📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 সম্পদের অবাধ আগমন এবং অবারিত প্রাচুর্যের দ্বার উন্মোচন

📄 সম্পদের অবাধ আগমন এবং অবারিত প্রাচুর্যের দ্বার উন্মোচন


উমাইয়া প্রশাসনের দুর্বলতার কারণ ও কার্যকারণ এ আমলের দুর্বলতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কার্যকারণ হল,

১. সম্পদের অবাধ আগমন এবং অবাঞ্ছিত প্রাচুর্যের দ্বার উন্মোচন: এ সময় বিভিন্ন বিজয়াভিযানের বদৌলতে নতুন করে মুসলমানদের সামনে বিশাল পৃথিবী উন্মুক্ত হয়ে পড়েছিল এবং প্রচুর সম্পদ মুসলমানদের হস্তগত হয়েছিল। বিশেষত স্বাধীন উমাইয়া প্রশাসন আমলের প্রতাপ-যুগের শেষদিকে এ ধারা যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্র ও পরিসর বহুগুণ প্রসারিত হয়েছিল। পুরো দেশে কোনো দরিদ্র নাগরিক খুঁজে পাওয়া যেত না। ফলে মুসলিম জনগণ সম্পদ মোহে প্রবৃত্ত হল আর আন্দালুসের ইতিহাসে বিলাসিতার মতো পরিস্থিতি তৈরি হল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, ‘আল্লাহর শপথ! আমি তোমাদের জন্য দরিদ্রতার আশঙ্কা করি না; বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের কাছে দুনিয়ার প্রাচুর্য এসে যাবে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের কাছে এসেছিল; তখন তোমরা তা লাভ করতে পরস্পর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, যেভাবে তারা লিপ্ত হয়েছিল। এ ধন-সম্পদ তাদেরকে যেভাবে ধ্বংস করেছিল, তোমাদেরকেও তেমনইভাবে ধ্বংস করে দেবে।’

টিকাঃ
৫৯৩ সহীহ্ বুখারী, হাদীস নং ৩৫৯৬ ও সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬১।
৫৯৫ সহীহ্ মুসলিম, হাদীস নং ২৯৬১।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 যিরইয়াব

📄 যিরইয়াব


২. যিরয়াব: ইতিহাসপাঠকের কাছে এ নামটি হয়তো অপরিচিত নয়; কিন্তু আমরা অনেকেই জানি না যে, আন্দালুসের ইতিহাসে যিরয়াবই ছিল সেই ব্যক্তি, যার মাধ্যমে বিলাসিতা ও অপসংস্কৃতির বীজ বপন করা হয়েছিল। যিরয়াব ছিলেন বাগদাদের একজন সঙ্গীতশিল্পী। তিনি বাগদাদেই আমীর ও খলীফাদের সান্নিধ্যে বড় হন। তার সঙ্গীতের ওস্তাদ ছিলেন তৎকালীন বাগদাদের বিখ্যাত সঙ্গীতজ্ঞ ইবরাহীম মূসিলী। যিরয়াব রাজদরবারে থাকতেন এবং গান গেয়ে প্রাসাদবাসীদের আনন্দ দিতেন। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাগদাদের সর্বমহলে যিরয়াবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে ওঠে। তার অত্যধিক জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে ইবরাহীম মূসিলী তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেন। ফলে যিরয়াব বাগদাদ থেকে বিতাড়িত হন। যিরয়াব আন্দালুসকে তার কাঙ্খিত স্থান হিসেবে নির্বাচন করেন। কারণ, তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে সম্পদ প্রাচুর্য ও রাজপ্রাসাদের চাকচিক্যের কারণে আন্দালুস ছিল তার মতো মানুষকে স্বাগত জানাতে ও আশ্রয় দিতে উপযুক্ত কেন্দ্র।

প্রবল ধারণা এটাই যে, আন্দালুস সে সময় সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। কিন্তু যিরয়াব যখন আন্দালুসে পা রাখলেন, আন্দালুসবাসী তাকে স্বাগত জানাল। যিরয়াব গান-বাদ্যসহ বিভিন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের প্রচলন করলেন। তিনি বাগদাদে অর্জন করা সঙ্গীতজ্ঞান আন্দালুসে বিতরণ করতে লাগলেন। আন্দালুসবাসীকে আনন্দ দিতে তিনি রচনা করতে লাগলেন ‘আন্দালুসী রীতি’ নামের বিশেষ এক ধরনের সঙ্গীত। যিরয়াব শুধু সঙ্গীতচর্চাই নয়, বরং তিনি আন্দালুসবাসীকে চলাচলের স্টাইল ও ফ্যাশনও শিক্ষা দিতে লাগলেন। আন্দালুসে তার মাধ্যমে পোশাকের নিত্য-নতুন ধারার প্রচলন ঘটল। তিনি তাদেরকে শেখাতেন আহার-বিহারে আধুনিক রীতি, বিভিন্ন উপলক্ষে নতুন ধরনের খাবার তৈরি করা ইত্যাদি। আন্দালুসবাসী এর পূর্বে এ জাতীয় বিষয়ে পরিচিত ছিল না। যিরয়াব তাদেরকে শোনাতেন রাজা-বাদশাহদের রসালো গালগল্প ও রূপকথা। মানুষ তার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ল এবং শুরু হল পাপের প্রকটতা। আন্দালুসে গায়ক-সঙ্গীতশিল্পীর সংখ্যা বেড়ে গেল। এরই ধারাবাহিকতায় কিছুদিনের পর আন্দালুসে নৃত্যের প্রচলন শুরু হল।

যে সময় আন্দালুসে জ্ঞান ও ইলম চর্চার জোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক সে সময়েই যিরয়াবের সুস্মিত কণ্ঠ মানুষকে আলিমদের মজলিস থেকে বিমুখ করে সঙ্গীতের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। মানুষ কোরআন পাঠ বাদ দিয়ে তার অশ্লীল রসালাপে নিমগ্ন থাকতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিল। শয়তান এভাবেই খিরইয়াওয়া বা যিরয়াব শ্রেণির মানুষের মাধ্যমে আপন অপচেষ্টা জোরদার করেছে।

টিকাঃ
৬০০ দেখুন : মাক্বারী, নফহুত তীব, ১/১২০।
৬০১ মাক্বারী, নফহুত তীব, ১/১২০।
৬০২ মাক্বারী, নফহুত তীব, ১/১২১।
৮৫০ দেখুন : তাবারী, তারীখুল উমাম ওয়াল মুলুক, ২৩/২৯; বায়হাকী, আস-সুনানুল কুবরা, ২/৬৪; কুরতুবী, আল-জামি লি-আহকামিল কুরআন, ১৫/৬৩ ও ইবনে কাসীর, তাফসীরুল কুরআনিল আযীম, ৩/৪৫২।

📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 উমাইয়া প্রশাসনের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ওমর বিন হাফছুন

📄 উমাইয়া প্রশাসনের দুর্বলতার অন্যতম কারণ ওমর বিন হাফছুন


৩. উমাইয়া প্রশাসনের দুর্বলতার আরও কয়েক কারণ এবং ওমর বিন হাফছুন: ওমর বিন হাফছুন (২৪০-৩০০ হি./৮৫৬-৯১৩ খৃ.) বংশগত দিক থেকে মিশ্র বংশোদ্ভূত ছিল। তার নেতৃত্বে বিদ্রোহী একটি দল গড়ে ওঠে। আন্দালুসের মুসলিম সমাজ যখন ইসলামী চেতনা পরিত্যাগ করে বিলাসিতায় মগ্ন হল, তখন ওমর বিন হাফছুনের দল ভারী হল। সে তার দলবল নিয়ে আন্দালুসের দক্ষিণ অঞ্চলে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। এভাবে একপর্যায়ে ওমর বিন হাফছুন পুরো দক্ষিণ আন্দালুসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করল। ২৮৬ হিজরীতে (৮৯৯ খৃষ্টাব্দে) ওমর বিন হাফছুন এমন এক ঘৃণিত কাজ করল, যার দৃষ্টান্ত মুসলিম উমাইয়া ইতিহাসে খুব বেশি নেই। সে নিজের ধর্মপরিচয় পাল্টে মুরতাদ হয়ে গেল এবং ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খৃষ্টধর্ম দীক্ষিত হল। ইসলামী নাম বদলে সে তার নতুন নাম রাখল স্যমুয়েল। তার লক্ষ্য ছিল এর মাধ্যমে উত্তরের খৃষ্টানদের লিওন সাম্রাজ্যের সমর্থন লাভ করা। ধর্মত্যাগের পর তার অনেক অনুসারী দল ত্যাগ করলেও সে লিওন সাম্রাজ্যের সমর্থন লাভ করল। এই সুযোগে লিওন সাম্রাজ্য ইসলামী রাষ্ট্রের সীমান্তে হামলা শুরু করল। উভয় দিক থেকে খৃষ্টান সাম্রাজ্যের আক্রমণ আর দক্ষিণ দিক থেকে স্যামুয়েলের আক্রমণ—মুসলিম আন্দালুস তখন হঠাৎ করেই ত্রিমুখী আক্রমণের শিকার হল।

টিকাঃ
৮৫১ ইবনু আছীর, আল-কামিলু ফিত-তারীখ, ১/১৫০।

ফন্ট সাইজ
15px
17px