📄 লিওন রাষ্ট্র
হিজরী তৃতীয় শতকের শেষার্ধে আন্দালুসে অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও বিশৃঙ্খলা যখন চূড়ান্ত স্তরে ছিল, তখন সেই সুযোগে উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ক্ষমতা সুসংহত করে। ৯১৭ খৃষ্টাব্দে সেন্ট স্টিফেন-এর যুদ্ধে লিওনের খৃষ্টান বাহিনী আবদুর রহমান আননাসিরের বাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়। ৯২৪ খৃষ্টাব্দে লিওন রাষ্ট্রের নৃপতি দ্বিতীয় অর্ডোনিও (Ordono II) মৃত্যুবরণ করলে তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার সংঘাত শুরু হয়। তাঁর দুই পুত্র সানচো (Sancho) ও চতুর্থ আলফোন্সো (Alfonso IV) রাজসিংহাসন নিয়ে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হন। এক পর্যায়ে চতুর্থ আলফোন্সো ক্ষমতার মায়া ত্যাগ করে সন্ন্যাস জীবন গ্রহণ করেন এবং ভাই দ্বিতীয় রামিরোর (Ramiro II) হাতে ক্ষমতা অর্পণ করেন। কিন্তু কিছুকাল পর তিনি পুনরায় ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করলে রামিরো তাকে বন্দী করেন এবং তাঁর চোখ উপড়ে ফেলেন। রামিরো ছিলেন অত্যন্ত কট্টরপন্থী এবং মুসলমানদের ঘোর শত্রু। ৩২৭ হিজরীতে (৯৩৯ খৃষ্টাব্দে) সিমানকাস বা পরিবার যুদ্ধে খৃষ্টান বাহিনী মুসলিম বাহিনীর ওপর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধন করে।
📄 ক্যাস্টেলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা-প্রচেষ্টা
ক্যাস্টেলা ছিল লিওন রাষ্ট্রের পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি প্রদেশ। এ অঞ্চলের অধিবাসীগণ লিওন শাসকদের অধীনে থাকলেও সর্বদা স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখত। ফার্নান্দ গঞ্জালেস (Fernán González) নামক জনৈক বীরের নেতৃত্বে ক্যাস্টেলাবাসী লিওন নৃপতি দ্বিতীয় রামিরোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে। যদিও শুরুতে তিনি পরাজিত ও বন্দী হন, কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি মুক্তি পান এবং ক্যাস্টেলার সকল যোদ্ধাকে এক পতাকাতলে নিয়ে আসতে সক্ষম হন। ৯৪৮ খৃষ্টাব্দে আবদুর রহমান আননাসির যখন লিওন ও ক্যাস্টেলার সীমান্তে আক্রমণ করেন, তখন লিওন বাহিনী পরাজিত হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ফার্নান্দ গঞ্জালেস নিজের ক্ষমতা সুসংহত করেন, যা ভবিষ্যতে ক্যাস্টেলা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথ প্রশস্ত করে।
📄 লিওন রাষ্ট্র সম্পর্কে বাকি কথা
৯৫০ খৃষ্টাব্দে লিওন নৃপতি দ্বিতীয় রামিরো মারা গেলে তাঁর দুই পুত্র আলফোন্সো ও সানচোর মধ্যে পুনরায় সংঘাত শুরু হয়। সানচো ক্ষমতা লাভের জন্য তাঁর মাতামহ নাভারার রাজা এবং ক্যাস্টেলার ফার্নান্দ গঞ্জালেসের সাহায্য চান। তবে শুরুতে আলফোন্সোই জয়ী হন। ৯৩২ খৃষ্টাব্দের দিকে অভ্যন্তরীণ বিবাদে জর্জরিত হয়ে আলফোন্সো খলীফা আবদুর রহমান আননাসিরের কাছে সন্ধির আবেদন জানান। এর কিছুকাল পর আলফোন্সো মারা গেলে সানচো ক্ষমতায় বসেন, কিন্তু তিনিও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করায় মুসলমানদের আক্রমণের মুখে পড়েন। পরবর্তীতে সানচো তাঁর ক্ষমতা ফিরে পেতে খলীফা আবদুর রহমান আননাসিরের সরাসরি সহায়তা প্রার্থনা করেন। ৯৬৭ হিজরীতে সানচো এবং নাভারার রানী টোটা কর্ডোভায় খলীফার দরবারে উপস্থিত হয়ে আনুগত্যের শপথ নেন। খলীফা তাদের সহায়তা করেন এবং সানচো পুনরায় লিওনের সিংহাসন ফিরে পান।
টিকাঃ
৫০৭. ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৯৮; ইবনে খালদুন, ৪/১৩৪-১৩৫।
৫০৮. ইবনে খালদুন, ৪/১৪৬।
📄 নাফার রাষ্ট্র
নাফার বা নাভারা রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়েছিল খ্রিস্টীয় নবম শতকে। ৯০৫ খ্রিস্টাব্দে সাঞ্চো গাসিয়া এখানকার রাজা হন। তিনি এবং তাঁর উত্তরসূরিরা প্রায়ই মুসলিম আন্দালুসের সীমান্ত অঞ্চলে হামলা চালাতেন। গাসিয়া সানচেজ যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন তাঁর মাতা রানী টোটা বা জুতা প্রকৃতপক্ষে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক বুদ্ধির মাধ্যমে লিওন ও ক্যাস্টেলার রাজপরিবারের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। ফলে এই তিনটি খৃষ্টান রাষ্ট্র প্রায়ই মুসলমানদের বিরুদ্ধে একজোট হতো। তবে হাকাম আল-মুসতান্সিরের শাসনামলে যখন মুসলিম বাহিনী উত্তর দিকে প্রবল অভিযান চালায়, তখন নাফার রাষ্ট্রও বশ্যতা স্বীকার করতে ও জিজিয়া প্রদানে বাধ্য হয়। ৩৫৫ হিজরীতে মুসলিম নৌবাহিনীও উপকূলীয় এলাকায় জলদস্যুদের দমন করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করে। ৩৬৬ হিজরীতে হাকাম আল-মুসতান্সিরের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উত্তর সীমান্তে মুসলিম আধিপত্য অটুট ছিল।
টিকাঃ
৫০৯. ইবনে আযারী, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/১০৩; ইবনে খালদুন, ৪/৩৪১।