📄 খারেজী ফিতনা ও বিদ্রোহ এবার আন্দালুস-ভূমিতে
প্রশাসক ও প্রশাসনবিরোধী এই বিদ্রোহ কেবল উত্তর আফ্রিকায় সীমাবদ্ধ রইল না, তা দ্রুত আন্দালুসেও ছড়িয়ে পড়ল। আন্দালুসে বসবাসরত বার্বার জনগোষ্ঠী প্রশাসনের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করল। বিশেষ করে উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের গ্যালিসিয়া ও আস্তুরিয়া এলাকায় বিদ্রোহ প্রবল আকার ধারণ করে। বিদ্রোহীরা তিনটি বড় বাহিনীতে বিভক্ত হয়ে টলেডো, কর্ডোভা এবং জাজিরাতুল খাদরা বা দক্ষিণ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে আব্দুল মালিক বিন কাতান দিশেহারা হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত তিনি মাগরেবে অবরুদ্ধ হয়ে থাকা শামী বাহিনীর নেতা বালজ বিন বিশারকে সাহায্য করার জন্য আন্দালুসে ডেকে পাঠান। শামী বাহিনী আন্দালুসে প্রবেশ করে বিদ্রোহীদের দমন করলেও পরবর্তীতে তারা নিজেরাই ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়।
টিকাঃ
১০৬. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ : ৪২।
১০৯. ড. হুসাইন মুনিস, ফাতহুল আন্দালুস, পৃ : ১৭৪-১৭৬।
📄 কায়সী-ইয়ামানী সংঘাত
বিদ্রোহীদের দমনের পর বালজ বিন বিশার ও আব্দুল মালিক বিন কাতানের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়। বালজ বিন বিশারের শামী বাহিনী বয়োবৃদ্ধ আব্দুল মালিক বিন কাতানকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে। এই হত্যাকাণ্ডের ফলে আন্দালুসে কায়সী ও ইয়ামানী আরবদের মধ্যে সুপ্রাচীন গোষ্ঠীগত সংঘাত পুনরায় জেগে ওঠে। আব্দুল মালিকের দুই পুত্র কাতান ও উমাইয়া তাঁদের বাবার হত্যার প্রতিশোধ নিতে সেনাবাহিনী সংগ্রহ করেন। ১২৪ হিজরীতে ‘আকবাতুল বকর’ নামক স্থানে উভয় বাহিনীর মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়, যাতে বালজ বিন বিশার জয়ী হলেও মারাত্মকভাবে আহত হয়ে পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে সা’লাবা বিন সা’লামা দায়িত্ব নেন এবং গৃহযুদ্ধ আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে।
টিকাঃ
১১০. শামের কর্তৃপক্ষ কর্তৃক রাজপরিবারের কাউকে খলিফা পদমর্যাদায় ঘোষণা করা হলে তাঁকে খলিফা বলা হতো। (অনুবাদক)
১১১. লেখক অজ্ঞাত, ‘আখবারুন মাজমুআ’, পৃ : ৫৬ ও মাক্কারী, নফহুত তীব, ৩/১৩。
📄 সামীল বিন হাতিম ও ইউসুফ আলফিহরী
বিবাদমান কায়সী ও ইয়ামানী গোষ্ঠীগুলোকে শান্ত করতে এবং আন্দালুসে স্থিতিশীলতা ফেরাতে ৪২৬ হিজরীর দিকে সামীল বিন হাতিম ও ইউসুফ আলফিহরী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সামীল ছিলেন অত্যন্ত চতুর ও প্রভাবশালী একজন নেতা। তিনি ইউসুফ আলফিহরীকে সামনে রেখে কার্যত শাসন পরিচালনা করতেন। তাঁরা ইয়ামেনীদের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসেন যে, পালাক্রমে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। কিন্তু সামীল নিজের প্রভাব বজায় রাখতে বারবার চুক্তি ভঙ্গ করতে থাকেন। এক পর্যায়ে তারা টলেডোর বনু যিননূনদের সঙ্গেও মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হন। ইউসুফ আলফিহরী ১৩২ হিজরী পর্যন্ত আন্দালুসে নিজের শাসন বজায় রাখতে পারলেও তাঁর শাসনামল ছিল প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা ও দুর্বলতায় ভরা। বস্তুত এই সময়টিই ছিল উমাইয়া রাজপুত্র আবদুর রহমান আদদাখিলের আগমনের ক্ষেত্র তৈরির মুহূর্ত।
📄 চলমান সময়কালে মুসলিম প্রাচ্যে খেলাফত-পরিস্থিতি
১২৫ হিজরীতে উমাইয়া খলীফা হিশাম বিন আব্দুল মালিকের মৃত্যুর পর দামেশকের খেলাফতে ভাঙন ধরতে শুরু করে। তাঁর পর দ্বিতীয় ওয়ালিদ ক্ষমতায় বসেন, কিন্তু তাঁর বিলাসিতা ও অযোগ্যতার কারণে তিনি নিজ বংশীয়দের হাতেই নিহত হন। এরপর তৃতীয় ইয়াজীদ ও ইবরাহীম বিন ওয়ালিদ অতি অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় আসেন। উমাইয়াদের এই গৃহবিবাদের সুযোগে আব্বাসীয় আন্দোলন প্রবল আকার ধারণ করে। সর্বশেষ উমাইয়া খলীফা মারওয়ান বিন মুহাম্মাদ (মারওয়ান-২) বিদ্রোহীদের দমনে আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। ১৩২ হিজরীর জুমাদাল উখরা মাসে ‘যাব’ নদীর তীরে সংঘটিত যুদ্ধে উমাইয়া বাহিনী চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয় এবং আব্বাসী সালতানাতের উত্থান ঘটে। আব্বাসীয়রা বনু উমাইয়ার সদস্যদের নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করে, যা থেকে বাঁচতে আবদুর রহমান বিন মুয়াবিয়া পালিয়ে মাগরেবে চলে আসেন।