশি তাঁর সময়ে জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং শিল্পসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও আন্দালুস উন্নতির শিখরে পৌঁছায়। তাঁর সময়ে পুরো আন্দালুসে কোনো দরিদ্র মানুষ খুঁজে পাওয়া যেত না।

টিকাঃ
৫০৫. ইবনে আযারী, ২/২৫৭।
৫০৬. মাক্কারী, ৪/৪০৬।
৫০৭. ইবনে খালদুন, ৪/৪৯১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 তিন. বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলাযুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার সফল নির্মাতা

📄 তিন. বিদ্রোহ-বিশৃঙ্খলাযুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার সফল নির্মাতা


হাজিব আলমানসুরের শাসনকালের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে দেশে কোনো প্রকার অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ বা অরাজকতা সৃষ্টি হয়নি। এর একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল সেনাপতি গালিবের সাথে তাঁর সংঘাত। তিনি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী নেতৃত্বের মাধ্যমে দেশে শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রেখেছিলেন। তিনি ছিলেন প্রজাদের অধিকারের প্রতি অত্যন্ত সচেতন। একবার একজন সাধারণ গ্রাম্য ব্যক্তি তাঁর দরবারে এক উচ্চপদস্থ সচিবের বিরুদ্ধে সুবিচারের প্রার্থনা নিয়ে আসে। আলমানসুর তৎক্ষণাৎ সচিবকে তলব করেন এবং তাঁকে নির্দেশ দেন তাঁর পদের জাঁকজমক ও ইউনিফর্ম খুলে সাধারণ মানুষের মতো বিচারকের সামনে বসতে। বিচারে সচিব দোষী সাব্যস্ত হলে আলমানসুর তাকে নির্ধারিত শাস্তির দ্বিগুণ দণ্ড প্রদান করেন এবং বলেন যে তাঁর পদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে প্রজাদের ওপর যুলুম করার সাহস যেন আর কেউ না পায়। এভাবেই তিনি এক শান্ত ও সুশৃঙ্খল রাষ্ট্রব্যবস্থা নির্মাণ করেছিলেন।

টিকাঃ
৪৮৯. ইবনুল আছীর, আল-কামেল ফিত-তারীখ, ৫/২৫৯।

ফন্ট সাইজ
15px
17px