📘 আন্দালুসের ইতিহাস 📄 আবদুর রহমান আলআওসাত (দ্বিতীয় আবদুর রহমান) রহ.

📄 আবদুর রহমান আলআওসাত (দ্বিতীয় আবদুর রহমান) রহ.


হাকাম বিন হিশামের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আবদুর রহমান শাসন ক্ষমতা অধিষ্ঠিত হন। ইতিহাসে তিনি আবদুর রহমান আল-আওসাত নামে খ্যাত। কেননা, আন্দালুসের (স্বাধীন প্রশাসন) ইতিহাসে যে তিনজন খ্যাতনামা প্রশাসক আবদুর রহমান নামে গত হয়েছেন, তিনি তাদের মধ্যে মধ্যবর্তী জন। (প্রথমজন আবদুর রহমান আদদাখিল; আর তৃতীয় জন আবদুর রহমান আননাসির, যার আলোচনা সামনে আসবে)। দ্বিতীয় আবদুর রহমান ২০৯ হিজরী থেকে ২৩৮ হিজরী (৮২১-৮৫২ খৃষ্টাব্দ) পর্যন্ত অর্থাৎ উমাইয়া স্বাধীন প্রশাসক আমলের প্রথম স্তরের (প্রতাপের যুগ) শেষ পর্যন্ত আন্দালুসের প্রশাসক ছিলেন। তাঁর শাসনামলকে আন্দালুস ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠতম যুগ বলে গণ্য করা হয়। তিনি নতুন করে উত্তরের খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এবং বেশ কয়েকবার তাদেরকে পরাজিত করেন।

দ্বিতীয় আবদুর রহমান ছিলেন বিদ্যানুরাগী, মহানুভব, শান্ত-প্রকৃতি, জ্ঞানানুরাগী ও জনগণের প্রতি সদাচারী। তাঁর সম্পর্কে সাফাদী রহ. বলেছেন, তিনি তাঁর পিতার বিপরীত জনগণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। ছিলেন উদার, মহানুভব। বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্নতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। আন্দালুসে তিনিই প্রথম নতুন মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি অনেক নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। তাঁকে খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আবদুর রহমান আলেমদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সান্নিধ্যে থাকতেন। সাধারণত নিজেই নামাযে ইমামতি করতেন। প্রাচীন অনেক জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থাদি তিনিই প্রথম আন্দালুসে আনার ব্যবস্থা করেন এবং আন্দালুসের আলিমসমাজকে এসব গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত করেন। তিনি সুপরামর্শক ও প্রভাবশালী ছিলেন। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতেন, হাদীস অধ্যয়ন করতেন। তাঁর শাসনামলকে 'আনন্দের যুগ' বলা হত। তিনি নাগরিক সভ্যতার বিকাশের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। জনগণ তাঁর শাসনামল উপভোগ করত এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করত। তিনি ইনসাফের সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন। রাষ্ট্রের বিনির্মাণে তিনি অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনকি তাঁর শাসনামলে দেশের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দশ লক্ষ দিনারে পৌঁছেছিল।

দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলিঃ
১. বুদ্ধিবৃত্তিক সভ্যতার সমৃদ্ধিঃ তাঁর আমলের বিখ্যাত একজন ব্যক্তিত্ব হলেন আব্বাস বিন ফিরনাস রহ. (মৃত্যু: ২৭৪ হিজরী/৮৮৭ খৃষ্টাব্দ)। তার উপনাম আবুল কাসিম। তিনি কর্ডোভার অধিবাসী ও বনু উমাইয়া মাওয়ালী ছিলেন। দর্শন ও বিজ্ঞানশাস্ত্রে তাঁর বিশেষ দখল ছিল। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। আন্দালুসে ইবনে ফিরনাসই সর্বপ্রথম পাথর থেকে কাঁচ উৎপাদন শিল্প আবিষ্কার করেন। সময় নিরূপণ-যন্ত্রও (কালঘড়ি) তাঁর আবিষ্কার। গবেষণার সুবিধার্থে নিজ বাড়িতে তিনি একটি কৃত্রিম সৌরজগত তৈরি করেছিলেন, যাতে আকাশ, তারকারাজি, মেঘ, বিজলী, বজ্র ইত্যাদির প্রতিকৃতি ছিল। মানুষের শূন্যে ওড়ার স্বপ্ন তিনিই সর্বপ্রথম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন। নিজের শরীরে পাখির পালক লাগিয়ে এবং দুটি ডানায় ভর করে তিনি বাতাসে বেশ কিছুদূর ভেসে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই তিনি ভূপাতিত হন এবং পিঠে আঘাত পান।

২. নাগরিক সভ্যতার উন্নতিঃ দ্বিতীয় আবদুর রহমান নাগরিক সভ্যতার উন্নয়নে (নির্মাণশিল্প, অর্থনীতি ইত্যাদি) যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। তাঁর আমলে আন্দালুসের বাণিজ্যব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এ কারণে রাষ্ট্রের সম্পদও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তৎকালীন বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র সিন্ধুসভ্যতার প্রভাবাধীন থাকলেও তাঁর আমলে আন্দালুসে তার কোনো প্রভাব ছিল না। তাঁর শাসনামলে কৃষি ও সেচ-ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল।

৩. নরম্যান জলদস্যুদের দমনঃ উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া (Scandinavia) অঞ্চলের অধিবাসীদের নরম্যান (The Normans) বলা হয়। ইতিহাসে তারা ভাইকিং (Viking) জলদস্যু নামে সুপরিচিত। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে ২৩০ হিজরীতে (৮৪৫ খৃষ্টাব্দে) এই ভয়ঙ্কর দস্যুগোষ্ঠী সেভিল সমুদ্র বন্দর দিয়ে হামলা করে। তারা শহরে ঢুকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সংবাদ জানতে পেরে দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করেন এবং তাদের মোকাবেলায় রওনা হন। এক মাসব্যাপী যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী ভাইকিং দস্যুদের জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করেন।

টিকাঃ
৮০১. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮০২. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮০৩. সাফাদী, ওয়াফিয়াতুল আয়ান, ১৯/১০।
৮০৪. হাত্বীব, ১৯/৬৩০।
৮০৫. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৩/৫৪২।
৮০৬. সাফাদী, ওয়াফিয়াতুল আয়ান, ১৯/১৮০।
৮০৭. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮০৮. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, ১/১১২।
৮০৯. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮১০. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮১১. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১২. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১৩. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮১৪. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৫; মাক্কারী, ওয়াফিয়াত, ১৯/৮৫।
৮১৫. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১৬. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৩/৩৮৫।

ফন্ট সাইজ
15px
17px