📄 আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া ও আব্বাসী খেলাফত
আন্দালুস ও আব্বাসীয় খেলাফতের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা মূলত শুরু হয়েছিল আব্বাসীয়দের উমাইয়া-নিধন যজ্ঞের মাধ্যমে। আব্বাসীয়রা বনু উমাইয়ার সদস্যদের যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তার ফলে উমাইয়াদের মধ্যে আব্বাসীয়দের প্রতি প্রচণ্ড অনাস্থা ও ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। আবদুর রহমান আদদাখিল যদি দেখতেন যে আব্বাসীয়দের কাছে তাঁর জীবন ও মর্যাদা নিরাপদ, তবে হয়তো তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ খেলাফতের অধীনে কাজ করতেন। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তিনি আন্দালুসে একটি পৃথক উমাইয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে বাধ্য হন। এটি ছিল ইসলামী ইতিহাসের এক বড় ট্র্যাজেডি যে, উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ কেন্দ্রীয় খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি অনুযায়ী যে কোনো শত্রুকে আপন করে নেওয়ার যে আর্দশ ছিল, আব্বাসীয়রা তা পালনে ব্যর্থ হয়েছিল।
টিকাঃ
৯০০. লেখক অজ্ঞাত, তারিখে আব্বাসীয়, পৃ: ১৩৭ ও ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/১৯।
৯০১. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৪২।
আন্দালুস ও আব্বাসী খেলাফতের মাঝে দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্নতা ও বৈরিতা বজায় ছিল। আবদুর রহমান আদদাখিলের মতো একজন বীর এবং সুদক্ষ রাজনীতিবিদ কী করে তৎকালীন মূল ইসলামী শক্তি আব্বাসী সালতানাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেন? এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আব্বাসী খেলাফত সূচনালগ্নে বনু উমাইয়াদের প্রতি অত্যন্ত রূঢ় ও অমানবিক নীতি গ্রহণ করেছিল। তারা উমাইয়াদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছিল। এটি ছিল একটি মারাত্মক ভুল। আব্বাসীদের উচিত ছিল উমাইয়াদের কাছে টেনে নিয়ে তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নয়নে কাজে লাগানো। কিন্তু তাঁরা তাঁদেরকে এমনভাবে কোণঠাসা করেছিলেন যে, উমাইয়া বংশধররা বাধ্য হয়েই আন্দালুসে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। আবদুর রহমান আদদাখিল যদি দেখতেন যে আব্বাসীদের কাছে তাঁর জীবন ও মর্যাদা নিরাপদ, তবে হয়তো তিনি উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে কাজ করতেন। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি আন্দালুসে একটি শক্তিশালী উমাইয়া দুর্গ গড়ে তোলেন। আব্বাসী শাসকগণ পরবর্তী সময়ে তাঁদের প্রাথমিক নীতি থেকে সরে এলেও ততক্ষণে বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
৯০০. লেখক অজ্ঞাত, তারিখে আব্বাসীয়, পৃ: ১৩৭ ও ইবনে আযারী, ২/১৯।
৯০১. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৪২।
📄 বিদ্রোহ দমনে আবদুর রহমান আদদাখিলের নীতি পর্যালোচনা
আবদুর রহমান আদদাখিল তাঁর চৌত্রিশ বছরের শাসনামলে অসংখ্য বিদ্রোহের মোকাবিলা করেছেন। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যেহেতু আন্দালুসের জনসাধারণ তাঁকে শাসক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তাই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছিল অবৈধ। তিনি বিদ্রোহী দমনে অত্যন্ত কঠোর হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথমে শান্তির প্রস্তাব দিতেন। তবে বিদ্রোহীরা যদি একরোখা হতো, তবে তিনি তলোয়ারের মাধ্যমে সমাধান করতেন। তাঁর এই নীতির ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ফ্রান্সের মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মুসলিমদের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।
টিকাঃ
৯০৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪২।
আবদুর রহমান আদদাখিলের চৌত্রিশ বছরের শাসনামলে আন্দালুসের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যেহেতু আন্দালুসের জনসাধারণ তাঁকে প্রশাসক হিসেবে মেনে নিয়েছিল, তাই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছিল অবৈধ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ হলো— যখন তোমরা কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বে একমত হও, এরপর তোমাদের কেউ যদি ঐক্যে ভাঙন ধরাতে চায়, তবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করো। বিদ্রোহ দমনে আবদুর রহমান আদদাখিলের নীতি ছিল পুরোপুরি যথার্থ। এর মাধ্যমে যেমন ফিতনা দমিত হয়েছে, তেমনই রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে তিনি সর্বদা প্রথমে বিদ্রোহীদের ক্ষমা করার ও শান্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। একান্ত বাধ্য না হলে তিনি সংঘাতের পথে যেতেন না।
টিকাঃ
৯০৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪২।
📄 আবদুর রহমান আদদাখিলের নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিনির্মাণ
আন্দালুসে যখন আবদুর রহমান আদদাখিলের অবস্থান সুদৃঢ় হলো এবং বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা তুলনামূলক হ্রাস পেলো, তখন তিনি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় মনোযোগী হলেন। তিনি একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সামরিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি উমাইয়াদের হারানো ঐতিহ্য ও শৌর্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু করেন এবং আন্দালুসকে একটি উন্নত ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।
আন্দালুসে যখন আবদুর রহমান আদদাখিলের অবস্থান সুদৃঢ় হলো এবং বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা তুলনামূলক হ্রাস পেলো, তখন তিনি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় মনোযোগী হলেন। তিনি একটি আধুনিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সামরিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি উমাইয়াদের হারানো ঐতিহ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু করেন এবং আন্দালুসকে একটি উন্নত ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।
📄 এক. সুদৃঢ় সামরিক শক্তি প্রতিষ্ঠা
আবদুর রহমান আদদাখিল একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১. তিনি মিশ্র প্রজন্ম (মুওয়াল্লাদ), বার্বার এবং সাকলাবী (ইউরোপীয় স্লেভ) সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করেন। ২. তাঁর সেনাসংখ্যা প্রায় এক লক্ষে পৌঁছেছিল। ৩. তিনি টলেডো ও বার্সেলোনা সহ বিভিন্ন শহরে বড় বড় অস্ত্র কারখানা ও সমর সরঞ্জাম তৈরির কেন্দ্র গড়ে তোলেন। ৪. তিনি একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী ও একাধিক নৌবন্দর স্থাপন করেন। ৫. রাষ্ট্রীয় বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ তিনি সেনাবাহিনীর উন্নয়নে ও সুরক্ষায় ব্যয় করতেন।
টিকাঃ
৯৫৯. ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/১০০।
৯৬০. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৩।
৯৬১. রাফীক, ৩/৯৯।
৯৬২. রাফীক, ৩/৯৯।
৯৬৪. প্রাচীনকালের যুদ্ধে ব্যবহৃত ঢাল বা বর্ম বিশেষ। (অনুবাদক)
৯৬৫. আধুনিক ফ্রান্সের বর্দো (Bordeaux) নগরীকে প্রাচীনকালে এই নামে ডাকা হতো। (অনুবাদক)
আবদুর রহমান আদদাখিল একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন।
১. সেনাবাহিনীতে সদস্য নির্বাচনে তিনি দক্ষতা ও বিশ্বস্ততার ওপর নির্ভর করতেন। তিনি মিশ্র প্রজন্ম (মুওয়াল্লাদ), আরব ও বার্বারদের সমন্বয়ে সেনাবাহিনী গঠন করেন। পরবর্তীতে আরবদের অনৈক্যের কারণে তিনি সাকলাবী (ইউরোপীয় স্লেভ) সম্প্রদায়ের ওপরও নির্ভর করেন। তাঁর শাসনামলে অশ্বারোহী সেনাসংখ্যা প্রায় এক লক্ষে পৌঁছেছিল।
২. তিনি টলেডো ও বার্সেলোনা সহ বিভিন্ন স্থানে উন্নত মানের অস্ত্র কারখানা গড়ে তোলেন। বিশেষ করে তরবারি ও মিনজানিক (পাথর নিক্ষেপক যন্ত্র) তৈরির জন্য কারখানাগুলো খ্যাতি অর্জন করেছিল।
৩. তিনি বেশ কয়েকটি নৌবন্দর প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একটি শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলেন।
৪. রাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ তিনি সামরিক খাতে ব্যয় করতেন।
টিকাঃ
৯৫৯. ইবনে আযারী, ২/১০০।
৯৬০. মাক্কারী, ৩/৩।
৯৬১. রাফীক, ৩/৯৯।
৯৬২. রাফীক, ৩/৯৯।
৯৬৪. প্রাচীনকালে যুদ্ধে ব্যবহৃত এক ধরনের যন্ত্র যা দিয়ে বড় পাথর নিক্ষেপ করা হতো। (অনুবাদক)
৯৬৫. বর্তমান ফ্রান্সের বর্দো (Bordeaux) নগরীকে অনেক ঐতিহাসিক এই নামে উল্লেখ করেছেন। (অনুবাদক)