📄 আব্বাসীদের অভ্যুত্থান চেষ্টা ও ‘কুরাইশী ঈগল’ উপাধি
আবদুর রহমান আদদাখিলের শাসনামলে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ ছিল আব্বাসীয়দের পক্ষ থেকে আসা আক্রমণ। ১৪৬ হিজরীতে দ্বিতীয় আব্বাসীয় খলীফা আবু জাফর আল-মানসূর আন্দালুসকে কেন্দ্রীয় খেলাফতের অধীনে নিতে আলা বিন মুগিস আল-হাযরামীকে প্রেরণ করেন। আলা আন্দালুসে পৌঁছে আব্বাসীয়দের কৃষ্ণ পতাকা উত্তোলন করেন। কিন্তু আদদাখিল দ্রুত এই বিদ্রোহ দমন করেন এবং যুদ্ধে আলা নিহত হন। এই সংবাদ শুনে আবু জাফর আল-মানসূর ভীত ও বিস্মিত হয়ে আবদুর রহমান আদদাখিলকে ‘সাকরু কুরাইশ’ বা ‘কুরাইশী ঈগল’ উপাধি দেন। তিনি মন্তব্য করেছিলেন যে, যে ব্যক্তি একাকী সমুদ্র পাড়ি দিয়ে অপরিচিত ভূমিতে গিয়ে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং সকল শত্রুকে পরাস্ত করতে পারে, সে নিঃসন্দেহে কুরাইশদের ঈগল।
টিকাঃ
২৬১. দেখুন : ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৪/১১২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/৩৩৯।
২৬২. দেখুন : লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ১০৬ ও ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/৭২。
২৬৩. ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/১০২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৩৬।
আবদুর রহমান আদদাখিল আন্দালুসের শাসনক্ষমতা গ্রহণ করার প্রায় আট বছর পর ১৪৬ হিজরীতে (৭৬৩ খৃষ্টাব্দে) এক ভয়াবহ বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা সংঘটিত হয়। এর নেতৃত্বে ছিলেন আল-আলা বিন মুগিস আল-হাযরামী। দ্বিতীয় আব্বাসী খলীফা আবু জাফর আল-মানসূর তাঁকে আন্দালুসে প্রেরণ করেন। উদ্দেশ্য ছিল আবদুর রহমান আদদাখিলকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং আন্দালুসকে আব্বাসী খেলাফতের অন্তর্ভুক্ত করা।
আলা বিন মুগিস আন্দালুসে পৌঁছে আব্বাসীয়দের কৃষ্ণ পতাকা উত্তোলন করেন। আবদুর রহমান আদদাখিল এ বিদ্রোহ মোকাবিলায় কালবিলম্ব করেননি। উভয় বাহিনীর মধ্যে বিরাট যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অন্যান্য বিদ্রোহ দমনের ন্যায় এ যুদ্ধেও তিনি জয়লাভ করেন। যুদ্ধে আব্বাসী বাহিনী শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং আলা বিন মুগিস নিহত হন। এ সংবাদ শুনে খলীফা আবু জাফর আল-মানসূর বলে ওঠেন, ‘আল্লাহর শোকর! যিনি আমাদের ও তাঁর (আবদুর রহমানের) মাঝে সমুদ্রকে অন্তরায় রেখেছেন।’ মূলত এ সময় থেকেই আব্বাসীয়রা আন্দালুস জয়ের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে দেয়। আব্বাসী খলীফা আবু জাফর আল-মানসূরই সর্বপ্রথম আবদুর রহমান আদদাখিলকে 'সাকরু কুরাইশ' বা 'কুরাইশী ঈগল' নামে অভিহিত করেন। তিনি বলেছিলেন, ‘একাকী পাড়ি দিয়েছেন উত্তাল সমুদ্র, অতিক্রম করেছেন বিজন মরুভূমি, একাকী প্রবেশ করেছেন এক অনারব ভূখণ্ডে, এরপর আবাদ করেছেন শহর-নগর, প্রস্তুত করেছেন সুদক্ষ সেনাবাহিনী, প্রণয়ন করেছেন বিভিন্ন দপ্তর এবং কেন্দ্রবিচ্ছিন্ন হয়েও আপন সহজাত নেতৃত্বগুণ, সুদক্ষ পরিকল্পনা ও অবিচল সহিষ্ণুতায় গড়ে তুলেছেন এক সুবিশাল রাষ্ট্র। তিনিই কুরাইশদের ঈগল।’
টিকাঃ
২৬০. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ১০০ ও ইবনে আযারী, ২/১০১।
২৬১. দেখুন : ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৪/১১২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/৩৩৯।
২৬২. দেখুন : লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ১০৬ ও ইবনে আযারী, ২/৭২।
২৬৩. ইবনে আযারী, ২/১০২ ও মাক্কারী, ৩/৩৬।
২৬৪. ইবনে আযারী, ২/১০৩।
📄 আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া ও আব্বাসী খেলাফত
আন্দালুস ও আব্বাসীয় খেলাফতের মধ্যকার এই দীর্ঘস্থায়ী শত্রুতা মূলত শুরু হয়েছিল আব্বাসীয়দের উমাইয়া-নিধন যজ্ঞের মাধ্যমে। আব্বাসীয়রা বনু উমাইয়ার সদস্যদের যেভাবে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল, তার ফলে উমাইয়াদের মধ্যে আব্বাসীয়দের প্রতি প্রচণ্ড অনাস্থা ও ঘৃণা তৈরি হয়েছিল। আবদুর রহমান আদদাখিল যদি দেখতেন যে আব্বাসীয়দের কাছে তাঁর জীবন ও মর্যাদা নিরাপদ, তবে হয়তো তিনি একটি ঐক্যবদ্ধ খেলাফতের অধীনে কাজ করতেন। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে তিনি আন্দালুসে একটি পৃথক উমাইয়া সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে বাধ্য হন। এটি ছিল ইসলামী ইতিহাসের এক বড় ট্র্যাজেডি যে, উম্মাহর একটি শক্তিশালী অংশ কেন্দ্রীয় খিলাফত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নীতি অনুযায়ী যে কোনো শত্রুকে আপন করে নেওয়ার যে আর্দশ ছিল, আব্বাসীয়রা তা পালনে ব্যর্থ হয়েছিল।
টিকাঃ
৯০০. লেখক অজ্ঞাত, তারিখে আব্বাসীয়, পৃ: ১৩৭ ও ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/১৯।
৯০১. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৪২।
আন্দালুস ও আব্বাসী খেলাফতের মাঝে দীর্ঘকাল ধরে বিচ্ছিন্নতা ও বৈরিতা বজায় ছিল। আবদুর রহমান আদদাখিলের মতো একজন বীর এবং সুদক্ষ রাজনীতিবিদ কী করে তৎকালীন মূল ইসলামী শক্তি আব্বাসী সালতানাত থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলেন? এর কারণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আব্বাসী খেলাফত সূচনালগ্নে বনু উমাইয়াদের প্রতি অত্যন্ত রূঢ় ও অমানবিক নীতি গ্রহণ করেছিল। তারা উমাইয়াদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করেছিল। এটি ছিল একটি মারাত্মক ভুল। আব্বাসীদের উচিত ছিল উমাইয়াদের কাছে টেনে নিয়ে তাঁদের মেধা ও অভিজ্ঞতাকে ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নয়নে কাজে লাগানো। কিন্তু তাঁরা তাঁদেরকে এমনভাবে কোণঠাসা করেছিলেন যে, উমাইয়া বংশধররা বাধ্য হয়েই আন্দালুসে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। আবদুর রহমান আদদাখিল যদি দেখতেন যে আব্বাসীদের কাছে তাঁর জীবন ও মর্যাদা নিরাপদ, তবে হয়তো তিনি উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে কাজ করতেন। কিন্তু নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় তিনি আন্দালুসে একটি শক্তিশালী উমাইয়া দুর্গ গড়ে তোলেন। আব্বাসী শাসকগণ পরবর্তী সময়ে তাঁদের প্রাথমিক নীতি থেকে সরে এলেও ততক্ষণে বিভাজন চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল।
টিকাঃ
৯০০. লেখক অজ্ঞাত, তারিখে আব্বাসীয়, পৃ: ১৩৭ ও ইবনে আযারী, ২/১৯।
৯০১. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৪২।
📄 বিদ্রোহ দমনে আবদুর রহমান আদদাখিলের নীতি পর্যালোচনা
আবদুর রহমান আদদাখিল তাঁর চৌত্রিশ বছরের শাসনামলে অসংখ্য বিদ্রোহের মোকাবিলা করেছেন। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যেহেতু আন্দালুসের জনসাধারণ তাঁকে শাসক হিসেবে গ্রহণ করেছিল, তাই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছিল অবৈধ। তিনি বিদ্রোহী দমনে অত্যন্ত কঠোর হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রথমে শান্তির প্রস্তাব দিতেন। তবে বিদ্রোহীরা যদি একরোখা হতো, তবে তিনি তলোয়ারের মাধ্যমে সমাধান করতেন। তাঁর এই নীতির ফলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ফ্রান্সের মতো সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে মুসলিমদের প্রভাব কিছুটা হ্রাস পেয়েছিল।
টিকাঃ
৯০৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪২।
আবদুর রহমান আদদাখিলের চৌত্রিশ বছরের শাসনামলে আন্দালুসের বিভিন্ন প্রান্তে অসংখ্য বিদ্রোহ সংঘটিত হয়েছে। শরীয়তের বিধান অনুযায়ী যেহেতু আন্দালুসের জনসাধারণ তাঁকে প্রশাসক হিসেবে মেনে নিয়েছিল, তাই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছিল অবৈধ। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশ হলো— যখন তোমরা কোনো ব্যক্তির নেতৃত্বে একমত হও, এরপর তোমাদের কেউ যদি ঐক্যে ভাঙন ধরাতে চায়, তবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করো। বিদ্রোহ দমনে আবদুর রহমান আদদাখিলের নীতি ছিল পুরোপুরি যথার্থ। এর মাধ্যমে যেমন ফিতনা দমিত হয়েছে, তেমনই রাষ্ট্রে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে তিনি সর্বদা প্রথমে বিদ্রোহীদের ক্ষমা করার ও শান্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করতেন। একান্ত বাধ্য না হলে তিনি সংঘাতের পথে যেতেন না।
টিকাঃ
৯০৫. সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ১৮৪২।
📄 আবদুর রহমান আদদাখিলের নতুন এক রাষ্ট্রব্যবস্থার বিনির্মাণ
আন্দালুসে যখন আবদুর রহমান আদদাখিলের অবস্থান সুদৃঢ় হলো এবং বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা তুলনামূলক হ্রাস পেলো, তখন তিনি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় মনোযোগী হলেন। তিনি একটি স্থায়ী ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সামরিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি উমাইয়াদের হারানো ঐতিহ্য ও শৌর্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু করেন এবং আন্দালুসকে একটি উন্নত ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।
আন্দালুসে যখন আবদুর রহমান আদদাখিলের অবস্থান সুদৃঢ় হলো এবং বিদ্রোহ-প্রচেষ্টা তুলনামূলক হ্রাস পেলো, তখন তিনি রাষ্ট্রের পুনর্গঠন পরিকল্পনায় মনোযোগী হলেন। তিনি একটি আধুনিক ও শক্তিশালী রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে সামরিক, বিচারিক ও প্রশাসনিক সকল খাতে ব্যাপক সংস্কার সাধন করেন। তিনি উমাইয়াদের হারানো ঐতিহ্য পুনরায় ফিরিয়ে আনার জন্য কাজ শুরু করেন এবং আন্দালুসকে একটি উন্নত ইসলামী সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করেন।