📄 সামীল বিন হাতিম ও ইউসুফ আলফিহরী
বিবাদমান কায়সী ও ইয়ামানী গোষ্ঠীগুলোকে শান্ত করতে এবং আন্দালুসে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ৪২৬ হিজরীর দিকে সামীল বিন হাতিম ও ইউসুফ আলফিহরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সামীল ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও প্রভাবশালী একজন নেতা। তিনি ইউসুফ আলফিহরীকে সামনে রেখে কার্যত শাসন পরিচালনা করতেন। তাঁরা ইয়ামেনীদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসেন যে, পালাক্রমে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। কিন্তু সামীল নিজের প্রভাব বজায় রাখতে বারবার চুক্তি ভঙ্গ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা টলেডোর বনু যিননূনদের সঙ্গেও মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ইউসুফ আলফিহরী ১৩২ হিজরী পর্যন্ত আন্দালুসে নিজের শাসন বজায় রাখতে পারলেও তাঁর শাসনামল ছিল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতায় ভরা। বস্তুত এই সময়টিই ছিল উমাইয়া রাজপুত্র আবদুর রহমান আদদাখিলের আগমনের ক্ষেত্র তৈরির মুহূর্ত।
📄 চলমান সময়কালে মুসলিম প্রাচ্যে খেলাফত-পরিস্থিতি
১২৫ হিজরীতে উমাইয়া খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুর পর দামেশকের খেলাফতে ভাঙন ধরতে শুরু করে। তাঁর পর দ্বিতীয় ওয়ালিদ ক্ষমতায় বসেন, কিন্তু তাঁর বিলাসিতা ও অযোগ্যতার কারণে তিনি নিজ বংশীয়দের হাতেই নিহত হন। এরপর তৃতীয় ইয়াজীদ ও ইবরাহীম বিন ওয়ালিদ অতি অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসেন। উমাইয়াদের এই গৃহবিবাদের সুযোগে আব্বাসীয় আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। সর্বশেষ উমাইয়া খলীফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ (মারওয়ান-২) বিদ্রোহীদের দমনে আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ১৩২ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে ‘যাব’ নদীর তীরে সংঘটিত যুদ্ধে উমাইয়া বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং আব্বাসী সালতানাতের উত্থান ঘটে। আব্বাসীয়রা বনু উমাইয়ার সদস্যদের নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে, যা থেকে বাঁচতে আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া পালিয়ে মাগরেবে চলে আসেন।
📄 প্রশাসক-আমলের দ্বিতীয় ধাপে সংঘটিত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাপ্রবাহ
প্রশাসক আমলের এই দ্বিতীয় ধাপে (১২৩-১৩৮ হিজরী) কয়েকটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা আন্দালুসের ইতিহাসে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। প্রথমত, উত্তর-পশ্চিম আন্দালুসে ‘লিওন’ নামক খ্রিষ্টান রাষ্ট্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। দ্বিতীয়ত, আন্দালুসের প্রশাসন দামেশকের কেন্দ্রীয় খেলাফত থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, ভয়াবহ খারেজী বিদ্রোহ বার্বারদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং মুসলিম ঐক্য বিনষ্ট হয়। চতুর্থত, কায়সী ও ইয়ামানী আরবদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ স্থায়ী রূপ ধারণ করে। পঞ্চমত, আমীরিয়া সালতানাতের পতন এবং উমাইয়া খেলাফতের বিলুপ্তি ঘটে। এই সংকটময় মুহূর্তেই ১৩৮ হিজরীর যিলহজ্ব মাসে আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া আন্দালুসে পদার্পণ করেন, যা এক নতুন যুগের সূচনা করে।
📄 প্রশাসক-আমলের দ্বিতীয় স্তরের বৈশিষ্ট্যাবলি
এই আমলের শাসনব্যবস্থায় চারটি মৌলিক নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়:
১. সম্পদপ্রীতি: বিজয়লব্ধ অঢেল সম্পদ পাওয়ার পর মুসলমানদের মধ্যে দুনিয়াবী লোভ-লালসা বৃদ্ধি পায়, যা তাদের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদ সৃষ্টি করে। নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগেই সতর্ক করেছিলেন যে, উম্মতের বড় পরীক্ষা হবে সম্পদ।
২. গোত্রবাদ ও সাম্প্রদায়িক চিন্তাধারার আত্মপ্রকাশ: আরব ও বার্বারদের মধ্যে এবং পরবর্তীতে আরবদের নিজেদের মধ্যে কায়সী-ইয়ামানী বিভেদ চরম আকার ধারণ করে। জাহেলী যুগের এই গোত্রবাদ ইসলামের ভ্রাতৃত্বের চেতনাকে গ্রাস করে ফেলে।
৩. প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা: শাসক ও প্রশাসকরা প্রজাদের অধিকারের চেয়ে নিজেদের ক্ষমতার সুরক্ষা ও বিলাসিতায় মত্ত ছিলেন। আব্দুল মালিক বিন কাতানের মতো অনেক প্রশাসক ছিলেন জালিম ও অদূরদর্শী।
৪. বিজয়াভিযান পরিত্যাগ: অভ্যন্তরীণ কলহ ও বিদ্রোহের কারণে খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো বন্ধ হয়ে যায়। ফলে পিরেনিজ পর্বতমালা পেরিয়ে ফ্রান্সে যে বিজয়াভিযান শুরু হয়েছিল, তা স্থবির হয়ে পড়ে এবং উত্তর-পশ্চিমের খ্রিষ্টান শক্তিগুলো শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পায়।
টিকাঃ
১২১. সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩০৩৩।