📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পুনঃবণ্টন (কর্ডোভা প্রশাসনে পরিশুদ্ধি অভিযান)

📄 গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব পুনঃবণ্টন (কর্ডোভা প্রশাসনে পরিশুদ্ধি অভিযান)


আবদুর রহমান আননাসির যখন আন্দালুসের শাসনভার গ্রহণ করেন, তখন উমাইয়া প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে কর্ডোভা ও আশপাশের কিছু গ্রাম ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যদিও কর্ডোভাকে আন্দালুসের সবচেয়ে বড় নগরী এবং রাজধানী হওয়ায় তা কেন্দ্রবিন্দু বলে বিবেচিত হত; কিন্তু আয়তনে তা পুরো আন্দালুসের এক দশমাংশের বেশি ছিল না। আবদুর রহমান আননাসির এই স্বল্প এলাকা থেকেই ইতিহাস পরিবর্তনের মিশন শুরু করলেন। প্রথমেই তিনি রাজদরবারের নীতিনির্ধারক পরিষদে পরিবর্তন আনলেন। অনুপযুক্তদের অপসারণ করে যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান করলেন। এরপর তিনি আলেমদের যথাযথ পদমর্যাদা প্রদান করলেন। আলেমদের যে কোনো নির্দেশ জনগণের মাঝে বাস্তবায়নের পূর্বে প্রথমে নিজের ওপর বাস্তবায়ন করলেন। সমাজে শরীয়তের বিধি-বিধান বাস্তবায়নে তিনি যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন। তিনি নিয়মিত জুমার নামাজে উপস্থিত থাকতেন। তৎকালীন কর্ডোভার অন্যতম আলেম ও নেতা মুনযির বিন সাঈদ রহ. খলীফার উপস্থিতিতেও তাঁর বিভিন্ন কাজের কঠোর সমালোচনা করতেন। আবদুর রহমান আননাসির যখন একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করেন, মুনযির বিন সাঈদ তার তীব্র সমালোচনা করেন। কেউ তাকে অপসারণের পরামর্শ দিলে আবদুর রহমান বলেন, 'তাকওয়া ও খোদাভীতিতে অনন্য মুনযির বিন সাঈদের মতো ব্যক্তিকে আমি আল্লাহর দরবারে আমার ও আমার আল্লাহর মাঝে রাখতে লজ্জাবোধ করি।' মৃত্যু পর্যন্ত মুনযির বিন সাঈদ তার পদে বহাল ছিলেন।

টিকাঃ
৬৬৬ মাক্বারী, নফহুত তীব, ১/২৯৬।
৬৬৭ ইবনুল আছীর, আল-কামিল, ৬/৫৯৮।
৩৬৯ আবুল হাসান নুবাহী, তারিখুল কুদাতিল আন্দালুস, পৃ: ৭০; ইবন খালদূন, আল-ইবার, ৪/১১৪।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 বিদ্রোহ দমন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা

📄 বিদ্রোহ দমন ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা


কর্ডোভার অভ্যন্তরীণ বিন্যাস সঠিকভাবে সমাপ্ত হওয়ার পর আবদুর রহমান আননাসির বাইরের বিভিন্ন ইস্যুতে পদক্ষেপ নিতে শুরু করলেন। সমগ্র আন্দালুস-ভূমিতে তখন অনেকগুলো বিদ্রোহ চলছিল। প্রথমে তিনি তাঁর অন্যতম সেনাপতি আব্বাস বিন আবদুল আযীযের নেতৃত্বে রাবাহ দুর্গে একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন। সেখানে জনৈক বার্বার নেতা বিদ্রোহ করেছিল। কয়েক রাতের প্রচণ্ড যুদ্ধের পর বিদ্রোহীরা পরাজিত হল। এ অভিযানের মাধ্যমে ৩০০ হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে রাবাহ দুর্গ ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকা নিয়ন্ত্রিত হয়। এরপর তিনি জুমাদাল উলা মাসে পশ্চিম আন্দালুসে একটি বাহিনী প্রেরণ করেন। এ অভিযানে বিদ্রোহীদের সেভিল দুর্গটি সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আসে এবং বিদ্রোহ দমনে নগরপ্রাচীরও ভেঙে ফেলা হয়। এরপর স্বয়ং আবদুর রহমান আননাসির সেনাপতি হিসেবে একটি সামরিক অভিযানে বের হলেন। তিনি ওমর বিন হাফসুন (স্যামুয়েল)-এর বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য নিজেই নেতৃত্ব দেন। এর মাধ্যমে তিনি সৈন্যদের মাঝে বীরত্ব ও উদ্দীপনা জাগিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন এবং এটি ছিল ধর্মত্যাগীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি বড় উদাহরণ।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 স্যামুয়েলের বিদ্রোহ দমনের পথে

📄 স্যামুয়েলের বিদ্রোহ দমনের পথে


সামুয়েলের বিরুদ্ধে এ অভিযান ৩০০ হিজরীর শাবান, রমযান ও শাওয়াল পূর্ণ তিন মাস স্থায়ী হল। এ অভিযানে আবদুর রহমান আননাসির আন্দালুসের অন্যতম সুরক্ষিত নগরী জাইয়ান পুনরূদ্ধার করলেন। পুনরুদ্ধারের করলেন মূল বিদ্রোহী দুর্গের মধ্য হতে প্রায় সত্তরটি দুর্গ। এসব দুর্গে অবস্থানরত ইবনে হাফজুনের বাহিনীকে তিনি শোচনীয়ভাবে পরাজিত করতে সক্ষম হলেন। কিন্তু এরপরও সামুয়েলের প্রভাব ও শক্তিতে ভাটা পড়ল না। কারণ, সে উত্তর থেকে খৃষ্টান রাষ্ট্র এবং দক্ষিণ দিক থেকে উবাইদী (ফাতেমী) রাষ্ট্রের সহায়তা লাভ করছিল। আবদুর রহমান আননাসির সামুয়েলের সহায়তার পথ বন্ধ করার জন্য কর্ডোভার পর দক্ষিণালুসের সবচেয়ে বড় নগরী সেভিলে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিলেন। শাসনভার গ্রহণের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি সেভিল বিজয় করলেন এবং উমাইয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করলেন। এরপর তিনি একে একে রনডা (Ronda), সিদোনিয়া ও মারবেলা নগরী পুনরুদ্ধার করলেন। তিনি জাবালে তারিক প্রণালী হয়ে আসা উবাইদী রাষ্ট্রের সহযোগিতার পথও বন্ধ করে দিলেন। এভাবে তিনি সামুয়েলের শক্তিশৈলী চূর্ণ করলেন।

টিকাঃ
৩৭০ ইবন আযারী, আল-বয়ানুল মুগরিব, ২/১৫০-১৫৬; ইবনে খালদূন, ৪/১৩৯।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 সবাইকে অবাক করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আকস্মিক অভিযান

📄 সবাইকে অবাক করে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে আকস্মিক অভিযান


সামুয়েলের দমনের উদ্দেশ্যে পরিচালিত অভিযানের ফলে দক্ষিণ আন্দালুসের বিশাল অঞ্চলে আবদুর রহমানের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হল। যদিও সামুয়েল তখনও অনেকগুলো দুর্গের মালিক ছিল, কিন্তু তার শক্তি অনেক সীমিত হয়ে গিয়েছিল। তখনও টলেডো, জারাগোসা ও পশ্চিম আন্দালুসে বিদ্রোহ চলছিল। সবাই ধারণা করেছিল আবদুর রহমান আননাসির নিকটবর্তী বিদ্রোহী কেন্দ্রগুলোর ওপর আগে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করবেন। কিন্তু তিনি সবাইকে অবাক করে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন উত্তর-পশ্চিমের খৃষ্টান রাষ্ট্র লিওন-এর প্রতি। তিনি সেখানে বাহিনী প্রেরণ করলেন এবং বিজয় অর্জন করলেন। এ অভিযানের মাধ্যমে তিনি একটি বার্তা দিতে চেয়েছিলেন যে, আন্দালুসের প্রকৃত শত্রু দেশের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহী মুসলমানগণ নয়, বরং উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো। এই সিদ্ধান্তের ফলে বিদ্রোহী নেতাদের মাঝে অস্বস্তি তৈরি হল এবং সাধারণ জনগণের মনে আবদুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা ও আস্থা জেগে উঠল। ৩০৬ হিজরীতে সায়মুয়েল (ওমর বিন হাফসুন) ইন্তেকাল করলে তার দাপট ও বিদ্রোহের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং ৩১৩ হিজরীর মধ্যে তার সকল দুর্গ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়।

টিকাঃ
৫৫৯ ইবনে আযারী, আল-বয়ানুল মুগরিব, ২/১৯৮।
৫৬০ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ ইনান, দাওয়ালাতুল ইসলাম ফিল আন্দালুস, ১/৩৮০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px