📄 আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া কাহিনী
আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়ার আন্দালুসে প্রবেশের ঘটনা সম্পূর্ণভাবে বোঝার জন্য আমাদের একটু পেছনে (১৩২ হিজরীতে/৭৫০ খৃষ্টাব্দে) ফিরে যেতে হবে। এই সময়কালটি ছিল মুসলিম প্রাচ্যে বনু উমাইয়ার খেলাফতের পতনকাল। আব্বাসীয়রা এই সময় বনু উমাইয়ার যারাই খেলাফতের দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত ছিল, তাদের প্রায় সবাইকে নির্বিচারে হত্যা করেছিল। উমাইয়া রাজবংশের অল্প কয়েকজন রাজপুত্রই সেই সময় আব্বাসীয়দের খড়গ থেকে বাঁচতে পেরেছিলেন। বনু আব্বাস যে সমস্ত উমাইয়া রাজপুত্রদের নাগাল পায়নি, তাঁদেরই একজন হলেন খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের পৌত্র আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া। তাঁর সম্পর্কে তাঁর পিতামহের ভাই মাসলামা বিন আব্দুল মালিক শৈশবেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তিনি হবেন উমাইয়াদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের কারিগর।
আব্বাসীয়দের অভ্যুত্থানের সময় আবদুর রহমান সিরিয়ার একটি গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন। যখন আব্বাসীয় সেনারা গ্রামটি ঘিরে ফেলে, তখন তিনি তাঁর ছোট ভাই হিশামকে নিয়ে পালিয়ে ফুরাত নদীর তীরে পৌঁছান। প্রাণ বাঁচাতে তাঁরা দুই ভাই নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতার কাটতে শুরু করেন। ধাওয়া করা সেনারা তাঁদের অভয় দিয়ে ফিরে আসতে বলে। কিশোর হিশাম তাদের কথায় বিশ্বাস করে ফিরে গেলে তক্ষুণি তাঁকে হত্যা করা হয়। আবদুর রহমান কোনোমতে নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে পৌঁছান এবং দীর্ঘ বন্ধুর পথ অতিক্রম করে লিবিয়া, মিশর ও তিউনিসিয়া হয়ে মাগরেবে (উত্তর আফ্রিকা) পৌঁছান। সেখানে তিনি পাঁচ বছর আত্মগোপন করে থাকেন। সেই সময়ে মাগরেবের প্রশাসক আবদুর রহমান বিন হাবীব উমাইয়াদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন, কারণ তিনি আশঙ্কা করেছিলেন যে কোনো উমাইয়া রাজপুত্র তাঁর ক্ষমতা দখল করতে পারে। বিশেষ করে মাসলামা বিন আব্দুল মালিকের একটি ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী তিনি আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়াকে হত্যার চেষ্টা করেন। প্রাণ বাঁচাতে আবদুর রহমান এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যাযাবরের ন্যায় ঘুরে বেড়াতে থাকেন।
টিকাঃ
২৪১. ইবনে কুতায়বা, আল-মাআরিফ ওয়াল রিওয়ায়া, ১০/৪৮ ও ইবনে খালদুন, তারিখে ইবনে খালদুন, ৩/৩৩২।
২৪২. ইবনে আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ১/৫১ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ১/২৩৯।
২৪৩. মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৩১৩।
২৪৪. আযারী, আলবায়ানুল মুগরিব, ৪/১২৯।
📄 আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়ার আন্দালুস-প্রবেশ পরিকল্পনা
১৩৬ হিজরীতে (৭৫৩ খৃষ্টাব্দে) আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া আন্দালুসে প্রবেশ করার জন্য প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। এই লক্ষ্যে তিনি অত্যন্ত ধীরস্থির ও সুপরিকল্পিত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত, তিনি আন্দালুসের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং সেখানকার প্রভাবশালী শক্তিগুলোর অবস্থান বোঝার জন্য তাঁর বিশ্বস্ত ও মুক্ত ক্রীতদাস বদরকে সেখানে প্রেরণ করেন। আন্দালুসে তখন ইয়ামেনী ও কায়সী আরবদের মধ্যে প্রচণ্ড দ্বন্দ্ব চলছিল, যা ছিল ইবনে মুয়াবিয়ার জন্য একটি বড় সুযোগ। দ্বিতীয়ত, বদরের মাধ্যমে তিনি আন্দালুসে বসবাসরত উমাইয়া সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাঁদের আনুগত্য কামনা করেন। বদর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে উমাইয়া মাওয়ালী এবং ইয়ামেনী নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। কায়সী নেতা সুমাইল বিন হাতেম উমাইয়াদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের বিপক্ষে অবস্থান নিলেও ইয়ামেনীরা আবদুর রহমানের প্রস্তাবকে স্বাগত জানায়। অবশেষে বদর আবদুর রহমানের কাছে বার্তা পাঠান যে, পরিস্থিতি এখন অনুকূল। আবদুর রহমান ‘তামাম’ নামক এক ব্যক্তির মাধ্যমে এই শুভ বার্তাটি লাভ করেন। এরপর তিনি কালবিলম্ব না করে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে আন্দালুসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন।
টিকাঃ
২২৩. আযারী, আল-মুগরিব, ১/২৬৬ ও ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৬১।
২২৪. আযারী, আল-মুগরিব, ১/২৬৬ ও আল-কিন্দী, আল-ইসতিফসার, ১৫/৯৬।
২২৫. আযারী, আল-মুগরিব, ১/২৬৬ ও ইবনে কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১০/৬০।
২২৬. ইবনে আযারী, আল-কামিল, ১/২৬৬।
📄 আন্দালুস-ভূমিতে আবদুর রহমান আদদাখিল
আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া একাকী আন্দালুসের তীরে অবতরণ করলেন। সেখানে তাঁর মুক্ত ক্রীতদাস বদর তাঁকে স্বাগত জানালেন। সে সময় আন্দালুসের শাসনকর্তা ছিলেন ইউসুফ আলফিহরী। তিনি তখন দেশের উত্তর অংশে বিদ্রোহ দমনে ব্যস্ত ছিলেন। আবদুর রহমান আন্দালুস-ভূমিতে পা রাখতেই বনু উমাইয়ার সমর্থক গোষ্ঠী, বার্বার সম্প্রদায় এবং ইউসুফ আলফিহরীর বিরোধী বিভিন্ন গোত্রের লোকজন তাঁর পাশে সমবেত হতে শুরু করল। বিশেষ করে পালিয়ে বেঁচে যাওয়া উমাইয়া রাজবংশের সদস্য এবং ইয়ামেনী আরবরা তাঁর সাথে যোগ দিল। ইয়ামেনীদের নেতা আবুল সাবাহ আল-ইয়াহসাবী সেভিলে আবদুর রহমানকে স্বাগত জানান এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। সেভিল তখন ইউসুফ আলফিহরীর নিয়ন্ত্রণের বাইরের একটি শক্তিশালী কেন্দ্র ছিল। আবদুর রহমান প্রথমে ইউসুফ আলফিহরীর কাছে পত্র পাঠিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাব দেন এবং তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রদানের আশ্বাস দেন। কিন্তু ইউসুফ সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।
টিকাঃ
৯৩৪. ইবনে আযারী, আখবারুল মাজমুআ, পৃ: ৭৩, মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৬ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪২।
৯৩৫. ইবনুল আছীর, আল-কামিল ফিত তারিখ, ৫/১১।
৯৩৬. প্রাগুক্ত, ৫/১২ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/৬৬।
📄 মাসারার যুদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্রে উভয় দিকেই ছিল মুসলিম পক্ষ। এটি ছিল আন্দালুসের ইতিহাসের এক দুর্ভাগ্যজনক কিন্তু অনিবার্য সংঘাত। ১৩৬ হিজরীর জিলহজ্ব মাসে মাসারা (Masara) নামক প্রান্তরে ইউসুফ আলফিহরী ও আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়ার বাহিনীর মধ্যে ঐতিহাসিক এই যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইউসুফ আলফিহরীর পক্ষে লড়ছিল কায়সী বাহিনী, আর আবদুর রহমানের মূল শক্তি ছিল ইয়ামেনীরা। যুদ্ধের আগে ইয়ামেনীরা আবদুর রহমানের বীরত্ব নিয়ে সংশয়ে ছিল যে, তিনি হয়তো বিপদে পড়লে দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে যাবেন। এই সন্দেহ দূর করতে আবদুর রহমান নিজের ঘোড়াটি ইয়ামেনী নেতা আবুস সাবাহকে দিয়ে তাঁর ধীরগতির খচ্চরটি চেয়ে নেন এবং তাতে চড়েই রণক্ষেত্রে এগিয়ে যান। তাঁর এই অকুতোভয় মানসিকতা দেখে সৈন্যরা উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড যুদ্ধের পর আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া জয়ী হন এবং ইউসুফ আলফিহরী রণাঙ্গন ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
টিকাঃ
৯৩৭. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৭৮ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪২।
৯৩৮. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৮৮-৯১।
৯৩৯. লেখক অজ্ঞাত, আখবারুল মাজমুআ, পৃ : ৯১ ও ইবনুল আছীর, আল-বায়ানুল মুগরিব, ২/৪৬।