📄 হিশাম বিন আবদুর রহমান আদদাখিল রহ.
আবদুর রহমান আদদাখিল তাঁর পুত্র হিশামের মধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার উপযুক্ততা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাই তিনি বড় পুত্র সুলাইমানের পরিবর্তে ছোট পুত্র হিশামকেই যুবরাজ হিসেবে নির্বাচন করেন। হিশাম সবদিক থেকেই বড় ভাই সুলাইমানের চেয়ে দক্ষ ও উপযুক্ত ছিলেন। আবদুর রহমান আদদাখিলের এই নির্বাচন যে ভুল ছিল না; বরং তাঁর ধারণা ছিল পুরোপুরিই সঠিক, তার প্রমাণ হল, জনগণ হিশামকে ইলম, আমল ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে মহান খলীফা ওমর বিন আবদুল আযীয রহ.-এর সঙ্গে তুলনা করত। পিতার মৃত্যুর সময় হিশাম মেরিডায় অবস্থান করছিলেন। পিতার মৃত্যুর ছয় দিন পর তিনি কর্ডোভায় পৌঁছান। তখন প্রশাসনের দায়িত্বশীলগণ এবং জনসাধারণ তাঁর হাতে বাইআত গ্রহণ করে। এটি ১৭২ হিজরীর (৭৮৮ খৃষ্টাব্দের) ঘটনা।
বড় ভাই সুলাইমান তখন টলেডোতে অবস্থান করছিলেন। হিশামের ক্ষমতাপ্রাপ্তির সংবাদে তিনি অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হন এবং ভাইয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ভাইয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তৎক্ষণাৎ তিনি বাহিনী প্রস্তুত করে কর্ডোভার উদ্দেশে রওয়ানা হন। সংবাদ জানতে পেরে হিশাম রাজধানী থেকে সৈন্যদের নিয়ে বের হয়ে আসেন। উভয় বাহিনীর মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধের পর সুলাইমান পরাজিত হন এবং পালিয়ে টলেডোতে ফিরে যান।
হিশামের আরেক ভাই ছিলেন আবদুল্লাহ। হিশাম আবদুল্লাহর সঙ্গে যথেষ্ট সলাহপরামর্শ করতেন; কিন্তু আবদুল্লাহ হয়তো ভাইয়ের স্নেহের চেয়ে আরও বেশি কিছু প্রত্যাশা করছিলেন। তাই তিনি পালিয়ে টলেডোতে বড় ভাই সুলাইমানের কাছে চলে যান। জানতে পেরে হিশাম আবদুল্লাহর প্রতি স্নেহবশত তাকে সন্তুষ্টপূর্বক ফিরিয়ে আনতে দূত পাঠান; কিন্তু দূত তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে ব্যর্থ হন। এ অবস্থায় হিশামের জন্য ভাই সুলাইমানের উদ্দেশে অভিযান প্রেরণ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা রইল না। পিতার রণনীতির অনুসরণে তিনি সুলাইমান কর্ডোভায় হামলা করার পূর্বেই নিজেই টলেডোর উদ্দেশে অগ্রসর হন। টলেডোতে পৌঁছে তিনি শহর অবরোধ করেন। সুযোগসন্ধানী সুলাইমান সুযোগের সদ্ব্যবহার করেন এবং হিশামের অনুপস্থিতিতে রাজধানী কর্ডোভা দখলের উদ্দেশে রওয়ানা হন। কিন্তু কর্ডোভাবাসী তাকে প্রতিরোধ করে। এরপর তিনি কর্ডোভার নিকটবর্তী শহর মেরিডা দখল করার চেষ্টা করেন; যেন ভবিষ্যতে কর্ডোভার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু মেরিডার গভর্নরও তাকে মেরিডা থেকে তাড়িয়ে দিতে সক্ষম হন। তিনি সেখান থেকে মুরসিয়া, মুরসিয়া থেকে ভ্যালেন্সিয়া পালিয়ে যান আর হিশাম তাকে তাড়া করে ফেরেন। একপর্যায়ে সুলাইমানের অন্তর যখন নিরাশায় ছেয়ে গেল, তখন তিনি হিশামের কাছে নিরাপত্তা প্রার্থনা করেন। হিশাম তাকে নিরাপত্তা প্রদান করেন। ইতঃপূর্বেই তিনি আবদুল্লাহকেও নিরাপত্তা প্রদান করেছিলেন। এবার তিনি তাদের উভয়কে উত্তর আফ্রিকায় চলে যাওয়ার সুযোগ দেন।
হিশাম বিন আবদুর রহমান আদদাখিল অত্যন্ত আমানতগুজার ছিলেন। তিনি আলেমদের ভালোবাসতেন এবং তাঁদের সাহচর্য দ্বারা উপকৃত হতেন। আন্দালুসে আরবী ভাষার প্রসার ও বিস্তারে তাঁর যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তাঁর অব্যাহত প্রচেষ্টার ফলে আরবী ভাষার অবস্থান এমন স্তরে পৌঁছেছিল যে, আন্দালুসের অভ্যন্তরে অবস্থিত ইহুদি-খৃষ্টানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও আরবী ভাষা পাঠদান করা হত। হিশামের যুগে আন্দালুসে যেসব মৌলিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম হল আন্দালুসে মালেকী মাযহাবের প্রসার। ইতঃপূর্বেই আন্দালুসে ইমাম আওযাঈ রহ.-এর মাযহাবের প্রচলন ছিল। হিশাম তাঁর শাসনকালে বহুবার উত্তরের খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলোতে অভিযান পরিচালনা করেছেন।
হিশাম বিন আবদুর রহমান আদদাখিলের ৭ বছর ৮ মাস ৮ দিন সফল শাসনব্যবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটে ১৮০ হিজরীর সফর মাসে (৭৯৬ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে)। ৩৩ বছর ৪ মাস ৪ দিন বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। রাজধানীতে তাকে দাফন করা হয়। পুত্র হাকাম বিন হিশাম তাঁর জানাযার নামাযে ইমামতি করেন।
টিকাঃ
৮৫. ইবনুস আছীর, আলকামেল, ৬/৮-১০; ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২৯।
৮৬. ইবনুল কুতীয়্যা, আলকাইরিন, ৭/২৯-৩০; ইবনুস আছীর, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/১১ এবং ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২৯।
৮৭. ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২৯।
৮৮. ড. ছাহীহ মুনিস, আলিয়াউল মুসলিমিন, ২/৩২ ও ইবনে খালদুন, তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২৯।
৮৯. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৪৪।
৯০. ইবনুস আছীর, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/১২ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/১৩।
৯১. ইবনুল ফারাদী, তারীখু উলামায়ে উন্দালুস, পৃ : ৭১।
৯২. আবুল ওয়ালীদ আযী, তারীখু উলামায়ে বিন আদাবুল, ১/৩০৫।
৯৩. ইবনুস আছীর, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/১৫ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/১৩০।
৯৪. ইবনুস আছীর, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/১৫ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৩০০।
📄 হাকাম বিন হিশাম বিন আবদুর রহমান আদদাখিল রহ.
হিশামের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র হাকাম তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। তাঁর শাসনকাল ১৮০ হিজরী হতে ২০৬ হিজরী (৭৯৬-৮২১ খৃষ্টাব্দ) পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। কিন্তু রাষ্ট্রপরিচালনায় হাকাম না তাঁর পিতার আদর্শ অনুসরণ করেছিলেন, না তাঁর পিতামহের।
হাকাম অত্যন্ত নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিলেন। জনগণের ওপর উচ্চ হারে কর আরোপ করতেন, নিজে কবিতার আসর ও শিকারের নেশায় ডুবে থাকতেন। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিভিন্ন বিদ্রোহ-প্রচেষ্টাকে এমন নির্দয়ভাবে দমন করেন, যার নজীর আন্দালুসের ইতিহাসে ছিল না। তাঁর বেশীরভাগই নিষ্ঠুরতা এমন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, বিদ্রোহীদের খণ্ড-বিখণ্ড অঙ্গগুলো ঝুলিয়ে দেওয়া হত এবং তাদেরকে দেখে অন্যদের ভীত-সন্ত্রস্ত করা হত।
হাকাম বিন হিশাম তাঁর শাসনকালে যেসব বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা দমন করেছেন, তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল ২০২ হিজরীর (৮১৮ খৃষ্টাব্দে) রাবায গোষ্ঠীর বিদ্রোহ। রাবায গোষ্ঠী কর্ডোভার নিকটবর্তী একটি শহরতলিতে বাস করত। হাকামের অরাজকতা, অর্থনৈতিক শোষণ ও শিকারের নেশায় মগ্ন থাকার খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে রাবায গোষ্ঠী তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। এর পরপরই হাকাম কর্ডোভার কয়েদখানায় জনৈক বিশিষ্ট নেতাকে হত্যা করলে ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। তারা হাকাম ও তাঁর সেনাবাহিনীকে ঘৃণা করতে থাকে এবং তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-সংগ্রাম শুরু করে। নিজের নিরাপত্তা চিন্তায় উদ্বিগ্ন হাকাম কর্ডোভাকে সুরক্ষিত করার প্রয়াসে নগরীর চারপাশে নজরবন্দী-প্রাচীর নির্মাণ করেন, পরিখা খনন করেন এবং সেনাবাহিনী সবসময় নিজের কাছে রাখার ব্যবস্থা করেন।
তাঁর এসব পদক্ষেপে কর্ডোভাবাসীর ক্ষোভ আরও বৃদ্ধি পায়। কিছুদিন পর তাঁর জনৈক ক্রীতদাস রাবায গোষ্ঠীতে গিয়ে একজন সাধারণ নাগরিককে হত্যা করলে রাবাযবাসী পুনরায় বিদ্রোহী হয়ে ওঠে এবং রাজপ্রাসাদের দিকে অগ্রসর হয়ে তাকে অবরোধ করে ফেলে। তিনি তাঁর সৈন্যদের দিয়ে অবরোধকারীদের ওপর হামলা করেন এবং প্রচণ্ড যুদ্ধের পর তাদের পরাজিত করেন।
কিন্তু অবরোধকারীদের পরাভূত করেই হাকাম শান্ত হননি; তিনি তাদের ঘর-বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন, সহায়-সম্পদ হরণ করেন, নগরীর তিন শ' বিশিষ্ট ব্যক্তিকে হত্যা করেন এবং অবশিষ্ট বিদ্রোহীদের দেশের বাইরে তাড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। রাবায গোষ্ঠীর বিদ্রোহীরা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের একটি দল চলে যায় মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায়। সেখানে কিছুদিন অবস্থান করার পর তারা ক্রেট (Crete) দ্বীপে আশ্রয় নেয় এবং ২১২ হিজরীর (৮২৮ খৃষ্টাব্দে) সেখানে একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে। বহু বছর পর বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য এই ইসলামী রাষ্ট্রটি দখল করে নেয়।
শাসনামলের অধিকাংশ সময় তিনি এসব মন্দ ও গর্হিত আচরণ করলেও অবশ্য তিনি নিয়মিত ইসলামী বিজয়াভিযানের ধারা অব্যাহত রেখেছিলেন। এটি ছিল সামরিক দিক থেকে উমাইয়া খিলাফাত ও আন্দালুস-কেন্দ্রিক উমাইয়া ইমারতের শাসক-প্রশাসকদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্য। অবশ্য এসব অভিযানে তিনি জয়-পরাজয় উভয় ধরনের ফলাফলেরই সম্মুখীন হয়েছিলেন। হাকামের দুঃশাসন ও শাসক-শাসিতের বৈরী সম্পর্কের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে তাঁর শাসনকালে ইসলামী রাষ্ট্রের বেশ কিছু বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যায়। বার্সেলোনা নগরীর পতন ঘটে এবং বার্সেলোনার পার্শ্ববর্তী উত্তর-পূর্ব আন্দালুসে একটি ক্ষুদ্র খৃষ্টান রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে, ইতিহাসে যা আরাগোনের রাষ্ট্র (The Kingdom of Aragon) নামে পরিচিত। এ ক্ষুদ্র রাষ্ট্রটি আন্দালুসের উত্তর-পূর্ব অংশে পিরেনিজ পর্বতমালার কাছে ফ্রান্সের সীমান্তে অবস্থিত ছিল।
অবশ্য হাকামের শেষ জীবন অত্যন্ত অনুশোচনায় কেটেছে। তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে জনগণের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। এরপর তিনি নিজের সন্তানদের মধ্য হতে উপযুক্ত সন্তানকে পরবর্তী শাসক (ওলি এ আহদ) হিসেবে মনোনীত করেন।
টিকাঃ
৯৫. দেখুন। ইবনুল কুতীয়্যা, আলকাইরিন, ৩/৪০ ও মাক্কারী, নাফহুত তীব, ১/৩০৬।
৯৬. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/৭১।
৯৭. ইবনুল কুতীয়্যা, আলকামেল, ৩/৪০-৪৬।
৯৮. মাক্কারী, ১/৪৩৯।
৯৯. বর্তমান গ্রিসের অন্তর্গত ক্রিট দ্বীপকে বোঝানো হয়েছে।
১০০. ইবনুল কুতীয়্যা, আলকামেল, ৩/৪৩-৪৩ ও তারীখে ইবনে খালদুন, ৪/১২৯।
৯৫. ইবনুল কুতীয়্যা, আলকাইরিন, ৩/৭২।
৯৬. ইবনুস আছীর, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/১২-৬২।
৯৭. আবু সাঈদ আলখুশানি, আলকামেল ফিততারিখ, ৬/৪০।
📄 আবদুর রহমান আলআওসাত (দ্বিতীয় আবদুর রহমান) রহ.
হাকাম বিন হিশামের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র দ্বিতীয় আবদুর রহমান শাসন ক্ষমতা অধিষ্ঠিত হন। ইতিহাসে তিনি আবদুর রহমান আল-আওসাত নামে খ্যাত। কেননা, আন্দালুসের (স্বাধীন প্রশাসন) ইতিহাসে যে তিনজন খ্যাতনামা প্রশাসক আবদুর রহমান নামে গত হয়েছেন, তিনি তাদের মধ্যে মধ্যবর্তী জন। (প্রথমজন আবদুর রহমান আদদাখিল; আর তৃতীয় জন আবদুর রহমান আননাসির, যার আলোচনা সামনে আসবে)। দ্বিতীয় আবদুর রহমান ২০৯ হিজরী থেকে ২৩৮ হিজরী (৮২১-৮৫২ খৃষ্টাব্দ) পর্যন্ত অর্থাৎ উমাইয়া স্বাধীন প্রশাসক আমলের প্রথম স্তরের (প্রতাপের যুগ) শেষ পর্যন্ত আন্দালুসের প্রশাসক ছিলেন। তাঁর শাসনামলকে আন্দালুস ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠতম যুগ বলে গণ্য করা হয়। তিনি নতুন করে উত্তরের খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন এবং বেশ কয়েকবার তাদেরকে পরাজিত করেন।
দ্বিতীয় আবদুর রহমান ছিলেন বিদ্যানুরাগী, মহানুভব, শান্ত-প্রকৃতি, জ্ঞানানুরাগী ও জনগণের প্রতি সদাচারী। তাঁর সম্পর্কে সাফাদী রহ. বলেছেন, তিনি তাঁর পিতার বিপরীত জনগণের প্রতি ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। ছিলেন উদার, মহানুভব। বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক উন্নতির প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। আন্দালুসে তিনিই প্রথম নতুন মুদ্রার প্রচলন করেন। তিনি অনেক নগরপ্রাচীর নির্মাণ করেন। তাঁর তত্ত্বাবধানে কর্ডোভা মসজিদের সম্প্রসারণ করা হয়। তাঁকে খলীফা ওয়ালিদ বিন আবদুল মালিকের সঙ্গে তুলনা করা হয়। আবদুর রহমান আলেমদের ভালোবাসতেন এবং তাদের সান্নিধ্যে থাকতেন। সাধারণত নিজেই নামাযে ইমামতি করতেন। প্রাচীন অনেক জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থাদি তিনিই প্রথম আন্দালুসে আনার ব্যবস্থা করেন এবং আন্দালুসের আলিমসমাজকে এসব গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত করেন। তিনি সুপরামর্শক ও প্রভাবশালী ছিলেন। বেশি বেশি কোরআন তেলাওয়াত করতেন, হাদীস অধ্যয়ন করতেন। তাঁর শাসনামলকে 'আনন্দের যুগ' বলা হত। তিনি নাগরিক সভ্যতার বিকাশের মাধ্যমে দেশের মানুষের মন জয় করেছিলেন। জনগণ তাঁর শাসনামল উপভোগ করত এবং তাঁর দীর্ঘায়ু কামনা করত। তিনি ইনসাফের সঙ্গে রাজস্ব সংগ্রহ করতেন। রাষ্ট্রের বিনির্মাণে তিনি অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। এমনকি তাঁর শাসনামলে দেশের বার্ষিক রাজস্বের পরিমাণ দশ লক্ষ দিনারে পৌঁছেছিল।
দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যাবলিঃ
১. বুদ্ধিবৃত্তিক সভ্যতার সমৃদ্ধিঃ তাঁর আমলের বিখ্যাত একজন ব্যক্তিত্ব হলেন আব্বাস বিন ফিরনাস রহ. (মৃত্যু: ২৭৪ হিজরী/৮৮৭ খৃষ্টাব্দ)। তার উপনাম আবুল কাসিম। তিনি কর্ডোভার অধিবাসী ও বনু উমাইয়া মাওয়ালী ছিলেন। দর্শন ও বিজ্ঞানশাস্ত্রে তাঁর বিশেষ দখল ছিল। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানেও তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল। আন্দালুসে ইবনে ফিরনাসই সর্বপ্রথম পাথর থেকে কাঁচ উৎপাদন শিল্প আবিষ্কার করেন। সময় নিরূপণ-যন্ত্রও (কালঘড়ি) তাঁর আবিষ্কার। গবেষণার সুবিধার্থে নিজ বাড়িতে তিনি একটি কৃত্রিম সৌরজগত তৈরি করেছিলেন, যাতে আকাশ, তারকারাজি, মেঘ, বিজলী, বজ্র ইত্যাদির প্রতিকৃতি ছিল। মানুষের শূন্যে ওড়ার স্বপ্ন তিনিই সর্বপ্রথম বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করেন। নিজের শরীরে পাখির পালক লাগিয়ে এবং দুটি ডানায় ভর করে তিনি বাতাসে বেশ কিছুদূর ভেসে গিয়েছিলেন। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরই তিনি ভূপাতিত হন এবং পিঠে আঘাত পান।
২. নাগরিক সভ্যতার উন্নতিঃ দ্বিতীয় আবদুর রহমান নাগরিক সভ্যতার উন্নয়নে (নির্মাণশিল্প, অর্থনীতি ইত্যাদি) যথেষ্ট যত্নবান ছিলেন। তাঁর আমলে আন্দালুসের বাণিজ্যব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল। এ কারণে রাষ্ট্রের সম্পদও যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। তৎকালীন বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্র সিন্ধুসভ্যতার প্রভাবাধীন থাকলেও তাঁর আমলে আন্দালুসে তার কোনো প্রভাব ছিল না। তাঁর শাসনামলে কৃষি ও সেচ-ব্যবস্থায় প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল।
৩. নরম্যান জলদস্যুদের দমনঃ উত্তর ইউরোপের স্ক্যান্ডিনেভিয়া (Scandinavia) অঞ্চলের অধিবাসীদের নরম্যান (The Normans) বলা হয়। ইতিহাসে তারা ভাইকিং (Viking) জলদস্যু নামে সুপরিচিত। দ্বিতীয় আবদুর রহমানের শাসনামলে ২৩০ হিজরীতে (৮৪৫ খৃষ্টাব্দে) এই ভয়ঙ্কর দস্যুগোষ্ঠী সেভিল সমুদ্র বন্দর দিয়ে হামলা করে। তারা শহরে ঢুকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। সংবাদ জানতে পেরে দ্বিতীয় আবদুর রহমান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে প্রস্তুত করেন এবং তাদের মোকাবেলায় রওনা হন। এক মাসব্যাপী যুদ্ধের পর মুসলিম বাহিনী ভাইকিং দস্যুদের জাহাজ ডুবিয়ে দেয়। অবশেষে আল্লাহ্ তা'আলা মুসলিম বাহিনীকে বিজয় দান করেন।
টিকাঃ
৮০১. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮০২. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮০৩. সাফাদী, ওয়াফিয়াতুল আয়ান, ১৯/১০।
৮০৪. হাত্বীব, ১৯/৬৩০।
৮০৫. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৩/৫৪২।
৮০৬. সাফাদী, ওয়াফিয়াতুল আয়ান, ১৯/১৮০।
৮০৭. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮০৮. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, ১/১১২।
৮০৯. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১১২।
৮১০. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮১১. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১২. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১৩. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুন মাজমুআ, পৃ. ১২২।
৮১৪. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৫; মাক্কারী, ওয়াফিয়াত, ১৯/৮৫।
৮১৫. ইবনু আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৯৬।
৮১৬. মাক্কারী, নাফহুত তীব, ৩/৩৮৫।