📄 স্থাপত্য ও নির্মাণখাত
খলীফা আবদুর রহমান আননাসিরের শাসনামলে স্থাপত্য খাতে যেসব কাজ হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এবং আলোচিত হলো তাঁর নির্মিত আয-যাহরা নগরী। আয-যাহরা নগরী সে সময়ের সর্বাধুনিক নকশা ও পরিকল্পনাকে সামনে রেখে তৈরি করা হয়েছিল। এ নগরীর নির্মাণকাজের জন্য বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী তিনি কন্সট্যান্টিনোপল, বাগদাদ, তিউনিসিয়া ও ইউরোপ থেকে আমদানি করেছিলেন। পুরো শহরটির নকশা ও পরিকল্পনায় প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগকে। শহরের একটি অংশ ছিল সরকারি প্রহরী, কেরানী ও কর্মচারীদের জন্য। অন্য একটি অংশ ছিল মন্ত্রীবর্গ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত নাগরিকদের জন্য। আর শেষভাগে ছিল খলীফার নিজস্ব রাজপ্রাসাদ।
খলীফা আবদুর রহমান আননাসির নির্মাণ করেছিলেন আয-যাহরা প্রাসাদ। এ প্রাসাদের আভিজাত্য ও সৌন্দর্যের সঙ্গে তুলনা করার মতো কোনো প্রাসাদ সমকালীন বিশ্বে ছিল না। এটি তৎকালীন স্থাপত্যশিল্পের বিস্ময়ে পরিণত হয়েছিল। ইউরোপ ও ইসলামী বিশ্বের প্রতিটি অঞ্চল থেকে মানুষ এটি দেখতে আসত। আয-যাহরা প্রাসাদে ছিল স্বর্ণের কারুকাজ, শ্বেতপাথরের স্তম্ভ এবং বিলাসবহুল জলাশয় ও পানির ফোয়ারা। এ ছাড়াও তাঁর আমলে কর্ডোভা নগরী এক সমৃদ্ধ জনপদে পরিণত হয়। সাধারণ মানুষের বাড়ির সংখ্যা দাঁড়ায় এক লক্ষ তের হাজার এবং মসজিদের সংখ্যা ছিল তিন হাজার। কর্ডোভা মসজিদের আয়তনও এ সময় সম্প্রসারণ করা হয়, যা একে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উপাসনালয়ে পরিণত করে। কর্ডোভা তখন পরিচিতি লাভ করেছিল 'জাওহারুল আলম' বা পৃথিবীর রত্ন হিসেবে।
টিকাঃ
১. ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/২৫; ইবনুল খতীব, আখবারুল আন্দালুস, পৃ: ৩৩; ইবনে খালদূন, ৪/১১৪।
২. মাক্বারী, নফহুত তীব, ১/২৯৯।
৩. মুকাদ্দিমা ইবনে খালদুন, ২/৪০৫।
📄 অর্থনৈতিক খাত
আবদুর রহমান আননাসির রহ.-এর শাসনামলে আন্দালুস অভূতপূর্ব সচ্ছলতা ও প্রাচুর্যের মুখ দেখেছিল। রাষ্ট্রীয় সম্পদের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং বার্ষিক রাজস্ব আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ১০০ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রায়। তিনি রাষ্ট্রীয় আয়কে তিন ভাগে বণ্টন করতেন: এক-তৃতীয়াংশ সামরিক খাতে, এক-তৃতীয়াংশ উন্নয়ন ও প্রশাসনের বেতন-ভাতায় এবং অবশিষ্ট এক-তৃতীয়াংশ আপৎকালীন পরিস্থিতির জন্য সংরক্ষিত রাখা হতো। তাঁর সময়ে কৃষিব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। ধান, আখ, জলপাইসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ বৃদ্ধি পায় এবং রেশম পোকার চাষের জন্য বিশেষ খামার প্রতিষ্ঠিত হয়। রেশম ও সুতা উৎপাদনের জন্য তিনি সুনিপুণ সেচ-ব্যবস্থা ও আধুনিক প্রযুক্তির প্রবর্তন করেছিলেন। স্বর্ণ, রুপা ও তামার মতো খনিজ সম্পদের প্রতিও তিনি বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। পণ্য উৎপাদনের জন্য তিনি অনেকগুলো বড় বাজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
টিকাঃ
১. ইবনে আযারী, ২/২০১; ইবনুল খতীব, পৃ: ৩১।
📄 নিরাপত্তা খাত
পুলিশ প্রশাসন একটি দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবদুর রহমান আননাসিরের শাসনামলে পুলিশ বিভাগকে তিনটি স্তরে বিন্যস্ত করা হয়: উচ্চতর পুলিশ বিভাগ, মধ্যম স্তরের পুলিশ বিভাগ ও নিম্নতর পুলিশ বিভাগ। এ ছাড়াও ৩৯৬ হিজরীতে তিনি বিচারব্যবস্থাকে নতুনভাবে সাজান এবং বিচার বিভাগকে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থেকে স্বতন্ত্র রূপ দান করেন। অভিযোগ গ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য আলাদা আলাদা ব্যবস্থা চালু করেন, যা জনগণের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া সহজতর করে।
📄 আবদুর রহমান আলনাসিরের পররাষ্ট্রনীতি
আবদুর রহমান আননাসিরের সুখ্যাতি সমকালীন বিশ্বের সব দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিল। উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো তাঁর প্রতাপে জিজিয়া প্রদান করতে বাধ্য ছিল। জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো দেশগুলো থেকে রাজদূতরা তাঁর দরবারে আসত। এমনকি সুদূর কনস্টান্টিনোপলের বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের সম্রাটও তাঁর সঙ্গে পত্রযোগাযোগ করতেন এবং মূল্যবান উপঢৌকন পাঠাতেন। তাঁর শাসনকালে মুসলিম আন্দালুস তৎকালীন ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। আধুনিক স্পেনের ইতিহাসবিদেরাও স্বীকার করেন যে, আবদুর রহমান আননাসির ছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক।