📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আযযাহিরা নগরী নির্মাণ

📄 আযযাহিরা নগরী নির্মাণ


আবদুর রহমান আননাসির যেমন নিজ খেলাফতের কেন্দ্র হিসেবে কর্ডোভার উত্তর-পশ্চিম অংশে আয-যাহরা নগরী নির্মাণ করেছিলেন, এবার মুহাম্মাদ বিন আবূ আমির কর্ডোভার পূর্ব অংশে একটি নতুন রাজকীয় নগরীর পত্তন করেন। তিনি এর নামকরণ করেন 'আযযাহিরা' বা 'আলআমিরিয়া নগরী'। এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় ৩৫৯ হিজরীতে। ৩৮৯ হিজরীতে নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হওয়ার পর তিনি সপরিবারে সেখানে স্থানান্তরিত হন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনিক দপ্তর সেখানে স্থানান্তরিত করেন। নিজের বসবাসের জন্য তিনি এ শহরে একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন। ফলে আযযাহিরা নগরী আন্দালুসের কেন্দ্রীয় শহর ও রাষ্ট্রপ্রধানের নিবাসস্থলে পরিণত হয়।

আযযাহিরা নগরী নির্মাণের ফলে মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য একই সঙ্গে বাস্তবায়িত হল। ১. তাঁর ক্ষমতার জন্য মূল হুমকি ও সম্ভাব্য বড় ধরনের কারণ হতে পারে যারা, অর্থাৎ উমাইয়া রাজবংশ এবং খলীফা ও তাঁর মা, তাঁদের অবস্থানস্থল থেকে তিনি নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে সক্ষম হন। ২. এর মাধ্যমে তিনি তাঁর ক্ষমতা ও প্রভাবকে আরও সুদৃঢ় করতে সক্ষম হন। বস্তুত এটি ছিল রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও অন্যান্য বিষয়াদিতে তাঁর একক কর্তৃত্ব অর্জনের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

টিকাঃ
৪৭৮. দেখুন: ইবনে আত'যারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/২৪৯ ও ইবনে খালদুন, আলইবর ফী আখবার, ৪/১৪৭।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 দৃশ্যপটে জাফর বিন হামদূনের আগমন

📄 দৃশ্যপটে জাফর বিন হামদূনের আগমন


৩৭১ হিজরীতে মুহাম্মাদ বিন আবু আমির মাগরেব অঞ্চল থেকে বিখ্যাত যোদ্ধা পুরুষ বনু বায্যাল গোত্রপ্রধান জাফর বিন হামদুনকে আন্দালুসে তলব করেন। মুহাম্মাদ বিন আবু আমির যখন মাগরেবে বিচারক পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তখন থেকেই তাঁদের দু'জনের মাঝে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। আহ্বানে সাড়া দিয়ে জাফর বিন হামদুন আন্দালুসে উপস্থিত হলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু আমির তাঁকে কাছে টেনে নিলেন এবং উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত করলেন। নিসন্দেহে এ পদক্ষেপের ফলে মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরের শক্তি ও ক্ষমতার ভিত্তি আরও সুদৃঢ় হল। কারণ, একদিকে জাফর নিজে একজন বীর পুরুষ ও সুদক্ষ যোদ্ধা, অপরদিকে তিনি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং বারবারদের নেতা। সুতরাং তাঁকে উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত করার অর্থ একই সঙ্গে ব্যক্তি জাফর ও বারবার জাতির শক্তি ও সমর্থন লাভ করা। ইবনে আবু আমির যেহেতু পরবর্তীতে প্রশাসনিক ও সামরিক ক্ষেত্রে বারবারদের সহায়তা গ্রহণ করবেন, তাই বারবার-সমাজে তাঁর প্রভাব, মর্যাদা ও ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়া একান্ত প্রয়োজন ছিল। তবে জাফর বিন হামদুনের আন্দালুসে আগমন এবং এর সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ পরিণতি আন্দালুস সেনাপতি গালিব আননাসিরীর মোটেও অজানা ছিল না। তিনি স্পষ্টই অনুভব করছিলেন যে, জাফরের উপস্থিতি তাঁর জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 গালিব আলনাসিরের বিদ্রোহ

📄 গালিব আলনাসিরের বিদ্রোহ


মুহাম্মাদ বিন আবু আমির এক গ্রীষ্মকালীন অভিযানে ক্যাস্টোলার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। সংবাদ পেয়ে গালিব আননাসিরী তাঁকে আন্তিনিসা (Atienza) নগরের দুর্গে আয়োজিত এক ভোজ অনুষ্ঠানে দাওয়াত করলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু আমির দরবারে উপস্থিত হলে উভয়ের মধ্যে বাদানুবাদ হল এবং উত্তেজিত হয়ে একপর্যায়ে গালিব মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরকে গালি দিয়ে বললেন, 'আরে কুকুর! তুই-ই তো দেশটাকে শেষ করে ফেলেছিস, সুরক্ষিত দুর্গগুলোকে ধ্বংস করেছিস, দেশে নৈরাজ্য কায়েম করেছিস।' এ কথা বলে গালিব তাঁর তরবারি কোষমুক্ত করলেন এবং মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরকে আঘাত করলেন। সৌভাগ্যক্রমে ইবনে আবু আমির আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হলেন এবং দ্রুত দুর্গ থেকে নেমে কর্ডোভায় ফিরে এলেন। গালিব আননাসিরী এই সময় এক আত্মঘাতী ভুল করে বসলেন। মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরের বাহিনীর মোকাবালার জন্য তিনি খৃষ্টান রাষ্ট্র লিওনের নৃপতি তৃতীয় রামিরোর সঙ্গে যোগাযোগ করলেন এবং কর্ডোভার বাহিনীর মোকাবলায় তাঁর সহায়তা চাইলেন।

উভয় বাহিনী মুখোমুখি হল। এক দিকে কর্ডোভা-বাহিনী, যার নেতৃত্বে মুহাম্মাদ বিন আবু আমির ও জাফর বিন হামদুন; অন্যদিকে গালিব আননাসিরী ও খৃষ্টানদের বিশাল সম্মিলিত বাহিনী। গালিব যদিও তখন আশি বছর বয়সে উপনীত হয়েছিলেন, কিন্তু যুদ্ধবিদ্যায় তিনি প্রতিপক্ষের রণনীতি ভেঙে ফেললেন। মুহাম্মাদ বিন আবু আমিরের মুখোমুখি হওয়ার পূর্ব মুহূর্তে গালিব প্রচণ্ড চিৎকার করে বলে উঠলেন, 'হে আল্লাহ! মুসলমানদের জন্য আমি যদি ইবনে আবু আমিরের তুলনায় শ্রেয়তর হয়ে থাকি, তাহলে আমাকে সাহায্য করুন আর যদি সে শ্রেয়তর হয়ে থাকে, তাহলে তাকে সাহায্য করুন!' এরপর গালিব হঠাৎ তাঁর অশ্ব নিয়ে যুদ্ধরত দুই পক্ষের মাঝ থেকে বেরিয়ে দূরে চলে গেলেন। দীর্ঘক্ষণ তাঁর সাড়া না পাওয়ায় সৈন্যরা তাঁকে খুঁজতে বের হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে মৃত অবস্থায় পেল, অথচ তাঁর শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল না। এই আকস্মিক ঘটনার পর গালিবের মুসলিম সৈন্যরা কর্ডোভা বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়ে খৃষ্টানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।

টিকাঃ
৫০১. দেখুন : ইবনে আ'যারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/২৮৯।
৫০২. মাক্বারী, নাফহুত তীব, ৩/৫১।
৫০৩. ইবনে হাইয়ান এ ঘটনা তাঁর পিতা ও তৎকালীন বীর আব্দুল বিন হাইয়ান-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৫০৪. ইবনুল আছীর, আল-কামিলু ফিল তারীখ, ৭/৩৮।

ফন্ট সাইজ
15px
17px