📄 আন্দালুস-ভূমিতে আবদুর রহমান আদদাখিল
আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া একাকী আন্দালুসের তীরে অবতরণ করলেন। সেখানে তাঁর মুক্ত ক্রীতদাস বদর তাঁকে স্বাগত জানালেন। সে সময় আন্দালুসের শাসনকর্তা ছিলেন ইউসুফ আলফিহরী। তিনি তখন দেশের উত্তর অংশে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। আবদুর রহমান আন্দালুস-ভূমিতে পা রাখতেই বনু উমাইয়ার সমর্থক গোষ্ঠী, বার্বার সম্প্রদায় এবং ইউসুফ আলফিহরীর বিরোধী বিভিন্ন গোত্রের লোকজন তাঁর পাশে সমবেত হতে শুরু করল। বিশেষ করে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া উমাইয়া রাজবংশের সদস্য এবং ইয়ামেনী আরবরা তাঁর সাথে যোগ দিল। ইয়ামেনীদের নেতা আবুল সাবাহ আল-ইয়াহসাবী সেভিলে আবদুর রহমানকে স্বাগত জানান এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সেভিল তখন ইউসুফ আলফিহরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল। আবদুর রহমান প্রথমে ইউসুফ আলফিহরীর কাছে পত্র পাঠিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানের আশ্বাস দেন। কিন্তু ইউসুফ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
৯৩৪. ইবনে আযারী, আখবারুল মাজমুআ, পৃ: ৭৩, মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৬ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪২।
৯৩৫. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/১১।
৯৩৬. প্রাগুক্ত, ৫/১২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৬।
📄 মাসারার যুদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় দিকেই ছিল মুসলিম পক্ষ। এটি ছিল আন্দালুসের ইতিহাসের এক দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু অনিবার্য সংঘাত। ১৩৬ হিজরীর জিলহজ্ব মাসে মাসারা (Masara) নামক প্রান্তরে ইউসুফ আলফিহরী ও আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়ার বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইউসুফ আলফিহরীর পক্ষে লড়ছিল কায়সী বাহিনী, আর আবদুর রহমানের মূল শক্তি ছিল ইয়ামেনীরা। যুদ্ধের আগে ইয়ামেনীরা আবদুর রহমানের বীরত্ব নিয়ে সংশয়ে ছিল যে, তিনি হয়তো বিপদে পড়লে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যাবেন। এই সন্দেহ দূর করতে আবদুর রহমান নিজের ঘোড়াটি ইয়ামেনী নেতা আবুস সাবাহকে দিয়ে তাঁর ধীরগতির খচ্চরটি চেয়ে নেন এবং তাতে চড়েই রণক্ষেত্রে এগিয়ে যান। তাঁর এই অকুতোভয় মানসিকতা দেখে সৈন্যরা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া জয়ী হন এবং ইউসুফ আলফিহরী রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
টিকাঃ
৯৩৭. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৭৮ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪২।
৯৩৮. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৮৮-৯১।
৯৩৯. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৯১ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪৬।
📄 আবদুর রহমান আদদাখিলের মহত্ত্ব, প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার নিদর্শন
মাসারা প্রান্তরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবদুর রহমান যখন ইউসুফ আলফিহরীর প্রাসাদ দুর্গ দখল করেন, তখন তাঁর এক অনন্য প্রশাসনিক ও মানবিক গুণ প্রকাশ পায়। বিজয়ী সৈন্যরা যখন পরাজিত পক্ষের পলায়নপর সদস্যদের ওপর হামলা করতে এবং পরিবারের সদস্যদের বন্দী করতে উদ্যত হয়, তখন আবদুর রহমান তাঁদের বাধা দিয়ে বলেন, ‘এমন শিকড় উপড়ে ফেলো না, ভবিষ্যতে যার ফল প্রত্যাশা করো।’ তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, আজ যারা শত্রু, আগামীতে তারাই আমাদের দেশের রক্ষক ও শক্তিশালী সৈন্যে পরিণত হবে। তিনি ইউসুফ আলফিহরীর পরিবারের সদস্যদের কোনো ক্ষতি না করে বরং তাঁদেরকে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ করে দেন এবং তাঁদের লুষ্ঠিত সম্পদ ফিরিয়ে দেন। আবদুর রহমান আদদাখিলের এই দূরদর্শিতা ও মহত্ত্বই পরবর্তীতে অনেক বিদ্রোহীকে তাঁর অনুগত হতে সাহায্য করেছিল। তিনি রাজনৈতিক ও শরয়ী উভয় বিধান অনুযায়ী বিদ্রোহীদের প্রতি উদারতা প্রদর্শন করেন।
টিকাঃ
৯৪০. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৭।
৯৪১. ইবনুল আরাবী, আল-মুহাদ্দাসাতুস সুলতানিয়া, পৃ: ২৯ ও ইবনুল কায়সারানী, ফিদলুল জিয়ার, পৃ: ১০১১।
📄 আবদুর রহমান আদদাখিল ও আবুস সাবাহর মধ্যে দ্বন্দ্ব
মাসারা প্রান্তরে যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আবদুর রহমান যখন ইউসুফ আলফিহরীর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন এবং সম্পদ লুটপাটে বাধা দিলেন, তখন ইয়ামেনী নেতা আবুস সাবাহ আল-ইয়াহসাবী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হলেন। তিনি মনে করেছিলেন আবদুর রহমান তাঁর নিজ বংশীয়দের (কায়সীদের) প্রতি পক্ষপাতিত্ব করছেন। আবুস সাবাহ তাঁর অনুসারীদের প্ররোচিত করে আবদুর রহমানকে হত্যার ষড়যন্ত্র করেন, যেন শাসনক্ষমতা পুরোপুরি ইয়ামেনীদের হাতে চলে আসে। আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া এই গোপন ষড়যন্ত্রের খবর পেয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে বিষয়টি চেপে যান এবং প্রকাশ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। তিনি ধৈর্য ধারণ করেন যাতে এই নাজুক সময়ে মুসলমানদের মধ্যে নতুন কোনো বিভেদ সৃষ্টি না হয়। প্রায় এগার বছর পর আবদুর রহমান আবুস সাবাহকে তাঁর পদ থেকে অপসারিত করেন এবং আন্দালুসে নিজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন।
টিকাঃ
২৪২. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৮৩-৮৪ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৪।
২৪৩. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৮৫-৮৬ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৫।
২৪৪. দেখুন : ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ২/৫৩।